রিচার্ড ওয়েন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
রিচার্ড ওয়েন
Richard-owen2.jpg
জন্ম (১৮০৪-০৭-২০)২০ জুলাই ১৮০৪
ল্যাঙ্কাস্টার, ইংল্যান্ড
মৃত্যু ১৮ ডিসেম্বর ১৮৯২(১৮৯২-১২-১৮) (৮৮ বছর)
রিচমন্ড পার্ক, লন্ডন, ইংল্যান্ড
জাতীয়তা যুক্তরাজ্য
কর্মক্ষেত্র তুলনামূলক শারীরস্থান
পুরাজীববিদ্যা
প্রাণীবিজ্ঞান[১]
জীববিজ্ঞান[১]
প্রাক্তন ছাত্র এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়
সেন্ট বার্থোলোমিউ'জ হসপিটাল
পরিচিতির কারণ ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, লন্ডন
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার উওলাস্টন পদক (১৮৩৮)
রয়াল পদক (১৮৪৬)
কোপলি পদক (১৮৫১)
ক্লার্ক পদক (১৮৭৮)
লিনিয়ান পদক (১৮৮৮)

স্যার রিচার্ড ওয়েন (২০শে জুলাই ১৮০৪ - ১৮ই ডিসেম্বর ১৮৯২) ছিলেন একজন ইংরেজ জীববৈজ্ঞানিক, তুলনামূলক শারীরস্থান বিশেষজ্ঞ এবং পুরাজীববিদ। বেশ কিছু বিতর্কে জড়িত থাকা সত্ত্বেও ওয়েনকে বিশেষত জীবাশ্মের বিশ্লেষণে অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন একজন প্রকৃতি-বৈজ্ঞানিক হিসেবে মানা হয়।

ওয়েনের বৈজ্ঞানিক কর্মকান্ডের পরিধি সুবিস্তৃত হলেও প্রধানত ডাইনোসরিয়া (অর্থাৎ ভয়ঙ্কর সরীসৃপ বা ভয়ানক ও মহান সরীসৃপ) নামটির প্রচলনের জন্যই তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়া চার্লস ডারউইন-এর প্রাকৃতিক নির্বাচন মারফত বিবর্তনের তত্ত্বের প্রবল ও প্রকাশ্য বিরোধিতার জন্যেও তাঁকে মনে রাখা হয়। তিনি ডারউইনের সাথে একমত ছিলেন যে বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি বাস্তব, কিন্তু মনে করতেন ডারউইনের অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস বইতে বর্ণিত পদ্ধতির চেয়ে আসল বিবর্তন অনেক বেশি জটিল।[২] বিবর্তনীয় উন্নয়নমূলক জীববিজ্ঞান-এর সাম্প্রতিক উত্থানের পিছনে যে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাব আছে, ওয়েনকে তার জনক বলা যায়।[৩] তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাকৃতিক নমুনাসমূহের নতুন কোনো ভবনে স্থানান্তরের জন্য সচেষ্ট ছিলেন এবং এরই ফলে ১৮৮১ খ্রিঃ লন্ডনের দক্ষিণ কেনসিংটনে অধুনা-বিখ্যাত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গোড়াপত্তন হয়।[৪] বিল ব্রাইসন মন্তব্য করেছেন যে, "ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামকে একটি সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলে ওয়েন মিউজিয়াম সম্পর্কে আমাদের ধারণার মাপকাঠিটাই পালটে দিয়েছিলেন"।[৫]

জনশিক্ষা ও বিজ্ঞানের জগতে ওয়েনের অনস্বীকার্য অবদান সত্ত্বেও তাঁর তীব্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বদমেজাজ ও সাফল্য লাভের জন্য অত্যধিক দৃঢ় সংকল্পের কারণে সতীর্থ বিজ্ঞানীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর। টমাস হেনরি হাক্সলি প্রমুখ কোনো কোনো বিজ্ঞানী ওয়েনকে ভয় করতেন, এমনকি ঘৃণাও করতেন। এই সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে ওয়েন যখন ডারউইন প্রস্তাবিত বিবর্তন মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনায় ওয়েনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয় এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের অধিকাংশের সাথে তাঁর দূরত্বের সূচনা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তাঁর কর্মজীবনের শেষভাগ একাধিক বিতর্কের সাক্ষী; এমন অভিযোগও উঠেছে যে তিনি অন্যদের গবেষণার কৃতিত্ব হরণ করেছেন।

সংক্ষিপ্ত জীবনী[সম্পাদনা]

১৮০৪ খ্রিঃ ল্যাঙ্কাস্টারে ওয়েনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রিচার্ড ওয়েন (১৭৫৪ - ১৮০৯) ছিলেন পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে কর্মরত একজন ব্যবসায়ী এবং মা ক্যাথরিন প্যারিন 'হিউগনট' দের অন্যতম বংশধর। ওয়েনরা ছিলেন ছয় ভাইবোন এবং তাঁর স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন হয় ল্যাঙ্কাস্টার রয়াল গ্রামার স্কুলে। ১৮২০ খ্রিঃ একজন স্থানীয় সার্জন এবং অ্যাপোথিকারির কাছে তালিম নেন এবং ১৮২৪ খ্রিঃ এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। পরের বছরই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন এবং লন্ডনের সেন্ট বার্থোলোমিউ'জ হসপিটাল থেকে ঐ বিষয়ের পাঠ সম্পূর্ণ করেন। এখানে খ্যাতনামা সার্জন জন অ্যাবার্নেথির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে।

তরুণ রিচার্ড ওয়েন

১৮৩৫ খ্রিঃ ওয়েন সেন্ট পাংক্রাসে ক্যারোলিন আমেলিয়া ক্লিফ্ট-কে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান উইলিয়াম ওয়েন এবং আমেলিয়া নিজেও রিচার্ডের জীবদ্দশাতেই মারা যান। ১৮৯২ খ্রিঃ মৃত্যুর সময় রিচার্ড ওয়েনের উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর তিন নাতি-নাতনী এবং পুত্রবধূ এমিলি ওয়েন, যিনি রিচার্ডের উইল অনুযায়ী তাঁর সঞ্চিত ৩৩,০০০ পাউন্ড অর্থের অধিকাংশ লাভ করেন।

শিক্ষা শেষ করে রিচার্ড ওয়েন প্রথাগত চিকিৎসাশাস্ত্র অনুসারে জীবিকার খোঁজ করতে থাকেন, কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল প্রধানত শারীরস্থানিক গবেষণার ক্ষেত্রে। অ্যাবার্নেথির পরামর্শ অনুযায়ী তিনি রয়াল কলেজ অফ সার্জনসের সংরক্ষক উইলিয়াম ক্লিফটের সহকারীর পদ গ্রহণ করেন। কাজটি ওয়েনের পছন্দ হয় এবং শীঘ্রই চিকিৎসকের পেশার ভাবনা ছেড়ে দিয়ে তিনি পুরোদস্তুর বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। রয়াল কলেজ অফ সার্জনস-এর হান্টার সংগ্রহের জন্য তিনি অনেকগুলো ক্যাটালগ তৈরি করেন আর এই কাজ করতে করতেই তুলনামূলক শারীরস্থান বিষয়ে তাঁর অনন্য প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটে যার মাধ্যমে তিনি বিষয়টির সমস্ত শাখাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। বিশেষ করে তাঁর বিভিন্ন প্রকার বিলুপ্ত প্রাণীর দেহাবশেষ সংক্রান্ত গবেষণাগুলো এর ফলে সম্ভব হয়েছিল।

