বল্লাল সেন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮) ছিলেন বাংলার সেন রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা। কুলজি গ্রন্থসমূহ থেকে জানা যায় যে, বিজয় সেনের পুত্র এবং উত্তরসূরি। বল্লাল সেন বাংলায় সামাজিক সংস্কার, বিশেষ করে কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনকারী হিসেবে পরিচিত।
বল্লাল সেন ওষধিনাথ নামক এক দাক্ষিণাত্য ব্রাহ্মণবংশ জাত।এজন্য সেন রাজাদেরকে 'দ্বিজরাজ ওষধি নাথ বংশজ' বলে উল্লেখ দেখা যায়।বল্লালের পিতা বিজয়সেন গৌড়াধিপতি চন্দ্রসেনের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন।1033 শকাব্দে রামপাল নগরে বল্লালসেনের জন্ম হয়।শৈব বরে তাঁর জন্ম হওয়াতে বিজয়সেন পুত্রের নাম 'বরলাল' রাখেন।'বল্লাল' শব্দ এরই অপভ্রংশ ।তিনি দীর্ঘকায়, বলবান, বুদ্ধিমান, মেধাবী ছিলেন; মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই শস্ত্রবিদ্যায় ও শাস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়েছিলেন।

রাজ্য জয়[সম্পাদনা]

বল্লাল সেনের সময়কার দুটি লিপি-প্রমাণ (নৈহাটি তাম্রশাসন এবং সনোকার মূর্তিলিপি) এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলিতে বল্লাল সেনের বিজয় সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। অবশ্য তাঁর কিছু সামরিক কৃতিত্ব ছিল বলে মনে হয়। অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, গৌড়ের রাজার সঙ্গে বল্লাল সেন যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। এই গৌড়রাজকে পাল বংশের রাজা গোবিন্দ পালের সঙ্গে অভিন্ন বলে শনাক্ত করা হয়। আনন্দভট্টের বল্লালচরিতে (১৫১০ খ্রিস্টাব্দে রচিত) এ তথ্যের দৃঢ় সমর্থন পাওয়া যায়। এমনও হতে পারে যে, বল্লাল সেন মগধে পালদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানেন। অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, পিতা বিজয় সেনের শাসনকালে বল্লাল সেন মিথিলা জয় করেছিল। এটি মোটেই অসম্ভব নয় যে, বল্লাল সেন পিতা বিজয় সেনের মিথিলা অভিযানের সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন। অবশ্য সেন সাম্রাজ্যে মিথিলার অন্তর্ভুক্তি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না এবং বিজয় সেনের প্রতিপক্ষ নান্যদেবের উত্তরাধিকারিগণ দীর্ঘকাল ব্যাপী মিথিলা শাসন করেন।
মাতামহ ও পিতার উত্তরাধিকারিস্বত্বে গৌড় ও বঙ্গ দুইটি রাজ্য প্রাপ্ত হলেও তিনিই সমস্ত বরেন্দ্রভূমি, রাঢ়, বঙ্গ, বগ্দি, মিথিলা জয় করে পালরাজবংশ সহ বৌদ্ধরাজত্বের সকল চিহ্ন নি:শেষ করে বাঙ্লায় সনাতন ধর্ম পুনঃস্হাপন করেন।বৌদ্ধদের বহু মঠ ও সংঘকে তিনি দেবালয়ে পরিণত করেছিলেন। বল্লাল দ্বাদশ রাজ্যের অধিপতি হয়ে বিশ্বজিৎ যজ্ঞ করেন, এবং সার্বভৌম সম্রাট উপাধি ধারণ করেন।

সম্পত্তির আয়[সম্পাদনা]

বল্লালের মাসিক লক্ষ নিষ্ক আয় ছিল।দশ টাকা মূল্যের স্বর্ণ-মুদ্রার নাম নিষ্ক।তখন এক তোলা সোনার দাম ছিল ষোল টাকা।সুতরাং বল্লালের প্রকান্ড সাম্রাজ্যের বার্ষিক আয় মোট এক কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা ছিল।

কৌলীন্য প্রথা[সম্পাদনা]

