আস সালিহ আইয়ুব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আস-সালিহ নাজম আল-দ্বীন আইয়ুব
মিশরের শাসক
রাজত্বজুন ১২৪০ – নভেম্বর ২২, ১২৪৯
পূর্বসূরিআল-আদিল দ্বিতীয়
উত্তরসূরিআাল-মুয়াজ্জেম তুরানশাহ
জন্ম৫ নভেম্বর ১২০৫
কায়রো
মৃত্যু২২ নভেম্বর ১২৪৯(1249-11-22) (বয়স ৪৪)
আল মানসুরাহ
জীবনসঙ্গীশাজরাতুদ দুর
বংশধরআল-মুয়াজ্জেম তুরানশাহ
পূর্ণ নাম
আল-মালিক আস-সালিহ নাজম আল-দ্বীন আইয়ুব
পিতাআল-কামিল
ধর্মইসলাম

আল-মালিক আস-সালিহ নাজম আল-দ্বীন আইয়ুব ( আরবি: الملك الصالح نجم الدين ايوب‎‎  ; (৫ নভেম্বর ১২০৫ - ২২ নভেম্বর ১২৪৯) উপনাম আবু আল-ফুতু (أبو الفتوح), যিনি আল-মালিক আল-সালিহ নামেও পরিচিত, ১২৪০ থেকে ১২৪৯ পর্যন্ত মিশরের আইয়ুবী সালতানাতের শাসক ছিলেন। তাকে বলা যায় আইয়ুবী রাজবংশের শেষ যোগ্য শাসক। তিনি ক্রুসেডারদের কাছ থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের জন্য স্মরণীয়।

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

১২২১ সালে পঞ্চম ক্রুসেডের শেষে আস-সালিহ জিম্মি হয়েছিলেন, যখন জন অব ব্রাইন আস-সালিহ এর বাবা আল-কামিল এর নিকট জিম্মি হন, যতদিন না মিশর দমইয়াত পুনর্দখল ও পুনঃনির্মাণ করে।[১] ১২৩২ সালে তাকে জাজিরার হাসানকীফের শাসনভার দেওয়া হয়, যা তার বাবা আর্তুকীদের কাছ থেকে দখল করেছিলেন। ১২৩৪ সালে বাবার বিরুদ্ধে মামলুকদের সাথে ষড়যন্ত্রের সন্দেহে তাঁর বাবা তাঁকে উত্তরাধিকার থেকে সরিয়ে দামেস্ক পাঠিয়ে দেন। এর পরপরই তাঁর চাচা আস-সালিহ ইসমাইল তাকে দামেস্ক থেকে বহিষ্কার করলে তিনি পালিয়ে জাজিরা পৌঁছে, খোয়ারিজমীদের সাথে যোগ দেন।

[২] ১২৩৮ সালে আল কামিলের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। তখন সিংহাসনের দাবীদার ছিলেন দু'জন, মিশরে দ্বিতীয় আল আদিল এবং জাজিরায় আস-সালিহ। এই বিরোধের জেরে ১২৩৯ সালে তিনি দামেস্ক দখল করে, একে তার রাজ্যবিস্তারের ভিত হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।[২] তাঁর বাবার প্রবীণ আমীররা তাকে সমর্থন দিয়ে তাঁর ভাইকে সিংহাসনচূত্য করতে অনুরোধ করেন। ১২৪০ সালের শুরুতে, যখন তিনি মিশর দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, জানতে পারেন যে তাঁর ভাইকে সৈন্যরা বন্দী করে তাঁকে সিংহাসনে আরোহণ করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।[২] শেষমেশ ১২৪০ সালের জুন মাসে আস-সালিহ বিজয়ী বেশে কায়রোতে প্রবেশ করেন এবং আইয়ুবী সালতানাতের সর্বস্বীকৃত শাসক হিসেবে সিংহাসনে বসেন।[২]

মামলুকদের উত্থান[সম্পাদনা]