১৮৮১ খ্রিঃ লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ওয়েন।

১৮৩৬ খ্রিঃ ওয়েন রয়াল স্কুল অফ সার্জনস-এ হান্টার অধ্যাপকের পদে বৃত হন এবং ১৮৪৯ খ্রিঃ ক্লিফটের পর সংরক্ষকের পদটিও তাঁর দখলে আসে। ১৮৫৬ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি এই দ্বিতীয় পদটিতে বহাল ছিলেন এবং তারপর ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাকৃতিক ইতিহাস ('ন্যাচারাল হিস্ট্রি') বিভাগের সুপারইনটেন্ডেন্ট হন। এর পর তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করতে থাকেন প্রাকৃতিক ইতিহাসের একটি জাতীয় জাদুঘর নির্মাণের জন্য, যার ফলে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাকৃতিক ইতিহাসের নমুনাগুলো স্থানান্তরিত হয় দক্ষিণ কেনসিংটনের একটি ভবনে। এটিই 'ব্রিটিশ মিউজিয়াম (প্রাকৃতিক ইতিহাস)' নামে আত্মপ্রকাশ করে (অধুনা ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, লন্ডন)। ১৮৮৩ খ্রিঃ ডিসেম্বর মাসে এই কর্মকান্ড শেষ হওয়া পর্যন্ত ওয়েন পূর্বোক্ত পদে নিযুক্ত ছিলেন। অতঃপর অর্ডার অফ দ্য বাথ-এর একজন নাইট হিসেবে তাঁকে সম্মানিত করা হয়।[৬] রিচমন্ড পার্কের শীন লজ-এ তিনি তাঁর শান্ত অবসর জীবন অতিবাহিত করেন এবং সেখানেই ১৮৯২ খ্রিঃ মারা যান।

ওয়েনের কর্মজীবনে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল যে তিনি অন্যের গবেষণার কৃতিত্ব স্বীকার করতেন না, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলোকে নিজের নামে রদবদল অবধি করতেন। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বেলেমনাইট জাতীয় প্রাণীদের উপর লেখা তাঁর একটি গবেষণাপত্র, যেটির জন্য ১৮৪৬ খ্রিঃ তাঁকে রয়াল পদক দেওয়া হয়। উক্ত গবেষণাপত্রে ওয়েন উল্লেখ করেননি যে চার বছর আগে চ্যানিং পিয়ার্স নামক জনৈক শখের প্রাণীবিদ বেলেমনাইটদের আবিষ্কার করেছিলেন। এই ঘটনার ফলে যে নিন্দার সূত্রপাত হয়েছিল তার জন্য জুলজিকাল সোসাইটি অফ লন্ডন এবং রয়াল সোসাইটি থেকে তাঁকে ভোটদানের মাধ্যমে বহিষ্কার করা হয়।

ওয়েন বরাবর প্রথাগত বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা এবং সার্বিক স্থিতাবস্থার সমর্থক ছিলেন। ব্রিটিশ রাজপরিবার তাঁকে রিচমন্ড পার্কের কুটিরটি উপহার দেন এবং রবার্ট পীল তাঁর নাম সিভিল লিস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮৪৩ খ্রিঃ তিনি রয়াল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর অন্যতম বিদেশী সদস্য নির্বাচিত হন।

অমেরুদন্ডী সংক্রান্ত কাজ[সম্পাদনা]

হান্টার সংগ্রহের ক্যাটালগ নির্মাণের কাজে নিযুক্ত থাকার সময় ওয়েন ঐ কাজের পাশাপাশি নবলব্ধ প্রতিটি নমুনাকেও ব্যবচ্ছেদ করতেন। তিনি লন্ডন চিড়িয়াখানায় যে সমস্ত প্রাণীরা মারা যেত তাদের দেহ ব্যবচ্ছেদের অনুমতি পেয়েছিলেন, এবং ১৮৩১ খ্রিঃ চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে শুরু করলে ওয়েন তাতে শারীরস্থান সংক্রান্ত নিবন্ধের সবচেয়ে সক্রিয় অবদানকারীর ভূমিকা নেন। তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য নিবন্ধ মেময়্যার অন দ্য পার্লি নটিলাস (লন্ডন, ১৮৩২) শীঘ্রই বিদগ্ধ মহলে ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। এর পরবর্তী পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি তুলনামূলক শারীরস্থান এবং প্রাণীবিদ্যার সমস্ত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে থাকেন। স্পঞ্জদের জগতে ওয়েনই প্রথম "ভেনাস্ ফ্লাওয়ার বাস্কেট" বা ইউপ্লেক্টেলা প্রজাতিটির বর্ণনা দেন (১৮৪১, ১৮৫৭)। এন্টোজোয়াদের মধ্যে তাঁর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল ট্রিকিনা স্পাইরালিস (Trichina spiralis) (১৮৩৫)। এই পরজীবীটি মানুষের পেশীতে আক্রমণ করে বর্তমানে ট্রিকিনোসিস বলে কুখ্যাত রোগটির কারণ হয় (আরও দেখুন, জেমস প্যাজেট)। ব্র্যাকিওপড জাতীয় প্রাণীদের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ঐ বিষয়ে জ্ঞানের সীমানা বিস্তার করে এবং ঐ প্রাণীদের এখনও অবধি স্বীকৃত শ্রেণীবিন্যাসের পদ্ধতিটি নির্ধারণ করে দেয়। কম্বোজদের মধ্যে তিনি মুক্তোসদৃশ নটিলাস ছাড়াও স্পাইরুলা এবং অন্যান্য জীবিত ও অবলুপ্ত সেফালোপড প্রজাতিরও বর্ণনা দেন। সেফালোপোডা শ্রেণীটিকে ডাইব্র্যাঙ্কিয়াটা ও টেট্রাব্র্যাঙ্কিয়াটা এই দুই ভাগে বিভাজনের অধুনা সর্বজনগ্রাহ্য প্রস্তাবনাটিও তাঁরই দেওয়া (১৮৩২)। ১৮৫২ খ্রিঃ ওয়েন প্রোটিকনাইটস বা পৃথিবীর উপর প্রাপ্ত প্রাচীনতম পদচিহ্নের নামকরণ করেন।[৭] তাঁর শারীরস্থান বিষয়ক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ওয়েন সঠিকভাবে অনুমান করেন যে ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে সৃষ্ট এই পদচিহ্নগুলোর মালিক ছিল কোনো বিলুপ্ত সন্ধিপদী,[৮] আর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট প্রাণীটির কোনো জীবাশ্ম আবিষ্কারের ১৫০ বছরেরও বেশি আগে।[৯][১০] জীবিত সন্ধিপদী লিমুলাস কাঁকড়ার সাথে ওয়েন এই প্রাণীটির সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন ১৮৭৩ খ্রিঃ লিখিত একটি স্মৃতিকথায়।

মাছ, সরীসৃপ, পাখি ও ডাইনোসরের নামকরণ[সম্পাদনা]

১৮৫৬ খ্রিঃ রিচার্ড ওয়েন, একটি কুমিরের করোটি নিয়ে

ওয়েনের কাজকর্মের মধ্যে মেরুদন্ডী প্রাণীদের স্থান অমেরুদন্ডীদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। বাস্তবিক, জর্জ কুভিয়ারের Leçons d'anatomie comparée বইটির পর ওয়েনের কম্পারেটিভ অ্যানাটমি অ্যান্ড ফিজিওলজি অফ ভার্টিব্রেটস -ই (৩ খন্ডে; লন্ডন ১৮৬৬ - ১৮৬৮) সর্বাধিক মৌলিক গবেষণা-সমৃদ্ধ বিজ্ঞানভিত্তিক বই। জীবিত প্রাণীদের সম্বন্ধে গবেষণা করার পাশাপাশি বিলুপ্ত প্রজাতিদের উপরেও তাঁর মনোযোগ ছিল এবং এই ক্ষেত্রে তিনি মেরুদন্ডী পুরাজীববিদ্যার জনক জর্জ কুভিয়ারের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। কর্মজীবনের প্রথম ভাগে তিনি জীবিত ও বিলুপ্ত প্রাণীদের দাঁত নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করে চিত্র-অধ্যুষিত বই ওডোন্টোগ্রাফি (১৮৪০ - ১৮৪৫) প্রকাশ করেন। অবলুপ্ত প্রাণীকুল ল্যাবাইরিন্থোডন্টার নামকরণ ও দাঁতের গঠনের ব্যাখ্যা - দুইই তাঁর অবদান। মাছেদের ক্ষেত্রে আফ্রিকান লাংফিশ (যার ওয়েন-প্রদত্ত নাম প্রোটোপ্টেরাস) এর উপর তাঁর গবেষণা পরবর্তীকালে জোহান মুলারের ডিপনয় শনাক্তকরণের সহায়ক হয়। টেলিওস্টিয়ানগ্যানয়েড মাছেদের পারস্পরিক যোগসূত্র আবিষ্কার করে তিনি এদেরকে টেলিওস্টোমি নামক নতুন অধঃশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেন।

