বিষয়বস্তুতে চলুন

আথেনা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আথেনা
Ἀθηνᾶ
জ্ঞানের দেবী
ল্যুভরে অবস্থিত মাত্তেই অ্যাথিনা । খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে গ্রিক সংস্করণের আদলে খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দী খ্রিস্টাব্দের ১ম শতকে রোমানদের সংস্করণ। শিল্পী সেফিসোডোটোস বা ইউফ্রানোর।
আবাসঅলিম্পাস পর্বত
প্রতীকপেঁচা, জলপাই বৃক্ষ, সাপ, বর্ম, শিরস্ত্রাণ, অ্যাজিস ,বর্শা, গরগোনিওন
ব্যক্তিগত তথ্য
মাতাপিতামেটিস, জিউস
সহোদরআর্টেমিস, আফ্রোদিতে, মিউস, গ্রেইস, আরেস, অ্যাপোলো, ডায়োনিসাস, হিব, হার্মিস, হেরাকেলস, হেলেন অফ ট্রয়, হেফেস্টাস, মিনস, পের্সেউস, পোরাস
রোমান সমকক্ষমিনার্ভা

আথেনা (প্রাচীন গ্রিক: Ἀθηνᾶ; Athene নামেও পরিচিত) গ্রিক পুরাণের এক প্রাচীন দেবী।[১] তাঁকে প্রায়ই পাল্লাস উপাধিতে অভিহিত করা হয়। তিনি প্রজ্ঞা, যুদ্ধকৌশল এবং কারুশিল্পের দেবী। পরবর্তীকালে রোমান পুরাণে তাঁকে মিনার্ভা দেবীর সঙ্গে সমন্বিত করা হয়।[২] আথেনাকে সমগ্র গ্রিসের বহু নগর-রাষ্ট্রের রক্ষক ও অভিভাবক দেবী হিসেবে গণ্য করা হতো, তবে বিশেষভাবে এথেন্স নগরীর পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে তিনি সর্বাধিক পরিচিত। ধারণা করা হয়, এথেন্স নগরীর নামই তাঁর নাম থেকে এসেছে।[৩] তাঁর প্রধান প্রতীকগুলোর মধ্যে রয়েছে পেঁচা, জলপাই গাছ, সাপ এবং গর্গোনেইয়ন (গর্গনের মুখখচিত প্রতীক)। শিল্পকলায় তাঁকে সাধারণত শিরস্ত্রাণ পরিহিত এবং হাতে বর্শাধারী রূপে চিত্রিত করা হয়।

এজীয় সভ্যতার প্রাসাদকেন্দ্রিক দেবী হিসেবে তাঁর সূচনা হলেও, আথেনা পরবর্তীকালে এথেন্স নগরীর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি পোলিয়াস ও পোলিউখোস উপাধিতে পরিচিত ছিলেন, যার অর্থ যথাক্রমে নগরীর দেবী ও নগরীর রক্ষক। তাঁর মন্দিরগুলো সাধারণত নগরের কেন্দ্রস্থ দুর্গবেষ্টিত অ্যাক্রোপলিসে নির্মিত হতো। এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসে অবস্থিত পার্থেনন তাঁর উদ্দেশে নিবেদিত সর্বাধিক বিখ্যাত মন্দির; এছাড়াও তাঁর নামে বহু মন্দির ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল।

কারুশিল্প ও বয়নকলার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আথেনা এরগানে উপাধি লাভ করেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এক যুদ্ধদেবী, যিনি সৈন্যদের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন বলে বিশ্বাস করা হতো। এই রূপে তাঁর আরেকটি উপাধি ছিল আথেনা প্রোমাখোস। এথেন্সে তাঁর প্রধান উৎসব ছিল পানাথেনাইয়া, যা গ্রীষ্মকালে হেকাটোম্বায়োন মাসে পালিত হতো এবং এথেনীয় বর্ষপঞ্জির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচিত ছিল।

গ্রিক পুরাণ অনুসারে, আথেনার জন্ম হয় তাঁর পিতা জিউসের কপাল থেকে। হেসিওডের থিওগোনি অনুসারে, জিউস তাঁর গর্ভবতী পত্নী মেটিসকে গিলে ফেলার পর এই অলৌকিক জন্মের ঘটনা ঘটে। এথেন্সের প্রতিষ্ঠাকাহিনিতে বর্ণিত আছে যে, নগরীর পৃষ্ঠপোষক হওয়ার প্রতিযোগিতায় আথেনা প্রথম জলপাই গাছ সৃষ্টি করে পোসেইডনকে পরাজিত করেন। তিনি আথেনা পার্থেনোস বা ‘কুমারী আথেনা’ নামেও পরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন অ্যাটিক পুরাণের একটি কাহিনিতে বলা হয়, হেফাইস্টাস আথেনাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। এর ফলে গাইয়ার গর্ভে এরিখথোনিয়োস-এর জন্ম হয়, যিনি পরবর্তীকালে এথেন্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বীর হিসেবে খ্যাত হন এবং আথেনাই তাঁকে লালন-পালন করেন।

আথেনা ছিলেন বীরোচিত কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষক দেবী। তিনি পার্সেউস, হেরাক্লেস, বেলেরোফন এবং জেসন-এর মতো বীরদের সহায়তা করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। অ্যাফ্রোদিতি ও হেরার সঙ্গে তিনিই ছিলেন সেই তিন দেবীর একজন, যাঁদের বিরোধ থেকেই ট্রয় যুদ্ধের সূচনা হয়। ইলিয়াড-এ তিনি সক্রিয়ভাবে আখীয়দের সহায়তা করেন, আর ওডিসি-তে তিনি ওডিসেউসের অভিভাবক দেবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রোমান কবি ওভিডের পরবর্তী রচনাগুলোতে আথেনাকে একাধিক প্রসিদ্ধ পুরাণকাহিনির কেন্দ্রে দেখা যায়। সেখানে তিনি বয়নকলার প্রতিযোগিতায় নশ্বর নারী আরাখনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত আরাখনেকে পৃথিবীর প্রথম মাকড়সায় রূপান্তরিত করেন। একইভাবে, নিজের মন্দিরে পোসেইডনের হাতে মেদুসা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর তাঁকেই গর্গন-এ রূপান্তরিত করেন। ওভিড আরও উল্লেখ করেন, কোরোনে নামের এক কুমারীকে পোসেইডনের হাত থেকে রক্ষা করতে আথেনা তাঁকে কাকে রূপান্তরিত করেছিলেন।

রেনেসাঁ যুগের পর থেকে আথেনা প্রজ্ঞা, শিল্পকলা এবং ধ্রুপদি শিক্ষার আন্তর্জাতিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। পাশ্চাত্যের শিল্পী ও রূপকচিত্রকারেরা তাঁকে প্রায়ই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

নামের উৎপত্তি

[সম্পাদনা]
লিও ফন ক্লেঞ্জে অঙ্কিত এথেন্সের অ্যাক্রোপলিস (১৮৪৬)

আথেনা দেবীর সঙ্গে এথেন্স নগরীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।[৪] প্রাচীন গ্রিক ভাষায় এথেন্সের নাম ছিল Ἀθῆναι (Athēnai)—এটি একটি বহুবচন স্থাননাম। পুরাণ অনুসারে, এই স্থানেই আথেনার উপাসনায় নিবেদিত নারীদের একটি সংঘ বা আথেনাই-এর ওপর তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাচীন যুগে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক ছিল—আথেনার নাম কি এথেন্স থেকে এসেছে, নাকি এথেন্সের নাম আথেনার নামে রাখা হয়েছে? বর্তমানে অধিকাংশ গবেষকের অভিমত, দেবী আথেনার নামই নগরী এথেন্স থেকে উদ্ভূত।[৫] এর একটি ভাষাতাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। -ene প্রত্যয়টি স্থাননামে প্রচলিত হলেও ব্যক্তিনামে তা খুবই বিরল।

প্রাচীন গ্রিসের বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের তথ্য থেকে জানা যায়, অন্যান্য শহরেও সংশ্লিষ্ট নগরের নামে অভিভাবক দেবীর পূজা হতো। যেমন, মাইসেনি নগরীতে মাইকেনে নামে এক দেবী পূজিত হতেন এবং তাঁর উপাসিকাদের সংঘ পরিচিত ছিল মাইকেনাই নামে। একইভাবে থিবস নগরীতে থেবে নামে এক দেবীর পূজা হতো, আর নগরীর নাম ছিল থেবাই। এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, নগরের নাম থেকেই দেবীর নাম গঠনের রীতি প্রাচীন গ্রিসে প্রচলিত ছিল। গবেষকদের মতে, আথেনাই নামটির উৎস সম্ভবত প্রাক-গ্রিক, কারণ এতে *-ān- নামের একটি উপাদান রয়েছে, যা প্রাক-গ্রিক ভাষার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।[৬]

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ক্রাটাইলাস সংলাপে আথেনার নামের কয়েকটি কল্পনাপ্রসূত ব্যুৎপত্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, প্রাচীন এথেনীয়রা আথেনাকে মন (নউস) এবং বুদ্ধিমত্তা (দিয়ানোইয়া)-র প্রতীক হিসেবে দেখতেন। প্লেটোর মতে, আথেনার নামের সঙ্গে ‘ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা’ (থেও নোয়েসিস) ধারণার সম্পর্ক রয়েছে; অর্থাৎ তিনি এমন এক দেবী, যিনি দেবমনের অধিকারিণী বা দিব্য জ্ঞানের ধারক। প্লেটো আরও ধারণা করেছিলেন যে, আথেনার নামের একটি প্রাচীন রূপ ছিল এথেওনোয়ে, যা পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে আথেনা রূপ ধারণ করে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর বক্তা এলিয়ুস অ্যারিস্টাইডিস আবার আথেনার নামের ব্যুৎপত্তিকে আকাশ, বায়ু, পৃথিবী এবং চন্দ্র—এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।[৭]

উৎপত্তি

[সম্পাদনা]
খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগের মাইসিনির উপাসনাকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত একটি ফ্রেস্কোর খণ্ডাংশ। এতে একটি যুদ্ধদেবীকে চিত্রিত করা হয়েছে—যিনি সম্ভবত আথেনা। তাঁকে বুনো শূকরের দাঁত দিয়ে নির্মিত একটি শিরস্ত্রাণ পরিহিত এবং হাতে একটি গ্রিফিন ধরে থাকতে দেখা যায়।

আথেনা মূলত এজীয় সভ্যতার প্রাসাদকেন্দ্রিক দেবী ছিলেন। তিনি গৃহস্থালির কারুশিল্পের তত্ত্বাবধান করতেন এবং রাজাকে রক্ষা করতেন।[৮] এ কারণে তাঁকে প্রাচীন এজীয় রাজপ্রাসাদের অন্যতম অভিভাবক দেবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আথেনার প্রাচীনতম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় মাইসিনীয় গ্রিক ভাষায় রচিত লিনিয়ার বি লিপির একটি ফলকে। এটি ক্রিটের নোসোস প্রাসাদের ‘রুম অব দ্য চ্যারিয়ট ট্যাবলেটস’ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এটি লেট মিনোয়ান দ্বিতীয় যুগের।[৯] সেখানে (a-ta-na po-ti-ni-ja) শব্দগুচ্ছটি পাওয়া যায়। একে সাধারণত ‘প্রভুসমা আথেনা’ (Mistress Athena) হিসেবে অনুবাদ করা হলেও, এর অর্থ ‘আথানার পোত্নিয়া’ বা ‘এথেন্সের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’ও হতে পারে। তবে এই লেখার সঙ্গে এথেন্স নগরীর সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।[১০]

আরও প্রাচীন লিনিয়ার এ লিপিতেও a-ta-no-dju-wa-ja নামে একটি শব্দমালা পাওয়া যায়। এই লিপির ভাষা আজও অপাঠ্য। কিছু গবেষকের মতে, এটি লিনিয়ার বি-তে পাওয়া a-ta-na po-ti-ni-ja এবং Diwia-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।[১১] সে ক্ষেত্রে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘জিউসের আথেনা’ বা ‘ঐশ্বরিক আথেনা’। পরবর্তী গ্রিক পুরাণেও আথেনাকে জিউসের কন্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।[১২]

মাইসিনীয় যুগের একটি প্রাচীরচিত্রে দেখা যায়, দুটি নারী একটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন; সেই চরিত্রটি একটি বিশাল আট-আকৃতির ঢাল দ্বারা আবৃত। গবেষকদের ধারণা, এটি হয় আথেনার কোনো প্রাথমিক রূপ, নয়তো তাঁর পবিত্র প্রতীক প্যালাডিয়ন-এর প্রতিরূপ।[১৩] নোসোসের আরেকটি বিখ্যাত ‘প্রসেশন ফ্রেস্কো’-তেও পাত্র বহনকারী দুই সারির মানুষের মিলনস্থলে এক কেন্দ্রীয় দেবীমূর্তি দেখা যায়, যাকে অনেক গবেষক আথেনার মিনোয়ান পূর্বসূরি বলে মনে করেন।

প্রাচীন আক্কাদীয় সিলিন্ডার সিল (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৩৩৪–২১৫৪ অব্দ) যেখানে ইন্নানা—যুদ্ধের দেবী—কে চিত্রিত করা হয়েছে। তাঁকে বর্ম পরিহিত ও অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় দেখা যায়; তিনি একটি সিংহের পিঠের ওপর পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।

বিশ শতকের গবেষক মার্টিন পারসন নিলসন মত দেন যে, মিনোয়ান সভ্যতার সর্পদেবীর মূর্তিগুলো সম্ভবত আথেনার প্রাচীনতম রূপের প্রতিনিধিত্ব করে।[১৪] তাঁর মতে, আথেনা একসময় পেঁচাদেবী, এমনকি আরও প্রাচীন পর্যায়ে পাখিদেবী ছিলেন। ওডিসি মহাকাব্যের তৃতীয় সর্গে তাঁকে সমুদ্রঈগলের রূপ ধারণ করতেও দেখা যায়। এই মতের সমর্থকদের মতে, পরবর্তীকালে তিনি তাঁর পাখিরূপ ত্যাগ করেন এবং পেঁচা ও সাপ তাঁর প্রতীক হিসেবে থেকে যায়। গবেষক জেন এলেন হ্যারিসন মন্তব্য করেছিলেন যে, শিল্পকলায় আথেনা তাঁর প্রাণীরূপ পুরোপুরি ত্যাগ করলেও, কালো-চিত্রশৈলীর কিছু গ্রিক মৃৎপাত্রে তাঁকে এখনো ডানাসহ চিত্রিত করা হয়েছে।[১৫]

