লৌহঘটিত ধাতুবিদ্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মধ্যযুগ এর সময়ে ব্লুমারি ধাতু বিগলন ।

লৌহঘটিত ধাতুবিদ্যা হল লোহা এবং এর সঙ্কর ধাতু নিয়েধাতুবিদ্যা । এর চর্চা প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসের সময়কাল থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে পুরনো লোহার নিদর্শন খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ সহস্রাব্দের, যা মিশরে [১] উল্কাপিন্ড থেকে প্রাপ্ত লোহা-নিকেল সংকর ধাতু থেকে তৈরি করা হয়েছে । [২] যদিও কোথায় এবং কখন থেকে আকরিক থেকে লোহার বিগলন করা আরম্ভ হয়, কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ২য় সহস্রাব্দের শেষ নাগাদ লোহার আকরিক থেকে লোহার উৎপাদন হয়েছিল অন্তত গ্রীস থেকে ভারতে পর্যন্ত [৩][৪][৫] এবং আরও বিতর্কিতভাবে বলতে গেলে সাব-সাহারান আফ্রিকা পর্যন্ত । [৬][৭] পেটা লোহার ব্যবহার (পেটানো লোহা) খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দ দ্বারা পরিচিত ছিল, এবং এর বিস্তার লৌহ যুগকে চিহ্নিত করেছিল। মধ্যযুগীয় সময়কালে, ইউরোপে শোধনশালার হাপর ব্যবহার করে ঢালাই লোহা (এই প্রসঙ্গে শূকর লোহা হিসাবে পরিচিত) থেকে গড়া লোহা উৎপাদন করা শুরু হয়। এই সমস্ত প্রক্রিয়াগুলির জন্য, জ্বালানী হিসাবে কাঠকয়লা প্রয়োজন ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে উটজ স্টিল ( শূকর লোহা এবং পেড়া লোহার মধ্যে কার্বনের সংকর) ভারত থেকে প্রাচীন চীন, আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য এবং ইউরোপে রফতানি করা হচ্ছিল। ঢালাই লোহার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে উপস্থিত হয়। [৮] সিমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় কার্বুরাইজিং করা লোহার বার দ্বারা এটি উৎপাদন করার নতুন পদ্ধতি ১৭শ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল। শিল্প বিপ্লবের সময়, কাঠকয়ালের স্থানে কোক-কয়লা ব্যবহার করে লোহার বার উৎপাদন করার নতুন পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছিল এবং এগুলি পরবর্তীকালে ইস্পাত উৎপাদন করতে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা ইস্পাতের ব্যাপকহারে ব্যবহারের এক নতুন যুগের সৃষ্টি করেছিল এবং কিছু সমসাময়িক লোকেরা সে সময়কে একটি নতুন লৌহ যুগ হিসাবে বর্ণিত করেছিল। ১৮৫০ এর দশকের শেষদিকে, হেনরি বেসমার একটি নতুন ইস্পাত তৈরির প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন, এতে কার্বন জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য গলিত শূকর লোহার মধ্য দিয়ে বায়ু প্রবাহ করা হত এবং নরম ইস্পাত তৈরি করা হ্ত। এটি এবং ১৯শ শতাব্দীর এবং পরবর্তীকালের ইস্পাত তৈরির প্রক্রিয়াগুলি পেড়া লোহাকে সরিয়ে ফেলে। কার্যত সমতুল্য নরম বা কম কার্বন ইস্পাত দ্বারা বাস্তুচ্যুত হয়ে আজকের দিনে পেড়া লোহা আর বাণিজ্যিক আকারে উৎপাদিত হয় না। [৯] :১৪৫

বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে আধুনিক ভূগর্ভস্থ লৌহ আকরিক খনি ল্যাপল্যান্ডের নররবটেন কাউন্টিকিরুনায় অবস্থিত। সুইডেনের একটি বৃহত খনন সংস্থা লুসাসাওয়ারা-কিরুনাভারা এবি'র মালিকানাধীন এই খনিটির বার্ষিক লৌহ আকরিক উৎপাদন ক্ষমতা ২৬ মিলিয়ন টন ।

উল্কাপিন্ড থেক প্রাপ্ত লোহা[সম্পাদনা]

বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম উইলমেট উল্কাপিন্ড হ'ল লৌহ-নিকেল উল্কাপিণ্ড ।
লোহার উল্কাপিন্ডগুলির বেশিরভাগই লোহা-নিকেল মিশ্রণ দিয়ে গঠিত। এই উল্কাপিন্ড থেকে নেওয়া ধাতুটি মিটিওরাইটিক আয়রন হিসাবে পরিচিত এবং এটি মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য লোহার অন্যতম প্রাথমিক উৎস ছিল।

