ভার্জিলের ইনিড এবং হোমারের ইলিয়াডওডিসি-র মধ্যে সাদৃশ্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ইনিড রচনার সময়[১] ভার্জিল হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড[২]ওডিসি[৩] অধ্যয়নের ফলে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন রোমান জাতির জন্য এক জাতীয় মহাকাব্য রচনার কাজে।[৪][৫] মহাকাব্য, বিশেষত হোমারের মহাকাব্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্যবহার ভার্জিল তাঁর কাব্যে ঘটান রোমান ও তাদের সাংস্কৃতিক পূর্বসূরি গ্রিকদের মধ্যে সাদৃশ্য রচনার জন্য। এগুলির মধ্যে রয়েছে হেক্সামিটার, পদ্য, গ্রন্থ-বিভাগ, বংশাবলির তালিকা এবং অন্তর্লীন বিষয়বস্তুগুলির ব্যবহার।[৪][৫]

ইলিয়াড মহাকাব্যের সঙ্গে সাদৃশ্য[সম্পাদনা]

ইনিড-এর দ্বিতীয়ার্ধের (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ সর্গ) সঙ্গে সমগ্র ইলিয়াড মহাকাব্যে বর্ণিত বিষয়ের সাদৃশ্য রয়েছে।[১]

বীরবৃন্দ[সম্পাদনা]

ইনিড-এর ষষ্ঠ সর্গে বলা হয়েছে যে, ক্যুমির সিবিল ইনিয়াসের জন্য একটি ভবিষ্যদ্বাণী করে জানান যে অ্যাকিলিস নামে এক লাতিন-জাত দেবীপুত্রের অস্তিত্ব রয়েছে (ইনিড, ষষ্ঠ সর্গ, ৮৯-৯০ চরণ)।[৬] এই লাতিন-জাত অ্যাকিলিসের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি কোথাও। ইনিড-এ ইনিয়াস ও টার্নাস উভয়েই লাতিন-জাত অ্যাকিলিসের ভবিষ্যদ্বাণীটি পূর্ণ করার একাধিক ইঙ্গিত বহন করছেন।[৭] প্যালাসের মৃত্যু ইনিয়াসের মনে এক উন্মাদ অবস্থার জন্ম দিয়েছিল, ঠিক যেমন প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু অ্যাকিলিসে উন্মাদ করে তুলেছিল। এই জাতীয় উন্মাদনা মহাকাব্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য; কারণ এই অবস্থাই বীর যোদ্ধাদের যুদ্ধ ও প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।[৭]

ভবিষ্যদ্বাণী[সম্পাদনা]

মহাকাব্যে ভষিষ্যদ্বাণী একটি অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু। ইলিয়াড, ওডিসিইনিড-এর ক্ষেত্রে এই বিষয়টির বিশেষ প্রয়োগ দেখা যায়। ইলিয়াড-এর গোড়াতেই পাঠক জানতে পারেন যে, ট্রোজানদের পরাজয় ও গ্রিকদের জয় অবশ্যম্ভাবী; কারণ দেবরাজ জিউস সেই কথাই ঘোষণা করেছেন।[২] অ্যাকিলিসের নিয়তিও পূর্বকথিত হয়েছিল: যুদ্ধে গেলে তাঁর ভাগ্যে লেখা ছিল বীরোচিত মৃত্যু। অনুরূপভাবে ইনিড-এর দ্বিতীয় সর্গে হেক্টরের প্রেত ইনিয়াসকে বলেন যে, তাঁকে জ্বলন্ত ট্রয় ত্যাগ করতে হবে নতুন এক শহর প্রতিষ্ঠার জন্য।[১] এই মহাকাব্যের অবশিষ্টাংশ জুড়ে দেবতা সহ অন্যান্যরাও ইনিয়াসকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে ইতালি দেশটি খুঁজে বের করা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রোম প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব তাঁকেই দেওয়া হয়েছে।

একফ্রেসিস[সম্পাদনা]

