মুনাফিক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Munafiq থেকে পুনর্নির্দেশিত)

মুনাফিক (আরবিতে: منافق, বহুবচন মুনাফিকুন) একটি ইসলামি পরিভাষা যার অর্থ একজন প্রতারক বা "ভন্ড ধার্মিক" ব্যক্তি। যে প্রকাশ্যে ইসলাম চর্চা করে; কিন্তু গোপনে অন্তরে কুফরী বা ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস লালন করে। আর এ ধরনের প্রতারণাকে বলা হয় নিফাক (আরবি: نفاق‎‎)।

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

সালিহ আল মুনাজ্জিদের মতে, কুফরের মতও নিফাক দুই প্রকার, যার একটি বড় যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়, আরেকটি ছোট যা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, যথাঃ

  • আক্বীদাগত মুনাফেকি বা বিশ্বাসগত নিফাক: বাইরে ইসলামী আকীদা কিন্তু ভেতরে অনৈসলামিক আকীদা পোষণ করা। এটি বড় কুফর যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। তা ছয় প্রকার: রাসূলকে (মুহাম্মাদ) মিথ্যা সাব্যস্ত করা, অথবা রাসূল যে ধর্ম নিয়ে এসেছেন তার কোনো কিছুকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, কিংবা রাসূলকে ঘৃণা করা, অথবা রাসূল যে ধর্ম নিয়ে এসেছেন তাকে ঘৃণা করা, রাসূলের ধর্মের ক্ষতিতে খুশি হওয়া অথবা রাসূলের ধর্মের বিজয় অপছন্দ করা।
  • আমলগত মুনাফেকি বা কর্মগত নিফাক: তা হলো ছোট কুফর যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে না। তবে তা বড় ধরনের অপরাধ ও মহাপাপ। তন্মধ্যে রয়েছে সে আমল যা নবি মুহাম্মাদ হাদীসে উল্লেখ করেছেন।

মুহাম্মদ মুনাজ্জিদ মুনাফেকীকে আরও একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি আলাদা ভাগে বিভক্ত করেছেন, তা হলো, মৌলিক ও অমৌলিক মুনাফিকী এ বিষয়ে তিনি বলেন, "যে লোক আদি থেকেই কোনদিন ছহীহ-শুদ্ধ, খাঁটি ইসলামে বিশ্বাসী নয়। মূলতঃ সেই মূল থেকে মুনাফিক। জাগতিক কোন স্বার্থের টানে এমন লোকেরা ইসলামের সঙ্গে সম্বন্ধ যাহির করে বটে, অথচ তারা মন থেকে ইসলামকে বিশ্বাস করে না। ফলে তারা তাদের ইসলাম ঘোষণার প্রথম দিন থেকেই মুনাফিক। তারপর সেই মুনাফিকীর উপর তারা চলছেই। এটা মৌলিক মুনাফিকী। আবার কিছু লোক আছে যারা সত্যিকারভাবেই অন্তর থেকে ইসলামের ঘোষণা দেয়। তারপর তাদের মনে সন্দেহ ও শঠতা ভর করে। অতঃপর বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন করে আল্লাহ তা'আলা তাদের ঈমানের সত্যতার পরীক্ষা নেন। তখন তারা ইসলামের দাবী রক্ষা করতে না পেরে ভেতর থেকে ইসলাম ছেড়ে দেয় বা মুরতাদ হয়ে যায়। কিন্তু প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলে তাদের উপর মুরতাদের বিধান কার্যকর হতে পারে কিংবা মুসলিম নাম বহাল থাকায় জাগতিক যেসব সুযোগ-সুবিধা সে পাচ্ছে তা খোয়াতে হবে অথবা তাকে নিন্দা শুনতে হবে এবং সমাজে তার যে অবস্থান আছে তা তাকে হারাতে হবে, এরকম আরো অনেক উপভোগ্য ও লোভনীয় বিষয়ের কথা চিন্তা করে তারা প্রকাশ্যে ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিতে ভয় পায়। ফলে তারা বাহ্যিকভাবে ইসলামের উপর চলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা কাফির মুরতাদ হয়ে গেছে। এটাই অমৌলিক মুনাফিকী।"[১]