লৌহ-নিকেল মিশ্রণ থেকে লোহা বের করা হয়েছিল, যা পৃথিবীতে পতিত সমস্ত উল্কাপিণ্ডের প্রায় 6% । ধাতুটি ঠান্ডা বা কম তাপমাত্রায় কাজ করার সময় সুরক্ষিত থাকে এবঙ্গি এর ফলে উপাদানটির অনন্য স্ফটিক বৈশিষ্ট্য়ের ( উইডম্যানস্টাটেন সজ্জা ) কারণে এই উৎসটি প্রায়শই নিশ্চয়তার সাথে চিহ্নিত করা যায়। তারই উদাহরণস্বরূপ, ইরানে পাওয়া খ্রিস্টপূর্ব ৫ম সহস্রাব্দের একটি জপমালা [২] এবং প্রাচীন মিশর এবং সুমের খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ এর কাছাকাছি সময়ে বর্শার অগ্রভাগ এবং অলঙ্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। [১০]

এই প্রাথমিক ব্যবহারগুলি মূলত আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিকভাবে দেখা গেছে। উল্কাপিন্ড থেকে প্রাপ্ত লোহা খুব বিরল হওয়ায় ধাতুটি সম্ভবত খুব ব্যয়বহুল ছিল, এমনকি সোনার চেয়েও বেশি। প্রাগৈতিহাসিক হিত্তীয়রা খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের দিকে রাচীন এসিরিয়ান সাম্রাজ্যের সাথে লোহার তুলনায় ৪০ গুণ ওজনের রৌপ্যের সাথে লোহার বিনিময় করত।

১০০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে মেরু অঞ্চলে উল্কাপিন্ড থেকে প্রাপ্ত লোহা বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরীতে ব্যবহৃত হত, বিশেষ করে গ্রীণল্যান্ডের থিউল প্রজাতির লোকেরা কেইপ ইয়র্ক উল্কাপিন্ড থেকে হারপুন, ছুরি, উলু এবং আরও ধারালো সরঞ্জাম তৈরী করত। সাধারণত মটর আকারের ধাতুর বিটগুলিকে কক্ষ তাপমাত্রায় পিটিয়ে চাকতির মতো বানিয়ে হাড়ের হাতলের সাথে লাগানো হ্ত। [২] এই নিদর্শনগুলি মেরু অঞ্চলের অন্যান্য় লোকদের সাথে বাণিজ্য পণ্য হিসাবেও ব্যবহৃত হয়েছিল: কেপ ইয়র্ক উল্কাপিণ্ড থেকে তৈরি সরঞ্জামগুলি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির থেকে ১,০০০ মাইল (১,৬০০ কিমি) এরও বেশি দূরে পাওয়া গেছে ১,০০০ মাইল (১,৬০০ কিমি) দূরের। আমেরিকান পোলার এক্সপ্লোরার রবার্ট পেরি ১৮৯৭ সালে যখন নিউইয়র্ক সিটির আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টোরিতে উল্কাটির বৃহত্তম টুকরোটি পাঠিয়েছিলেন, তখনও এর ওজন ৩৩ টনেরও বেশি ছিল । উল্কাপিন্ড থেকে প্রাপ্ত লোহার দেরীতে ব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ হ'ল সুইডেনে পাওয়া যায় প্রায় 1000 খ্রিস্টাব্দের একটি বাটালি ।

প্রকৃতিজ লোহা[সম্পাদনা]

প্রকৃতিজ লোহা নির্দিষ্ট কিছু বেসাল্ট শিলার মধ্যে ছোট অন্তর্ভুক্তি হিসাবে কদাচিৎ পাওয়া যায়। উল্কাপূর্ণ লোহা ছাড়াও গ্রিনল্যান্ডের থিউল লোকেরা ডিস্কো অঞ্চলের প্রকৃতিজ লোহা ব্যবহার করতো। [২]

লোহার বিগলন - অক্সাইডযুক্ত লোহা আকরিক থেকে ব্যবহারযোগ্য লোহার নিষ্কাশন - টিন এবং তামা বিগলনের তুলনায় অনেক কঠিন। যেখানে এই ধাতুগুলি এবং তাদের মিশ্রণগুলি তুলনামূলকভাবে সাধারণ চুল্লিগুলিতে (যেমন মৃৎশিল্পের জন্য ব্যবহৃত ভাট্টাগুলি ) কোল্ড ওয়ার্ক করা বা বিগালিত করা যেতে পারে এবং ছাঁচে ফেলে দেওয়া যেতে পারে, সেখানে বিগালিত লোহা তৈরীতে হট-ওয়ার্কিঙ্ এর প্রয়োজন হয় এবং কেবল বিশেষভাবে নকশা করা চুল্লিগুলিতে গলানো যায়। আয়রন তামার আকরিকগুলিতে একটি সাধারণ অপদ্রব্য এবং লোহা আকরিকটি কখনও কখনও বিগালক হিসাবে ব্যবহৃত হত, সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই যে মানুষ ব্রোঞ্জ ধাতববিদ্যার কয়েক সহস্রাব্দ পরে কেবল লোহার বিগলন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছিল। [১০]

