কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস
| ইয়োহান কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস | |
|---|---|
ইয়োহান কার্ল ফ্রিড্রিশ গাউস (১৭৭৭–১৮৫৫), ক্রিস্তিয়ান আলব্রেশট জেনসেন অঙ্কিত। |
|
| জন্ম | এপ্রিল ৩০, ১৭৭৭ ব্রাউনশ্ভাইগ, ইলেক্টরেট অফ ব্রুন্সউইক-লিউনেবুর্গ, হলি রোমান এম্পায়ার |
| মৃত্যু | ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৮৫৫ (৭৭ বছর) গটিংগেন, হানোভার |
| বাসস্থান | হানোভার |
| জাতীয়তা | জার্মানি |
| ক্ষেত্র | গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান |
| প্রতিষ্ঠান | গেয়র্গ-আউগুস্ট বিশ্ববিদ্যালয় |
| প্রাক্তন ছাত্র | হেল্মষ্টেট বিশ্ববিদ্যালয় |
| পিএইচডি উপদেষ্টা | ইয়োহান ফ্রিডরিশ ফাফ |
| অন্যান্য শিক্ষা উপদেষ্টা | ইয়োহান ক্রিস্তিয়ান মার্টিন বার্টেলস |
| পিএইচডি ছাত্রসমূহ | ফ্রিড্রিশ বেসেল ক্রিস্টফ গূডারমান ক্রিস্তিয়ান লুডভিগ গার্লিং রিচার্ড ডেডেকিন্ড জোহান এঙ্কে জোহান লিস্টিং বার্নার্ড রিম্যান ক্রিস্টিয়ান পিটার্স মরিৎস ক্যান্টর |
| অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছাত্র | অগুস্ত ফার্দিনান্দ মোবিয়াস জুলিয়াস ভাইসবাখ এল. সি. শ্নুরলেইন |
| যেজন্য পরিচিত | সংখ্যা তত্ত্ব গাউসীয় চুম্বকত্ব |
| প্রভাবিত করেছেন | সোফি জার্মেইন |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | কোপলে মেডেল (১৮৩৮) |
| স্বাক্ষর |
|
ইয়োহান কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস (
উচ্চারণ (সাহায্য·তথ্য): য়োহান্ কাল্ ফ্রিড্রিশ্ গাউস্; জার্মান ভাষায়: Johann Carl Friedrich Gauß) (এপ্রিল ৩০, ১৭৭৭ - ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৮৫৫) অসামান্য প্রতিভাবান জার্মান গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানী, যার গণিত এবং বিজ্ঞানের প্রায় সকল বিভাগে অবদান আছে । তাকে "গণিতের যুবরাজ" ও "সর্বকালের সেরা গণিতবিদ" বলা হয়। গণিতের যে সব বিষয়ে তার অবদান আছে সেগুলোর মধ্যে আছে সংখ্যা তত্ত্ব, গাণিতিক বিশ্লেষণ, অন্তরক জ্যামিতি, চুম্বকের ধর্ম, আলোকবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইত্যাদি। গণিত এবং বিজ্ঞানের বহু শাখায় তার প্রশংসাযোগ্য প্রভাব ছিল, যে কারণে তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গণিতবিদদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[১]
গাউস ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব প্রতিভাবান ছিলেন । ছোটবেলার তার গাণিতিক প্রতিভা নিয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। তিনি কৈশোরেই তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক আবিষ্কারগুলো সম্পাদন করেন। ১৭৯৮ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ ডিসকিশিয়নেস অ্যারিথমেটিকা[২] লেখা সমাপ্ত করেন, যা ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর এই কাজ গণিতের একটি পৃথক শাখা হিসেবে সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে এবং আজও এর প্রভাব অপরিসীম।
পরিচ্ছেদসমূহ |
শৈশব ও কৈশোর (১৭৭৭–১৭৯৮) [সম্পাদনা]
কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস ১৭৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন বর্তমান লোয়ার সাক্সনির অন্তর্গত ব্রাউনশভিগে। তাঁর পিতামাতা ছিলেন নিতান্তই খেটে-খাওয়া শ্রেণীর।[৩] শৈশবেই তিনি তাঁর গাণিতিক প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন। তার অসাধারণ প্রতিভা সম্বন্ধে বেশ কিছু গল্প প্রচলিত আছে। কথিত আছে মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তার বাবার হিসাবের খাতার ভুল ধরে দেন মনে মনে গণনা করে। তার সম্বন্ধে আরেকটি বহুল প্রচলিত গল্প হচ্ছে- একবার তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দুষ্টু ছাত্রদের ব্যস্ত রাখবার জন্যে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো যোগ করতে বলেন। গাউস তার শিক্ষককে অবাক করে দিয়ে মুহুর্তের মধ্যেই সঠিক উত্তরটি বের করে ফেলেন।
গাউসের যোগ করার পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত সহজ - তিনি লক্ষ্য করেন ধারাটির দুই বিপরীত দিক থেকে পদ নিয়ে জোড়া তৈরি করতে থাকলে তাদের যোগফল সমান থাকে 1 + 100 = 101, 2 + 99 = 101, 3 + 98 = 101, এবং এভাবে সম্পূর্ণ যোগফলটি দাঁড়ায় 50 × 101 = 5050। তবে এই গল্পটির বিস্তারিত বিবরণ কিছুটা অনুমান করা বলেই মনে করা হয়;[৪] কিছু লেখক, যেমন জোসেফ রটম্যান তার বই এ ফার্স্ট কোর্স ইন এলজেবরাতে ঘটনাটি আদৌ ঘটেছিল কিনা তা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
গাউসের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা ব্রাউনশভিগের ডিউকের নজর কাড়ে,[১] যিনি তাকে কলোজিয়াম কারোলিনামে (বর্তমান টেকনিশে উইনিভার্সিতেত ব্রাউনশভিগ) এ পড়ালেখা করবার সুযোগ করে দেন। তিনি ১৭৯২ থেকে ১৭৯৫ পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়ন করেন এবং তারপর গোটিগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭৯৫ থেকে ১৭৯৮ পর্যন্ত পড়েন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় গাউস বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্য নতুন করে আবিষ্কার করেন এবং ১৭৯৬ সালে তিনি প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেন; তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে যেসব সুষম বহুভুজের সংখ্যা ফার্মা প্রাইম (এবং, সেই সাথে যেসব বহুভুজের বাহুর সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ফার্মা প্রাইম ও 2 এর ঘাতের গুণফল) তাদের কম্পাস ও দাগ-না-কাটা রুলার ব্যবহার করে আঁকা সম্ভব। এ আবিষ্কারটি গণিতের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল; অঙ্কণের সমস্যা গণিতবিদদের প্রাচীন গ্রিক আমল থেকেই ভাবিয়ে আসছিল, এবং এই আবিষ্কারই গাউসকে ভাষাবিজ্ঞানের পরিবর্তে গণিতকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করে। গাউস তার এই উদ্ভাবন নিয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করতেন এবং তার ইচ্ছে ছিল তার স্মৃতিফলকে একটি সুষম হেপ্টাডেকাগন (সতেরভুজ) খোদাই করা থাকবে। তবে কারিগররা এতে অপারগতা প্রকাশ করে, কারণ সতেরভুজ খোদাই করা বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল, এবং এই শ্রমসাধ্য সপ্তদশভুজকে ভালোভাবে লক্ষ্য না করলে বৃত্তের সাথে পার্থক্য করা যেত না।[৫] ১৭৯৬ সালটি ছিল গাউস এবং সংখ্যাতত্ত্ব উভয়ের জন্যেই অন্যতম সফল একটি বছর। মার্চের ৩০ তারিখ তিনি হেপ্টাডেকাগন অঙ্কনের একটি কৌশল উদ্ভাবন করেন।[৬] তিনি মডুলার এরিথমেটিক আবিষ্কার করেন, যা সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ বহুগুণ সহজতর করে।তিনি 8 এপ্রিল কোয়াড্রাটিক রেসিপ্রোসিটি নিয়মটি প্রমাণ করেন। এই অসাধারণ সাধারণ সূত্রের মাধ্যমে কোন দ্বিঘাত সমীকরণ মডুলার পাটীগণিতের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব কিনা তা নির্ধারণ করা যায়। 