আবার কারও মতে, নিফাকের ধরন তিনটি

  • প্রকৃত ঈমান সম্পর্কে আল্লাহর প্রতি নিফাক। (কুরআন 2:8) এবং (কুরআন 2:14)
  • ঈমানের নীতিগুলির প্রতি নিফাক: উদাহরণস্বরূপ, কেউ আল্লাহ, বিচার দিবস, হিসাব, ​​কাজের মাপকাঠি এবং জাহান্নাম (একটি অনিশ্চয়তা এবং সন্দেহের সাথে) বিশ্বাস করতে পারে কিন্তু তাদের ভয় না করে (বাস্তবে) বা পাপ করা থেকে বিরত থাকে না সেগুলোর কারণে। তবুও তিনি দাবি করেন, "আমি আল্লাহকে ভয় করি।"
  • অন্যের প্রতি নিফাক: দুমুখো ব্যক্তি। যে কারও উপস্থিতিতে তার প্রশংসা করে, তারপর, তার পিছনে, তার নিন্দা করে এবং তাকে কষ্ট দিতে ও তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

কুরআনে মুনাফিক[সম্পাদনা]

কুরআনের শতাধিক আয়াতে মুনাফিকদের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে[২] এবং মুসলমানদের জন্য তাদের অমুসলিম শত্রুদের তুলনায় মুনাফিকদেরকে অধিক বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে করা হয়েছে। কুরআনে মুনাফিকদের নামে একটি সূরাও রয়েছে।[৩]

হাদীসে মুনাফিক[সম্পাদনা]

ইসলামী নবী মুহাম্মদ বলেছেন :

"চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হবে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। সেগুলো হলো: ১. সম্পদ গচ্ছিত রাখা হলে তা হনন করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে বিস্ফোরিত হয় (فَجَرَ, ফাজারা)/অশ্লীল গালি দেয়/সত্য থেকে বিচ্যুত হয়/অত্যন্ত অবিবেচক, অযৌক্তিক, মূর্খ, মন্দ এবং অপমানজনকভাবে আচরণ করে।"[৪]

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে। এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খিয়ানত করে।’’ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ’’যদিও সে রোযা রাখে এবং নামায পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।’’

— সহীহুল বুখারী ৩৩, ২৬৮২, ২৭৪৯, ৩১৭৮, মুসলিম ৫৮, তিরমিযী ২৬৩২, নাসায়ী ৫০২০, আবূ দাউদ ৪৬৮৮, আহমাদ ৬৭২৯, ৬৮২৫, ৬৮৪০

আহমাদ ইবন মানী‘ ..... আবূ উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ হায়া (লজ্জাশীলতা) এবং রুদ্ধবাক হওয়া (কম কথা বলা) ঈমানের দু’টি শাখা। অশ্লীলতা (লজ্জাহীনতা) ও বাক্যবাগিশ হওয়া (বেশি কথা বলা) মুনাফেকীর দু’টি শাখা।

— ঈমান ইবনু আবী শাইবা ১১৮, মিশকাত, তাহকীক ছানী ৪৭৯৬, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২০২৭

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিনের উদাহরণ হল ক্ষেতের শস্যের মতো যাকে বাতাস সর্বদা আন্দোলিত করতে থাকে। মু'মিন সদাসর্বদাই বিপদগ্রস্ত হতে থাকবে। মুনাফিক হল বট গাছের মতো যা বাতাসে না হেললেও (ঝড়ে) সমূলে উৎপাটিত হয়।

— সহীহঃ তাখরাজুল ঈমান ইবনু আবী শাইবা (৮৬), সহীহাহ (২৮৮৩), বুখারী ও মুসলিম।

উক্ত রাবী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মুনাফিক (কপট)দের উপর ফজর ও এশার নামায অপেক্ষা অধিক ভারী নামায আর নেই। যদি তারা এর ফযীলত ও গুরুত্ব জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বা পাছার ভরে অবশ্যই (মসজিদে) উপস্থিত হত।"

— সহীহুল বুখারী ৬৫৭, ৬৪৪, ৬৫৭, ২৪২০, ৭২২৪, মুসলিম ৬৫১, তিরমিযী ২১৭, নাসায়ী ৮৪৮, দাউদ, ৭২৬০, ৭৮৫৬, ২৭৩৬৬, ২৭৪৭৫, মুওয়াত্তা মালিক ২৯৯, দারেমী ১২১২, ১২৭৪

বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মু’মিন ছাড়া আনসারদেরকে কেউ ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ তাঁদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে না।

— বুখারী ৩৭৮৩,(আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৫০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৫০৯) মুসলিম ১/৩৩, হাঃ নং ৭৫, আহমাদ ১৮৬০০