কায়রোর সিংহাসনে আরোহণের পর, আস-সালিহ মোটেও নিরাপদ ছিলেন না। আইয়ুবী রাজবংশের তো বটেই, কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর আনুগত্যের প্রকৃতিও ছিল জটিল। আশরাফিয়া নামক একদল আমীর তাকে হটিয়ে তার চাচা আস-সালিহ ইসমাইলকে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্র করছিল, যিনি কি না তাঁর দামেস্ক ত্যাগের পর দামেস্ক পুনর্দখল করেছিলেন। আস-সালিহ নিজেকে কায়রোর দূর্গে বন্দী করে নেন, তিনি তাঁর একসময়ের অনুগত আমীরদেরকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, যারা কি না তাঁকে ক্ষমতায় এনেছিল। অনুগত সৈনিকের অভাবে তিনি প্রচুর কিপচাক দাস কিনতে শুরু করেন। মধ্য এশিয়ায় মোঙ্গল আক্রমণের কারণে এদের সংখ্যা বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। তারা শীঘ্রই তাঁর সেনাবাহিনীতে তাদের নিজস্ব বিভাগ গড়ে তোলে এবং মূল বাহিনীতে পরিণত হয়, যা মামলুক বাহিনী বলে পরিচিত ছিল।[২] আস-সালিহ মামলুক বাহিনীকে ব্যবহারকারী প্রথম আইয়ুবী সুলতান ছিলেন না, তবে তাঁর পূর্বসূরীরা কেউ তাঁর মতো তাদের উপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েননি।[৩] স্বল্প সংখ্যক মামলুককে বাহিনীতে নিযুক্ত করার পরিবর্তে, তিনি হাজারখানেক সৈন্যের দু'টি বাহিনী গঠন করেন।[৪] এদের বড়টির নাম বাহারিয়্যা, কেননা তাদের শিবির ছিল নীলনদের বুকে 'রাওদাহ দ্বীপে[৩] [৪], আর ছোটটির নাম জামদারিয়া, কেননা তাঁরা আস-সালিহের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।[৪] যেহেতু পরবর্তীকালে আইয়ুবী রাজবংশকে উচ্ছেদ করে নিজেরাই ক্ষমতা দখল করেছিল, তাই আস-সালিহের অধীনে তাদের প্রাথমিক জাগরণ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত হয়। আস-সালিহের মৃত্যুর পর যেসব বাহারিয়্যারা মিশরের ক্ষমতা দখল করে, তাদেরকে বাহরি মামলুক বলে অভিহিত করা হয়। আস-সালিহ নিজে যেসব বাহরি মামলুকদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন, তাদেরকে আবার কখনো কখনো সালিহিয়্যা বলা হয়। অবশ্য, তাঁর জীবিতাবস্থায় শব্দদ্বয় সমার্থকই ছিল।

আইয়ুবি রাজ্য ও ক্রুসেডারদের সাথে যুদ্ধসমূহ[সম্পাদনা]

১২৪০-১২৪৩ সালের সময়কাল সামরিক ও কুটনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল ছিল। এর সাথে জড়িত ছিল ফিলিস্তিনের ক্রুসেডার রাজ্যগুলো, ব্যারনের ক্রুসেডের সময় আগত ইউরোপীয় সেনাসদস্যরা, সিরিয়া দখল নেওয়া অন্যান্য আইয়ুবী শাসকরা এবং দিয়ার মুদার এর খোয়ারেজমীরা, যারা কি না আস-সালিহের মিত্র ছিলেন।

সক্রিয়ভাবে মিশর শাসনের জন্য বাহরি মামলুকরা তাঁর জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, খোয়ারেজমীরাও তেমন ছিল আশেপাশের আইয়ুবী বংশোদ্ভূত শাসকদের উপর প্রভাব বজায় রাখার জন্য।

১২৪৪ সালে[৩] আস-সালিহের নির্দেশে খোয়ারেজমীরা সিরিয়াফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয় এবং জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে, যা কিনা ষষ্ঠ ক্রুসেডের সময় আল-কামিল হলি রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিখের কাছে হস্তান্তরে বাধ্য হয়েছিলেন।

পরের বছর আস-সালিহ পুনরায় খোয়ারেজমীদের সঙ্গে নিয়ে লা ফোবিয়ার যুদ্ধে ক্রুসেডার জেরুজালেম রাজ্যের মিত্র সিরিয়ার আস-সালিহ ইসমাইলকে পরাজিত করেন।

১২৪৫ সালে আস-সালিহ দামেস্ক পুনর্দখল করেন[২] এবং তৎকালীন বাগদাদের খলিফা আল মুসতাসিম তাকে সুলতান পদবী প্রদান করেন।

যদিও তিনি তাঁর রাজ্যের সীমানা দামেস্ক থেকে বেশীদূর প্রসারিত করতে সক্ষম হননি,[৩] তবে তিনি সা'দ আল-দ্বীন আল-হুমাইদীর অধীনে বালবাক আমীরাত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। [৫]