ওয়েনের সরীসৃপ সংক্রান্ত কাজগুলোর অধিকাংশই বিলুপ্ত প্রজাতিসমূহের কঙ্কালের সাথে সম্পর্কিত ছিল, আর লুপ্ত ব্রিটিশ সরীসৃপদের উপর তাঁর সুবৃহৎ রচনা হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ফসিল রেপটাইলস্ (৪ খন্ডে, লন্ডন ১৮৪৯ - ১৮৮৪) নামে পুনর্মুদ্রিত হয়। মেসোজোয়িক মহাযুগের স্থলচর সরীসৃপদের সম্পর্কে তিনি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ বর্ণনা দেন, এবং গ্রিক δεινός (দেইনস্ = "ভয়ানক, শক্তিমান, বিরাট") ও σαῦρος (সাউরোস = "টিকটিকি/গিরগিটি") শব্দ দু'টির মেলবন্ধন ঘটিয়ে ডাইনোসর কথাটির প্রবর্তন করেন। ওয়েন তিনটে গণে ভাগ করে ডাইনোসরদের বর্ণনা দেন, যথা - মাংসাশী মেগালোসরাস, শাকাহারী ইগুয়ানোডন এবং বর্মধারী হাইলিওসরাস। তিনি আদি মেসোজোয়িকের অদ্ভুত সাইন্যাপসিডদেরও প্রথম শনাক্ত করেন, যাদের সাথে উভচরস্তন্যপায়ী - উভয়েরই মিল পাওয়া যায়। এদের তিনি নামকরণ করেন 'অ্যানোমোডন্টিয়া' (স্তন্যপায়ীসদৃশ সাইন্যাপসিড বা বর্তমানে থেরাপসিডা)। এদের অধিকাংশ অবশেষই পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে, ১৮৪৫ খ্রিঃ (ডাইসাইনোডন) এবং তৎপরবর্তী সময়ে। এই নমুনাগুলোর উপর ভিত্তি করে ১৮৭৬ খ্রিঃ ওয়েন প্রকাশ করেন ক্যাটালগ অফ দ্য ফসিল রেপটিলিয়া অফ সাউথ আফ্রিকা (প্রকাশক- ব্রিটিশ মিউজিয়াম)। তাঁর পাখি সংক্রান্ত লেখালেখির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল কিউই পাখির উপর একটি অসামান্য রচনা (১৮৪০-৪৬), নিউজিল্যান্ডের বিলুপ্ত ডাইনর্নিথিডির উপর ধারাবাহিকভাবে লেখা একগুচ্ছ গবেষণাপত্র এবং অ্যাপ্টর্নিস, তাকাএ, ডোডোবৃহৎ আউক পাখির উপর আরো কিছু রচনা। ১৮৬৩ খ্রিঃ ব্যাভেরিয়ায় প্রাপ্ত দাঁতওয়ালা পাখি আর্কিওপ্টেরিক্স-এর উপর রচিত ওয়েনের মনোগ্রাফও একটি যুগান্তকারী কীর্তি।

বেঞ্জামিন ওয়াটারহাউস হকিন্স-এর সাথে যুগ্মভাবে ওয়েন ডাইনোসরদের সম্ভাব্য আকৃতি কল্পনা ও অনুসরণ করে তাদের প্রমাণ আয়তনের মূর্তি নির্মাণ করান। প্রথম কয়েকটি মূর্তি ১৮৫১ খ্রিঃ এর বৃহৎ প্রদর্শনীর জন্য নির্মীত হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে ক্রিস্টাল প্যালেস দক্ষিণ লন্ডনের সিডেনহ্যামে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় আরও ৩৩ টা বানানো হয়। ১৮৫৩ খ্রিঃ নিউ ইয়ার্স ঈভ-এর সময় ওয়েন একটি ফাঁপা কংক্রিটের ইগুয়ানোডনের মূর্তির পেটের ভিতর ২১ জন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিককে নিয়ে এক ভোজসভার আয়োজন করেন। ১৮৪৯ খ্রিঃ গিডিয়ন ম্যান্টেল বুঝতে পেরেছিলেন যে ইগুয়ানোডন প্রকৃতপক্ষে ওয়েনের কল্পনানুসারী স্থূল ও স্থবির জানোয়ার ছিল না,[১১] কিন্তু ক্রিস্টাল প্যালেসের মূর্তিগুলো তৈরি হওয়ার আগেই ম্যান্টেলের মৃত্যু হওয়ায় মূর্তিগুলো ওয়েনের ভুল ধারণা অনুসারেই তৈরি হয়েছিল। ইস্পাত ও ইঁটের কাঠামোর উপর কংক্রিট জমিয়ে প্রায় দুই ডজন প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মূর্তি নির্মাণ করিয়েছিলেন ওয়েন, যার মধ্যে একটা বিশ্রামরত আর একটা দাঁড়িয়ে থাকা ইগুয়ানোডনও ছিল।

স্তন্যপায়ী সংক্রান্ত কাজ[সম্পাদনা]

ওয়েনের আঁকা উটের কঙ্কালের চিত্র

লন্ডন চিড়িয়াখানার সমস্ত সদ্যমৃত প্রাণীর দেহের উপর ওয়েন গবেষণা চালানোর অধিকার পেয়েছিলেন। একবার তাঁর স্ত্রী বাড়ি ফিরে দেখেন সামনের হলঘরে একটি মৃত গন্ডারের দেহ রাখা রয়েছে।[১২]

জীবন্ত প্রাণীদের মধ্যে ওয়েনের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আছে হংসচঞ্চু, মারসুপিয়াল এবং নরবানরদের উপর। ১৮৪৮ খ্রিঃ কতকগুলি জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করার সময় তিনিই প্রথম আনগুলেট বা খুরওয়ালা তৃণভোজীদের প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করেন, যথা— পেরিসোড্যাক্টাইলা এবং আর্টিওড্যাক্টাইলা। ওয়েনের স্তন্যপায়ী সংক্রান্ত অধিকাংশ রচনাই অবশ্য মৃত প্রজাতিগুলোর উপর মনোযোগী, এবং এই বিষয়ে তাঁর আগ্রহের সম্ভাব্য কারণ ছিল দক্ষিণ আমেরিকা থেকে চার্লস ডারউইনের আনীত জীবাশ্মের বিচিত্র সংগ্রহ। পম্পাস তৃণভূমি থেকে প্রাপ্ত টক্সোডন ছিল বিলুপ্ত খুরওয়ালা একটি পরিবারের সাক্ষ্য প্রমাণ। ইঁদুর, ইডেনটাটা এবং তৃণভোজী সিটাসিয়াদের সাথে এর সাদৃশ্য আছে। দক্ষিণ আমেরিকার বিলুপ্ত স্তন্যপায়ীদের উপর ওয়েনের আগ্রহের ফলে এক প্রকার দৈত্যাকার আর্মাডিলোর আবিষ্কার সম্ভব হয়। ওয়েন প্রাণীটির নাম রাখেন গ্লিপ্টোডন (১৮৩৯)। এছাড়া দৈত্যাকার স্থলচর স্লথ মাইলোডন (১৮৪২) এবং মেগাথেরিয়ামের (১৮৬০) উপরেও তাঁর নিবন্ধগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৮৬৩ খ্রিঃ ওয়েন প্রথম নকল খুনে তিমির বর্ণনা দেন।