বর্তমানে অধিকাংশ গবেষক একমত যে, আথেনার উপাসনায় প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় বহুমুখী দেবীর কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত রয়েছে।[১৬] একই সঙ্গে তাঁর পূজার ওপর নিকটপ্রাচ্যের যুদ্ধদেবীদের, বিশেষত পূর্ব সেমিটিক ইশতার এবং উগারিতীয় আনাত-এর প্রভাবও ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই দুই দেবীকেও প্রায়ই অস্ত্রধারী যোদ্ধা হিসেবে চিত্রিত করা হতো। ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক চার্লস পেংগ্লেস উল্লেখ করেছেন যে, আথেনা ও ইনান্না—উভয়েই ভয়ংকর যুদ্ধদেবী হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য বহন করেন এবং সৃষ্টির ধারণার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কিছু গবেষকের মতে, জিউসের কপাল থেকে আথেনার জন্মের কাহিনি সুমেরীয় পুরাণে ইনান্নার পাতাললোকে অবতরণ ও প্রত্যাবর্তনের প্রাচীন মিথ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।[১৭]

দার্শনিক প্লেটো উল্লেখ করেছেন যে, মিশরের সাইস নগরীর অধিবাসীরা নেইথ নামে এক দেবীর পূজা করতেন, যাঁকে তিনি আথেনার সমতুল্য বলে মনে করেছিলেন।[১৮] নেইথ ছিলেন প্রাচীন মিশরের যুদ্ধ, শিকার ও বয়নকলার দেবী, এবং তাঁর উপাসনার সূচনা মিশরের প্রাক-রাজবংশীয় যুগে। গ্রিক পুরাণে আথেনাকে লিবিয়ার ট্রাইটন নদী এবং উত্তর আফ্রিকার আরও কয়েকটি পৌরাণিক স্থানে গমন করতে দেখা যায়। এই সাদৃশ্যগুলোর ভিত্তিতে ইতিহাসবিদ মার্টিন বার্নাল বিখ্যাত ‘ব্ল্যাক আথেনা’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁর দাবি ছিল, নেইথের উপাসনা এবং গ্রিক সভ্যতার বহু উপাদান মিশর থেকে গ্রিসে পৌঁছেছিল। তবে এই তত্ত্ব বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও, আধুনিক গবেষকদের অধিকাংশই এটিকে গ্রহণ করেন না।[১৯]

উপাধি ও বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]
আথিনার উপাসনামূর্তি (খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীর প্রথমভাগ), যা কারপেগনা ধাঁচের মুখাবয়ব ধারণ করে। এটি রোমের পিয়াজ্জা দেল'এম্পোরিও এলাকা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে।
ভেলেত্রি পাল্লাস ধাঁচের আথিনার আবক্ষ মূর্তি, যা এথেন্সে ক্রেসিলাস নির্মিত একটি উৎসর্গীকৃত মূর্তির (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫ অব্দ) অনুলিপি।

আথেনাকে শান্তির দেবী হিসেবেও পূজা করা হতো।[২০]

যেমন তিনি বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের অভিভাবক দেবী ছিলেন, তেমনি নানা মানবিক কর্মকাণ্ডেরও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁকে বীরদের রক্ষক, শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক এবং বিভিন্ন স্থানীয় শিল্প ও কারুশিল্প-সংক্রান্ত ঐতিহ্যের অভিভাবক দেবী বলে মনে করা হতো।[২১]

আথেনার বহু উপাধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আত্রিতোনে (Atrytone, ‘অক্লান্ত’), পার্থেনোস (Parthenos, ‘কুমারী’) এবং প্রোমাখোস (Promachos, ‘অগ্রসৈনিক’ বা ‘সামনের সারির যোদ্ধা’)। পোলিয়াস (Polias, ‘নগরীর দেবী’) উপাধিটি তাঁর নগররক্ষক রূপকে নির্দেশ করে। আর এরগানে (Ergane, ‘পরিশ্রমী’ বা ‘শিল্পকার্যের অধিষ্ঠাত্রী’) উপাধির মাধ্যমে তিনি কারিগর ও শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ধ্রুপদি গবেষক ভাল্টার বুর্কার্ট উল্লেখ করেছেন যে, এথেনীয়রা অনেক সময় তাঁকে কেবল ‘দেবী’ (হে থেওস) বলেই সম্বোধন করতেন, যা সম্ভবত অত্যন্ত প্রাচীন একটি উপাধি। ওরেস্তেসের বিচার শেষে, যখন আথেনা ঘোষণা করেন যে অ্যাপোলোর নির্দেশ পালন করায় ওরেস্তেস মাতৃহত্যার অপরাধে দোষী নন, তখন তিনি আরেইয়া (Areia) উপাধি লাভ করেন।[২২]

কখনও কখনও আথেনাকে হিপ্পিয়া (Hippia, ‘অশ্বদেবী’ বা ‘অশ্বারোহীদের দেবী’) নামেও ডাকা হতো। এই উপাধি এসেছে ঘোড়ার লাগাম, বিট, রথ ও গাড়ি আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে। ভ্রমণলেখক পসানিয়াস উল্লেখ করেছেন যে, করিন্থে অবস্থিত আথেনা খালিনিতিস (‘লাগামের দেবী’) মন্দিরটি মিডিয়ার সন্তানদের সমাধির নিকটে অবস্থিত ছিল। তাঁর অন্যান্য উপাধির মধ্যে রয়েছে আগেলেইয়া, ইতোনিয়া এবং আইথুইয়া, যেসব নামে বিশেষত মেগারায় তাঁর পূজা হতো। আসেসোস নগরে তিনি আসেসিয়া নামে পূজিত ছিলেন। আইথুইয়া শব্দটির অর্থ ‘ডুবুরি’; এটি কিছু জলচর পাখির নামও নির্দেশ করে এবং রূপক অর্থে ‘জাহাজ’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তাই এই উপাধিটি সম্ভবত জাহাজ নির্মাণ বা নৌচালনার বিদ্যা আথেনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। এলিসের ফ্রিক্সা নগরের একটি মন্দিরে, যা কথিত আছে ক্লাইমেনাস নির্মাণ করেছিলেন, আথেনা কিডোনিয়া নামে পূজিত হতেন। আবার বুপোর্থমোসে তাঁর একটি উপাসনালয় ছিল, যেখানে তিনি প্রোমাখোরমা (Promachorma)—অর্থাৎ নোঙরস্থলের রক্ষক—নামে পরিচিত ছিলেন।[২৩]

গ্রিক জীবনীকার প্লুটার্ক উল্লেখ করেছেন যে, পেরিক্লেস অ্যাক্রোপলিসের প্রবেশদ্বার নির্মাণকালে আহত এক শ্রমিককে সফলভাবে চিকিৎসা করার অনুপ্রেরণা স্বপ্নে আথেনার কাছ থেকে পাওয়ার পর তাঁর সম্মানে আথেনা হাইজেইয়া (Athena Hygieia, ‘স্বাস্থ্যের দেবী’) নামে একটি মূর্তি উৎসর্গ করেছিলেন।[২৪]

মেখানিতিস (Mechanitis), যার অর্থ ‘উদ্ভাবনে পারদর্শিনী’, ছিল আথেনার আরেকটি উপাধি। এথেন্সের প্রাচীন আগোরায় একটি আথেনা ফ্রাত্রিয়া মন্দিরও ছিল, যেখানে তিনি একটি ফ্রাত্রি (গোত্রভিত্তিক সামাজিক সংগঠন)-এর অভিভাবক দেবী হিসেবে পূজিত হতেন।[২৫]

পাল্লাস আথেনা

[সম্পাদনা]
রেমব্রান্টের আঁকা “প্যালাস আথেনা” (১৬৫৭) চিত্রকর্ম, যেখানে যুদ্ধের দেবী হিসেবে তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হয়েছ

পাল্লাস আথেনার সবচেয়ে সুপরিচিত উপাধি। এই উপাধির উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, এটি গ্রিক πάλλω (পাল্লো) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘অস্ত্র নাড়ানো’ বা ‘বর্শা দোলানো’। আবার অধিকাংশ গবেষকের মতে, এটি παλλακίς (পাল্লাকিস) এবং সংশ্লিষ্ট শব্দসমূহ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘তরুণী’ বা ‘যুবতী’।[২৬]

এ প্রসঙ্গে ধ্রুপদি গবেষক ভাল্টার বুর্কার্ট মন্তব্য করেছেন, যেমন হেরা আর্গোস নগরীতে হেরে আর্গেইয়ে নামে পরিচিত ছিলেন, তেমনি আথেনা এথেন্সে পাল্লাস আথেনাইয়ে নামে পূজিত হতেন। পরবর্তী যুগে ‘পাল্লাস’ নামটির প্রকৃত অর্থ বিস্মৃত হয়ে গেলে গ্রিকরা এর ব্যাখ্যা দিতে বিভিন্ন পুরাণকাহিনি রচনা করে। ফিলোদেমুস এবং ছদ্ম-অ্যাপোলোদোরাসের বিব্লিওথেকে-এ বলা হয়েছে, পাল্লাস মূলত আথেনা থেকে পৃথক এক সত্তা ছিলেন, যাকে আথেনা যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন।[২৭]

একটি কাহিনি অনুসারে, পাল্লাস ছিলেন সমুদ্রদেব ট্রাইটনের কন্যা এবং শৈশব থেকে আথেনার অন্তরঙ্গ সখী।[২৮] একদিন আথেনা ও পাল্লাস বন্ধুত্বপূর্ণ ক্রীড়াযুদ্ধে অংশ নেন। জিউস কন্যাকে পরাজিত হতে দিতে না চেয়ে তাঁর ঐজিস ঢাল নেড়ে পাল্লাসের মনোযোগ বিচ্যুত করেন। ফলে আথেনা অনিচ্ছাকৃতভাবে বর্শাঘাতে পাল্লাসকে হত্যা করেন। প্রিয় সখীর মৃত্যুশোকে আথেনা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের নামের সঙ্গে ‘পাল্লাস’ উপাধি যুক্ত করেন। অপরাধবোধে জিউসও তাঁকে ঐজিস উপহার দেন। অন্য একটি কাহিনিতে পাল্লাস ছিলেন এক দানব। গিগান্টোমাখিয়া যুদ্ধে আথেনা তাঁকে বধ করেন এবং তাঁর চামড়া খুলে নিজের আবরণ হিসেবে ব্যবহার করেন, যা ছিল বিজয়ের প্রতীক। একই কাহিনির আরেকটি ভিন্ন রূপে পাল্লাসকে আথেনার পিতা বলা হয়েছে। সেখানে তিনি নিজের কন্যাকে বলপূর্বক দখল করার চেষ্টা করলে আথেনা তাঁকে হত্যা করেন এবং তাঁর চামড়া যুদ্ধলব্ধ স্মারক হিসেবে ধারণ করেন।[২৯]

প্যালাডিয়ন ছিল আথেনার একটি পবিত্র মূর্তি, যা ট্রয়ের অ্যাক্রোপলিসে অবস্থিত তাঁর মন্দিরে সংরক্ষিত ছিল। কিংবদন্তি অনুসারে, আথেনা তাঁর মৃত সখী পাল্লাসের প্রতিকৃতি অনুসরণ করে নিজেই এই মূর্তিটি নির্মাণ করেছিলেন। প্যালাডিয়নকে অলৌকিক রক্ষাকবচ বলে মনে করা হতো এবং বিশ্বাস করা হতো, যতদিন এটি ট্রয়ে থাকবে, ততদিন নগরীটি কখনো পতিত হবে না। কিন্তু গ্রিকরা ট্রয় দখল করার পর রাজা প্রিয়াম ও হেকুবার কন্যা ক্যাসান্দ্রা আশ্রয়ের জন্য প্যালাডিয়নকে আঁকড়ে ধরেন। তখন লঘু আজাক্স তাঁকে জোরপূর্বক মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে বন্দিদের কাছে টেনে নিয়ে যান এবং তাঁকে ধর্ষণ করেন। নিজের পবিত্র আশ্রয়ের এমন অবমাননায় আথেনা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন। রাজা আগামেমনন বলিদানের মাধ্যমে তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। প্রতিশোধস্বরূপ আথেনা কাফেরেওস অন্তরীপে এক ভয়ংকর ঝড় সৃষ্টি করেন, যাতে গ্রিক নৌবহরের প্রায় সব জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায় এবং বেঁচে যাওয়া জাহাজগুলো এজীয় সাগরের বিভিন্ন স্থানে ছিটকে পড়ে।[৩০]

গ্লাউকোপিস

[সম্পাদনা]
জলপাই পাতার মালা দিয়ে ঘেরা আথেনার পেঁচা। অ্যাথেনীয় রৌপ্য টেট্রাড্রাকম মুদ্রার পশ্চাৎভাগ, আনুমানিক ১৭৫ খ্রিস্টপূর্ব।

হোমারের মহাকাব্যগুলোতে আথেনার সবচেয়ে প্রচলিত উপাধি হলো গ্লাউকোপিস (γλαυκῶπις)। এই উপাধির অর্থ সাধারণত ‘উজ্জ্বল-নয়না’, ‘দীপ্তদৃষ্টি’ অথবা ‘দীপ্তিময় চোখের অধিকারিণী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। গ্লাউকোপিস শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দের সমন্বয়ে গঠিত—গ্লাউকোস (glaukós), যার অর্থ ‘দীপ্তিময়’, ‘রূপালি আভাযুক্ত’, পরে যার অর্থ ‘ধূসর’ বা **‘নীলাভ-সবুজ’**ও হয়েছে; এবং ওপ্স (ṓps), যার অর্থ ‘চোখ’ বা ‘মুখমণ্ডল’।[৩১]

একই মূল থেকে এসেছে গ্লাউক্স (glaúx) শব্দটি, যার অর্থ ‘পেঁচা’। ধারণা করা হয়, পাখিটির উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ চোখের কারণেই এই নামের উৎপত্তি। আথেনার সঙ্গে পেঁচার সম্পর্ক অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীন শিল্পকর্মে তাঁকে প্রায়ই হাতে বসে থাকা একটি পেঁচাসহ চিত্রিত করা হয়েছে। আথেনার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে পেঁচা ধীরে ধীরে এথেন্সের জাতীয় প্রতীক হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের সর্বজনস্বীকৃত প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।[৩২]

ত্রিতোজেনেইয়া

[সম্পাদনা]

