রানী চন্দ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রানী চন্দ (জন্ম: ১৯১২ - মৃত্যূ: ১৯ জুন ১৯৯৭) একজন চিত্রশিল্পী এবং লেখিকাে

রানী চন্দের জন্ম হয় মেদিনীপুরে। তার বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মচারী কুলচন্দ্র দে এবং মা পূর্ণশশী। তার ৪ বছর বয়েসে বাবা কুলচন্দ্র দে'র মারা যান। তার দুবছর বাদে মা পূর্ণশশী তার পিতৃগৃহে ঢাকা বিক্রমপুরে গঙ্গাধরপুরে চলে এলে তাদের মামাবাড়িতে ছেলেবেলার প্রাথমিক পর্ব সেখানেই কাটে। তার বড় ভাই সরকারি চারু ও কারু মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুকুল দের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে মুকুল দে মা, ভাই, বোনেদের শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন এবং তারপরের বছরই রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে রাণী কলাভবনে ভর্তি হন। খুব কম সময়েই তিনি নন্দলাল বসুর প্রিয় ছাত্রী হয়ে ওঠেন। পরে তিনি অবনীন্দ্রনাথের কাছেও আঁকা শিখেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তিনি যৌথভাবে বাল্মিকী প্রতিভা নাটকের সিরিজ এবং শান্তিনিকেতনের দৃশ্যাবলীর রঙিন ছবি আঁকেন। তার আঁকা ছবিগুলির ভিতরে রাধার বিরহ এবং ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে লিনোকাটের উপর তার একটি বই বহু প্রশংসা পেয়েছিল।

১৯৩৪ এ রবীন্দ্রনাথের পৌরহিত্যে তার ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দের সাথে মুম্বাইতে তার বিবাহ হয়। এ বিবাহ নিয়ে পাত্র, পাত্রী দুই পরিবারের মধ্যে মনোমালিন্য ও মনান্তর হয়। ১৯৩৬ এ তাঁদের একমাত্র পুত্র ও সন্তান অভিজিতের জন্ম। ১৯৪২ এ 'ভারত ছাড়ো ' আন্দোলনে যোগ দেন ও কারাবরণ করেন। তিনি তার জেল জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটিয়ে তুলেছিলেন জেনানা ফটক বইতে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে দেশের প্রথম মহিলা চিত্রশিল্পী হিসাবে দিল্লি ও মুম্বাইতে একক চিত্রপ্রদর্শনী করে খ্যাতিলাভ করেন। তার আঁকা ছবি দিয়ে তৈরি অ্যালবাম খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। দিল্লির রাষ্ট্রপতিভবন সহ তার আঁকা ছবিগুলি বিভিন্ন রাজ্যের রাজভবনগুলিতেও স্থান পেয়েছে। চিনের প্রধানমন্ত্রী চুনকিং-এর আমলে ভারত সরকার তার আঁকা ছবি সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসাবে চিন সরকারের হাতে তুলে দেয়।

সঙ্গীত এবং নৃত্যাভিনয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। আশ্রমের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন দেশে বিদেশে অনুষ্ঠান করছেন তখন তিনিও সেইসব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কায় শাপমোচন নৃত্যনাট্যে তিনি নাচে অংশ নিয়েছিলেন।

স্বামী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে স্বামীর সাথে দীর্ঘ ২০ বছর দিল্লিতে ছিলেন। সেই সময়ে জওহরলাল নেহরু, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত প্রমুখের সাহচর্য পান। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্বামীর সাথে সাংস্কৃতিক দলের অন্যতম প্রতিনিধি হয়ে পূর্ব ইউরোপ এবং তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় ভ্রমণ করেন।

রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণা এবং নির্দেশে তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রোগশয্যায় মুখে মুখে বলা রচনার অনুলিপিকার ছিলেন তিনি। এ ছাড়া অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী এবং তার দুটি স্মৃতিকথা জোড়াসাঁকোর ধারে এবং ঘরোয়া তারই অনুলিখন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তার পূর্ণকুম্ভ গ্রন্থের জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। তার সাহিত্যকীর্তির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি.লিট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে। তার রচিত অন্যান্য গ্রন্থ : আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ, গুরুদেব, পথে ঘাটে, সব হতে আপন, আমার মায়ের বাপের বাড়ি, শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ প্রভৃতি।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন এবং তিনি সেখানেই আমৃত্যু কাটান। ১৯৭৬ এ অনিল চন্দ মারা যান। ১৯৯৭ সালের ১৯ জুন দীর্ঘ অসুস্থতার পরে শান্তিনিকেতনে নিজের বাসভবন 'জিৎ ভূম' এ পরলোকগমন করেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - সাহিত্য সংসদ - দ্বিতীয় খণ্ড