ইলিয়াড থেকে ভার্জিল অপর যে ধারণাটি গ্রহণ করেছিলেন সেটি হল ইনিয়াসের ঢালের একফ্রেসিসইনিড-এর অষ্টম সর্গে দেখা যায়, ভালক্যান (গ্রিক দেবতা হিফিস্টাসের রোমান প্রতিরূপ) যুদ্ধে যাওয়ার আগে ইনিয়াসকে একটি ঢাল তৈরি করে দেন।[১] ইলিয়াড-এর সপ্তদশ সর্গে হিফিস্টাস অ্যাকিলিসকে ঠিক অনুরূপভাবে একটি ঢাল তৈরি করে দিয়েছিলেন।[২] দুই বীরের জননী যে দুই দেবী (ভেনাসথিটিস), তাঁরা আসন্ন যুদ্ধে পুত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে অগ্নিদেবতা ভালক্যান/হিফিস্টাসকে পুত্রের জন্য বর্ম ও ঢাল প্রস্তুত করে দিতে বলেছিলেন। দেবতার কাজের বিবরণ দেওয়ার পর দুই কবিই সেই ঢালের বিবরণ দেন একটি একফ্রেসিসে। অ্যাকিলিসের ঢালের একফ্রেসিসে বর্তমান জগতের সকল উপাদান যুদ্ধ ও শান্তি, স্বর্গ ও নরকের মতো বৈপরীত্যগুলি নিয়ে উপস্থিত।[২][৮] ইনিয়াসের ঢালের একফ্রেসিসে বর্ণিত হয় রোমের ভাবী গৌরবগাথা; যার মধ্যে ছিল মাদী-নেকড়ে কর্তৃক রোমের প্রতিষ্ঠাতা রোম্যুলাস ও তাঁর যমজ ভ্রাতা রেমাসের লালনপালন এবং অ্যাকটিয়ামের যুদ্ধে অগাস্টাসের বিজয়।[১]

ওডিসি মহাকাব্যের সঙ্গে সাদৃশ্য[সম্পাদনা]

ইনিড মহাকাব্যের প্রথমার্ধে বিভিন্ন ভাবে ওডিসিউসের সমুদ্রযাত্রাকে অনুকরণ করা হয়েছে। ওডিসি ২৪টি সর্গ জুড়ে বর্ণিত হলেও, ইনিড কাব্যে সেটির অনুকরণে বর্ণিত ঘটনা রয়েছে মাত্র ছ'টি সর্গে। তবে সেক্ষেত্রেও বেশ কয়েকটি সাদৃশ্য লক্ষিত হয়।

চরিত্রগণ[সম্পাদনা]

ওডিসিউসইনিয়াস উভয়েই রাজপরিবারের সন্তান; ওডিসিউস ইথাকার রাজা এবং ইনিয়াস এক ট্রোজান রাজকুমার। দেবতার হস্তক্ষেপ ছাড়া এঁদের কেউই লক্ষ্যে উপনীত হতে পারেননি, আবার প্রতিকূল মনোভাবাপন্ন দেবতারা দু'জনের যাত্রাপথেই বাধাবিপত্তির সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন।[৯] ওডিসিউসের প্রতিপক্ষ ছিলেন সমুদ্রদেবতা পসেইডন। তাঁর পুত্র পলিফেমাসকে অন্ধ করে দিয়ে ওডিসিউস পসেইডনের কোপে পড়েছিলেন। ফলে পসেইডন প্রত্যেকবারই মূল ঝড়ের সাহায্যে গ্রিক জাহাজগুলিকে বিপথে চালিত, এমনকি ধ্বংসও করছিলেন। অন্যদিকে ইনিয়াস-সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী পরিপূর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ করতে নিজের সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন দেবী হেরা। কারণ, ইনিয়াস ছিলেন ট্রোজান এবং ট্রোজান রাজকুমার প্যারিস আফ্রোদিতিকে সোনার আপেল দেওয়ার সময় বলেছিলেন যে, আফ্রোদিতি আথিনাহেরা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দরী। হেরা যে ঝড় সৃষ্টি করেছিলেন তার ফলে ট্রোজান জাহাজগুলি পথভ্রষ্ট হয়ে শেষপর্যন্ত কার্থেজে উপনীত হয় (যা ইনিয়াস ও ট্রোজানদের প্রতি হেরার ঘৃণা আরও বৃদ্ধি করে)।

গল্পের মধ্যে গল্প[সম্পাদনা]

ইনিডওডিসি উভয় মহাকাব্যেই দেখা যায়, বর্তমান গল্পের মধ্যেই একটি চরিত্র আরেকটি গল্প বলে পরবর্তী স্তরগুলির বিন্যাস ঘটাচ্ছেন। দুই মহাকাব্যই ঘটনাপ্রবাহের মাঝখানে শুরু হওয়ায় চরিত্রের গল্প বলার প্রাক্‌মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁর পূর্ববর্তী যাত্রার বিবরণই গল্পের মধ্যে বলা এই গল্পগুলির মাধ্যমে বলা হয়। গ্রিক ওডিসিউসের গল্পের ক্ষেত্রে তিনি যখন ফিয়েশীয়দের দেশ স্কিয়ারিয়ায় উপস্থিত হন, তখন ফিয়েশীয়রা জানতে চায় যে তিনি কীভাবে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। এরপর ওডিসিয়াস নবম থেকে দ্বাদশ সর্গ পর্যন্ত[৩] ট্রয় থেকে শুরু করে তাঁর সমগ্র যাত্রাপথের বিবরণ দেন। ইনিয়াসের ক্ষেত্রে কার্থেজে পৌঁছানোর পর ডিডো তাঁকে তাঁর গল্পটি বলতে বলেন। তাই দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্গে তিনি[১] ট্রয়ের পতন এবং কেমন করে তিনি দলবল নিয়ে কার্থেজে উপস্থিত হলেন তার বিবরণ দেন।