হোমারের ইলিয়াড, ওডিসি, হোমারীয় স্তোত্র এবং হেসিওডের থিওগোনি-তে আথেনার আরেকটি উপাধি হলো ত্রিতোজেনেইয়া (Τριτογένεια)। এই উপাধির প্রকৃত অর্থ আজও নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি এবং এটি গ্রিক পুরাণের অন্যতম রহস্যময় উপাধি হিসেবে বিবেচিত। একটি ব্যাখ্যায় ত্রিতোজেনেইয়া শব্দের অর্থ ‘ট্রাইটনের কন্যা’ বা ‘ট্রাইটনের জন্মদাত্রী’ বলে ধরা হয়। এর পেছনে প্রাচীন একটি কাহিনি রয়েছে, যেখানে সমুদ্রদেব ট্রাইটন আথেনার পালকপিতা ছিলেন।[৩৩] তিনি নিজের কন্যা পাল্লাস-এর সঙ্গে আথেনাকেও লালন-পালন করেছিলেন। পুরাণবিশারদ কার্ল কেরেনিই অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ত্রিতোজেনেইয়া-র অর্থ কোনো নির্দিষ্ট নদী বা হ্রদে জন্ম নেওয়া নয়; বরং এটি বোঝায় যে আথেনার জন্ম জলের মধ্য থেকেই। কারণ, ট্রাইটন নামটি সাধারণভাবে জল বা জলরাশির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি মনে করেন।[৩৪] রোমান কবি ওভিড তাঁর মেটামরফোসেস গ্রন্থে আথেনাকে কখনও কখনও ত্রিতোনিয়া (Tritonia) নামেও উল্লেখ করেছেন।[৩৫]

আরেকটি ব্যাখ্যায় ত্রিতোজেনেইয়া শব্দের অর্থ ‘তিনবার জন্মগ্রহণকারী’ বা ‘তৃতীয় জন্মপ্রাপ্ত’। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উপাধিটি হয় কোনো দেবত্রয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নির্দেশ করে, নয়তো জিউসের সন্তানদের মধ্যে তাঁর অবস্থান বোঝায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি তাঁর জন্মের বিশেষ প্রকৃতির ইঙ্গিত বহন করে—কারণ তিনি মেটিস, জিউস এবং শেষ পর্যন্ত জিউসের কপাল থেকে জন্ম নিয়েছিলেন। বিভিন্ন পুরাণে তাঁকে কখনও আর্টেমিস ও অ্যাপোলোর পরবর্তী সন্তান, আবার কখনও জিউসের প্রথম সন্তান হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।[৩৬] কয়েকজন গবেষক এই উপাধির সঙ্গে ঋগ্বেদের দেবতা ত্রিত-এরও সম্পর্ক খুঁজে দেখেছেন।[৩৭] ইন্দো-ইউরোপীয় পুরাণবিশেষজ্ঞ মিখায়েল ইয়ান্ডা-র মতে, ‘ত্রিতো’ শব্দটির একটি প্রাচীন অর্থ সম্ভবত ‘আকাশ’। এই ব্যাখ্যায় আথেনার জিউসের কপাল থেকে জন্ম নেওয়ার কাহিনি তাঁর স্বর্গীয় উৎসের প্রতীক। ইয়ান্ডা আরও মনে করেন, ইন্দো-ইউরোপীয় পুরাণে এই স্বর্গীয় জগতকে পৃথিবীকে ঘিরে থাকা আদিম জলরাশির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে—যার একটি সমান্তরাল উদাহরণ হলো অ্যাম্ফিত্রিতে, সমুদ্রদেব পোসেইডনের রানি এবং ট্রাইটনের জননী।[৩৮]

আরও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডায়োজেনিস লায়ার্তিয়ুস। দার্শনিক ডেমোক্রিতুস-এর জীবনচরিত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, আথেনাকে ত্রিতোজেনেইয়া বলা হতো, কারণ মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য তিনটি মৌলিক বিষয় তাঁর থেকেই উদ্ভূত বলে বিশ্বাস করা হতো।[৩৯]

উপাসনা ও পৃষ্ঠপোষকতা

[সম্পাদনা]

সর্বগ্রিক গ্রিস ও এথেন্সে উপাসনা

[সম্পাদনা]
আথেনাকে চিত্রিত করা অ্যাথেনীয় টেট্রাড্রাকম মুদ্রা।

আথেনা পোলিয়াস (Athena Polias) রূপে আথেনাকে নগরীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং দুর্গনগরের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে পূজা করা হতো।[৪০] বিশেষ করে এথেন্সে তিনি নগর-রাষ্ট্রের প্রধান অভিভাবক দেবী হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। এথেন্সে প্রতি বছর থার্গেলিয়ন মাসের শেষ দিকে প্লিনতেরিয়া (Plynteria, ‘স্নানোৎসব’) পালিত হতো।[৪১] পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবে আথেনার পুরোহিত্রীগণ, যাঁদের প্লিন্ত্রিদেস বলা হতো, এরেখথেইওন মন্দিরে তাঁর মূর্তিকে বস্ত্রমুক্ত করে বিশেষ শুদ্ধিকরণ আচার সম্পন্ন করতেন। এ সময় দেবীর বস্ত্র ধোয়া হতো এবং তাঁর মূর্তিকে প্রতীকীভাবে পবিত্র করা হতো। আথেনা এরগানে (Athena Ergane) রূপে তিনি বিভিন্ন কারুশিল্পের, বিশেষ করে বয়নশিল্পের, পৃষ্ঠপোষক দেবী ছিলেন। ধাতুশিল্পীরাও তাঁকে নিজেদের রক্ষাকর্ত্রী মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, বর্ম ও অস্ত্র নির্মাণে আথেনা তাঁদের সহায়তা করেন। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগে আথেনার উপাসনায় প্রজ্ঞা ও দর্শনের দেবী হিসেবে তাঁর পরিচয়ও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।[৪২][৪৩] আথেনা প্রোমাখোস (Athena Promachos) নামে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের অগ্রভাগে নেতৃত্বদানকারী দেবী হিসেবে পূজিত হতেন।[৪৪] যুদ্ধের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পরিকল্পনা, কৌশল ও শৃঙ্খলার প্রতীক।[৪৫] এ দিক থেকে তিনি তাঁর সৎভাই এরেস-এর সম্পূর্ণ বিপরীত; এরেস ছিলেন হিংস্রতা, রক্তপিপাসা ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের দেবতা। গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, আথেনা কেবল ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যে যুদ্ধকারীদেরই সমর্থন করেন এবং যুদ্ধকে তিনি মূলত সংঘাত নিরসনের একটি উপায় হিসেবে দেখতেন। এই কারণেই গ্রিক সমাজে আথেনা এরেসের তুলনায় অনেক বেশি সম্মানিত ছিলেন।[৪৬]

অ্যাথেনীয় অ্যাক্রোপলিসের পার্থেনন মন্দির, যা আথেনা পার্থেনোসের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত

পানাথেনাইয়া এবং পাম্বোয়োতিয়া উৎসবে আথেনার এই যোদ্ধা-রূপ বিশেষভাবে পূজিত হতো।[৪৭] এসব উৎসবে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সামরিক কৌশলের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো। বীর ও যোদ্ধাদের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে আথেনা বিশেষভাবে তাঁদেরই অনুগ্রহ করতেন, যারা শক্তির চেয়ে বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও কৌশলের ওপর নির্ভর করত।[৪৮]

রেমব্রান্টের আঁকা “প্যালাস আথেনা” (১৬৫৭) চিত্রকর্ম, যেখানে যুদ্ধের দেবী হিসেবে আথেনার বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আথেনা পার্থেনোস (Athena Parthenos, ‘কুমারী আথেনা’) রূপে তিনি চিরকুমারী দেবী হিসেবে পূজিত ছিলেন।[৪৯] আর্টেমিস ও হেস্তিয়া-র মতো তিনিও আজীবন অবিবাহিত ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হতো। এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসে অবস্থিত তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত মন্দির পার্থেনন-এর নামও এই উপাধি থেকেই এসেছে।

গ্রিক পুরাণবিশারদ কার্ল কেরেনিই-র মতে, ‘পার্থেনোস’ উপাধিটি কেবল আথেনার কৌমার্যের পরিচয় নয়; এটি যৌন সংযম ও ধর্মীয় পবিত্রতার রক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকারও প্রতীক।[৫০] এথেনীয়রা নারীর আদর্শ আচরণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে এই পবিত্রতাকে মূল্য দিত এবং আথেনার এই রূপকে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখত। কেরেনিইর মতে, জিউসের সঙ্গে আথেনার সম্পর্কও তাঁর এই চিরকুমারী পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই ধারণার প্রতিফলন পরবর্তী যুগের কাহিনিতেও দেখা যায়। নেয়াপোলিসের মারিনুস বর্ণনা করেন যে, খ্রিস্টানরা যখন পার্থেনন থেকে আথেনার মূর্তি অপসারণ করে, তখন দার্শনিক প্রোক্লুস স্বপ্নে এক অপরূপা নারীর দর্শন পান। তিনি নিজেকে ‘এথেন্সের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’ বলে পরিচয় দিয়ে জানান যে, তিনি এখন থেকে প্রোক্লুসের গৃহেই বাস করতে ইচ্ছুক।[৫১]

আথেনাকে নুড়িপাথর ব্যবহার করে ভবিষ্যদ্বাণীর একটি পদ্ধতির প্রবর্তক বলেও মনে করা হতো। এই পাথরগুলিকে বলা হতো থ্রিয়াই (thriai)। একই নাম ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষমতাসম্পন্ন একদল অপ্সরাকেও নির্দেশ করত। তবে আথেনার সৎভাই অ্যাপোলো, যিনি নিজেও ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা, এই পদ্ধতিকে নিজের বিদ্যার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন। তিনি জিউসের কাছে অভিযোগ করেন যে, অনেকেই নুড়িপাথর ছুড়ে ভবিষ্যৎ বলার দাবি করলেও প্রকৃত ভবিষ্যদ্রষ্টা খুবই বিরল। অ্যাপোলোর অভিযোগে সহানুভূতি দেখিয়ে জিউস নুড়িপাথর-নির্ভর এই ভবিষ্যদ্বাণীর শক্তি নষ্ট করে দেন। পরবর্তীকালে এই ঘটনাই প্রাচীন গ্রিক ভাষায় একটি প্রচলিত প্রবাদবাক্যের উৎস হয়ে ওঠে।[৫২]

আঞ্চলিক উপাসনা

[সম্পাদনা]
ইউমেনেস প্রথমের (শাসনকাল: খ্রিস্টপূর্ব ২৬৩–২৪১) সময়ে নির্মিত পার্গামীয় রৌপ্য টেট্রাড্রাখমার বিপরীত পৃষ্ঠ, যেখানে সিংহাসনে উপবিষ্ট আথেনাকে দেখানো হয়েছে।

আথেনা শুধু এথেন্সেরই অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন না; পার্গামন, আর্গোস, স্পার্টা, গোর্তিন, লিন্ডোস এবং লারিসা-সহ গ্রিসের বহু নগরেও তিনি পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে পূজিত হতেন।[৫৩][৫৪] আথেনার বিভিন্ন আঞ্চলিক উপাসনাপদ্ধতি মূলত তাঁর সর্বগ্রিক গ্রিক (প্যানহেলেনিক) উপাসনারই শাখা ছিল।[৫৫] এসব উপাসনায় প্রায়ই গ্রিক যুবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ দীক্ষা-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। যেমন—তরুণদের নাগরিকত্বে প্রবেশ কিংবা তরুণীদের বিবাহিত জীবনে পদার্পণের মতো সামাজিক রীতিগুলো আথেনার উপাসনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।[৫৬] ফলে তাঁর উপাসনা শুধু ধর্মীয় নয়, সমগ্র গ্রিক সমাজে অভিন্ন সামাজিকীকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে, যা মূল গ্রিসের বাইরেও বিস্তৃত ছিল।[৫৭] এজিনা দ্বীপে আথেনাকে স্থানীয় দেবী আফাইয়া-র সঙ্গে একীভূত করে দেখা হতো। আফাইয়া মূলত ক্রিট দ্বীপের দেবী ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে আর্টেমিস ও অপ্সরা ব্রিতোমার্তিস-এরও সম্পর্ক ছিল।[৫৮] আর্কাদিয়া অঞ্চলে আথেনা প্রাচীন দেবী আলেয়া-র সঙ্গে একীভূত হয়ে আথেনা আলেয়া নামে পূজিত হন।[৫৯] তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদিত মন্দির ম্যান্টিনেইয়া ও তেগেয়া নগরে অবস্থিত ছিল। বিশেষ করে তেগেয়ার আথেনা আলেয়ার মন্দির প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ভ্রমণলেখক পাউসানিয়াস-এর মতে, মন্দির-প্রাঙ্গণটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আলেউস।[৬০]

স্পার্টার অ্যাক্রোপলিসে আথেনার একটি প্রধান মন্দির ছিল।[৬১] সেখানে তিনি পোলিউখোস (‘নগররক্ষক’) এবং খালকিওইকোস (‘ব্রোঞ্জ-গৃহের দেবী’) নামে পূজিত হতেন।[৬২] এই উপাধির কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ মনে করেন, মন্দিরের উপাস্য মূর্তিটি ব্রোঞ্জের ছিল; কেউ মনে করেন, মন্দিরের দেয়ালে ব্রোঞ্জের আবরণ ছিল; আবার অনেকে মনে করেন, এটি ধাতুশিল্পীদের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে তাঁর পরিচয়েরই প্রতিফলন। স্পার্টায় তাঁর উপাসনায় মাটির ও ব্রোঞ্জের ঘণ্টা ব্যবহারেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।[৬৩] খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রিয়েনে নগরে আথেনা পোলিয়াস-এর উদ্দেশ্যে একটি আইওনিক শৈলীর মন্দির নির্মিত হয়।[৬৪] এর স্থপতি ছিলেন প্রিয়েনের পাইথেওস,[৬৫] যিনি হ্যালিকারনাসাসের সমাধিসৌধ-এরও অন্যতম স্থপতি। পরবর্তীকালে আলেকজান্ডার মহান এই মন্দির উৎসর্গ করেন। তাঁর উৎসর্গলিপি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।[৬৬]

কোলখিস অঞ্চলে আথেনা আথেনা এশিয়া নামে পূজিত হতেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, নিকটবর্তী এশিয়া পর্বত থেকেই এই উপাধির উৎপত্তি। আবার একটি কিংবদন্তি অনুসারে, কাস্টর ও পলিডিউকেস (ডায়োসকুরি) এই উপাসনাপদ্ধতি লাকোনিয়ায় নিয়ে আসেন এবং লাস নগরে তাঁর জন্য একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।[৬৭]

সিরিয়ার কির্রহেস্টিকা প্রদেশের কির্রহুস নগরে আথেনা আথেনা কির্রহেস্টিকা নামে পূজিত হতেন।[৬৮]