একই সময় টমাস মিচেল অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস-এ প্রচুর জীবাশ্মীভূত হাড়ের সন্ধান পান, যার উপর ভিত্তি করে ওয়েন দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার বিলুপ্ত স্তন্যপায়ীদের উপর অনেকগুলো গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন। ১৮৭৭ খ্রিঃ এই সমস্ত প্রবন্ধ একখানি অখন্ড বইয়ের আকারে প্রকাশিত হয়। বিশালকায় বিলুপ্ত ক্যাঙ্গারুউওমব্যাট ছাড়াও তিনি ডাইপ্রোটোডন (১৮৩৮) এবং থাইলাকোলিও (১৮৫৯) প্রাণীগুলোর আবিষ্কর্তা হিসেবে গণ্য হন। এই বিপুল পরিমাণ বিদেশী নমুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ওয়েন একই সাথে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের জীবাশ্মসমূহের উপরেও গবেষণা চালাচ্ছিলেন, আর ১৮৪৪-৪৬ খ্রিঃ এর ফলস্বরূপ প্রকাশিত হয় হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ফসিল ম্যামালস অ্যান্ড বার্ডস। এর পর ক্রমশ মনোগ্রাফ অফ দ্য ফসিল ম্যামালিয়া অফ দ্য মেসোজোয়িক ফর্মেশনস (প্যালিঅন্টোলজিকাল সোসাইটি, ১৮৭১) প্রভৃতি টীকা ও প্রবন্ধ পৃথকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর সর্বশেষ প্রপকাশনাগুলোর মধ্যে একটা হল অ্যান্টিকুইটি অফ ম্যান অ্যাজ ডিডিউসড ফ্রম দ্য ডিসকভারি অফ আ হিউম্যান স্কেলিটন ডিউরিং এক্সক্যাভেশনস অফ দ্য ডক্স অ্যাট টিলবারি (লন্ডন, ১৮৮৪) নামের ছোট মাপের একটা নিবন্ধ।

ওয়েন, ডারউইন এবং বিবর্তন মতবাদ[সম্পাদনা]

একটা দৈত্যাকার মোয়া পাখির কঙ্কালের সাথে ওয়েন

এইচএমএস বিগ্‌লের দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার পর চার্লস ডারউইন-এর নমুনার সংগ্রহ যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছিল। এই সময়, ১৮৩৬ খ্রিঃ ২৯ শে অক্টোবর চার্লস লিয়েল তাঁর সাথে রিচার্ড ওয়েনের পরিচয় করিয়ে দেন। ওয়েন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সংগৃহীত জীবাশ্মের উপর গবেষণা করতে সম্মত হন। ডারউইন প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন যে ঐ অঞ্চলের বর্তমান বাসিন্দা ক্ষুদ্রাকার ইঁদুর ও স্লথ জাতীয় প্রাণীরা তাদের আফ্রিকাবাসী বৃহদাকার বিলুপ্ত সংস্করণসমূহের উত্তরসূরী। কিন্তু ওয়েনের গবেষণার ফলে বোঝা যায় যে ডারউইনের সংগৃহীত হাড়গুলো ঐ একই প্রকার প্রাণীদেহের, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকাতেও আলাদাভাবে দৈত্যাকার স্লথ ও ইঁদুর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিবর্তন কাজ করেছে এবং ডারউইনের প্রাথমিক ধারণা ভুল। বেশ কিছু ক্ষেত্রে এইভাবে ওয়েন কর্তৃক সংশোধিত হয়ে ডারউইন তাঁর প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বে উপনীত হতে পেরেছিলেন।

এই সময়ে ওয়েন জোহানেস পিটার মুলার-এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হন এবং একটি নতুন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে থাকেন যে সজীব পদার্থের মধ্যে এক রকম অন্তর্নিহিত "সংগঠক শক্তি" কাজ করে যা কলাকোশের বৃদ্ধি থেকে শুরু করে একক জীব তথা প্রজাতিসমূহেরও আয়ুষ্কাল নির্ধারণের জন্য দায়ী। অন্যদিকে ১৮৩৮ খ্রিঃ ১৯ শে ডিসেম্বর জিওলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন-এর সেক্রেটারি ওয়েন তাঁর বন্ধুদের সাথে ল্যামার্ক কর্তৃক প্রচারিত রবার্ট এডমন্ড গ্রান্ট-এর কিছু তত্ত্বের পরিশোধিত সংস্করণের তীব্র সমালোচনা করেন। গ্রান্ট ছিলেন ডারউইনের শিক্ষক, ফলে গ্রান্টের তত্ত্বের অবমাননা তাঁকে নিজের মতামত সম্পর্কে কুন্ঠিত করেছিল। ১৮৪১ খ্রিঃ সদ্যবিবাহিত ডারউইন অসুস্থ থাকার সময় তাঁর বৈজ্ঞানিক বন্ধুদের যে অল্প কয়েকজন সংবাদ নিতে যান, ওয়েন ছিলেন তাঁদের একজন; যদিও প্রজাতির পরা-পরিব্যক্তি (Transmutation of Species) সংক্রান্ত যে কোনো আলোচনায় ওয়েনের প্রকাশ্য অনীহা ডারউইনকে তাঁর তত্ত্ব প্রকাশ থেকে বিরত রেখেছিল।

১৮৪০ এর দশকের কোনো একটা সময়ে ওয়েন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে প্রজাতির উদ্ভবের পিছনে কোনো বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার প্রভাব আছে।[১৩] তিনি ধারণা করেছিলেন ছয়টি সম্ভাব্য পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়— অপুংজনি, দীর্ঘায়িত বিকাশকাল, অপরিণত ভ্রূণের জন্ম, গঠনের বংশগত ত্রুটি, ল্যামার্কীয় অপুষ্টি, ল্যামার্কীয় অতিপুষ্টি এবং পরা-পরিব্যক্তি,[১৪] এবং এগুলোর মধ্যে পরা-পরিব্যক্তির সম্ভাবনাই তিনি সবচেয়ে কম মনে করতেন।[১৪] বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ইভলিন রিচার্ডস সওয়াল করেছেন যে ওয়েন প্রকৃতপক্ষে বিবর্তনের ক্রমিক উন্নয়নমূলক প্রক্রিয়ার সমর্থক ছিলেন, কিন্তু ঐ মতের উপর ১৮৪৪ খ্রিঃ প্রকাশিত অজ্ঞাত এক লেখকের রচিত বই ভেস্টিজেস অফ দ্য ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ ক্রিয়েশন বহুনিন্দিত হওয়ার পর সে'কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করা থেকে বিরত হন (পরে জানা যায় বইটির লেখক ছিলেন রবার্ট চেম্বার্স)। ওয়েন নিজে ১৮৪৯ খ্রিঃ তাঁর নিবন্ধ নেচার অফ দ্য লিম্বস প্রকাশের সময় বিবর্তনমুখী মতামত প্রকাশের জন্য সমালোচিত হন।[১৫] উক্ত নিবন্ধের শেষভাগে তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন যে মাছ থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে মানুষের আবির্ভাব হয়েছে।[১৬] তাঁর সমালোচক পত্রিকা ম্যাঞ্চেস্টার স্পেক্টেটরের বক্তব্য ছিল এই মতের মাধ্যমে ওয়েন অস্বীকার করেছেন যে মানুষ আসলে ঈশ্বরের সৃষ্টি।[১৭]