আবূ মূসা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঐ মু’মিন যে কুরআন পাঠ করে এবং সে অনুযায়ী ‘আমল করে, তাঁর দৃষ্টান্ত ঐ লেবুর মত যা খেতে সুস্বাদু এবং গন্ধে চমৎকার। আর ঐ মু’মিন যে কুরআন পাঠ করে না; কিন্তু এর অনুসারে ‘আমল করে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ খেজুরের মত যা খেতে সুস্বাদু কিন্তু সুগন্ধ নেই। আর মুনাফিক যে কুরআন পাঠ করে; তার উদাহরণ হচ্ছে, ঐ রায়হানের মত, যার মন মাতানো খুশবু আছে, অথচ খেতে একেবারে বিস্বাদ। আর ঐ মুনাফিক যে কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মাকাল ফলের মত, যা খেতে বিস্বাদ এবং গন্ধে দুর্গন্ধময়।

— [৫০২০] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৬৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৬৯০ তাওহীদঃ ৫০৫৯)

আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা এবং ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ... আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ সে মহান সত্তার শপথ, যিনি বীজ থেকে অংকুরোদ্‌গম করেন এবং জীবকুল সৃষ্টি করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, মুমিন ব্যাক্তই আমাকে ভালবাসবে আর মুনাফিক ব্যাক্তি আমার সঙ্গে শক্রতা পোষণ করবে।

— মুসলিম, ১৪৩

সাহল ইবনু মু‘আয ইবনু আনাস আল জুহানী (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো মু‘মিনকে মুনাফিক থেকে রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার শরীর জাহান্নাম থেকে রক্ষার জন্য একজজন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তাকে দোষারোপ করবে তাকে মহান আল্লাহ জাহান্নামের সেতুর উপর প্রতিরোধ ব্যবস্থা করবেন যতক্ষণ না তার কৃত কর্মের ক্ষতিপূরণ হয়।

— আবু দাউদ, ৪৮৮৩

আবূ সালামা ইয়াহইয়া ইবনু খালাফ বাসরী (রহঃ) ..... আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরে রাখা হয় তখন দুইজন কৃষ্ণবর্ণের ও নীল চক্ষু বিশিষ্ট ফিরিশতা তার কাছে আসেন, একজনকে বলা হয় ‘‘আল-মুনকার’’ আর অপরজনকে বলা হয় ‘‘আন-নাকীর’’। তাঁরা বলেন, এই ব্যক্তি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে তুমি কি বলতে? সে তখন (দুনিয়াতে) তাঁকে যা বলত ত-ই বলবে যে, ইনি হলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূলঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি কোন ইলাহ নেই আল্লাহ্ ছাড়া, আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তার পর তাঁরা বলবেন আমরা জানতাম যে তুমি এই কথা বলবে। এরপর তার কবর সত্তর গজ প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং তার জন্যে এটি আলোকিত করে দেওয়া হবে। এরপর তাকে বলা হবে। তুমি ঘুমিয়ে পড়। ঐ ব্যক্তি বলবে, আমি আমার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে যেতে চাই যাতে এই খবরটি তাদের দিতে পারি। তখন ফিরিশতা দুইজন বলবেন, নয়া দুলহার মত তুমি ঘুমিয়ে থাক। যাকে তার পরিবারের সবচাইতে প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া জাগায় না। অবশেষে আল্লাহ্ তা’আলা তাকে তার এই শয্যা থেকে উত্থিত করবেন। আর মৃত্যু ব্যক্তি যদি মুনাফিক হয় তবে সে (ফিরিশতাদের প্রশ্নের উত্তরে) বলবে, আমি তো জানিনা, তবে লোকদের যা বলতে শুনেছি আমিও তাই বলেছি। ফিরিশতারা বলবে, আমরা জানতাম তুমি এই ধরণেরই কথা বলবে। এরপর যমীনকে বলা হবে একে চাপ দাও। তখন যমীন তাকে চাপ দিবে। ফলে তার পিঞ্জরাস্থিসমূহ একটার ভিতর অন্যটা ঢুকে পড়বে। এভাবে সে আযাব ভোগ করতে থাকবে, অবশেষে তাকে আল্লাহ্ ত’আলা তার এ শয্যা থেকে উত্থিত করবেন।