অন্যদিকে পার্গামনে আথেনাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দেবী এবং সেই সব মহাজাগতিক শক্তির অধিষ্ঠাত্রী বলে মনে করা হতো, যেগুলো পার্গামন নগরীর কল্যাণ ও ভাগ্য নির্ধারণে সহায়ক ছিল।[৬৯]

পুরাণ

[সম্পাদনা]
আথেনা জিউসের কপাল থেকে স্বয়ম্ভূভাবে জন্মগ্রহণ করছেন, যেখানে ডানদিকে জিউস ইলেইথিয়া দেবীর পোশাক আঁকড়ে ধরে আছেন; কালো-চিত্রশৈলীর অ্যাম্ফোরা, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫৫০–৫২৫ অব্দ, লুভর জাদুঘর।
জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, এথেন্সে প্রদর্শিত ভারভাকিয়ন আথেনা—আথেনা পার্থেনোসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রতিলিপি।

প্রচলিত অলিম্পীয় পুরাণে আথেনাকে দেবরাজ জিউসের সর্বাধিক প্রিয় কন্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি জিউসের কপাল থেকে পূর্ণবয়স্ক ও সম্পূর্ণ অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের মুহূর্ত থেকেই তিনি অসাধারণ শক্তি ও প্রজ্ঞার অধিকারিণী ছিলেন।[৭০]

আথেনার জন্মকাহিনির একাধিক রূপ রয়েছে।[৭১] এর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় হোমারের ইলিয়াড-এর পঞ্চম সর্গে। সেখানে যুদ্ধদেব এরেস জিউসকে আথেনার প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে বলেন যে, জিউস নিজেই তাঁকে জন্ম দিয়েছেন।[৭২] হেসিওডের থিওগোনি অনুসারে, জিউস প্রথমে মেটিসকে বিবাহ করেন। মেটিস দেবতা ও মানুষের মধ্যে সর্বাধিক প্রজ্ঞাবতী ছিলেন।[৭৩] কিছুদিন পর জিউস জানতে পারেন যে মেটিস গর্ভবতী। তখন গাইয়া ও ইউরেনাস-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর মনে ভয় সৃষ্টি করে। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল—মেটিস প্রথমে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেবেন, এরপর এমন এক পুত্রের জন্ম দেবেন, যে নিজের পিতার চেয়েও শক্তিশালী হবে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে।[৭৪]

এই আশঙ্কায় জিউস কৌশলে মেটিসকে নিজেকে ক্ষুদ্রাকৃতি ধারণ করতে প্রলুব্ধ করেন এবং পরে তাঁকে গিলে ফেলেন। কিন্তু ততক্ষণে মেটিস আথেনাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। জিউসের দেহের ভেতরেই মেটিস তাঁর কন্যাকে লালন-পালন করতে থাকেন এবং পরবর্তীকালে শাসনকার্যে জিউসকে পরামর্শও দিতেন। আথেনা বড় হয়ে উঠলে মেটিস তাঁর জন্য বস্ত্র, বর্ম, ঢাল ও বর্শা নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় শতাব্দীতে রচিত ছদ্ম-অ্যাপোলোদোরাসের বিব্লিওথেকে-তে ঘটনাটি কিছুটা ভিন্নভাবে বলা হয়েছে। সেখানে মেটিসকে জিউসের স্ত্রী নয়, বরং তাঁর অনিচ্ছুক সঙ্গিনী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জিউসের হাত থেকে বাঁচতে মেটিস নানা রূপ ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত জিউস তাঁকে পরাস্ত করেন, গর্ভধারণ করান এবং পরে গিলে ফেলেন।[৭৫] মেটিসকে গিলে ফেলার পর জিউস আরও ছয়জন স্ত্রী গ্রহণ করেন এবং সর্বশেষ হেরাকে বিবাহ করেন।[৭৬] কিছুদিন পর তিনি অসহনীয় মাথাব্যথায় আক্রান্ত হন।[৭৭] যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে তিনি তাঁর মাথা কেটে খুলে দিতে আদেশ দেন। বিভিন্ন পুরাণে এই কাজটি হেফাইস্টাস, প্রমিথিউস, হার্মিস, এরেস অথবা পালাইমন-এর নামে আরোপ করা হয়েছে। অবশেষে জিউসের কপাল দ্বিখণ্ডিত হতেই সেখান থেকে সম্পূর্ণ বয়স্ক, বর্মপরিহিতা এবং হাতে অস্ত্রধারী আথেনা লাফিয়ে বেরিয়ে আসেন।[৭৮] হোমারীয় প্রথম আথেনা-স্তোত্র অনুযায়ী, তাঁর আবির্ভাবে দেবতারা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান।[৭৯] এমনকি সূর্যদেব হেলিওসও আকাশে তাঁর রথ থামিয়ে দেন। কবি পিন্ডার বর্ণনা করেন, আথেনা প্রচণ্ড যুদ্ধধ্বনি দিয়ে আবির্ভূত হন, আর সেই ধ্বনিতে আকাশ ও পৃথিবী কেঁপে ওঠে।[৮০] হেসিওডের মতে, জিউস একাই সন্তান জন্ম দিয়েছেন—এই ঘটনায় হেরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। প্রতিশোধস্বরূপ তিনি পুরুষের সাহায্য ছাড়াই হেফাইস্টাসের জন্ম দেন। তবে পরবর্তী কিছু লেখক, যেমন ফিলোস্ত্রাতোস, লিখেছেন যে হেরা আথেনার জন্মে আনন্দিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে নিজের কন্যার মতোই গ্রহণ করেছিলেন।[৮১]

আথেনার জন্ম নিয়ে আরও কয়েকটি বিরল ঐতিহ্যও রয়েছে।

  • খ্রিস্টীয় লেখক জাস্টিন মার্টির উল্লেখ করেন, কিছু পৌত্তলিক বিশ্বাসে আথেনা জিউসের চিন্তা বা বাণী (লোগোস) থেকে জন্ম নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, বিশ্বসৃষ্টির চিন্তা থেকেই তাঁর উদ্ভব।[৮২]
  • ইলিয়াড-এর একটি প্রাচীন টীকায় বলা হয়েছে, মেটিস তখন সাইক্লোপস ব্রন্তেস-এর মাধ্যমে আথেনাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন।[৮৩]
  • এতিমোলজিকুম ম্যাগনুম-এ তাঁকে ড্যাকটিল ইতোনোস-এর কন্যা বলা হয়েছে।[৮৪]
  • আবার ফিনিকীয় ঐতিহাসিক সানখুনিয়াথন-এর নামে প্রচলিত একটি বিবরণে আথেনাকে ক্রোনোসের কন্যা বলা হয়েছে।[৮৫]

হেসিওডের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, মেটিসের সন্তান পিতা জিউসকে উৎখাত করবে—কিন্তু যেহেতু তাঁর প্রথম সন্তান আথেনা, তাই সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়নি। আথেনা কখনোই জিউসকে সিংহাসনচ্যুত করেননি। তবে হোমারের ইলিয়াড-এ একটি ভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আথেনা, হেরা এবং পোসেইডন একসময় জিউসকে বেঁধে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করেন। কিন্তু সমুদ্রদেবী থেটিস শতবাহু দৈত্য ব্রিয়ারেউস-কে অলিম্পাসে ডেকে আনলে, অন্য দেবতারা ভয়ে সেই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেন। ফলে জিউসের শাসন অক্ষুণ্ণ থাকে।[৮৬]

এথেন্সের অধিষ্ঠাত্রী দেবী

[সম্পাদনা]
রেনে-অঁতোয়ান হুয়াসের আঁকা “মিনার্ভা ও নেপচুনের বিরোধ” (আনুমানিক ১৬৮৯ অথবা ১৭০৬)।

যুদ্ধ, সুপরামর্শ, বিচক্ষণ সংযম ও বাস্তব প্রজ্ঞার দেবী হিসেবে আথেনা রাজাদের কল্যাণ ও রাষ্ট্রশাসনের অভিভাবক বলে বিবেচিত হতেন। ছদ্ম-অ্যাপোলোদোরাস বর্ণিত এথেন্স প্রতিষ্ঠার একটি সুপরিচিত পুরাণে বলা হয়েছে, এথেন্স নগরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হওয়ার অধিকার নিয়ে আথেনা ও পোসেইডনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়।[৮৭] উভয়ে সম্মত হন যে, তাঁরা প্রত্যেকে নগরবাসীকে একটি করে উপহার দেবেন এবং এথেন্সের প্রথম রাজা কেক্রপস নির্ধারণ করবেন কোন উপহারটি অধিক মূল্যবান।[৮৮] পোসেইডন তাঁর ত্রিশূল দিয়ে ভূমিতে আঘাত করলে সেখান থেকে একটি লবণাক্ত জলের ঝরনা (কিছু বর্ণনায় সমুদ্রের জলধারা) উৎসারিত হয়। এর ফলে এথেন্সের মানুষের জন্য সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যদিও পরবর্তী কালে এথেন্স শক্তিশালী নৌশক্তিতে পরিণত হয় এবং সালামিসের যুদ্ধে পারসিক নৌবহরকে পরাজিত করে, তবু পোসেইডনের উপহার হিসেবে পাওয়া জল ছিল লবণাক্ত ও পানের অযোগ্য।[৮৯] অন্যদিকে, ভার্জিলের জর্জিকস-এ বর্ণিত একটি ভিন্ন রূপে বলা হয়েছে যে, পোসেইডন এথেন্সবাসীকে প্রথম ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন।[৯০]

আথেনা জুস্তিনিয়ানি—প্যালাস আথেনার একটি গ্রিক ভাস্কর্যের রোমান প্রতিলিপি। এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসের রক্ষাকর্তা পবিত্র সাপটি তাঁর পদতলে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে।

আথেনা এথেন্সবাসীকে উপহার দেন প্রথম জলপাই গাছ। রাজা কেক্রপস এই উপহারকেই অধিক মূল্যবান বলে ঘোষণা করেন এবং আথেনাকে এথেন্সের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। জলপাই গাছ থেকে কাঠ, তেল ও খাদ্য পাওয়া যেত; ফলে এটি এথেন্সের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি এবং নগরটির প্রতীকে পরিণত হয়। পৌরাণিক গবেষক রবার্ট গ্রেভস মনে করেন, পোসেইডনের বিভিন্ন নগরের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কাহিনিগুলো মূলত রাজনৈতিক পুরাণ; এগুলো মাতৃতান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যকার সংঘাতের প্রতিফলন।[৯১] পোসেইডন প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়ে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন। প্রতিশোধ নিতে তিনি তাঁর এক পুত্র হালির্রোথিয়োস-কে আথেনার পবিত্র জলপাই গাছটি কেটে ফেলতে পাঠান। কিন্তু গাছটিতে কুঠারের আঘাত করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হন; কুঠারটি উল্টো তাঁর নিজের গায়েই আঘাত করে এবং তিনি নিহত হন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এখান থেকেই আথেনার পবিত্র জলপাই গাছের "মোরিয়া" নামের উৎপত্তি; কারণ গ্রিক ভাষায় মোরোস (μόρος) শব্দের অর্থ মারাত্মক পরিণতি বা বিধ্বংসী ভাগ্য। নিজের পুত্রের মৃত্যুর জন্য ক্ষুব্ধ পোসেইডন এরেস-এর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনেন। পরে এরিওপাগাস (এরেসের পাহাড়)-এ বিচার হয় এবং রায় এরেসের পক্ষে যায়। বলা হয়, এই ঘটনার স্মৃতিতেই পাহাড়টির নাম এরিওপাগাস হয়।[৯২] ছদ্ম-অ্যাপোলোদোরাস[৯৩] একটি প্রাচীন কিংবদন্তির উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে একসময় হেফাইস্টাস আথেনাকে বলপূর্বক দখল করার চেষ্টা করেন।[৯৪] আথেনা তাঁকে প্রতিহত করলে তাঁর বীর্য আথেনার উরুতে পড়ে। আথেনা উলের একটি গুচ্ছ দিয়ে তা মুছে মাটিতে নিক্ষেপ করেন। সেই বীর্য থেকে গাইয়া গর্ভধারণ করেন এবং জন্ম দেন এরিখথোনিয়োস-কে। পরে আথেনা তাঁকে নিজের পালিত পুত্র হিসেবে লালন-পালন করেন।[৯৫] রোমান পুরাণকার হাইজিনাস-এর ফাবুলায় এই কাহিনির আরেকটি রূপ পাওয়া যায়। সেখানে হেফাইস্টাস জিউসের কাছে আথেনাকে বিবাহের অনুমতি চান, কারণ তিনিই জিউসের কপাল বিদীর্ণ করে আথেনার জন্মের পথ খুলে দিয়েছিলেন। জিউস সম্মতি দিলে তাঁদের বিবাহ হয়।[৯৬] কিন্তু সহবাসের মুহূর্তে আথেনা অদৃশ্য হয়ে যান। ফলে হেফাইস্টাসের বীর্য মাটিতে পড়ে এবং সেখান থেকেই গাইয়ার গর্ভে এরিখথোনিয়োসের জন্ম হয়।[৯৭]

ভূগোলবিদ পাউসানিয়াস[৯৮] বর্ণনা করেন, আথেনা নবজাতক এরিখথোনিয়োসকে একটি ছোট পবিত্র সিন্দুকে রেখে কেক্রপসের তিন কন্যা—হার্সে, পান্দ্রোসোস এবং আগলাউরোস-এর জিম্মায় দেন।[৯৯] তিনি তাঁদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেন, কোনো অবস্থাতেই যেন সিন্দুকটি খোলা না হয়; কিন্তু কেন খোলা যাবে না, তা জানাননি। কৌতূহলবশত আগলাউরোস এবং কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁর এক বোন সিন্দুকটি খুলে ফেলেন। এরপর কী দেখা যায়, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন, তারা একটি সাপরূপী শিশুকে দেখেছিল; কেউ বলেন, শিশুটিকে একটি বা দুটি সাপ পাহারা দিচ্ছিল; আবার কারও মতে, শিশুটির নিম্নাংশ ছিল সাপের মতো। পাউসানিয়াসের মতে, এই দৃশ্য দেখে দুই বোন উন্মাদ হয়ে অ্যাক্রোপলিস থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে প্রাচীন অ্যাটিক পাত্রচিত্রে তাঁদের সাপের তাড়া খেয়ে পাহাড়ের কিনারা থেকে পড়ে যেতে দেখা যায়। আরেকটি কাহিনিতে বলা হয়েছে, আথেনা অ্যাক্রোপলিস নির্মাণের জন্য পাল্লেনে উপদ্বীপ থেকে চুনাপাথরের একটি পাহাড় আনতে গিয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে আগলাউরোস ও হার্সে সিন্দুকটি খুলে ফেলেন। একটি কাক এই ঘটনা দেখে উড়ে গিয়ে আথেনাকে জানায়। ক্রোধে আথেনা তাঁর বহন করা পাহাড়টি ফেলে দেন, যা পরে লাইকাবেত্তোস পর্বত নামে পরিচিত হয়। রোমান কবি ওভিদ তাঁর মেটামরফোসিস-এ কাহিনির একটি ভিন্ন রূপ বর্ণনা করেছেন। সেখানে দেবতা হার্মিস হার্সের প্রেমে পড়েন এবং আগলাউরোসের কাছে তাঁকে সাহায্য করার অনুরোধ করেন। আগলাউরোস বিনিময়ে অর্থ দাবি করেন। হার্মিস সেই অর্থ দিলেও, আগলাউরোস পরে হার্মিসের পথ আটকে দাঁড়ান। তাঁর লোভ ও প্রতারণার শাস্তি হিসেবে আথেনা ঈর্ষার দেবীকে পাঠান, এবং শেষ পর্যন্ত হার্মিস আগলাউরোসকে পাথরে পরিণত করেন।[১০০] এরিখথোনিয়োসকে এথেন্সের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা বীর হিসেবে গণ্য করা হতো।[১০১] কেক্রপসের কন্যাদের এই কাহিনি আর্রেফোরিয়া উৎসবের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।[১০২]