ডারউইনের তত্ত্বের ক্রমোন্নয়নের সময় ১৮৪৯ খ্রিঃ বার্নাকল-দের উপর তাঁর গবেষণার ফলে বোঝা যায় তাদের দেহখণ্ডকগুলো অন্যান্য ক্রাস্টেশিয়ানদের থেকেই বিবর্তনের ধারায় আলাদা হয়ে গেছে। ডারউইন এবং ওয়েন উভয়ের কাছেই তুলনামূলক শারীরস্থানের এই সামঞ্জস্য বিবর্তনীয় উত্তরাধিকারের প্রমাণ রূপে প্রতিভাত হয়। ওয়েন ঘোড়ার ক্রমবিবর্তনের একটি জীবাশ্মভিত্তিক নিবেদন পেশ করেন এবং এইভাবে তাঁর "সুনির্দিষ্ট ক্রমপরিণতি" মতবাদের সপক্ষে যুক্তি দেন। ১৮৫৪ খ্রিঃ ওয়েন ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স-এ সদ্য আবিষ্কৃত গোরিলা প্রভৃতি 'পাশবিক' নরবানরের দু'পায়ে দাঁড়ানো ও মানুষে বিবর্তনের অসম্ভাব্যতার উপর বক্তৃতা দেন, কিন্তু মানুষ যে অন্যান্য নরবানর থেকে পরা-পরিব্যক্তি ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছে, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। অপরদিকে চরমপন্থী শ্রমিক সংগঠন প্রভৃতিরা মানুষের 'বাঁদুরে উৎস' সম্বন্ধে অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে উঠেছিল। এই সমস্ত ধারণাকে চূর্ণ করতে ওয়েন রয়াল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে প্রাইমেটদের মস্তিষ্কের উপর তাঁর আনুষ্ঠানিক গবেষণার ফল প্রকাশ করে বলেন যে মানুষের মস্তিষ্কের বেশ কিছু গঠনগত বৈশিষ্ট্য অন্য প্রাইমেটদের মস্তিষ্কে নেই, এবং সেইসূত্রে মানুষ একটা আলাদা অধঃশ্রেণীর অন্তর্গত। এই ঘোষণার ফলে একটি বিতর্কের সূত্রপাত হয় যা পরবর্তীকালে "দ্য গ্রেট হিপোক্যাম্পাস কোয়েশ্চন" হিসেবে তীব্র বিদ্রূপের সম্মুখীন হয়েছিল। ওয়েনের মূল বক্তব্য ছিল এই যে, অন্য নরবানর এবং অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষের মস্তিষ্ক ও অবশিষ্ট দেহের আয়তনের অনুপাত অনেক বেশি।[১৮] ডারউইন লেখেন, "মানুষ যে শিম্পাঞ্জির থেকে [অতটা] আলাদা এটা আমি মানতে পারি না"। ওয়েনের বিরোধী টমাস হেনরি হাক্সলি তাঁর ১৮৫৮ খ্রিঃ মার্চ মাসে রয়াল ইন্সটিটিউশনে প্রদত্ত বক্তৃতায় ওয়েনের বক্তব্য খন্ডন করে বলেন যে গঠনগত দিক থেকে গোরিলারা মানুষের যতটা কাছাকাছি বেবুনেরও ঠিক ততটাই। তিনি বিশ্বাস করতেন যে "প্রকৃতপক্ষে, মানসিক এবং নৈতিক গুণাবলী... আমাদের মধ্যে যে মাত্রায় আছে, অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও ঠিক তাই"। এই কথা ছিল ঐ একই স্থানে ওয়েনের উত্থাপিত মানুষের অসাধারণত্বের দাবির ঠিক বিপরীত।

১৮৪৭ খ্রিঃ ওয়েন অঙ্কিত এই রেখাচিত্রটি সমস্ত মেরুদন্ডীর মূল গঠন সম্পর্কে তাঁর ধারণা স্পষ্ট করে

অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস-এ ডারউইনের তত্ত্ব প্রকাশিত হওয়ার পর বইটির লেখক ওয়েনের কাছে একটি নোট পাঠান যেখানে এই তত্ত্ব সম্বন্ধে লেখা ছিল "ব্যাপারটাকে ঘৃণ্য মনে হতে পারে"। ওয়েন দ্রুত সাড়া দিয়ে যথাযথ ভদ্রতা সহকারে লেখেন যে তিনি দীর্ঘকাল যাবৎ বিশ্বাস করেন "উপস্থিত প্রভাবক" সমূহের দ্বারাই প্রজাতির "পরিকল্পিত" অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে। এরপর ডারউইন ওয়েনের সাথে দীর্ঘ কথোপকথনে অংশগ্রহণ করেন এবং ওয়েন জানান যে ডারউইনের বইতেই "প্রজাতির উৎপত্তির প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আজ অবধি প্রকাশিত" সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যদিও তাঁর মনে এই সংশয় তখনও ছিল যে পরা-পরিব্যক্তির তত্ত্ব মানুষকে পাশবিক বলে চিহ্নিত করবে। সম্ভবত ডারউইন ওয়েনকে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে তিনি গোটা ব্যাপারটাকে পূর্বনির্ধারিত কোনো 'নকশার' ফল হিসেবে দেখছেন। ওয়েন এই কথাকে "সৃষ্টিকারী শক্তি"র প্রতি তাঁদের দু'জনের সাধারণ বিশ্বাসের সূচক হিসেবে অনুবাদ করেন।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাকৃতিক ইতিহাসের সংগ্রহের প্রধান থাকার সময় ওয়েন অরিজিন- এর উপর অজস্র প্রশ্ন ও অভিযোগমূলক চিঠি পান। এই সময় ঐ ব্যাপারে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত সম্পর্কে যদিও কিছু জানা যায় না। সংসদীয় একটি কমিটির সামনে প্রাকৃতিক ইতিহাসের আলাদা জাদুঘরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য রাখার সময় তিনি খেয়াল করিয়ে দেন: "গোটা বুদ্ধিজীবী মহল এই বছর প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কিত একটা বই নিয়ে আলোড়িত হয়ে আছে; আর তার ফলে কী হচ্ছে? দর্শকেরা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আসেন আর বলেন, 'আমাদের এইসব পায়রাগুলো দেখান। টাম্বলার কোথায়? পাউটার কোথায়?' আর আমি লজ্জা সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হই, আমি আপনাদের ওগুলোর কোনোটাই দেখাতে পারব না।"... "আপনাদের ওইসব প্রজাতির নমুনা দেখানোর ক্ষেত্রে, বা এমন কোনোরকম সাহায্যের ক্ষেত্রে যা সমস্ত রহস্যের গূঢ়তম রহস্য তথা প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারবে — এরকম স্থান বা পরিকাঠামো আমাদের নেই; কিন্তু অবশ্যই এরকম জায়গার প্রয়োজন আছে, আর ব্রিটিশ মিউজিয়াম ছাড়া আর কোথায়ই বা তেমন উপযুক্ত স্থান পাওয়া যাবে?"

অবশ্য হাক্সলির আক্রমণাত্মক মনোভাবের ফলও ফলতে শুরু করেছিল। ১৮৬০ খ্রিঃ এপ্রিল মাসে এডিনবরা রিভিউ পত্রিকায় অরিজিন বইটির উপর ওয়েনের লেখা কিন্তু লেখক-পরিচয়বিহীন একটি রিভিউ প্রকাশিত হয়। এখানে ওয়েন ক্রুদ্ধভাবে বইটির বিরুদ্ধে সৃষ্টিতত্ত্বের অবমাননার অভিযোগ আনেন; সেইসঙ্গে ডারউইন যে ওয়েনের "সজীব উপাদানের পূর্বনির্ধারিত ক্রমপরিণতির নিরন্তর প্রক্রিয়াকে" পুরোপুরি অবজ্ঞা করেছেন সেই কারণেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এছাড়া ডারউইনের "শিষ্য" হুকার ও হাক্সলিকেও একহাত নিয়ে বলেন তাঁদের কার্যকলাপ তাঁদের "অদূরদর্শী আনুগত্যের" পরিচায়ক, এবং আলোচনাধীন বইটি "বিজ্ঞানের সেই রকম অপব্যবহারের দ্যোতক ... যার কবলে পড়ে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে সাময়িকভাবে তাদের মর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়েছিল"। এখানে ওয়েন ফরাসি বিপ্লবের প্রসঙ্গ এনেছেন। ডারউইনের কাছে এই রিভিউ "হিংসুক, চূড়ান্ত অসূয়াপ্রসূত, ধূর্ত, এবং ... ক্ষতিকারক" রূপে প্রতিভাত হয় এবং পরবর্তীকালে তিনি বলেন, "লন্ডনবাসীরা বলে যে আমার বই নিয়ে লোকে আলোচনা করে বলে ও (ওয়েন) নাকি হিংসায় পাগল হয়ে গেছে। ওয়েন আমায় যেরকম প্রবলভাবে ঘৃণা করে তেমনভাবে কারো দ্বারা ঘৃণিত হওয়া পীড়াদায়ক"।