31 মে তিনি মৌলিক সংখ্যা উপপাদ্যটি অনুমান করেন, যা মৌলিক সংখ্যার বন্টন সম্বন্ধে ধারণা প্রদান করে। গাউস আরও আবিষ্কার করেন যে, সকল ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যাকে সর্বোচ্চ তিনটি ত্রিভুজীয় সংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যেতে পারে; এই উদ্ভাবনের তারিখটি ছিল ১০ জুলাই এবং এ সম্বন্ধে তার ডায়েরিতে লেখা ছিল সেই বিখ্যাত শব্দগুচ্ছ, "ইউরেকা! num = Δ + Δ + Δ." অক্টোবর 1 তারিখে তিনি সসীম ক্ষেত্র সহগ বিশিষ্ট বহুপদীর সমাধান সংখ্যার ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন, যা ১৫০ বছর পর ভেইল অনুমিতির জন্ম দেয়।
মধ্যজীবন (১৭৯৯–১৮৩০) [সম্পাদনা]
১৭৯৯ সালে তার ডক্টরেট অভিসন্দর্ভ সকল একক-চলকবিশিষ্ট ইন্টিগ্রাল মূলদ বীজগাণিতিক ফাংশনকে প্রথম বা দ্বিতীয় ডিগ্রির বাস্তব উৎপাদকের গুণফল আকারে প্রকাশ করার তত্ত্বের একটি নতুন প্রমাণ এ গাউস বীজগণিতের মৌলিক তত্ত্বটি প্রমাণ করেন, যা হল জটিল সংখ্যায় সকল অ-ধ্রুবক একক-চলকধারী বহুপদীর কমপক্ষে একটি মূল আছে। তার পূর্বে কিছু গণিতবিদ এ তত্ত্বটির ভুল প্রমাণ দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন জাঁ লা রন্ড আলাম্বার্ট। তবে শ্লেষের ব্যাপার হল এই যে বর্তমান মানদন্ডে গাউসের প্রমাণটিও পুরোপুরি সঠিক নয়, কারণ তিনি জর্ডানের বক্রতা তত্ত্বের পরোক্ষ ব্যবহার করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি এ তত্ত্বের তিনটি প্রমাণ উপস্থাপন করেন, যার শেষটি ছিল সাধারণভাবে কড়াকড়ি প্রমাণ। তার প্রচেষ্টা পাশাপাশি জটিল সংখ্যার ধারণাও স্পষ্টতর করে। গাউস সংখ্যাতত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৮০১ সালে প্রকাশিত বই ডিসকিশিয়নেস এরিথমেটিকা (ল্যাটিন, পাটীগণিতে অনুসন্ধান) এ তিনি কনগ্রুয়েন্স বা অনুসমতার জন্যে একটি নতুন চিহ্নের &equiv ব্যবহার প্রচলন করেন এবং এর মাধ্যমে ভাগশেষ পাটীগণিতের পরিষ্কার উপস্থাপনা করেন, কোয়াড্রাটিক রিসিপ্রোসিটি তত্ত্বের প্রথম দু'টি প্রমাণ লিপিবদ্ধ করেন, বাইনারি ও টারনারি কোয়াড্রাটিক ফর্মের তত্ত্ব বর্ণনা করেন, তাদের জন্যে শ্রেণী সংখ্যা সমস্যা উদ্ধৃত করেন, এবং দেখান যে সুষম হেপ্টাডেকাগন (১৭-ভুজ) কম্পাস ও দাগ-না-কাটা রুলার দিয়ে অঙ্কণ করা সম্ভব।
একই বছর ইতালীয় জ্যোতিরবিজ্ঞানী জিওসেপ্পে পিয়াজ্জি বামন গ্রহ সেরেস আবিষ্কার করেন, কিন্তু তিনি মাত্র কয়েকদিন গ্রহটি পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন। গাউস গ্রহটির অবস্থান সঠিকভাবে হিসাব করে পুনরায় একে খুঁজে পাওয়ার পথ বাতলে দেন, এবং ৩১ ডিসেম্বর ১৮০১ সালে ফ্রাঞ্জ জাভের ফন জাখ গোথায় গ্রহটি পুনরাবিষ্কার করেন এবং তার এক দিন পর হাইনরিখ অলবার্সও ব্রেমেনে বসে গ্রহটি খুঁজে পেতে সমর্থ হন। জাখ মন্তব্য করেন, ডক্টর গাউসের বুদ্ধিদীপ্ত গণনা ভিন্ন আমরা হয়তো গ্রহটি আর খঁজে পেতাম না। যদিও তখন পর্যন্ত গাউস ডিউকের কাছ থেকে বৃত্তি পাচ্ছিলেন, তিনি এই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তাছাড়া তিনি মনে করতেন বিশুদ্ধ গণিত অর্থনৈতিক সহায়তা লাভ করার মত যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে চাকরি খঁজতে শুরু করেন এবং ১৮০৭ সালে গোটিগেনের জ্যোতির্বিজ্ঞান অবজার্ভেটরির প্রফেসর অফ এস্ট্রনমি ও ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ চাকরিতে বহাল ছিলেন।