১২৪৬ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁর খোয়ারেজমী মিত্ররা বিপদজনকভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেছে, তাই তিনি হোমসের কাছেই তাদের পরাজিত করে, তাদের নেতাকে হত্যা করেন এবং অবশিষ্টদেরকে সিরিয়াফিলিস্তিন অঞ্চলে ছত্রভঙ্গ করে দেন।[৩]

খোয়ারেজমীদের পুনরুদ্ধারের পর আস-সালিহ সরাসরি জেরুজালেমের দখল নিলে, তা ইউরোপকে এক নতুন ক্রুসেডের দিকে ধাবিত করে, এবং ফ্রান্সের নবম লুই ক্রুশ ধারণ করেন।[৩]

এসময় তাদের সংগঠিত হতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল, তবে ১২৪৯ সালে নবম লুই সপ্তম ক্রুসেডের ঘোষণা দেন[৬] এবং মিশর আক্রমণ করে দমইয়াত দখল করেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

আস-সালিহ যখন ক্রুসেডারদের আক্রমণের খবর পান, তখন তিনি মিশর থেকে দূরে সিরিয়ায় তাঁর চাচার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি যথাসম্ভব দ্রুত মিশরে ফিরে আসেন এবং আল মানসুরায় শিবির স্থাপন করেন। এখানেই একটা মারাত্মক ফোঁড়ার কবল থেকে জীবন রক্ষার্থে তাঁর এক পা কেটে ফেলা হয়, তবুও ২২শে নভেম্বর তিনি মারা যান।[৭][৮] আস-সালিহ তাঁর উত্তরসূরী আল মুয়াজ্জেম তুরান শাহ্কে বিশ্বাস করতেন না, তাই তিনি তাঁকে মিশর থেকে নিরাপদ দূরত্বে হাসানকীফে রেখেছিলেন।[৯] আস-সালিহের বিধবা শাজারাতুদ দুর তুরান শাহে্র আগমনের আগ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুসংবাদ লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হন।[১০] তুরান শাহে্র শাসনামল সংক্ষিপ্ত এবং অভ্যন্তরীণ জটিলতায় পূর্ণ ছিল, এরপরই মামলুকরা ক্ষমতা দখল করে।

আস-সালিহ শেষ উল্লেখযোগ্য আইয়ুবী শাসক ছিলেন, যিনি কিনা মিশরের সাথে সাথে ফিলিস্তিনসিরিয়ার অংশবিশেষ কার্যকরভাবে শাসন করেন[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Guy Perry, John of Brienne: King of Jerusalem, Emperor of Constantinople, c.1175–1237, Cambridge University Press, 2013 p.119
  2. Humphreys 1977
  3. Irwin 1986
  4. Whelan 1988
  5. Encyclopaedia Islamica, "Baalbek".
  6. Riley-Smith 1990
  7. Piers D. Mitchell, Medicine in the Crusades: Warfare, Wounds and the Medieval Surgeon, Cambridge University Press, 2004 p.213
  8.  One or more of the preceding sentences একটি প্রকাশন থেকে অন্তর্ভুক্ত পাঠ্য যা বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনেচিসাম, হিউ, সম্পাদক (১৯১১)। "Egypt/3 History"। ব্রিটিশ বিশ্বকোষ (১১তম সংস্করণ)। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। [[বিষয়শ্রেণী:উইকিসংকলনের তথ্যসূত্রসহ ১৯১১ সালের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে উইকিপিডিয়া নিবন্ধসমূহে উদ্ধৃতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে]]
  9. Irwin 1986, পৃ. 20।
  10. Ann Katherine Swynford Lambton & Bernard Lewis, The Cambridge History of Islam: A. The central islamic lands from pre-islamic times to the First World War, Cambridge University Press, 1977 vol.2 p.209

উৎস[সম্পাদনা]

  • Humphreys, R. Stephen (1977), From Saladin to the Mongols: The Ayyubids of Damascus, 1193–1260, Albany, New York: State University of New York Press, ISBN 0-87395-263-4
  • Irwin, Robert (1986), The Middle East in the Middle Ages: The Early Mamluk Sultanate, 1250–1382, Southern Illinois University Press / Croom Helm, ISBN 1-5974-0466-7
  • Riley-Smith, Jonathan, ed. (1990), The Atlas of the Crusades, Times Books, ISBN 0816021864
  • Whelan, Estelle (1988), "Representations of the Khassakiyah and the Origins of Mamluk Emblems", in Soucek, Priscilla (ed.), Content and Context of Visual Arts in the Islamic World, University Park, Pennsylvania: Pennsylvania State University Press

আরো দেখুন[সম্পাদনা]