ডারউইনের তত্ত্বের প্রতিক্রিয়ার সময় হাক্সলি ও ওয়েনের বাগ্‌যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। ওয়েন হাক্সলির বদনাম করার চেষ্টা করেন তাঁকে "পরিবর্তিত নরবানর থেকে মানুষের উদ্ভবের তত্ত্বের সমর্থক" হিসেবে চিহ্নিত করে। এথিনিয়াম-এ হাক্সলির একটি রচনার শিরোনাম ছিল 'এপ অরিজিন অফ ম্যান অ্যাজ টেস্টেড বাই দ্য ব্রেইন' (মস্তিষ্কের দ্বারা পরীক্ষিত মানুষের বাঁদর-উৎস)। ১৮৬২ খ্রিঃ (আর অন্যান্য সময়ে) হাক্সলি নরবানরের মস্তিষ্কের ব্যবচ্ছেদ এবং প্রদর্শনের একাধিক ব্যবস্থা করেন (যেমন বিএ মিটিং-এ অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালা যেখানে উইলিয়াম হেনরি ফ্লাওয়ার ব্যবচ্ছেদের কাজটি করেছিলেন)। তথাকথিত 'অনুপস্থিত অঙ্গ' সমূহের উপস্থিতির চাক্ষুষ প্রমাণ (হিপোক্যাম্পাস মাইনর ইত্যাদি) কার্যত ওয়েনের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ আনার কাজে ব্যবহৃত হয়। ওয়েন বলেছিলেন যে নরবানরদের মস্তিষ্কে উক্ত গঠনগুলোর অনুপস্থিতিই মানুষের সাথে তাদের পার্থক্যের প্রধান কারণ। হাক্সলির ব্যবচ্ছেদের পরেও তিনি শুধু স্বীকার করেন যে গঠনগুলো যদিও অপরিণত বা অনুন্নত রূপে নরবানরদের মস্তিষ্কে থাকতে পারে, তাও মানুষ ও নরবানরের পার্থক্যের প্রধান নির্ণায়ক মস্তিষ্কেরই আয়তন।[১৯] হাক্সলি দুই বছর ধরে প্রচারকার্য চালান এবং ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। প্রতিটা কর্মশালার পর আরও বেশি সংখ্যক বিজ্ঞানী ডারউইনের তত্ত্বের সমর্থনে এগিয়ে আসতে থাকেন এবং সাধারণভাবে বিজ্ঞান জগৎ ঐ তত্ত্বের সমর্থক হয়ে ওঠে। ওয়েন বলেছিলেন মানুষ বড় মস্তিষ্কের কারণে নরবানরদের থেকে আলাদা, কিন্তু হাক্সলি বলেন মানুষের নিজেদের জাতিগত বৈচিত্র্যের তুলনায় ঐ পার্থক্য নগন্য। ওয়েনের সমালোচনামূলক একটি গবেষণাপত্রে হাক্সলি সরাসরি লেখেন, "আমরা যদি ক অর্থাৎ ইউরোপীয় মগজ, খ অর্থাৎ বসজেসম্যান মগজ এবং গ অর্থাৎ ওরাং-ওটান মগজ পাশাপাশি সাজিয়ে রাখি, তাহলে ক আর খ এর মধ্যে যতটা পার্থক্য আজ অবধি বোঝা গেছে, খ আর গ এর মধ্যেও ঠিক সেরকম"।[২০] ওয়েন এর উত্তর হিসেবে বলেন যে প্রকৃতপক্ষে মানুষের বিভিন্ন জাতির মস্তিষ্ক একই রকম আয়তন ও ক্ষমতাবান, আর মানুষের মস্তিষ্ক যে গোরিলা প্রভৃতি অন্যান্য নরবানরের মস্তিষ্কের দ্বিগুণ বড় - গোরিলার দেহ মানুষের চেয়ে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও - এই ব্যাপারটাই মানুষকে আলাদা করতে সক্ষম।[২১] ১৮৬১ খ্রিঃ হাক্সলি জুলজিকাল সোসাইটি কাউন্সিলে যোগদান করলে ওয়েন সংস্থাটি থেকে বেরিয়ে যান, আর পরের বছর হাক্সলি ওয়েনের বিরুদ্ধে "ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচারের" অভিযোগ এনে তাঁর রয়াল সোসাইটিতে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা শেষ করেন (আরও দেখুন; টমাস হেনরি হাক্সলি)।

১৮৬৩ খ্রিঃ ওয়েন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের আর্কিওপ্টেরিক্স জীবাশ্মটি কেনেন। এই জীবাশ্মটি ডারউইনের ভবিষ্যদ্বাণী সফল করে প্রমাণ করে যে ডানায় অব্যবহারযোগ্য আঙুলবিশিষ্ট আদিম পাখির খোঁজ একদিন পাওয়া যাবে। যদিও ওয়েন নিজে এটিকে স্রেফ পাখি বলেই ঘোষণা করেছিলেন।

ওয়েন ও ডারউইনের সমর্থকদের বিবাদ চলতেই থাকে। ১৮৭১ খ্রিঃ ওয়েন কিউ-তে অবস্থিত জোসেফ ডালটন হুকার-এর উদ্ভিদবিদ্যা-সংগ্রহশালাটির সরকারি সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিতে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ওয়েন সম্ভবত প্রতিষ্ঠানটিকে তাঁর ব্রিটিশ মিউজিয়ামের আওতায় আনার চেষ্টা করছিলেন। ডারউইন এর পর মন্তব্য করেন, "আমি ওয়েনকে ঘৃণা করি বলে লজ্জা পেতাম, কিন্তু এবার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ঘৃণা আমি যত্ন করে পালন করব"।

উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

নাতনী এমিলির সঙ্গে ওয়েন

ওয়েনের সুবিস্তারিত স্মৃতিকথা আর বর্ণনামূলক রচনাগুলো পড়তে গেলে প্রখর মনঃসংযোগের দরকার হয়। তাঁর ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো জটিল, আর অভিব্যক্তিগুলো আপাত-দ্ব্যর্থবোধক। সাধারণভাবে তিনি যে পরিভাষাগুলোর প্রচলন করেছিলেন তাদের মধ্যে খুব কমই বর্তমান বিজ্ঞানীরা গ্রহণ করেছেন; নাহলে তাদের স্বীকৃতি আরও ব্যাপক হত। এর সাথেই অবশ্য এ'কথাও মনে রাখা দরকার যে নিখুঁত শারীরস্থানিক নামকরণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ। বিশেষ করে তাঁর প্রবর্তিত মেরুদন্ডী প্রাণীদের কঙ্কাল সংক্রান্ত পরিভাষাগুলো একটা স্পষ্ট ও সুসংবদ্ধ দার্শনিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এর ফলেই প্রথমবার তিনি সমবৃত্তীয়সমসংস্থ অঙ্গের পার্থক্য নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। ওয়েনের 'আর্কেটাইপ' বা আদিরূপ ও বিভিন্ন মেরুদন্ডী কঙ্কালের সাদৃশ্য সংক্রান্ত একটা তত্ত্ব (১৮৪৮) ছিল। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে লেখা ছোট বই অন দ্য নেচার অফ লিম্বস্ (১৮৪৯)-এ তিনি মেরুদন্ডী প্রাণীদেহের বুনিয়াদী কাঠামোকে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্যের যোগফল হিসেবে বর্ণনা করেন, যেগুলো মূলগতভাবে সমস্ত মেরুদন্ডী প্রজাতির দেহেই এক। বিভিন্ন পরিবেশ ও বিভিন্ন ধরণের কার্যকারিতার প্রয়োজনে অঙ্গগুলো আলাদা আলাদা প্রাণীদেহে আলাদা আকার পায়। ভ্রূণবিদ্যা শাস্ত্রটিকে ওয়েন এই তত্ত্বের প্রবর্তনের সময় উপেক্ষা করেছিলেন, এবং পরবর্তীকালে ভ্রূণবিদ্যার পরীক্ষায় এই তত্ত্বের অধিকাংশই ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু এটির আবিষ্কারের সময় কয়েকটি নিখাদ সত্যের এই ত্রুটিপূর্ণ ও বিকৃত বিবরণেরও একরকম বিশিষ্টতা ছিল বলা যায়।