১৮০১ সালের পহেলা জানুয়ারি পিয়াজ্জির সেরেস আবিষ্কার গাউসকে বৃহৎ গ্রহ দ্বারা বাঁধাগ্রস্ত উপগ্রহের গতি নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা ১৮০৯ সালে Theoria motus corporum coelestium in sectionibus conicis solem ambientum (সূর্যের চারপাশে মহাকাশের বস্তুসমূহের কনিক আকৃতি গতি সম্পর্কিত তত্ত্ব) নামে প্রকাশিত হয়। পিয়াজ্জি সেরেসকে কেবলমাত্র কয়েক মাসের জন্য পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন, তার সেরেসের পর্যবেক্ষণ রাতের আকাশে তিন ডিগ্রি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর গ্রহটি সূর্যের আড়ালে ক্ষণস্থায়ীভাবে ঢাকা পড়ে যায়। কয়েকমাস পরে সেরেসকে যখন পুনরায় দেখতে পাবার কথা, তখন পিয়াজ্জি তা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন: সে সময়কার গাণিতিক উৎকর্ষ কেবলমাত্র তিন ডিগ্রি কক্ষপথের হিসাব থেকে প্রকৃত কক্ষপথ হিসাব করবার মতো যথেষ্ট দক্ষ ছিল না— তিন ডিগ্রি প্রকৃত কক্ষপথের ১% এরও কম অংশ। ২৩ বছর বয়সে গাউস এ সমস্যার সাথে পরিচিত হন এবং তা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। তিন মাসের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি ডিসেম্বর ১৮০১ সালের জন্যে সেরেসের কক্ষপথ ভবিষদ্বাণী করেন— এবং তা এক ডিগ্রির অর্ধেকেরও কম ত্রুটিসহ সঠিক প্রমাণিত হয়। স্বর্গীয় বস্তুসমূহের গতি আজও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনায় মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। এ তত্ত্বে তিনি গাউসীয় মহাকর্ষ ধ্রুবক ধারণাটির জন্ম দেন এবং সর্বনিম্ন বর্গ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা কিনা আজও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ত্রুটি সর্বনিম্নকরণের কাজে ব্যবহৃত হয়। গাউস ১৮০৯ সালে এ তত্ত্বটি স্বাভাবিকভাবে বন্টিত ত্রুটির জন্যে প্রমাণ করতে সমর্থ হন।
গাউস অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সম্ভাবনার কথাও আবিষ্কার করেছিলেন বলে দাবি করেন, কিন্তু এ সম্পর্কে তার কোন কাজ তিনি প্রকাশ করেন নি। এ আবিষ্কারটি ছিল গণিতের জগতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা, কেবলমাত্র ইউক্লিডের স্বতঃসিদ্ধের মাধ্যমেই যুক্তিযুক্ত ও অসঙ্গতিবিহীন জ্যামিতি তৈরি করা যায় - এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে গণিতবিদদের মুক্ত করে। এ ধরণের জ্যামিতির ওপর গবেষণার মাধ্যমে অনেক নতুন আবিষ্কার হয়, যার মধ্যে অন্যতম হল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, যা মহাবিশ্বকে অ-ইউক্লিডীয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে। গাউসের বন্ধু ফারকাস উলফগ্যাং বোলাই যার সাথে তিনি ছাত্রাবস্থায় ভ্রাতৃত্ব ও সত্যের পতাকার শপথ নিয়েছিলেন, তিনি বহু বছর ধরে ইউক্লিডের অন্যান্য উপপাদ্য ব্যবহার করে সমান্তরাল স্বীকার্যটি প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। বোলাইয়ের পুত্র জেনোস বোলাই ১৮২৯ সালে অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি আবিষ্কার করেন; তার কাজ ১৮৩২ সালে প্রকাশিত হয়। তা দেখার পর গাউস ফারকাস বোলাইকে লেখেন: "এর প্রশংসা করা আমার জন্যেও গৌরবের। কারণ কাজটির প্রায় সম্পূর্ণ অংশই.... আমার এ সংক্রান্ত গত তিরিশ বা পয়ত্রিশ বছরের চিন্তা-ভাবনার সাথে মিলে যায়।"