পাউসানিয়াসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই উৎসবে আর্রেফোরোই নামে দুই কিশোরী, যারা আথেনা পোলিয়াস-এর মন্দিরের নিকটে বাস করত, পুরোহিতার কাছ থেকে কিছু গোপন বস্তু গ্রহণ করত।[১০৩] তারা সেই বস্তু মাথায় বহন করে ভূগর্ভস্থ একটি গোপন পথ দিয়ে নিচে নেমে যেত, সেখানে বস্তুগুলো রেখে অন্য কিছু রহস্যময় বস্তু নিয়ে আবার মন্দিরে ফিরে আসত। পুরো অনুষ্ঠানটি গভীর রাতে সম্পন্ন হতো, এবং কী বহন করা হতো তা পুরোহিতাও জানতেন না। এই কাহিনির সাপটিকে অনেকে ফিদিয়াস নির্মিত বিখ্যাত আথেনা পার্থেনোস মূর্তির পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা সাপটির সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করেন। হেরোডোটাস-ও উল্লেখ করেছেন যে অ্যাক্রোপলিসের উত্তর ঢালে একটি সাপ বাস করত, যার উদ্দেশ্যে এথেন্সবাসীরা প্রতি মাসে মধুর পিঠা নিবেদন করত। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারসিকদের দ্বিতীয় আক্রমণের ঠিক আগে সেই সাপটি নিবেদন গ্রহণ করেনি। এথেন্সবাসীরা এটিকে এই লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে আথেনা নিজেই নগর ত্যাগ করেছেন। আথেনা মির্সিনে নামে এক অ্যাটিক কুমারীকে বিশেষ অনুগ্রহ করতেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে সে সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করায় ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে হত্যা করে। আথেনা তার প্রতি করুণা প্রদর্শন করে তাকে মির্টল গাছে রূপান্তরিত করেন। এরপর থেকে মির্টল তাঁর প্রিয় বৃক্ষগুলোর একটি হয়ে ওঠে, যেমন জলপাই গাছও ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়।[১০৪] প্রায় একই ধরনের আরেকটি কাহিনি এলাইয়া নামে এক তরুণীকে ঘিরেও প্রচলিত, যিনি জলপাই গাছে রূপান্তরিত হন।[১০৫]

ওভিদের বর্ণনায়, একদিন করোনে নামে এক তরুণী সমুদ্রতীরে হাঁটছিলেন। তাঁকে দেখে পোসেইডন প্রথমে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হয়ে জোরপূর্বক দখল করতে উদ্যত হন। করোনে দেবতা ও মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেও কেউ তাঁর আর্তনাদ শোনেনি। তখন আথেনা এক কুমারীর বিপদে করুণা করে তাঁকে কাকে রূপান্তরিত করে রক্ষা করেন। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ক্লেওথেরা ও মেরোপে অনাথ হয়ে পড়লে তাঁদের লালন-পালনের দায়িত্ব নেন আফ্রোদিতি। অন্য অলিম্পীয় দেবীরাও তাঁদের আশীর্বাদ করেন। হেরা তাঁদের সৌন্দর্য দান করেন, আর্টেমিস উচ্চ দেহকাঠামো প্রদান করেন এবং আথেনা তাঁদের নারীদের বিভিন্ন গৃহশিল্প ও হস্তশিল্পের শিক্ষা দেন।[১০৬]

বীরদের পৃষ্ঠপোষক

[সম্পাদনা]

হোমারের ইলিয়াড-এ আথেনাকে এমন এক যুদ্ধদেবী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি গ্রিক বীরদের অনুপ্রাণিত করেন এবং তাঁদের পাশে থেকে যুদ্ধ করেন। তাঁর অনুগ্রহ ছিল সামরিক দক্ষতা ও বিজয়ের প্রতীক।

আনুমানিক ৪৮০–৪৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি অ্যাটিক লাল-চিত্রশৈলীর কাইলিক্স-এ আথেনাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন—যখন কোলখিসের ড্রাগন বীর জেসনকে উদ্গীরণ করছে।

দেবরাজ জিউস যুদ্ধের দায়িত্ব দুই দেবতার মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। এরেস ছিলেন যুদ্ধের হিংস্র ও ধ্বংসাত্মক দিকের দেবতা, আর আথেনা প্রতিনিধিত্ব করতেন যুদ্ধের কৌশল, প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রূপকে। এই কারণেই আথেনা নৈতিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই এরেসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হতেন। এরেস যেখানে রক্তপাত ও উন্মত্ততার প্রতীক, সেখানে আথেনা ছিলেন বিচক্ষণতা, ন্যায় ও দক্ষতার প্রতিমূর্তি। ইলিয়াড-এ তিনি বীরোচিত আদর্শের দেবরূপ; তাঁর সহচরী ছিলেন বিজয়ের দেবী নাইকি। যুদ্ধে আথেনা যে ঐজিস (দিব্য ঢাল বা বক্ষবর্ম) ধারণ করতেন, তাতে ভয়, সংঘর্ষ, প্রতিরক্ষা ও আক্রমণের শক্তির প্রতীক নিহিত ছিল। ছদ্ম-অ্যাপোলোদোরাসের বিব্লিওথেকে অনুসারে, আথেনা আর্গোসকে পরামর্শ দিয়েছিলেন আর্গো নামের বিখ্যাত জাহাজ নির্মাণে। এই জাহাজেই বীর জেসন ও তাঁর সঙ্গী আর্গোনটরা সোনার মেষচর্মের সন্ধানে যাত্রা করেছিলেন।[১০৭]

পিন্ডারের ত্রয়োদশ অলিম্পীয় ওড অনুযায়ী, আথেনা বীর বেলেরোফনকে ডানাওয়ালা অশ্ব পেগাসাসকে বশ মানাতে সাহায্য করেন। তিনি বেলেরোফনকে একটি লাগাম উপহার দেন, যার সাহায্যে পেগাসাসকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। এস্কাইলাসের ওরেস্টেস নাটকে আথেনা এরিনিয়েস-দের (প্রতিশোধের দেবীগণ) ক্রোধ থেকে ওরেস্টেসকে রক্ষা করেন এবং তাঁর বিচারসভায় সভাপতিত্ব করেন। ওরেস্টেস তাঁর মা ক্লাইটেমনেস্ত্রাকে হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত ছিলেন।[১০৮] বিচারকদের ভোট সমান ভাগে বিভক্ত হলে আথেনা নিজের সিদ্ধান্তমূলক ভোট দিয়ে ওরেস্টেসকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ঘোষণা করেন যে, ভবিষ্যতে কোনো বিচারসভায় ভোট সমান হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই নির্দোষ গণ্য করা হবে।[১০৯] ছদ্ম-অ্যাপোলোদোরাস আরও উল্লেখ করেন যে, মেডুসার শিরচ্ছেদের অভিযানে আথেনা বীর পার্সিউসকে পথনির্দেশ দেন।[১১০] যাত্রাপথে আথেনা ও হার্মিস তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও উপকরণ দেন। আথেনা তাঁকে নিজের মসৃণ ব্রোঞ্জের ঢাল ধার দেন, যাতে মেডুসার দিকে সরাসরি না তাকিয়ে ঢালে প্রতিফলন দেখে আক্রমণ করা যায়।[১১১] হার্মিস দেন বাঁকানো তলোয়ার হার্পে। পার্সিউস যখন মেডুসার মাথা কাটতে উদ্যত হন, আথেনা তাঁর হাত পরিচালিত করেন, ফলে এক আঘাতেই মেডুসার মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়।[১১২]

প্রাচীন গ্রিক শিল্পে আথেনাকে প্রায়ই হেরাক্লেস-এর সহায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।[১১৩] অলিম্পিয়ার জিউস মন্দিরের বারোটি শ্রমচিত্রের মধ্যে চারটিতে তাঁকে দেখা যায়।[১১৪] প্রথম শ্রমে তিনি হেরাক্লেসকে নেমিয়ার সিংহ বধের পর সিংহের নিজের নখ দিয়েই চামড়া ছাড়াতে শেখান। দশম শ্রমে তাঁকে হেরাক্লেসের সঙ্গে আকাশ ধারণ করতেও দেখা যায়।[১১৫] অ্যাপোলোদোরাস-এর মতে, আথেনার পরামর্শেই হেরাক্লেস দৈত্য আলকিওনেউসকে তাঁর জন্মভূমির বাইরে টেনে নিয়ে যান, যেখানে সে অমরত্ব হারায়, এবং পরে তাকে বধ করেন। শিল্পকর্মে হেরাক্লেসের দেবত্বপ্রাপ্তির দৃশ্যেও আথেনাকে দেখা যায়। তিনি নিজের রথে করে হেরাক্লেসকে অলিম্পাসে নিয়ে যান এবং জিউসের সামনে উপস্থিত করেন।[১১৬]

হোমারের ওডিসি-তে আথেনা বীর ওডিসিউস-এর বুদ্ধি, ধৈর্য ও কৌশলে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রধান অভিভাবক হয়ে ওঠেন।[১১৭] কাব্যের প্রথম অংশে তিনি দূর থেকেই ওডিসিউসকে সাহায্য করেন—মনে সঠিক চিন্তা ও পরিকল্পনা জাগিয়ে। এভাবেই তিনি বীরদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে তাঁর ভূমিকা পালন করেন।[১১৮] ওডিসিউস যখন ফিয়াকীয়দের দ্বীপে পৌঁছান, তখন আথেনা প্রথমবার সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তিনি রাজকন্যা নওসিকেয়ার স্বপ্নে এসে তাঁকে ওডিসিউসকে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং তাঁর ইথাকায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেন।[১১৯]

ইথাকায় পৌঁছালে আথেনা এক রাখালের ছদ্মবেশে ওডিসিউসের সামনে উপস্থিত হন। প্রথমে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলেন যে, পেনেলোপে অন্যত্র বিবাহ করেছেন এবং সবাই ওডিসিউসকে মৃত মনে করে। ওডিসিউসও পরিচয় গোপন রাখতে কৌশলে মিথ্যা উত্তর দেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে আথেনা নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেন এবং রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা জানান। তিনি ওডিসিউসকে এক বৃদ্ধ ভিখারির রূপ দেন, যাতে প্রণয়প্রার্থীরা তাঁকে চিনতে না পারে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও আথেনা তাঁকে সহায়তা করেন। আথেনা ওডিসিউসের পুত্র টেলেমাকোস-কেও পথপ্রদর্শন করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় টেলেমাকোস পিতার পুরোনো সঙ্গীদের কাছে যান এবং ওডিসিউসের খবর সংগ্রহ করেন। এই যাত্রার মধ্য দিয়েই তিনি ধীরে ধীরে একজন পরিণত নেতা হিসেবে গড়ে ওঠেন। অবশেষে প্রণয়প্রার্থীদের মৃত্যুর পর তাঁদের আত্মীয়দের সঙ্গে যে সংঘাত শুরু হয়, সেটিরও অবসান ঘটাতে আথেনা ভূমিকা রাখেন। তাঁর নির্দেশে লার্তেস বর্শা নিক্ষেপ করে অ্যান্টিনোওসের পিতা ইউপেইথেসকে হত্যা করেন, এবং এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিরোধের সমাপ্তি ঘটে।[১২০]

শাস্তিদানের উপাখ্যান

[সম্পাদনা]

হেলেনীয় যুগের (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক) কবি ক্যালিমাখাস তাঁর হিম্ন ৫-এ বর্ণনা করেছেন যে, একদিন মধ্যাহ্নে হেলিকন পর্বতের একটি ঝরনায় আথেনা তাঁর প্রিয় সঙ্গিনী অপ্সরা খারিক্লোকে নিয়ে স্নান করছিলেন।[১২১] সেই সময় খারিক্লোর পুত্র তিরেসিয়াস শিকার করতে করতে জল খুঁজতে এসে অনিচ্ছাকৃতভাবে নগ্ন আথেনাকে দেখে ফেলে। মানুষের চোখে যা দেখা নিষিদ্ধ, তা দেখে ফেলায় আথেনা তাকে অন্ধ করে দেন।[১২২] খারিক্লো করুণা ভিক্ষা করলে আথেনা জানান, তিনি অন্ধত্ব ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। তবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিরেসিয়াসকে তিনি পাখিদের ভাষা বোঝার এবং ভবিষ্যৎ জানার অলৌকিক ক্ষমতা দান করেন।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মেদুসার একটি ধ্রুপদী গ্রিক চিত্রায়ণ।

আরেক কাহিনিতে মিরমেক্স নামে এক বুদ্ধিমতী ও সতী অ্যাটিক কুমারী আথেনার বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে ওঠে। কিন্তু আথেনা যখন লাঙল আবিষ্কার করেন, তখন মিরমেক্স মানুষের কাছে মিথ্যা দাবি করে যে আবিষ্কারটি তার নিজের। এই বিশ্বাসঘাতকতায় আহত হয়ে আথেনা তাকে পিঁপড়ায় রূপান্তরিত করেন। গ্রিক ভাষায় মিরমেক্স শব্দের অর্থই ‘পিঁপড়া’।[১২৩]

গর্গোনেয়ন—অর্থাৎ গর্গনের মুখাবয়ব—মূলত অশুভ শক্তি প্রতিহত করার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী রোমান যুগের এক কাহিনিতে এর উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেই মতে, মেদুসাকে আথেনার মন্দিরে পোসেইডন ধর্ষণ করেন। মন্দির অপবিত্র হওয়ায় ক্রুদ্ধ আথেনা মেদুসার কেশকে বিষধর সাপে পরিণত করেন এবং এমন অভিশাপ দেন যে, তার মুখের দিকে তাকালেই যে কেউ পাথরে পরিণত হবে।[১২৪]