জীববৈজ্ঞানিক দর্শনের গভীরতর সমস্যাগুলোর আলোচনায় ওয়েনের প্রত্যক্ষ ও নির্দিষ্ট অবদানের পরিমাণ প্রায় শূণ্য। তাঁর সাধারণ তত্ত্বগুলোর প্রয়োগ কেবল তুলনামূলক শারীরস্থান, কার্যকারিতার জন্য অভিযোজন ও ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক পার্থক্য - এই ক্ষেত্রগুলোয় সীমাবদ্ধ। যদিও ১৮৪৯ খ্রিঃ প্রকাশিত অপুংজনি বা পার্থেনোজেনেসিসের উপর তাঁর বক্তৃতায় আধুনিক জার্ম প্লাজম মতবাদ-এর বীজ নিহিত ছিল, যা পরবর্তীকালে অগুস্ত ওয়াইজম্যান কর্তৃক প্রতিষ্ঠা পায়। এছাড়া ওয়েন প্রাণীদের গণ ও প্রজাতিসমূহের ভূতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার আর তাদের এক গোষ্ঠী থেকে আরেক গোষ্ঠীর ক্রমপরিবর্তন সম্পর্কেও অনেক ভাসা ভাসা মন্তব্য করেছিলেন। বিশেষ করে তিনি কুমির (১৮৮৪) আর ঘোড়ার (১৮৬৮) বিভিন্ন পূর্বপুরুষের জীবাশ্মে দৃষ্ট ক্রমপরিবর্তনের চিহ্নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু সাধারণভাবে জৈব বিবর্তন তত্ত্বের ঠিক কতখানি ওয়েন স্বীকার করতেন সেই সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তাঁর বক্তব্য ছিল শুধু এই যে "এখন থেকে জীবনের নিয়ন্ত্রক সূত্রগুলির প্রকৃতি ও কর্মপদ্ধতির ব্যাখ্যার আরোহ-ভিত্তিক অনুসন্ধানই হবে প্রকৃতি-বিজ্ঞানীর মহান লক্ষ্য"।

ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, লন্ডন-এর প্রথম পরিচালক ছিলেন ওয়েন। সেখানকার প্রধান হলঘরে তাঁর মূর্তি রাখা ছিল ২০০৯ খ্রিঃ পর্যন্ত। ঐ বছর ডারউইনের একটি মূর্তি তাঁর মূর্তিটিকে প্রতিস্থাপিত করে।

অ্যালফ্রেড গিলবার্ট নির্মিত ওয়েনের একটি আবক্ষমূর্তি (১৮৯৬) হান্টারিয়ান মিউজিয়ামে রাখা আছে।

সতীর্থদের সাথে বিতর্ক[সম্পাদনা]

ওয়েন: শ্রেষ্ঠ স্বনামধন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীবিদ এবং পুরাজীববিদ... কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে চূড়ান্ত প্রতারক ও ঘৃণ্য।

চার্লস ডারউইন: আ কম্প্যানিয়ন বইতে রিচার্ড ব্রোক ফ্রিম্যান, ১৯৭৮

কেউ কেউ ওয়েনকে কুটিল, অসৎ ও ঘৃণ্য এক ব্যক্তি রূপে বর্ণনা করেছেন। একটি জীবনীতে তাঁকে "ধর্ষকাম ও বিতর্কে আসক্ত এক সমাজ-গবেষক" বলা হয়েছে, "ঔদ্ধত্য ও ঈর্ষা ছিল যাঁর প্রধান চালিকাশক্তি"। ডেবোরা ক্যাডবেরি বলেছেন যে "একরকম আগ্রাসী অহঙ্কার ছিল ওয়েনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আর ছিল সমালোচকদের ছিন্নভিন্ন করে তাঁর একরকম নিকৃষ্ট আনন্দলাভ।" বাস্তবিক, অক্সফোর্ডের জনৈক অধ্যাপক ওয়েনকে একবার "ডাহা মিথ্যুক" বলেছিলেন, যিনি "ভগবানের নামে আর স্বভাবজ কুটিলতা থেকে মিথ্যে বলেন"।[২২] গিডিয়ন ম্যান্টেল বলেন, "এমন মেধাবী একজন লোক যে এত নীচ আর হিংসুক হতে পারে এটা খুবই দুঃখজনক।"

এটাই ওয়েনের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক...যে ওঁর একজনও প্রিয় ছাত্র বা অনুসারী ছিল না।

অ্যাসা গ্রের প্রতি চার্লস ডারউইন, ১৮৬০, মোর লেটার্স অফ সি.ডি., পৃঃ ১৫৩

ওয়েন জর্জ কুভিয়ারের সাথে ইগুয়ানোডন আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ভাগ করে নেন, এবং প্রাণীটির প্রকৃত আবিষ্কর্তা গিডিয়ন ম্যান্টেলের উল্লেখ পর্যন্ত করেননি। অন্যের আবিষ্কারকে নিজের বলে চালানোর কাজ অবশ্য ওয়েন এর আগে ও পরেও অনেকবার করেছিলেন। আ শর্ট হিস্ট্রি অফ নিয়ারলি এভরিথিং বইতে বিল ব্রাইসন এবং অন্যত্র অন্য কোনো কোনো লেখকও বলেছেন যে ওয়েন রয়াল সোসাইটি-তে নিজের প্রভাব খাটিয়ে গিডিয়ন ম্যান্টেলের অনেক গবেষণাপত্রের প্রকাশ রুখে দিয়েছিলেন। অন্যের লেখা নিজের বলে চালানোর অভিযোগে শেষ পর্যন্ত তাঁকে রয়াল সোসাইটির প্রাণীবিদ্যা সংসদ থেকে বিতাড়িত হতে হয়।

নিজের "শখের সওয়ার" হয়ে ওয়েন, ফ্রেডেরিক ওয়্যাডি অঙ্কিত ক্যারিকেচার, ১৮৭৩।

একটি দুর্ঘটনার ফলে ম্যান্টেল স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লে ওয়েন ম্যান্টেলের দ্বারা ইতোমধ্যেই আবিষ্কৃত ও নামাঙ্কিত অনেকগুলো ডাইনোসরের পুনর্নামকরণ করেন, এমনকি এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব পর্যন্ত নিজে দাবি করার ধৃষ্টতা দেখান। ১৮৫২ খ্রিঃ ম্যান্টেলের মৃত্যুর পর একটি অনামা স্মারক-লেখনিতে তাঁকে মাঝারি মানের এক বিজ্ঞানী বলে অসম্মান করা হয়, আর বলা হয় তিনি কর্মক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্বের সমস্ত ভূবিজ্ঞানী নিঃসংশয় ছিলেন যে এই লেখার লেখক স্বয়ং ওয়েন। জিওলজিকাল সোসাইটির অধিকর্তা জানান, লেখাটির মধ্যে "লেখকের মনের দুঃখজনক শীতলতার" প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে ম্যান্টেলের বিরুদ্ধে তাঁর নিয়মিত ও তীক্ষ্‌ণ বিষোদ্গারের কারণে ওয়েনকে সোসাইটি থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়।

ম্যান্টেলের কাজের বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদির প্রতি ওয়েনের উপেক্ষাও ছিল বিস্ময়কর। যেমন, পর্যাপ্ত নমুনার অভাব থাকা সত্ত্বেও ম্যান্টেল নিরূপণ করতে পেরেছিলেন যে ইগুয়ানোডন সমেত কোনো কোনো ডাইনোসর ছিল দ্বিপদ। এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটিকে ওয়েন পুরোপুরি উপেক্ষা করেন, আর ক্রিস্টাল প্যালেসের বাগানে ইগুয়ানোডনের মূর্তি নির্মাণের সময় ওয়েনের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী বেঞ্জামিন ওয়াটারহাউস হকিন্স প্রাণীগুলোর চেহারা বানান স্থূল, চতুষ্পদ আর ভুলভাবে শনাক্ত করা 'বুড়ো আঙুল' টাকে নাকের উপর বসিয়ে। ১৮৭৮ খ্রিঃ বেলজিয়ামের কয়লাখনি থেকে প্রাপ্ত ইগুয়ানোডনের কঙ্কালে যখন দ্বিপদী গঠনের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে, ম্যান্টেল তখন বেঁচে নেই। ঐ কঙ্কাল থেকে আরও বোঝা যায় যে দ্বিপদ অবস্থায় ইগুয়ানোডন তাদের বুড়ো আঙুলকে আত্মরক্ষার কাজে লাগাতে পারত। ওয়েন এর পরেও কোনো মন্তব্য বা ভুল স্বীকার করেননি; নিজের কোনো ভুলই তিনি কখনও স্বীকার করেননি। প্রথম প্রাপ্ত ডাইনোসরেদের অধিকাংশই দ্বিপদ ছিল বলে প্রমাণিত হয়, আর তাই ম্যান্টেলের ধারণা ছিল প্রকৃত অর্থেই দূরদর্শী।