এ প্রমাণহীন বাক্যটি গাউসের সাথে জেনাস বোলাইয়ের সম্পর্কে টানাপোড়েনের সৃষ্টি করেন (যিনি ভেবেছিলেন গাউস তার আইডিয়া চুরি করছেন)। ১৮২৯ এর আগে লেখা গাউসের পত্র থেকে জানা যায় তিনি সমান্তরাল স্বীকার্য নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তাভাবনা করছিলেন। গাউসের পুরনো ছাত্র ওয়ালডো ডানিংটন জানান গাউসের মতো প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি আবিষ্কারের সকল যোগ্যতাই ছিল, তবে তিনি এ সংক্রান্ত কোন কাজ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন, কারণ তিনি ভেবেছিলেন তা বিতর্কের সৃষ্টি করবে।
হ্যানোভারে সংঘটিত জরিপ অন্তরক জ্যামিতির প্রতি গাউসের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে, গণিতের যে ক্ষেত্রে বক্ররেখা এবং তল নিয়ে কাজ করা হয়। অন্যান্য অনেক কিছুর মতো তিনি গাউসীয় বক্রতার ধারণার জন্ম দেন। এ ধারণাই ১৮২৮ সালে Theorema Egregium (ল্যাটিনে অবিস্মরণীয় তত্ত্ব) এর আবিষ্কারের পথ প্রশস্ত করে, যা বক্রতার ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করে। সহজ কথায় বলতে গেলে তত্ত্বটির মূল কথা হল কোন তলের বক্রতা তলটির ওপরে কোণ ও দূরত্ব মেপে সম্পূর্ণরূপে নির্ণয় করা যায়। এর মানে হল, ত্রিমাত্রিক বা দ্বিমাত্রিক স্থানে কোন তল কেমন করে গাঁথা আছে তার ওপর বক্রতা নির্ভর করে না।
১৮২১ সালে তাকে রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস এর বিদেশী সভ্য নির্বাচন করা হয়।
জীবনের শেষভাগ ও মৃত্যু (১৮৩১–১৮৫৫) [সম্পাদনা]
১৮৩১ সালে গাউস পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভিলহেলম ওয়েবারের সাথে যৌথ গবেষণায় নিযুক্ত হন, যার ফলস্বরূপ চুম্বকত্বে নতুন জ্ঞান (যার মধ্যে রয়েছে ভর, দৈর্ঘ্য ও সময়ের সাপেক্ষে চুম্বকত্ব প্রকাশের একক) এবং তড়িতের কার্শফের বর্তনী সংক্রান্ত সূত্র আবিষ্কৃত হয়। তারা ১৮৩৩ সালে তড়িৎ-যান্ত্রিক টেলিগ্রাফ উদ্ভাবন করেন, যা অবজার্ভেটরির সাথে গোটিগেনের পদার্থবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের সংযোগ সাধন করে। তিনি অবজার্ভেটরির বাগানে একটি চৌম্বক অবজার্ভেটর স্থাপনের আদেশ করেন এবং ওয়েবারের সাথে magnetischer Verein (জার্মান ভাষায় চৌম্বক সভা ) স্থাপন করেন, যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে পরিমাপ কাজকে সহায়তা করে। তিনি চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান্তরাল তীব্রতা পরিমাপের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যা ২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় এবং পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের আভ্যন্তরীন (মজ্জা এবং ত্বক) এবং বহির্গত উৎসের পার্থক্যসূচক গাণিতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
গাউস ১৮৫৫ সালে গোটিগেনে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। দু'জন ব্যক্তি তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে প্রশংসাবাক্য পাঠ করেন, গাউসের জামাতা হাইনরিখ এওয়াল্ড এবং উলফগ্যাং সার্টরিয়াস ফন ভালটারশসেন, যিনি ছিলেন গাউসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তার জীবনীকার। তার মস্তিষ্ক রুডলফ ভাগনার কর্তৃক সংরক্ষিত ও পর্যবেক্ষিত হয়, যিনি সেটির ভর গণনা করেন ১৪৯২ গ্রাম এবং সেরেব্রাল এলাকা ২,১৯,৫৮৮ বর্গ মিমি।[৭] (৩৪০.৩৬২ বর্গ ইঞ্চি)। সুগঠিত মোচড়ও সেখানে আবিষ্কৃত হয়, যাকে ২০ শতকের গোড়ার দিকে তার অসামান্য প্রতিভার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।[৮]
টীকা [সম্পাদনা]
- ↑ ১.০ ১.১ Dunnington, G. Waldo. (May, 1927). "The Sesquicentennial of the Birth of Gauss". Scientific Monthly XXIV: 402–414. Retrieved on 29 June 2005. Comprehensive biographical article.