পিন্দার তাঁর দ্বাদশ পিথিয়ান ওড-এ লিখেছেন, মেদুসার শিরচ্ছেদের পর তার দুই বোনের শোকধ্বনি অনুকরণ করে আথেনা আউলোস (দ্বিমুখী বাঁশি) আবিষ্কার করেন। পরে তিনি সেটি মানুষের জন্য উপহার হিসেবে দেন। কিন্তু পরবর্তী কৌতুকনাট্যকার মেলানিপ্পিদেস কাহিনিটিকে ভিন্নভাবে বলেন। তাঁর মতে, আথেনা আয়নায় নিজের মুখ দেখে বুঝতে পারেন যে আউলোস বাজানোর সময় তাঁর গাল ফুলে কুৎসিত দেখায়। বিরক্ত হয়ে তিনি বাঁশিটি ফেলে দেন এবং অভিশাপ দেন—যে এটি কুড়িয়ে নেবে, তার ভয়াবহ পরিণতি হবে। পরে মার্সিয়াস নামের এক স্যাটির সেটি কুড়িয়ে নিয়ে বাজাতে শুরু করে এবং অহংকারবশে অ্যাপোলোর সঙ্গে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় নামে। পরিণতিতে অ্যাপোলো তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এই কাহিনি পরবর্তীকালে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, ভাস্কর মাইরন এর ওপর ভিত্তি করে বিখ্যাত ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন।

রেনে-অঁতোয়ান হুয়াসের আঁকা “মিনার্ভা ও আরাখনে” (১৭০৬)।

আরাখনের উপাখ্যান রোমান কবি ওভিদের মেটামরফোসিস-এ সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আরাখনে ছিলেন লিডিয়ার হিপাইপা নগরের এক প্রসিদ্ধ বস্ত্ররঞ্জকের কন্যা এবং আথেনার কাছেই তাঁত বোনার শিক্ষা নিয়েছিলেন। নিজের দক্ষতায় এতটাই গর্বিত হয়ে ওঠেন যে, তিনি দাবি করতে শুরু করেন—তাঁর বয়নশিল্প আথেনার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

আথেনা বৃদ্ধার ছদ্মবেশে এসে তাকে সতর্ক করেন, কিন্তু আরাখনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তখন আথেনা স্বরূপ প্রকাশ করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। আথেনার বস্ত্রে এথেন্সের অভিভাবকত্ব নিয়ে পোসেইডনের ওপর তাঁর বিজয় এবং দেবতাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দৃশ্য ফুটে ওঠে। অন্যদিকে আরাখনে দেবতাদের নানা প্রেমকাহিনি ও মানুষের প্রতি তাঁদের অন্যায় আচরণের চিত্র বুনে দেবতাদের বিদ্রূপ করেন।

আথেনা স্বীকার করেন যে আরাখনের কারিগরি নিখুঁত ছিল, কিন্তু বিষয়বস্তুর দুঃসাহসিকতায় তিনি ক্রোধান্ধ হয়ে তার তাঁত ও বস্ত্র ধ্বংস করেন এবং তাঁতের শাটল দিয়ে তাকে আঘাত করেন। অপমানে আরাখনে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে আথেনা করুণা করে তাকে মাকড়সায় রূপান্তরিত করেন, যাতে সে চিরকাল জাল বুনে যেতে পারে।

আরও একটি বিরল রূপে বলা হয়, আরাখনের এক ভাই ছিল, নাম ফ্যালানক্স। আথেনা আরাখনেকে তাঁত বোনা এবং ফ্যালানক্সকে যুদ্ধবিদ্যা শেখান। কিন্তু ভাই-বোন নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে আথেনা ঘৃণায় তাদের উভয়কেই মাকড়সায় পরিণত করেন—যে প্রাণী নিজের সন্তানদের হাতেই ভক্ষিত হওয়ার নিয়তিতে আবদ্ধ।[১২৫]

ওভিদের মেটামরফোসিস-এ আরেকটি কাহিনিতে ডেডালুস তাঁর ভাগনে পেরডিক্সকে যান্ত্রিক বিদ্যা শেখাচ্ছিলেন। পেরডিক্স মাছের কাঁটা বা সাপের চোয়াল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম করাত আবিষ্কার করে। ভাগনের প্রতিভায় ঈর্ষান্বিত হয়ে ডেডালুস তাকে একটি উঁচু টাওয়ার থেকে নিচে ফেলে দেন। কিন্তু আথেনা তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে তিতির পাখিতে রূপান্তরিত করেন। সেই থেকেই তিতির পাখি কখনও খুব উঁচুতে উড়ে না বা গাছের চূড়ায় বাসা বাঁধে না; বরং নিচু ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নেয়, যেন নিজের পতনের স্মৃতি কখনও ভুলে না যায়। এই অপরাধের জন্য ডেডালুস বিচারিত হয়ে নির্বাসিত হন। কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, আথেনা তাঁর দেহে তিতিরের আকৃতির একটি স্থায়ী দাগও রেখে দেন, যাতে তিনি সারাজীবন নিজের অপরাধের কথা স্মরণ করেন।

ট্রয় যুদ্ধ

[সম্পাদনা]
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর অ্যান্টিওকের একটি প্রাচীন গ্রিক মোজাইক, যেখানে প্যারিসের বিচার চিত্রিত হয়েছে।

প্যারিসের বিচার (Judgement of Paris)-এর কাহিনি ইলিয়াড-এ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলেও, এর পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় সাইপ্রিয়া (Cypria) নামের হারিয়ে যাওয়া মহাকাব্যের সংক্ষিপ্তসারে।[১২৬] কাহিনি অনুসারে, পেলেউস ও থেটিসের (ভবিষ্যতে আকিলিসের পিতা-মাতা) বিবাহে সকল দেব-দেবী ও বহু নশ্বর মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে কলহের দেবী এরিসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।[১২৭] অপমানিত এরিস অনুষ্ঠানে এসে "সর্বাধিক সুন্দরীর জন্য" (καλλίστῃ, ক্যাল্লিস্তেই) লেখা একটি সোনার আপেল দেবীদের মাঝে নিক্ষেপ করেন। এই আপেলের দাবিদার হন তিন দেবী—আফ্রোদিতি, হেরা এবং আথেনা। কে সবচেয়ে সুন্দর, সেই সিদ্ধান্ত দিতে অনিচ্ছুক জিউস বিচারভার অর্পণ করেন ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসের ওপর। ট্রয়ের নিকটবর্তী ইদা পর্বতের এক ঝরনায় স্নান শেষে তিন দেবী প্যারিসের সামনে উপস্থিত হন। প্রাচীন গ্রিক শিল্পে সাধারণত কেবল আফ্রোদিতিকেই নগ্ন রূপে দেখানো হতো; আথেনা ও হেরা থাকতেন সম্পূর্ণ বস্ত্রপরিহিতা।[১২৮] তবে রেনেসাঁ-পরবর্তী পাশ্চাত্য শিল্পে তিন দেবীকেই প্রায়শই নগ্ন অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে।

প্যারিস যখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, তখন তিন দেবী তাঁকে প্রলোভন দেখান।

  • হেরা প্রতিশ্রুতি দেন এশিয়া ও ইউরোপের ওপর সর্বময় রাজত্ব।
  • আথেনা প্রতিশ্রুতি দেন যুদ্ধে অমর খ্যাতি ও গৌরব।
  • আফ্রোদিতি প্রতিশ্রুতি দেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারীকে স্ত্রীরূপে লাভের সুযোগ।

সেই নারী ছিলেন হেলেন, যিনি তখন স্পার্টার রাজা মেনেলাউসের স্ত্রী। প্যারিস আফ্রোদিতিকেই বিজয়িনী ঘোষণা করে সোনার আপেল তুলে দেন। এতে হেরা ও আথেনা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং পরবর্তীকালে ট্রয় যুদ্ধে গ্রিকদের পক্ষ অবলম্বন করেন। এভাবেই প্যারিসের বিচার ট্রয় যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সূচনা ঘটায়।[১২৯] ইলিয়াড-এর পঞ্চম ও ষষ্ঠ সর্গে, আকিলিস যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর আথেনা গ্রিক বীর দিওমেদেসকে সহায়তা করেন। তাঁর সহায়তায় দিওমেদেস গ্রিকদের সবচেয়ে কার্যকর যোদ্ধায় পরিণত হন। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর বহু শিল্পকর্মে আথেনা ও দিওমেদেসকে পাশাপাশি চিত্রিত করা হয়েছে। ইলিয়াড-এ আরও উল্লেখ আছে যে, আথেনা এর আগেও দিওমেদেসের পিতা টাইদেউসের অভিভাবক দেবী ছিলেন।[১৩০]

আন্তালিয়া জাদুঘরে সংরক্ষিত আথেনার একটি মূর্তি

যখন ট্রয়ের নারীরা আথেনার মন্দিরে গিয়ে দিওমেদেসের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রার্থনা করেন, আথেনা তাঁদের প্রার্থনা উপেক্ষা করেন। পরে জিউস দেবতাদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিলে ট্রয়পক্ষের সমর্থক এরেস আথেনার ওপর আক্রমণ চালান। কিন্তু আথেনা এক বিশাল পাথর নিক্ষেপ করে এরেসকে পরাস্ত করেন। ইলিয়াড-এর বাইশতম সর্গে, আকিলিস যখন ট্রয়ের প্রাচীর ঘিরে হেক্টরকে তাড়া করছেন, তখন আথেনা হেক্টরের ভাই দেইফোবসের ছদ্মবেশ ধারণ করে তাকে পালিয়ে না গিয়ে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করেন। হেক্টর আকিলিসের দিকে বর্শা নিক্ষেপ করলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। তিনি ধারণা করেছিলেন দেইফোবস তাঁকে আরেকটি বর্শা দেবেন। কিন্তু তখনই আথেনা অদৃশ্য হয়ে যান। ফলে নিরস্ত্র হেক্টরকে একাই আকিলিসের মুখোমুখি হতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি নিহত হন।[১৩১] সোফোক্লিসের ট্র্যাজেডি এয়াজ-এ আথেনা ওডিসিউসের প্রতিদ্বন্দ্বী মহান এয়াজকে শাস্তি দেন। তিনি এয়াজকে উন্মাদ করে তোলেন, ফলে এয়াজ গ্রিক সৈন্যদের হত্যা করছে মনে করে তাদের গবাদিপশু জবাই করতে শুরু করেন। এমনকি ওডিসিউস নিজেও এয়াজের দুর্দশায় সহানুভূতি প্রকাশ করলে আথেনা বলেন— "শত্রুকে উপহাস করার চেয়ে মধুর হাসি আর কী হতে পারে?" এই অপমান সহ্য করতে না পেরে এয়াজ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন।

ধ্রুপদি শিল্পে আথেনা

[সম্পাদনা]

ধ্রুপদি গ্রিক শিল্পে আথেনার উপস্থিতি অত্যন্ত ব্যাপক। মুদ্রা, মৃৎপাত্রের চিত্রকলা, ভাস্কর্য এবং বিভিন্ন শিল্পকর্মে তাঁকে বারবার চিত্রিত করা হয়েছে। বিশেষত এথেন্সে নির্মিত শিল্পকর্মে আথেনার প্রাধান্য ছিল সর্বাধিক। ধ্রুপদি শিল্পে আথেনাকে সাধারণত সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থায়, পূর্ণদৈর্ঘ্যের খিতোন (গ্রিক পোশাক) পরিহিতা রূপে দেখানো হয়। অধিকাংশ চিত্রণে তিনি একজন পুরুষ যোদ্ধার মতো পূর্ণ বর্ম পরিহিতা এবং কপালের ওপর উঁচু করে তোলা করিন্থীয় শিরস্ত্রাণ পরিহিত।[১৩২]

তাঁর ঢালের কেন্দ্রে থাকে ঐজিস, যার মাঝখানে খোদাই করা থাকে গর্গনের মুখমণ্ডল (গর্গোনেয়ন), আর চারপাশে থাকে সাপের অলঙ্করণ। কখনও কখনও ঐজিসকে তাঁকে একটি চাদরের মতো পরিহিত অবস্থায়ও দেখানো হয়েছে। আথেনা প্রোমাখোস (অগ্রসেনানী আথেনা) রূপে তিনি হাতে উঁচু করে ধরা বর্শাসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় চিত্রিত হন।

শিল্পে আথেনার জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বারবার ফুটে উঠেছে, যেমন—

  • জিউসের মস্তক থেকে তাঁর জন্ম,
  • দৈত্যদের (গিগান্তেস) বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ,
  • এরিখথোনিয়ুসের জন্ম,
  • এবং প্যারিসের বিচার।

প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০–৪৬০ সালের 'শোকাতুর আথেনা' (Mourning Athena বা Athena Meditating) নামে পরিচিত বিখ্যাত রিলিফ ভাস্কর্যটিকে অনেক গবেষক আথেনা পোলিয়াস-এর প্রতিরূপ বলে মনে করেন। আথেনার সর্বাধিক বিখ্যাত ধ্রুপদি ভাস্কর্য ছিল আথেনা পার্থেনোস—এথেন্সের পার্থেনন মন্দিরে স্থাপিত প্রায় ১১.৫ মিটার (৩৮ ফুট) উচ্চতার স্বর্ণ ও হাতির দাঁতে নির্মিত এক বিশাল মূর্তি।[১৩৩] এটি নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত ভাস্কর ফিদিয়াস। যদিও মূল ভাস্কর্যটি আজ আর অস্তিত্বে নেই, বিভিন্ন প্রতিলিপি থেকে জানা যায় যে, মূর্তিতে আথেনার বাম হাতে ছিল ঢাল, আর ডান হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বিজয়ের পাখাওয়ালা দেবী নাইকি। আথেনা পোলিয়াস-এর আরেকটি নিও-অ্যাটিক রিলিফ বর্তমানে ভার্জিনিয়া মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস-এ সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে তাঁকে হাতে একটি প্যাঁচা, মাথায় তাঁর স্বাক্ষর করিন্থীয় শিরস্ত্রাণ, এবং পাশে একটি হার্ম-এর গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা ঢালসহ চিত্রিত করা হয়েছে।

পরবর্তীকালে রোমান দেবী মিনার্ভা আথেনার প্রায় সব গ্রিক প্রতীক ও শিল্পরীতি গ্রহণ করেন। তবে রোমান ধর্মে তিনি একই সঙ্গে ক্যাপিটোলাইন ত্রয়ী (জুপিটার, জুনো ও মিনার্ভা)-এর অন্যতম দেবী হিসেবেও পূজিত হন।[১৩৪]