লোহার বিগলন আবিষ্কারের জন্য স্থানকাল জানা যায় না, তার একটি কারণ হতে পারে উল্কাপিন্ড থেকে প্রাপ্ত লোহা থেকে লৌহ নিকেল আকরিক থেকে নিষ্কাশিত ধাতুকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা অনেক কঠিন। [২] প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে ব্রোঞ্জ যুগে মধ্য প্রাচ্যের অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দী অবধি পেড়া লোহার নিদর্শনগুলি বিরল হয়ে রইল।

লৌহ যুগটি প্রচলিতভাবে লোহা এবং ইস্পাতযুক্ত অস্ত্র ও সরঞ্জাম দ্বারা ব্রোঞ্জের অস্ত্র এবং সরঞ্জামগুলির ব্যাপক প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়। [১১] প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে এই রূপান্তরটি বিভিন্ন সময়ে ঘটেছিল। মেসোপটেমিয়া খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ সালের মধ্যে পুরোপুরি লৌহ যুগে প্রবেশ করেছিল। যদিও মিশর লোহার নিদর্শন উৎপাদন করেছিল, খ্রিস্টপূর্ব ৬৬৩ সালে আশেরিয়ার দ্বারা বিজিত হওয়া পর্যন্ত ব্রোঞ্জ প্রাধান্য পেয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে লৌহযুগের সূচনা হয়েছিল, মধ্য ইউরোপে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে এবং চীনে ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। [১২][১৩] খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের দিকে, নুবিয়ানরা, যারা এসিরিয়ানদের কাছ থেকে লোহার ব্যবহার শেখে এবং মিশর থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, তারা প্রধান উৎপাদনকারী এবং লোহার রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছিল। [১৪]

প্রাচীন নিকট প্রাচ্য[সম্পাদনা]

প্রাচীন মধ্য প্রাচ্যের খনি অঞ্চল। বাক্সের রং: আর্সেনিক বাদামি, তামা লাল, ধূসর টিন, লালচে বাদামীতে লোহা, হলুদে সোনালি, সাদা রঙে রৌপ্য এবং কালো রঙের সীসা । হলুদ অঞ্চলটি আর্সেনিক ব্রোঞ্জের জন্য, অন্যদিকে ধূসর অঞ্চলটি টিন ব্রোঞ্জের জন্য
  1. Rehren, T (২০১৩)। "5,000 years old Egyptian iron beads made from hammered meteoritic iron" (PDF): 4785–4792। ডিওআই:10.1016/j.jas.2013.06.002 
  2. Photos, E. (১৯৮৯)। "The Question of Meteoritic versus Smelted Nickel-Rich Iron: Archaeological Evidence and Experimental Results": 403–421। জেস্টোর 124562ডিওআই:10.1080/00438243.1989.9980081  উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "ephotos" নামটি একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "ephotos" নামটি একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "ephotos" নামটি একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "ephotos" নামটি একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
  3. Jane C. Waldbaum, From Bronze to Iron: The Transition from the Bronze Age to the Iron Age in the Eastern Mediterranean (Studies in Mediterranean Archaeology, vol. LIV, 1978).
  4. Riederer, Josef; Wartke, Ralf-B.: "Iron", Cancik, Hubert; Schneider, Helmuth (eds.): Brill's New Pauly, Brill 2009
  5. Rao, Kp। "Iron Age in South India: Telangana and Andhra Pradesh" (ইংরেজি ভাষায়)। 
  6. Miller, Duncan E.; Der Merwe, N.J. Van (১৯৯৪)। "Early Metal Working in Sub-Saharan Africa: A Review of Recent Research": 1–36। ডিওআই:10.1017/s0021853700025949 
  7. Stuiver, Minze; Der Merwe, N.J. Van (১৯৬৮)। "Radiocarbon Chronology of the Iron Age in Sub-Saharan Africa": 54–58। ডিওআই:10.1086/200878 
  8. Iron and Steel in Ancient China p.408"Donald B. Wagner (১৯৯৩)। Iron and Steel in Ancient China। BRILL। পৃষ্ঠা 408। আইএসবিএন 978-90-04-09632-5 
  9. Tylecote, R. F. (১৯৯২)। A History of Metallurgy, Second Edition। Maney Publishing, for the Institute of Materials। আইএসবিএন 978-0901462886 
  10. R. F. Tylecote, A History of Metallurgy (2nd edn, 1992), 3
  11. Waldbaum, Jane C. From Bronze to Iron. Göteburg: Paul Astöms Förlag (1978): 56–58.
  12. Marco Ceccarelli (2000). International Symposium on History of Machines and Mechanisms: Proceedings HMM Symposium. Springer. আইএসবিএন ০-৭৯২৩-৬৩৭২-৮. pp 218
  13. White, W. C.: "Bronze Culture of Ancient China", p. 208. University of Toronto Press, 1956.
  14. Collins, Rober O. and Burns, James M. The History of Sub-Saharan Africa. New York:Cambridge University Press, p. 37. আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৬৮৭০৮-৯.