— মিশকাত ১৩০, সহিহাহ ১৩৯১, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১০৭১ [আল মাদানী প্রকাশনী]

মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহ.) নাফি’ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু ’উমার (রাঃ) ততক্ষণ পর্যন্ত আহার করতেন না যতক্ষণ না তাঁর সঙ্গে খাওয়ার জন্য একজন মিসকীনকে ডেকে আনা হতো। একদা আমি তাঁর সঙ্গে বসে খাওয়ার জন্য এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসলাম। লোকটি খুব অধিক আহার করল। তিনি বললেনঃ নাফি’! এমন মানুষকে আমার কাছে নিয়ে আসবে না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মু’মিন এক পেটে খায় আর কাফির সাত পেটে খায়।

— [বুখারী, ৫৩৯৪; মুসলিম ৩৬/৩৪, হাঃ ২০৬০, আহমাদ ১৫২২০] (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৯৯২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮৮৮)

(২৩৬৫) ইবনে উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের উদাহরণ যেমন দুই ছাগপালের মাঝে যাতায়াতকারী বিপথগামী ছাগ। যা এ পালে একবার আসে আবার ও পালে একবার যায়। স্থির করতে পারে না যে সে কোন পালের অনুসরণ করবে।

— (মুসলিম ৭২২০, আহমাদ ৫৭৯০, নাসাঈ ৫০৩৭)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেলো যে, সে জিহাদ করেনি এবং মনে জিহাদের আকাঙ্ক্ষাও রাখেনি, তবে সে মুনাফিক্বী অবস্থায় মারা গেলো।

— আবু দাউদ ২৫০২

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিবাহ বন্ধন হতে (বিনা কারণে) বিচ্ছিন্নকারিণীগণ (অর্থাৎ- ধন-সম্পদের বিনিময়ে খুলা’ তালাক প্রার্থনাকারিণীগণ) মুনাফিক রমণী।

— মিশকাত ৩২৯০, নাসায়ী ৩৪৬১, তিরমিযী ১১৮৬, ইরওয়া ৬৩২, সহীহ আল জামি‘ ৬৬৮১। সহীহ : নাসায়ী ৩৪৬১, তিরমিযী ১১৮৬, ইরওয়া ৬৩২, সহীহ আল জামি‘ ৬৬৮১

মুসাদ্দাদ (রহঃ) ..... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু'মুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি (অর্থাৎ মুনাফিক) নিকৃষ্টতম, যে এক পক্ষের লোকের সাথে এক মুখে এবং অপর পক্ষের লোকের সাথে অন্য মুখে কথা বলে।

— আবু দাউদ ৪৭৯৬

আবূ বকর ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) ..... আম্মার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়াতে যে ব্যক্তি দু'মুখ বিশিষ্ট (মুনাফিক) হবে, কিয়ামতের দিন তার আগুনের দু'টি মুখ হবে।

— আবু দাউদ ৪৭৯৭

সালিহ আল মুনাজজিদ তার আননিফাক বইতে বলেন, ইসলামী নবী মুহাম্মদ কোন মুনাফিককে নেতা বানাতে নিষেধ করেছেন,

উবায়দুল্লাহ ইবন উমার (রহঃ) ..... আবদুল্লাহ ইবন বুরায়দা (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ 'তোমরা কোন মুনাফিককে সাইয়্যিদ বা নেতা নামে আখ্যায়িত কর না। কেননা সে যদি সত্যিই (তোমাদের) নেতা হয়, তাহ'লে তোমরা তোমাদের প্রভুকে ক্ষুব্ধ করবে'।

— আবু দাউদঃ ৪৯৭৭, ইফাঃ ৪৮৯৩

[৫]

মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

সালিহ আল মুনাজ্জিদ তার নিফাক বইয়ে কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত মুনাফিকদের স্বভাব-চরিত্রের বর্ননা দিয়েছেন। এগুলো হলোঃ