পরবর্তী যুগের সংস্কৃতিতে আথেনা

[সম্পাদনা]

শিল্প ও প্রতীকচর্চায় আথেনা

[সম্পাদনা]
অস্ট্রিয়ার সংসদ ভবনের সামনে স্থাপিত পাল্লাস আথেনার মূর্তি। পশ্চিমা ইতিহাসে আথেনাকে দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রথম যুগের খ্রিস্টান লেখকেরা—যেমন আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লেমেন্ট এবং ফিরমিকুস—আথেনাকে পৌত্তলিক ধর্মের সব নিন্দনীয় বিষয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁদের মতে, তিনি ছিলেন "লজ্জাহীন" ও "নৈতিকতাবর্জিত" দেবী।[১৩৫] তবে মধ্যযুগে আথেনার অনেক বৈশিষ্ট্যই স্থানান্তরিত হয় যিশুর জননী কুমারী মেরির ওপর। চতুর্থ শতকের কিছু চিত্রে মেরিকে গর্গোনেয়ন-অলঙ্কৃত বক্ষাবরণ পরিহিত অবস্থায় দেখানো হয়েছে। এমনকি অনেকের কাছে তিনি ছিলেন আথেনা পার্থেনোসের মতোই এক যোদ্ধা-কুমারী। একটি কিংবদন্তিতে বলা হয়, আভারদের অবরোধের সময় কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের ওপর কুমারী মেরি বর্শা হাতে আবির্ভূত হয়ে নগরবাসীকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।

মধ্যযুগ জুড়ে আথেনা ক্রমে খ্রিস্টীয় প্রতীক ও রূপকচিত্রের অংশ হয়ে ওঠেন। ইউরোপের বহু অভিজাত পরিবারের কোট অব আর্মস বা পারিবারিক প্রতীকে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। রেনেসাঁ যুগে আথেনা নতুন পরিচয়ে ফিরে আসেন—শিল্প, জ্ঞান ও মানবসৃষ্টির অভিভাবক হিসেবে। ইতালীয় রেনেসাঁ শিল্পীদের কাছে তাঁকে কেন্দ্র করে আঁকা রূপকচিত্র ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সান্দ্রো বত্তিচেল্লির পাল্লাস অ্যান্ড দ্য সেন্টর (প্রায় ১৪৮০-এর দশক)-এ আথেনাকে পবিত্রতা ও আত্মসংযমের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে তিনি এক সেন্টরের কেশমুষ্টি ধরে আছেন; সেন্টরটি প্রতীক হয়ে উঠেছে কামনা ও অবদমিত প্রবৃত্তির। আবার আন্দ্রেয়া মান্তেনিয়ার ১৫০২ সালের Minerva Expelling the Vices from the Garden of Virtue চিত্রে আথেনা (মিনার্ভা) গ্রিক-রোমান জ্ঞানচর্চার প্রতীক। তিনি মধ্যযুগীয় অজ্ঞতা ও দোষকে জ্ঞানের উদ্যান থেকে বিতাড়িত করছেন।

বার্তোলোমেউস স্প্র্যাঙ্গার-এর ১৫৯১ সালের The Triumph of Wisdom (বা Minerva Victorious over Ignorance)-এ আথেনা আবারও প্রজ্ঞার প্রতীক, যেখানে তিনি অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের বিজয়কে তুলে ধরেছেন। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে আথেনা নারী শাসকদের আদর্শ প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতে শুরু করেন। থমাস ব্লেনারহ্যাসেট তাঁর A Revelation of the True Minerva (১৫৮২) গ্রন্থে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথকে "নতুন মিনার্ভা" এবং "পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেবী" বলে আখ্যায়িত করেন। পরবর্তীকালে পিটার পল রুবেন্স তাঁর একাধিক চিত্রে ফ্রান্সের রানি মারি দ্য মেদিচিকে আথেনার স্নেহধন্য ও শিষ্যা হিসেবে দেখান। ধারাবাহিকটির শেষ চিত্রে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে মারি দ্য মেদিচিকেই আথেনার প্রতীক ও পার্থিব অবতার হিসেবে উপস্থাপন করেন।

১৭৭৪ সালে ফ্লেমিশ ভাস্কর জ্যাঁ-পিয়ের-অঁতোয়ান তাসার রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেটকে আথেনার রূপে একটি মার্বেল ভাস্কর্যে অমর করে রাখেন। ফরাসি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সজুড়ে বহু পৌত্তলিক দেবতার মূর্তি ধ্বংস করা হলেও আথেনার মূর্তিগুলো রক্ষা পায়। কারণ তখন তিনি আর কেবল প্রাচীন দেবী নন—তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্রের প্রতীক। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রেভল্যুশন-এর কেন্দ্রে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে আথেনাকে ঘিরে শিল্পকর্মের সংখ্যাও দ্রুত বেড়ে যায়। আজও আথেনার প্রতীকী উপস্থিতি বিশ্বের নানা প্রান্তে দৃশ্যমান। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পার্লামেন্ট ভবনের সামনে তাঁর একটি বিশাল মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। পাশ্চাত্যে স্ট্যাচু অব লিবার্টি এবং ব্রিটানিয়ার মতো স্বাধীনতার প্রতীকগুলোর নকশাতেও আথেনার প্রভাব স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ন্যাশভিল শহরে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পার্থেনন মন্দিরের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরূপ দাঁড়িয়ে আছে।[১৩৬] ১৯৯০ সালে সেখানে ফিদিয়াসের আথেনা পার্থেনোস মূর্তির প্রায় ১২.৫ মিটার (৪২ ফুট) উচ্চতার স্বর্ণাভ প্রতিরূপ স্থাপন করা হয়, যা কংক্রিট ও ফাইবারগ্লাস দিয়ে নির্মিত। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মহামোহরে একটি বাদামি গ্রিজলি ভালুকের পাশে হাঁটু গেড়ে বসা আথেনার চিত্র রয়েছে। আধুনিক মুদ্রাতেও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়—যেমন প্রাচীন এথেন্সের দ্রাখমায় ছিল, তেমনি ১৯১৫ সালের ৫০ ডলারের পানামা-প্যাসিফিক স্মারক মুদ্রায়ও আথেনার মুখমণ্ডল স্থান পেয়েছে।[১৩৭]

আধুনিক ব্যাখ্যায় আথেনা

[সম্পাদনা]
আধুনিক হেলেনিস্ট নব্য-পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বীদের আথেনা ও অ্যাপোলোর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি বেদি।

মনোবিশ্লেষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সবচেয়ে প্রিয় সংগ্রহগুলোর একটি ছিল আথেনার একটি ছোট ব্রোঞ্জের মূর্তি, যা সবসময় তাঁর কাজের টেবিলে রাখা থাকত। ফ্রয়েড একবার আথেনাকে বর্ণনা করেছিলেন এমন এক নারী হিসেবে, যিনি অধরা এবং যাঁর উপস্থিতি সব ধরনের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিহত করে, কারণ তাঁর মধ্যে তিনি মাতৃত্বের এক ভীতিপ্রদ ও রহস্যময় শক্তির প্রকাশ দেখেছিলেন। নারীবাদী চিন্তাধারায় আথেনাকে নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদল নারীবাদীর মতে, তিনি পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থারই প্রতিনিধি—নিজের শক্তি ও প্রজ্ঞাকে তিনি নারীদের নয়, বরং পুরুষদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে, অনেক নারীবাদী আথেনাকে নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাধীনতা ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দেখেন। সমসাময়িক উইক্কা ধর্মে আথেনাকে দেবীর এক বিশেষ রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। অনেক উইক্কান বিশ্বাস করেন, তিনি তাঁর ভক্তদের "প্যাঁচার আশীর্বাদ" দান করতে পারেন—অর্থাৎ স্পষ্টভাবে চিন্তা করা, সুন্দরভাবে লেখা এবং কার্যকরভাবে যোগাযোগ করার ক্ষমতা। গ্রিক দেবমণ্ডলীর বারোজন অলিম্পীয় দেবতার একজন হওয়ায়, আথেনা হেলেনিসম নামের আধুনিক নব্য-পৌত্তলিক ধর্মেও অন্যতম প্রধান দেবী। এই ধর্মের অনুসারীরা প্রাচীন গ্রিক ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাসকে যতটা সম্ভব মূল রূপে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।[১৩৮]

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবী হিসেবে আথেনা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও প্রতীকী অভিভাবক হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ব্রিন মার কলেজের গ্রেট হলে তাঁর একটি মূর্তি রয়েছে, যা প্রাচীন ব্রোঞ্জের মূল ভাস্কর্যের প্রতিরূপ। সেখানে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা সৌভাগ্যের প্রার্থনায় আথেনার মূর্তির সামনে ছোট ছোট উপহার রেখে যায়। আবার কেউ যদি কলেজের কোনো দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভঙ্গ করে ফেলে, তবে ক্ষমা প্রার্থনার নোটও সেখানে রেখে আসে।[১৩৯]