- ↑ Zeidler, Eberhard (2004). Oxford User's Guide to Mathematics. Oxford, UK: Oxford University Press. পৃ: 1188. আইএসবিএন 0198507631.
- ↑ "Carl Friedrich Gauss"। Wichita State University। http://www.math.wichita.edu/history/men/gauss.html।
- ↑ http://www.americanscientist.org/issues/pub/gausss-day-of-reckoning/2
- ↑ Pappas, Theoni: Mathematical Snippets, Page 42. Pgw 2008
- ↑ Carl Friedrich Gauss §§365–366 in Disquisitiones Arithmeticae. Leipzig, Germany, 1801. New Haven, CT: Yale University Press, 1965.
- ↑ This reference from 1891 (Donaldson, Henry H. (1891)। "Anatomical Observations on the Brain and Several Sense-Organs of the Blind Deaf-Mute, Laura Dewey Bridgman"। The American Journal of Psychology (E. C. Sanford) 4 (2): 248–294। ডিওআই:10.2307/1411270।) says: "Gauss, 1492 grm. 957 grm. 219588. sq. mm. ", i.e the unit is square mm. In the later reference: Dunnington (1927), the unit is erroneously reported as square cm, which gives an unreasonably large area, the 1891 reference is more reliable.
- ↑ Dunnington, 1927
উচ্চতর পঠন [সম্পাদনা]
- Dunnington, G. Waldo. (2003). Carl Friedrich Gauss: Titan of Science. The Mathematical Association of America. আইএসবিএন 088385547X. OCLC 53933110.
- Gauss, Carl Friedrich (1965). Disquisitiones Arithmeticae. tr. Arthur A. Clarke. Yale University Press. আইএসবিএন 0300094736.
- Hall, Tord (1970). Carl Friedrich Gauss: A Biography. Cambridge, MA: MIT Press. আইএসবিএন 0262080400. OCLC 185662235.
- Kehlmann, Daniel (2005). Die Vermessung der Welt. Rowohlt. আইএসবিএন 3498035282. OCLC 144590801.
- Sartorius von Waltershausen, Wolfgang (1966). Gauss: A Memorial.
- Simmons, J. (1996). The Giant Book of Scientists: The 100 Greatest Minds of All Time. Sydney: The Book Company.
- Tent, Margaret (2006). The Prince of Mathematics: Carl Friedrich Gauss. A K Peters. আইএসবিএন 1568814550.
বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা]
সংজ্ঞা, উইকিঅভিধান হতে
পাঠ্যবই, উইকিবই হতে
উক্তি, উইকিউক্তি হতে
রচনা সংকলন, উইকিউৎস হতে
ছবি ও অন্যান্য মিডিয়া, কমন্স হতে
ভ্রমণ নির্দেশিকা, উইকিভয়েজ হতে
সংবাদ, উইকিসংবাদ হতে
- টেমপ্লেট:Planetmath reference
- Complete works
- Gauss and his children
- Gauss biography
- গণিত উদ্ভববিজ্ঞান প্রকল্পে কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস
- Carl Friedrich Gauss, Biography at Fermat's Last Theorem Blog.
- Gauss: mathematician of the millennium, by Jürgen Schmidhuber
- English translation of Waltershausen's 1862 biography
- Gauss general website on Gauss
- MNRAS 16 (1856) 80 Obituary
- Carl Friedrich Gauss on the 10 Deutsche Mark banknote
- জন জে. ও'কনোর এবং এডমান্ড এফ. রবার্টসন। "কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস"। ম্যাকটিউটর গণিতের ইতিহাস আর্কাইভ।
- Carl Friedrich Gauss at Wikiquote
| পুরস্কার ও স্বীকৃতি | ||
|---|---|---|
| পূর্বসূরী আন্তনিও সিজার বেকেরেল এবং জন ফ্রেদেরিক দানিয়েল |
কোপলে মেডেল 1838 মাইকেল ফ্যারাডের সাথে যৌথভাবে |
উত্তরসূরী রবার্ট ব্রাউন |
তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]
| এই নিবন্ধটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এটিকে সমৃদ্ধ করে উইকিপিডিয়াকে সাহায্য করতে পারেন। |