  1. ব্যাধিগ্রস্ত মন
  2. খেয়াল-খুশির প্রলোভন
  3. অহংকার প্রদর্শন
  4. আল্লাহর আয়াত সমূহের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ
  5. মুমিনদের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ
  6. মানুষকে আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য ব্যয় করতে বাধা দান
  7. মুমিনদের মূর্খ আখ্যা দেওয়া কাফেরদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা
  8. মুমিনদের ফলাফলের ব্যাপারে প্রতীক্ষা
  9. আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি এবং ইবাদতে অলসতা
  10. দোটানা ও দোদুল্যমান মনোভাব
  11. মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজি
  12. আল্লাহদ্রোহী শাসকদের নিকট মামলা-মোকদ্দমা পেশ করা
  13. মুমিনদের মাঝে বিপর্যয় সৃষ্টি
  14. মিথ্যা শপথ, ভয়-ভীতি, কাপুরুষতা ও অস্থিরতা
  15. তারা যা করেনি তা করার নামে প্রশংসা পিয়াসী
  16. তারা সৎকর্মকে দূষণীয় গণ্য করে
  17. নিম্নতম অবস্থানে খুশী
  18. অন্যায়ের আদেশ ও ন্যায়ের নিষেধ
  19. জিহাদকে অপসন্দ করা এবং তা থেকে পিছুটান দেয়া
  20. যুদ্ধ না করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং ভীতিকর গুজব ছড়ানো
  21. মুমিনদের সাথে থাকায় গড়িমসি
  22. জিহাদে অংশ না নিতে অনুমতি প্রার্থনা
  23. জিহাদ থেকে পিছনে থাকার জন্য অজুহাত পেশ
  24. মানুষের দৃষ্টির আড়াল হওয়ার চেষ্টা
  25. মুমিনদের ক্ষয়ক্ষতিতে উল্লসিত হওয়া
  26. আমানতের খেয়ানত করা, কথোপকথনকালে মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করা এবং বাকবিতণ্ডাকালে বাজে কথা বলা
  27. ছালাতকে যথাসময় থেকে বিলম্বিত করা
  28. ছালাতের জামা'আতে শরীক না হওয়া।
  29. কুরুচিপূর্ণ বচন ও বাচালতা
  30. গান শোনা

নিফাকের প্রতিকার[সম্পাদনা]

সালিহ আল মুনাজ্জিদ তার নিফাক বইয়ে নিফাকের প্রতিকার হিসেবে কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী ১০টি কাজ করতে বলেছেন,

  1. (কোরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী বিশুদ্ধ ইসলামী আকীদার জ্ঞান ও বিশ্বাস অন্তরে গ্রহণ ও ধারণপূর্বক) তাকবীরে উলা (তাকবিরে তাহরিমা নামে বাংলায় প্রচলিত) বা প্রথম তাকবিরের সাথে জামাতের সালাতে টানা ৪০ দিন উপস্থিত হওয়া

আনাস বিন মালিক বর্ণনা করেছেন যে:

আল্লাহর রসূল, সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তার উপর আল্লাহর আশীর্বাদ ও শান্তি বর্ষিত হোক), বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি প্রথম তাকবীর ধরে চল্লিশ দিন পর্যন্ত আল্লাহর জন্য জামাতে নামায আদায় করে, তার জন্য দু’টি নাজাত লেখা হয়ঃ জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং মুনাফেকী থেকে মুক্তি। হাদীসের মান: যঈফ (দারুসসালাম)/হাসান লিগাইরিহি, তথ্যসূত্রঃ জামে আত-তিরমিযী ২৪১, সহীহা ১৯৭৯, সহীহ আত-তারগীব ৪০৯, সহীহ আল-জামি' ৬৩৬৫।

  1. সদাচারণ করা ও দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণ করা
  2. দানশীলতা
  3. রাত জেগে সালাত আদায়
  4. আল্লাহর পথে জিহাদ
  5. বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা
  6. দোআ
  7. আনসারদের ভালোবাসা
  8. আলী ইবনে আবি তালিবকে ভালোবাসা[৬]

মুনাফিকদের সাথে মুসলিমদের করনীয়[সম্পাদনা]

সালিহ আল মুনাজ্জিদ কুরআন ও সহিহ হাদীস অনুযায়ী মুনাফিকদের সাথে মুসলিমদেরকে নিম্নলিখিত আচরণ করতে বলেছেন,

  1. মুনাফিকদের আনুগত্য না করা
  2. মুনাফিকদের উপেক্ষা করা, ভীতি প্রদর্শন ও উপদেশ দান
  3. মুনাফিকদের সঙ্গে বিতর্কে না জড়ানো এবং তাদের পক্ষাবলম্বন না করা
  4. মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে না তোলা
  5. মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালনা এবং কঠোরতা আরোপ
  6. মুনাফিকদের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো এবং তাদের নেতা না বানানো
  7. মুনাফিকদের জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ না করা

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]