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সামাজিক ভ্রাতৃসংঘ ফাই ডেল্টা থিটা-র (Phi Delta Theta) অভিভাবক দেবীও আথেনা। তাঁর প্রতীক প্যাঁচা সংগঠনটির অন্যতম সরকারি প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।[১৪০]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ /əˈθiːnə/; Attic Greek: Ἀθηνᾶ, Athēnâ, or Ἀθηναία, Athēnaía; Epic: Ἀθηναίη, Athēnaíē; Doric: Ἀθάνα, Athā́nā
  2. ↑ Merriam-Webster's Encyclopedia of Literature. Merriam-Webster. 1995. p. 81.। আইএসবিএন ৯৭৮০৮৭৭৭৯০৪২৬।
  3. ↑ Burkert 1985, p. 139.
  4. ↑ Powell 2012, p. 230.
  5. ↑ Ruck & Staples 1994, p. 24
  6. ↑ Beekes, Robert S. P. (2009), Etymological Dictionary of Greek, Leiden and Boston: Brill
  7. ↑ Johrens, Gerhard (1981), Der Athenahymnus des Ailios Aristeides, Bonn, Germany: Habelt, pp. 438–452,। আইএসবিএন ৯৭৮৩৭৭৪৯১৮৫০৪।
  8. ↑ Nilsson, Martin Persson (1967), Die Geschichte der griechischen Religion, München, Germany: C. F. Beck
  9. ↑ Hurwit, Jeffrey M. (1999), The Athenian Acropolis: History, Mythology, and Archaeology from the Neolithic Era to the Present, Cambridge, England: Cambridge University Press,। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৪১৭৮৬-০।
  10. ↑ Burkert, Walter (1985), Greek Religion, Cambridge, Massachusetts: Harvard University Press,। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৭৪-৩৬২৮১-৯।
  11. ↑ KO Za 1 inscription, line 1.
  12. ↑ Best, Jan (1989), Fred Woudhuizen (ed.), Lost Languages from the Mediterranean, Leiden, Germany et al.: Brill, p. 30,। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০০৪০৮৯৩৪১।
  13. ↑ Mylonas, G. (1966), Mycenae and the Mycenaean Age, Princeton, New Jersey: Princeton University Press,। আইএসবিএন ৯৭৮-০৬৯১০৩৫২৩৯।
  14. ↑ Fururmark, A. (1978), "The Thera Catastrophe-Consequences for the European Civilization", Thera and the Aegean World I, London, England: Cambridge University Press
  15. ↑ Harrison 1922:306. Cfr. ibid., p. 307, fig. 84: "Detail of a cup in the Faina collection". Archived from the original on 5 November 2004. Retrieved 6 May 2007..
  16. ↑ Puhvel, Jaan (1987), Comparative Mythology, Baltimore, Maryland: Johns Hopkins University Press,। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮০১৮-৩৯৩৮-২।
  17. ↑ Penglase, Charles (1994), Greek Myths and Mesopotamia: Parallels and Influence in the Homeric Hymns and Hesiod, New York City, New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-১৫৭০৬-৩।
  18. ↑ Cf. also Herodotus, Histories 2:170–175.
  19. ↑ Fritze, Ronald H. (2009), Invented Knowledge: False History, Fake Science and Pseudo-Religions, London, England: Reaktion Books। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৬১৮৯-৪৩০-৪।
  20. ↑ Janson, Horst Woldemar; Janson, Anthony F. (2004). Touborg, Sarah; Moore, Julia; Oppenheimer, Margaret; Castro, Anita (eds.). History of Art: The Western Tradition. Vol. 1 (Revised 6th ed.). Upper Saddle River, New Jersey: Pearson Education. pp. 111, 160। আইএসবিএন ০-১৩-১৮২৬২২-০।
  21. ↑ Janson, Horst Woldemar; Janson, Anthony F. (2004). Touborg, Sarah; Moore, Julia; Oppenheimer, Margaret; Castro, Anita (eds.). History of Art: The Western Tradition. Vol. 1 (Revised 6th ed.). Upper Saddle River, New Jersey: Pearson Education. pp. 111, 160.। আইএসবিএন ০-১৩-১৮২৬২২-০।
  22. ↑ Schmitt, P. (2000), "Athena Apatouria et la ceinture. Les aspects féminins des apatouries à Athènes", Annales: Economies, Societies, Civilisations, London, England: Thames and Hudson, pp. 1059–1073
  23. ↑ "Pausanias, Description of Greece, *korinqiaka/, chapter 34, section 9"। www.perseus.tufts.edu। ২৪ জুন ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬।
  24. ↑ "A Dictionary of Greek and Roman biography and mythology, Ma, Ma'ximus, Fa'bius, Mechaneus"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬।
  25. ↑ Lesley A. Beaumont (2013). Childhood in Ancient Athens: Iconography and Social History. Routledge. p. 69.। আইএসবিএন ৯৭৮-০৪১৫২৪৮৭৪৭।
  26. ↑ Chantraine, s.v.; the New Pauly says the etymology is simply unknown
  27. ↑ New Pauly s.v. Pallas
  28. ↑ Graves, Robert (1960) [1955], The Greek Myths, London, England: Penguin। আইএসবিএন ৯৭৮-০২৪১৯৫২৭৪০।
  29. ↑ Kerényi, Karl (1951), The Gods of the Greeks, London, England: Thames and Hudson। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫০০-২৭০৪৮-৬।
  30. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  31. ↑ γλαυκῶπις in Liddell and Scott.
  32. ↑ Nilsson, Martin Persson (1950), The Minoan-Mycenaean Religion and Its Survival in Greek Religion (second ed.), New York: Biblo & Tannen। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৯৬-০২৭৩-২।
  33. ↑ Graves, Robert (1960) [1955], The Greek Myths, London, England: Penguin। আইএসবিএন ৯৭৮-০২৪১৯৫২৭৪০।
  34. ↑ Kerényi, Karl (1951), The Gods of the Greeks, London, England: Thames and Hudson। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫০০-২৭০৪৮-৬।
  35. ↑ "Henry George Liddell, Robert Scott, A Greek-English Lexicon, Τρι_το-γένεια"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬।
  36. ↑ Hesiod, Theogony II, 886–900.
  37. ↑ Janda, Michael (2005), Elysion. Entstehung und Entwicklung der griechischen Religion, Innsbruck: Institut für Sprachen und Literaturen। আইএসবিএন ৯৭৮৩৮৫১২৪৭০২২।
  38. ↑ Janda, Michael (2005), Elysion. Entstehung und Entwicklung der griechischen Religion, Innsbruck: Institut für Sprachen und Literaturen। আইএসবিএন ৯৭৮৩৮৫১২৪৭০২২।
  39. ↑ "Diogenes Laertius, Lives of Eminent Philosophers, BOOK IX, Chapter 7. DEMOCRITUS(? 460-357 B.C.)"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬।
  40. ↑ Herrington, C.J. (1955), Athena Parthenos and Athena Polias, Manchester, England: Manchester University Press
  41. ↑ Simon 1983, p. 46.
  42. ↑ Herrington 1955, pp. 1–11.
  43. ↑ Burkert 1985, pp. 305–337.
  44. ↑ Schmitt 2000, pp. 1059–1073.
  45. ↑ Hansen 2004, pp. 123–124.
  46. ↑ Darmon 1992, pp. 114–115.
  47. ↑ Robertson 1992, pp. 90–109.
  48. ↑ Robertson 1992, pp. 90–109.
  49. ↑ Herrington 1955, pp. 11–14.
  50. ↑ Kerényi, Karl (1952), Die Jungfrau und Mutter der griechischen Religion. Eine Studie uber Pallas Athene, Zurich: Rhein Verlag
  51. ↑ "Marinus of Samaria, The Life of Proclus or Concerning Happiness". tertullian.org. 1925. pp. 15–55. "Translated by Kenneth S. Guthrie (Para:30)"
  52. ↑ Apollodorus of Athens (13 February 2016). The Library of Apollodorus (Delphi Classics). UK: Delphi Classics। আইএসবিএন ৯৭৮১৭৮৬৫৬৩৭১২।
  53. ↑ Janson, Horst Woldemar; Janson, Anthony F. (2004). Touborg, Sarah; Moore, Julia; Oppenheimer, Margaret; Castro, Anita (eds.). History of Art: The Western Tradition. Vol. 1 (Revised 6th ed.). Upper Saddle River, New Jersey: Pearson Education. pp. 111, 160। আইএসবিএন ০-১৩-১৮২৬২২-০।
  54. ↑ Schmitt 2000, pp. 1059–1073.
  55. ↑ Schmitt 2000, pp. 1059–1073.
  56. ↑ Schmitt 2000, pp. 1059–1073.
  57. ↑ Schmitt 2000, pp. 1059–1073.
  58. ↑ Pilafidis-Williams, K. (1998), The Sanctuary of Aphaia on Aigina in the Bronze Age, Munich, Germany: Hirmer,। আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৭৭৭৪-৮০১০-৭।
  59. ↑ Jost, Madeleine (1996), "Arcadian cults and myths", in Hornblower, Simon (ed.), Oxford Classical Dictionary, Oxford, England: Oxford University Press
  60. ↑ Pausanias, Description of Greece viii.4.8.
  61. ↑ Deacy 2008, p. 127.
  62. ↑ Deacy 2008, p. 127.
  63. ↑ Deacy 2008, p. 127.
  64. ↑ Burn 2004, p. 10.
  65. ↑ Burn 2004, p. 11.
  66. ↑ Burn 2004, p. 10.
  67. ↑ Manheim, Ralph (1963). Prometheus: Archetypal Image of Human Existence. Princeton University Press. p. 56.। আইএসবিএন ৯৭৮০৬৯১০১৯০৭৯।
  68. ↑ "Dictionary of Greek and Roman Geography (1854), CA´BALEIS, CYNIA LACUS, CYRRHUS"। www.perseus.tufts.edu। ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  69. ↑ Janson, Horst Woldemar; Janson, Anthony F. (2004). Touborg, Sarah; Moore, Julia; Oppenheimer, Margaret; Castro, Anita (eds.). History of Art: The Western Tradition. Vol. 1 (Revised 6th ed.). Upper Saddle River, New Jersey: Pearson Education. pp. 111, 160। আইএসবিএন ০-১৩-১৮২৬২২-০।
  70. ↑ Kerényi 1951, pp. 118–120.
  71. ↑ Hansen 2004, pp. 121–123.
  72. ↑ Iliad Book V, line 880
  73. ↑ "Hesiod, Theogony, line 886"। www.perseus.tufts.edu। ১৯ মে ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  74. ↑ "Hesiod, Theogony, line 901"। www.perseus.tufts.edu। ৮ জুন ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  75. ↑ Hansen 2004, pp. 122–123.
  76. ↑ Hansen 2004, pp. 121–122.
  77. ↑ Kerényi 1951, pp. 119–120.
  78. ↑ Penglase, Charles (1994), Greek Myths and Mesopotamia: Parallels and Influence in the Homeric Hymns and Hesiod, New York City, New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-১৫৭০৬-৩।
  79. ↑ Penglase 1994, p. 233.
  80. ↑ Penglase 1994, p. 233.
  81. ↑ "Pindar, Olympian, Olympian 7 For Diagoras of Rhodes Boxing-Match 464 B. C."। www.perseus.tufts.edu। ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  82. ↑ Justin, Apology 64.5, quoted in Robert McQueen Grant, Gods and the One God, vol. 1:155, who observes that it is Porphyry "who similarly identifies Athena with 'forethought'".
  83. ↑ Yasumura, Noriko (১৬ অক্টোবর ২০১৩)। Challenges to the Power of Zeus in Early Greek Poetry (ইংরেজি ভাষায়)। A&C Black। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৭২৫-১৯৬৭-২।
  84. ↑ Kerényi 1951, p. 122.
  85. ↑ Archive, Internet Sacred Text। "THE THEOLOGY OF THE PHŒNICIANS: FROM SANCHONIATHO."। Internet Sacred Text Archive (English ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক)
  86. ↑ "Homer, Iliad, Book 1, line 386"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  87. ↑ Kerényi 1951, p. 281.
  88. ↑ Kerényi 1951, p. 124.
  89. ↑ Graves 1960, p. 62.
  90. ↑ Kerényi 1951, p. 124.
  91. ↑ Sophocles; Wunder, Eduard (১৮৫৫)। Oedipus rex. Oedipus Colonaeus. Electra. Antigone (গ্রিক ভাষায়)। Williams and Norgate, D. Nutt।
  92. ↑ Kerényi 1951, p. 123.
  93. ↑ Kerényi 1951, p. 281.
  94. ↑ Burkert, Walter (1985), Greek Religion, Cambridge, Massachusetts: Harvard University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৭৪-৩৬২৮১-৯।
  95. ↑ Hansen, William F. (2004), "Athena (also Athenê and Athenaia) (Roman Minerva)", Classical Mythology: A Guide to the Mythical World of the Greeks and Romans, Oxford, England: Oxford University Press, pp. 121–126। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩০০৩৫-২।
  96. ↑ Kerényi, Karl (1951), The Gods of the Greeks, London, England: Thames and Hudson। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫০০-২৭০৪৮-৬।
  97. ↑ Kerényi, Karl (1951), The Gods of the Greeks, London, England: Thames and Hudson। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫০০-২৭০৪৮-৬।
  98. ↑ Kerényi, Karl (1951), The Gods of the Greeks, London, England: Thames and Hudson। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫০০-২৭০৪৮-৬।
  99. ↑ Kerényi, Karl (1951), The Gods of the Greeks, London, England: Thames and Hudson। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫০০-২৭০৪৮-৬।
  100. ↑ Ovid, Metamorphoses, X. Aglaura, Book II, 708–751; XI. The Envy, Book II, 752–832.
  101. ↑ Burkert, Walter (1985), Greek Religion, Cambridge, Massachusetts: Harvard University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৭৪-৩৬২৮১-৯।
  102. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  103. ↑ Deacy 2008, p. 89.
  104. ↑ Cancik, Hubert; Schneider, Helmuth; Salazar, Christine F.; Orton, David E. (2002). Brill's New Pauly: Encyclopaedia of the Ancient World. Vol. IX. Brill Publications. p. 423। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০-০৪-১২২৭২-৭।
  105. ↑ Forbes Irving, Paul M. C. (1990). Metamorphosis in Greek Myths. Clarendon Press. p. 278। আইএসবিএন ০-১৯-৮১৪৭৩০-৯।
  106. ↑ "Homer, Odyssey, Book 20, line 44"। www.perseus.tufts.edu। ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  107. ↑ "Apollodorus, Library, book 1, chapter 9, section 16"। www.perseus.tufts.edu। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  108. ↑ Roman, Luke; Roman, Monica (2010), Encyclopedia of Greek and Roman Mythology, New York City, New York: Infobase Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৬০-৭২৪২-২।
  109. ↑ Roman, Luke; Roman, Monica (2010), Encyclopedia of Greek and Roman Mythology, New York City, New York: Infobase Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৬০-৭২৪২-২।
  110. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  111. ↑ Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca 2.37, 38, 39
  112. ↑ Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca 2.41
  113. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  114. ↑ Pollitt, J. J. (1999) [1972], Art and Experience in Classical Greece (revised ed.), Cambridge, England: Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-০৯৬৬২-১।
  115. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  116. ↑ "Apollodorus, Library, book 1, chapter 9, section 16"। www.perseus.tufts.edu। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬।
  117. ↑ Jenkyns, Richard (2016), Classical Literature: An Epic Journey from Homer to Virgil and Beyond, New York City, New York: Basic Books, A Member of the Perseus Books Group। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪৬৫-০৯৭৯৭-৫।
  118. ↑ W. F. Otto, Die Gotter Griechenlands (55–77). Bonn: F. Cohen, 1929.
  119. ↑ de Jong, Irene J. F. (2001), A Narratological Commentary on the Odyssey, Cambridge, England: Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৪৬৮৪৪-২।
  120. ↑ Murrin, Michael (২০০৭)। "Athena and Telemachus"। International Journal of the Classical Tradition। ১৩ (4): ৪৯৯–৫১৪। আইএসএসএন 1073-0508।
  121. ↑ Morford, Mark P. O.; Lenardon, Robert J. (1999), Classical Mythology (sixth ed.), Oxford, England: Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫১৪৩৩৮-৬।
  122. ↑ Kugelmann, Robert (1983), The Windows of Soul: Psychological Physiology of the Human Eye and Primary Glaucoma, Plainsboro, New Jersey: Associated University Presses। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৩৮৭-৫০৩৫-৩।
  123. ↑ "A Dictionary of Greek and Roman biography and mythology, Ma, Mycale'sides, MYRMEX"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৬।
  124. ↑ Seelig, Beth J. (August 2002), "The Rape of Medusa in the Temple of Athena: Aspects of Triangulation in the Girl", The International Journal of Psychoanalysis, 83 (4): 895–911, doi:10.1516/3NLL-UG13-TP2J-927M, PMID 12204171, S2CID 28961886
  125. ↑ Salzman-Mitchell, Patricia B. (২০০৫)। A Web of Fantasies: Gaze, Image, and Gender in Ovid's Metamorphoses (ইংরেজি ভাষায়)। Ohio State University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৪২-০৯৯৯-৮।
  126. ↑ Walcot, P. (1977-04)। "The Judgement of Paris"। Greece & Rome (ইংরেজি ভাষায়)। ২৪ (1): ৩১–৩৯। ডিওআই:10.1017/S0017383500019616। আইএসএসএন 1477-4550। {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: |তারিখ= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  127. ↑ www.semanticscholar.org https://www.semanticscholar.org/paper/5b17e063221c78669a3ed22458c7b208a53af674। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২৬। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  128. ↑ Bull, Malcolm (২০০৫)। The Mirror of the Gods (ইংরেজি ভাষায়)। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫২১৯২৩-৪।
  129. ↑ Hansen, William F. (2004), "Athena (also Athenê and Athenaia) (Roman Minerva)", Classical Mythology: A Guide to the Mythical World of the Greeks and Romans, Oxford, England: Oxford University Press, pp. 121–126। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩০০৩৫-২।
  130. ↑ Burgess, Jonathan S. (2001), The Tradition of the Trojan War in Homer and the Epic Cycle, Baltimore, Maryland: The Johns Hopkins University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮০১৮-৬৬৫২-৪।
  131. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  132. ↑ Palagia, Olga; Pollitt, J. J. (1996), Personal Styles in Greek Sculpture, Cambridge, England: Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৬৫৭৩৮-৯।
  133. ↑ Cartwright, Mark (25 January 2015). "Athena Parthenos by Phidias". World History Encyclopedia. Retrieved 26 June 2019.
  134. ↑ Aghion, Irène; Barbillon, Claire; Lissarrague, François (1996), "Minerva", Gods and Heroes of Classical Antiquity, Flammarion Infographic Guides, Paris, France and New York City, New York: Flammarion, pp. 192–194। আইএসবিএন ৯৭৮-২-০৮০১-৩৫৮০-৩।
  135. ↑ Deacy, Susan (2008), Athena, London and New York: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩০০৬৬-৭।
  136. ↑ Garland, Robert (2008), Ancient Greece: Everyday Life in the Birthplace of Western Civilization, New York City, New York: Sterling। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৫৪৯-০৯০৮-৮।
  137. ↑ Swiatek, Anthony; Breen, Walter (1981). The Encyclopedia of United States Silver & Gold Commemorative Coins, 1892 to 1954. New York City, New York: Arco Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৬৮-০৪৭৬৫-৪।
  138. ↑ Alexander, Timothy Jay (2007), The Gods of Reason: An Authentic Theology for Modern Hellenismos (First ed.), Lulu Press, Inc। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৩০৩-২৭৬৩-৯।
  139. ↑ Friedman, Sarah (2005), Bryn Mawr College Off the Record, College Prowler। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৯৬৫৮-০১৮-৩।
  140. ↑ "Phi Delta Theta International – Symbols". phideltatheta.org. Archived from the original on 7 June 2008. Retrieved 7 June 2008.
বারো অলিম্পিয়ান
জিউস | হেরা | পসেইডন | হেডিস | হেস্তিয়া | দিমিতির | আফ্রোদিতি | আথেনা | অ্যাপোলো | আর্তেমিস | আরেস | হেফাইস্তোস | হার্মিস | দিয়োনুসোস