বৃদ্ধ বয়সে রিচার্ড ওয়েন

প্রাথমিকভাবে ডারউইনের সঙ্গে তাঁর ভাল সম্পর্ক থাকলেও ডারউইনের অরিজিন অফ স্পিসিস বইয়ের কঠোর সমালোচক ছিলেন ওয়েন; বইটিতে ওয়েন ও চেম্বার্স সমেত অন্যান্য পূর্ববর্তী গবেষকদের প্রাণ সংক্রান্ত কাজকর্মের কথা উল্লেখ করা হয়নি বলে। এখানে উল্লেখ্য যে ওয়েন প্রমুখ গবেষকেরা বিবর্তনকে বাইবেলে বর্ণিত অবৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে তুলনা করেছিলেন।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে ওয়েন ডারউইন ও হাক্সলি প্রমুখ ডারউইন-শিষ্যদের দ্বারা প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু থেকে স্থানচ্যুত হয়েছেন বলে মনে করতেন, আর হিংসা তাঁর শুভবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করেছিল। ডারউইনের মতে ওয়েন ছিলেন "হিংসুক, অত্যন্ত অসৎ, ধূর্ত; লন্ডনের লোকেরা বলে আমার বই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে ও হিংসায় পাগল হয়ে গেছে"।[২৩] "ওয়েন আমাকে যেমন তীব্রভাবে ঘৃণা করে তেমনভাবে ঘৃণিত হওয়া পীড়াদায়ক"।[২৪] ম্যান্টেলের বিরুদ্ধে গৃহীত কৌশলটাও ওয়েন অন্যত্র কাজে লাগিয়েছিলেন। ১৮৬০ এর এপ্রিল মাসে এডিনবরা রিভিউ-তে তিনি একটা অনামা নিবন্ধ লেখেন। এখানে ডারউইনের বিরুদ্ধে তিনি নতুন পর্যবেক্ষণের অভাবের অভিযোগ তোলেন, এবং প্রথম পুরুষে নিজের প্রচুর প্রশংসা করেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য নিজের নামে চালাননি।[২৫] অবশ্য ডারউইনের পতঙ্গের আচরণ ও পায়রা প্রজননের গবেষনাগুলোকে ওয়েন "রত্ন বিশেষ" বলে প্রশংসা করেছিলেন।[২৬]

রয়াল বটানিক গার্ডেনসের সরকারী অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির সাথেও ওয়েন জড়িত ছিলেন (দেখুন হুকার ও কিউ-এর উপর আক্রমণ)। অ্যাক্টন স্মী আয়ারটন বলেছেন:

"এ'ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে একটি সমৃদ্ধ উদ্ভিদ সংগ্রহযুক্ত ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও কিউ-এর মধ্যে রেষারেষির সূত্রপাত হয়েছিল। সময়ে সময়ে এই রেষারেষি নিতান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যেত, বিশেষত হুকার ও ওয়েনের মধ্যে... এর মূলে ছিল ওয়েনের ধারণা যে কিউ-এর গবেষণাগারটিকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের (তথা ওয়েনের নিজের) অধীনে থাকতে হবে আর সেটিকে নিজস্ব উদ্ভিদ সংগ্রহবিশিষ্ট একটি স্বাধীন গবেষণাগার হয়ে উঠতে দেওয়া যাবে না।"[২৭]

কোনো কোনো গ্রন্থকার বলেছেন যে ওয়েনের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও বিশ্বাসঘাতক ভাবমূর্তিটি হয়তো ডারউইন, হুকার, হাক্সলি প্রমুখ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বানানো একটি গল্প, আর এর সবটা সত্যি নয়। তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে ওয়েন যথাযথভাবেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচিত হতেন। পরবর্তীকালে তাঁর জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। কেবল সহকর্মীদের সাথে প্রতারণামূলক কাজকর্মই নয়, এর অন্যতম কারণ ছিল তাঁর একাধিক গুরুতর বৈজ্ঞানিক ভুল, যা আবিষ্কৃত ও প্রচারিত হয়। একটা ভাল উদাহরণ হল তাঁর মানুষকে স্তন্যপায়ীদের অন্তর্গত একটা আলাদা অধঃশ্রেণীতে ফেলার পরিকল্পনা (দেখুন ম্যান'স্ প্লেস ইন নেচার)। এই ক্ষেত্রে ওয়েন কোনো সমর্থকই পাননি। এছাড়া সময়ের সাথে সাথে বিবর্তন বিষয়ে তাঁর অনমনীয় মনোভাবও তাঁর মর্যাদার পক্ষে হানিকর হয়ে ওঠে। ৭৯ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণের পরেও ওয়েন কর্মরত থাকেন, কিন্তু তরুণ বয়সের হারানো সুখ্যাতি কোনোদিন ফিরে পাননি।[২৮][২৯]

রচনা[সম্পাদনা]

  • মেময়্যার অন দ্য পার্লি নটিলাস (১৮৩২)
  • ওডোন্টোগ্রাফি (১৮৪০-১৮৪৫)
  • অন দ্য আর্কেটাইপ অ্যান্ড হোমোলজিস অফ দ্য ভার্টিব্রেট স্কেলেটন (১৮৪৮)
  • হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ফসিল রেপটাইল্‌স (চার খন্ডে, ১৮৪৯-১৮৮৪)
  • অন দ্য নেচার অফ লিম্বস (১৮৪৯)
  • প্যালিঅন্টোলজি অর আ সিস্টেম্যাটিক সামারি অফ এক্সটিংক্ট অ্যানিমালস অ্যান্ড দেয়ার জিওলজিকাল রিলেশনস (১৮৬০)
  • আর্কিওপ্টেরিক্স (১৮৬৩)
  • অ্যানাটমি অফ ভার্টিব্রেটস (১৮৬৬) ছবি
  • মনোগ্রাফ অফ দ্য ফসিল ম্যামালিয়া অফ দ্য মেসোজোয়িক ফর্মেশনস (১৮৭১)
  • ক্যাটালগ অফ দ্য ফসিল রেপটিলিয়া অফ সাউথ আফ্রিকা (১৮৭৬)
  • অ্যান্টিকুইটি অফ ম্যান অ্যাজ ডিডিউস্‌ড ফ্রম দ্য ডিসকভারি অফ আ হিউম্যান স্কেলেটন ডিউরিং এক্সক্যাভেশনস অফ দ্য ডক্স অ্যাট টিলবারি (১৮৮৪)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. http://www.telegraph.co.uk/science/evolution/8185977/Richard-Owen-the-greatest-scientist-youve-never-heard-of.html
  2. Cosans (2009) pp. 97–103.
  3. Amundson, 2005, pp. 76–106
  4. Rupke, 1994
  5. Bryson (2003), p. 81.
  6. p. 299, Sir Richard Owen (Obituary) in Eminent persons: Biographies reprinted from the Times, Vol V, 1891–1892। Macmillan & Co.। ১৮৯৬। পৃ: 291–299 
  7. Owen,1852, pp. 214–225.
  8. Owen,1852, p. 224.
  9. Collette and Hagadorn, 2010.
  10. Collette, Gass and Hagadorn, 2012.
  11. Mantell, Gideon A. (১৮৫১)। Petrifications and their teachings: or, a handbook to the gallery of organic remains of the British Museum.। London: H. G. Bohn। ওসিএলসি 8415138 
  12. Bryson (2003), p. 88.
  13. Rupke, 1994, p. 220, p. 223
  14. Rupke, 1994, p. 226
  15. Richards, 1987
  16. Owen, 2007, p. 86
  17. Rupke, 1994, p.232
  18. Cosans, 2009, pp. 52–58
  19. Cosans, 2009, pp. 108–111
  20. Huxley, 1861, p. 83
  21. Cosans, 2009, pp. 109–111
  22. Rocky Road: Sir Richard Owen. Strangescience.net (2011-05-28). Retrieved on 2011-09-17.
  23. Darwin 1887, p.149
  24. Darwin & Seward 1903, p.300
  25. Darwin on the Origin of Species. Darwin.gruts.com. Retrieved on 2011-09-17.
  26. Owen, 1860, p. 255
  27. Turrill W.B. 1963. Joseph Dalton Hooker. Nelson, London. p90.
  28. Desmond A. 1982. Archetypes and ancestors: paleontology in Victorian London 1850–1875. Muller, London.
  29. Sir Richard Owen: the archetypal villain. Darwin.gruts.com. Retrieved on 2011-09-17.