যাত্রাপথ[সম্পাদনা]

উভয় যোদ্ধাই একই সমুদ্রে যাত্রা করেছিলেন, কখনও কখনও একই স্থানে উপনীত হয়েছেন এবং একই ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন। ইনিড-এর তৃতীয় সর্গে[১] ইনিয়াস ও তাঁর দলবল সিলাকারিবডিসের নিকটবর্তী হয়ে পড়েন, ঠিক যেমন ওডিসিউস ও তাঁর লোকজন ওডিসি-র দ্বাদশ সর্গে হয়েছিলেন।[৩] এরপর তৃতীয় সর্গে ওডিসিউসের মতোই ট্রোজানরাও সাইক্লপসের দ্বীপে অবতরণ করেন।[১] তবে ইনিয়াসের দলবলের কপালে ওডিসিউসের দলবলের অনুরূপ নিয়তি লেখা ছিল না। ভার্জিল অ্যাকেমিনিডেস নামে এক দুর্বল চেহারা গ্রিকের কথা যোগ করেন। তিনি ওডিসিউসের সঙ্গেই যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু পিছিয়ে পড়েছিলেন। দুই মহাকাব্যের নায়করাই মৃতদের থেকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাতাললোকে অবতরণ করেছিলেন।

গৃহে প্রত্যাবর্তন[সম্পাদনা]

ইথাকায় প্রত্যাবর্তনের পর ওডিসিউস নিজের প্রাসাদে স্ত্রী পেনেলোপির পাণিপ্রার্থীদের দেখতে পান। একদিনে তারা যখন তাঁর প্রাসাদ নষ্ট করছিল, তখন অন্যদিকে তিনি পত্নীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে প্রয়াসী হন। ওডিসিউস এই পাণিপ্রার্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং তাদের হত্যা করে নিজের প্রাসাদের অধিকার ছিনিয়ে নেন। একই ভাবে ইনিয়াসকেও লাতিনামে নিজের ঘর খুঁজে নিতে এবং রাজকুমারী লাভিনিয়াকে বিয়ে করতে হয়েছিল। লাতিনামে তিনি মুখোমুখি হন টার্নাসের বাহিনীর। এই টার্নাস ছিলেন রুতুলির রাজা এবং ইনিয়াস লাতিনামে আসার আগে সেখানে লাভিনিয়ার প্রধান পাণিপ্রার্থী। নিজের নবলব্ধ গৃহে আশ্রয় গ্রহণের জন্য ইনিয়াসকেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়।[৪][১০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Virgil (২০০৮)। Aeneid। Translated by Ahl। আইএসবিএন 978-0199231959 
  2. Homer (২০১১)। Iliad of Homer। Translated by Lattimore। আইএসবিএন 978-0226470498 
  3. Homer (২০০৭)। Odyssey of Homer। Translated by Lattimore। আইএসবিএন 978-0061244186 
  4. "Literary Predecessors of the Aeneid"www.cliffsnotes.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৫-০১ 
  5. Williamson, Makyra (২০১৯)। "Vergil's Aeneid: The Cornerstone of Roman Identity"Tenor of Our Times8 – ScholarWorks-এর মাধ্যমে। 
  6. Virgil (২০০৮)। Aeneid। Translated by Ahl। আইএসবিএন 978-0199231959 
  7. van Nortwick, Thomas (১৯৮০)। "Transactions of the American Philological Association (1974-2014)"। The Johns Hopkins University Press110: 303–314 – JSTOR-এর মাধ্যমে। 
  8. Kotin, Joshua (Fall ২০০১)। "Shields of Contradiction and Direction: Ekphrasis in the Iliad and the Aeneid" (PDF)Hirundo: The McGill Journal of Classical Studies, Volume I: 11–16 
  9. Capco, Constantine। "Compare and Contrast Odyssey and Aeneas"www.academia.edu। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৫-০১ 
  10. Gross, Nicolas P. (২০০৩)। "Mantles Woven with Gold: Pallas' Shroud and the End of the "Aeneid""The Classical Journal99 (2): 135–156। আইএসএসএন 0009-8353 

টেমপ্লেট:ইনিড টেমপ্লেট:ইলিয়াড