কৌলিন্য মর্যাদা বাঙালীদের জীবনাধিক গুরুতর গণ্য ছিল।অনেকে সর্বস্ব বিক্রয় করে কুলমর্যাদা রক্ষা করতেন।কেউ কেউ অশীতিপর বৃদ্ধের সাথে সপ্তবর্ষীয় কন্যার বিবাহ দিয়ে কুল বাঁচাতেন।এমনকী রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেক সময় কুল মর্যাদা রক্ষায় ধর্মশাস্ত্রের বিধান লঙ্ঘিত হত এবং পঞ্চাশ বছর বয়স্কা কুমারীকে দশবর্ষীয় বালকের সাথে নামমাত্র বিবাহ দিয়ে কুলমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হত।পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি সুদীর্ঘ চারশ বছর কুল মর্যাদাই উচ্চ শ্রেণীর বাঙালীদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল।
এটি বিশ্বাস করা হয় যে, কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে বল্লাল সেন সামাজিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন। কুলগ্রন্থ বা কুলজিশাস্ত্রসমূহ হচ্ছে কৌলীন্য প্রথার আদি ইতিহাস সম্পর্কে জানার মূল উত্স। অধিকন্তু বল্লাল সেনের সময়কালের পাঁচ-ছয়শত বছর পরে রচিত এসকল গ্রন্থ অসামঞ্জস্যতায় পূর্ণ এবং এগুলি নানা ধরনের পরস্পর বিরোধী তথ্য ধারণ করে আছে। সুতরাং এসকল গ্রন্থে লিপিবদ্ধ তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এছাড়া কোন সেন-লিপি-প্রমাণেও কৌলীন্য প্রথার উল্লেখ নেই। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় কৌলীন্য প্রথার বহুল প্রচলন দেখা যায় এবং এ প্রথার উদ্যোক্তা বাঙালি ব্রাহ্মণগণ নিজেদের দাবি জোরদার করার উদ্দেশ্যে একে ঐতিহাসিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে বিগত হিন্দু শাসনকালে অর্থাৎ সেন যুগের রাজা বল্লাল সেনের সময় থেকে এ প্রথার উৎপত্তি হয়েছে, এমন মতবাদ পণ্ডিতরা প্রচার করেছেন।
অন্য মতে, বল্লাল সেন কনৌজের ভট্টশালীগ্রাম-নিবাসী শ্রোত্রিয়দের বসবাসের অসুবিধা দূর করার জন্য নিজের প্রকান্ড রাজ্যের নানা স্হানে পাঠিয়ে তাঁদের ভরণ-পোষণের যোগ্য ব্রহ্মত্র দিয়েছিলেন।এদের মধ্যে একশ ঘর গঙ্গার বাম পারে বরেন্দ্রভূমিতে বাসস্থান পেয়ে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ নামে খ্যাত হন আর ছাপ্পান্ন ঘর গঙ্গার অপর পারে রাঢ়দেশে ব্রহ্মত্র লাভ করে রাঢ়ী ব্রাহ্মণ আখ্যা প্রাপ্ত হন।রাঢ়ী ও বারেন্দ্র বিভাগ ব্রাহ্মণ ছাড়াও বৈদ্য, কায়স্থ ও অধিকাংশ অপর জাতীর মধ্যেও ছিল।
সম্মানলাভার্থে প্রজারা সৎপথে চলবে, এই উদ্দেশ্যে বল্লালসেন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন।শ্রোত্রিয়দের মধ্যে যাঁরা নবগুণবিশিষ্ট ছিলেন, বল্লাল তাঁদের কুলীন উপাধি দিয়েছিলেন।বৈদ্যদের মধ্যে যারা ধার্মিক ও গুণবান এবং কায়স্থদের মধ্যে যারা শ্রোত্রিয়দের পরিচারক-সন্তান তারা কুলীন উপাধি পেয়েছিলেন।এভাবে ঘোষ, বসু, গুহ ও মিত্র বংশীয়রা কায়স্হরা কুলীন হল; তিলী, তাঁতি, কামার, কুমোর প্রভৃতি সৎশূদ্রদের গুণ ও সঙ্গতি দেখে বল্লাল তাদের শ্রেষ্ঠ লোকদের কুলীন করেছিলেন, এরাই মানী বা পরামানিক নামে পরিচিত হয়।

জীবন কাল[সম্পাদনা]

সেনদের লিপি-প্রমাণ এবং কিংবদন্তি থেকে এটি প্রমাণিত যে, বল্লাল সেন ছিলেন একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ও প্রসিদ্ধ লেখক। ১১৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দানসাগর রচনা করেন। ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দে অদ্ভুতসাগর লেখা শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেন নি। পিতার মতো তিনিও শিবের উপাসক ছিলেন। অন্যান্য রাজকীয় উপাধির সঙ্গে তিনি 'অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। চালুক্য রাজকন্যা রামদেবীকে তিনি বিবাহ করেন। এ বিবাহ আদি পুরুষদের বাসস্থানের সঙ্গে সেনদের নির্দেশ করে। অদ্ভুতসাগর গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বৃদ্ধ বয়সে বল্লাল সেন রাজ্যভার নিজ পুত্র লক্ষ্মণ সেনকে অর্পণ করেন। বল্লাল সেন জীবনের শেষ দিনগুলি সস্ত্রীকে নিয়ে ত্রিবেণীর কাছে গঙ্গাতীরবর্তী একটি স্থানে অতিবাহিত করেন। তিনি প্রায় ১৮ বছর সাফল্যের সঙ্গে রাজত্ব করেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস- দুর্গাচন্দ্র সান্যাল।

আরোও দেখুন[সম্পাদনা]