মিশরের ষষ্ঠ রাজবংশ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
আবিডোসে প্রাপ্ত ষষ্ঠ রাজবংশের ফারাওদের তালিকা (৩৪ - ৩৯)

মিশরের ষষ্ঠ রাজবংশ (২৩৪৭ - ২২১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সাধারণভাবে মিশরের পুরাতন রাজত্বের শেষ রাজবংশ হিসেবে গণ্য হয়। তবে এক্ষেত্রে কেউ কেউ দ্বিমতও পোষণ করেন। যেমন দ্য অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব এইনসেন্ট ইজিপ্ট-এ সপ্তম ও অষ্টম রাজবংশকেও পুরাতন রাজত্বেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে।[১] প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত মানথেওর সাক্ষ্য অনুযায়ী ষষ্ঠ রাজবংশের ফারাওরা মেমফিস থেকেই রাজত্ব করেন। সাক্কারায় তাঁদের পিরামিডগুলি অবস্থিত।[২]

নৃপতিবৃন্দ[সম্পাদনা]

এই রাজবংশের যেসব ফারাও'এর নাম জানা যায় তাঁদের নাম ক্রমপর্যায় অনুযায়ী নীচের ছকে উদ্ধৃত হল। এই রাজবংশের শাসনকাল ১৬৪ বছর ধরে ব্যাপ্ত ছিল। তবে এখানে বিভিন্ন ফারাও'এর রাজত্বকালের ব্যাপ্তি হিসেবে যে সনগুলি উল্লিখিত হয়েছে, তার অনেকগুলিই পুরোপুরি তথ্যনির্ভর নয়, কিছুটা অনুমাননির্ভর। হোরাসনাম ও রাণীদের নামের জন্য এখানে মূলত ডডসন ও হিলটনের দেওয়া তথ্যাবলীর উপর নির্ভর করা হয়েছে।[৩]

ষষ্ঠ রাজবংশের ফারাওরা
ব্যক্তিনাম হোরাসনাম রাজত্বকাল পিরামিড সম্রাজ্ঞী
তেতি সেহেতেপতোয়াই ২৩৪৫ – ২৩৩৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সাক্কারায় তেতির পিরামিড
উসারকারে ২৩৩৩ – ২৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
প্রথম পেপি নেফেরসাহোর/মেরেনরে ২৩৩১ – ২২৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সাক্কারায় প্রথম পেপির পিরামিড
প্রথম মেরেনরে মেরেনরে ২২৮৭ – ২২৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সাক্কারায় মেরেনরের পিরামিড
দ্বিতীয় পেপি নেফেরকারে ২২৭৮ – ২১৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সাক্কারায় দ্বিতীয় পেপির পিরামিড
দ্বিতীয় মেরেনরে মেরেনরে ২১৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
নেতিয়েরকারে সিপতা ২১৮৪ – ২১৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ

লিখিত উপাদানের তুলনামূলক প্রাচূর্য[সম্পাদনা]

এই রাজবংশের আমলের ইতিহাস জানার জন্য আমাদের হাতে আগের আমলগুলির তুলনায় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি লিখিত উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজকীয় নয় এমন অনেক সমাধি থেকেও প্রাপ্ত খোদিত লিপি। খুব স্বাভাবিকভাবেই এইসব অরাজকীয় সমাধির প্রাচূর্য্য এক নতুন ক্ষমতাধর অভিজাত শ্রেণির উত্থানের ইঙ্গিত বহন করে। এইসব লিপিগুলি থেকে আমরা অনেকসময়ই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবন ও সমসাময়িক নানা ঘটনা সম্পর্কে বহু তথ্য জানতে পারি।[৪] যেমন, ফারাও প্রথম পেপিকে হত্যা করার একটি ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের খবর এইধরনের লিপি থেকেই আমাদের গোচরে আসে।[৫] তরুণ ফারাও দ্বিতীয় পেপির একটি চিঠিও আমাদের হাতে আসে, যাতে তাঁর নুবিয়া অভিযানের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।[৬]

প্রশাসন[সম্পাদনা]

সংস্কৃতিগত দিক থেকে বিচার করলে ষষ্ঠ রাজবংশের রাজত্বকাল (২৩৪৭ - ২২১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পঞ্চম রাজবংশেরই ধারাবাহিক উত্তরাধিকার বহন করে। এই আমলে প্রশাসনিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণের প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। তার সাথে সারা দেশের বিভিন্ন অংশে প্রশাসক নিযুক্ত হবার ফলে তাদের কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করে। এইসব আঞ্চলিক প্রশাসকদের সাথে অনেকসময়েই ফারাও'এর আর কোনও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল না। তারউপর এইসব প্রশাসক পদগুলিও ধীরে ধীরে পারিবারিক উত্তরাধিকার কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। ফলে তাদের উপর ফারাও'এর নিয়ন্ত্রণ যত কমতে শুরু করে, কেন্দ্রীয় প্রশাসন ততই দুর্বল হতে থাকে, এইসব আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্রের গুরুত্বও ততই বাড়তে শুরু করে। লিবিয়া, নুবিয়াপ্যালেস্তাইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের সাথে সাথে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতা আরও হ্রাস পায়।

কিন্তু তাসত্ত্বেও নীল নদের নিয়মিত বাৎসরিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও মরেইস হ্রদ পর্যন্ত খালখনন (২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ) তখনও পর্যন্ত ছিল এক অতি প্রয়োজনীয় বিশাল কর্মকাণ্ড, যার জন্য কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অস্তিত্বের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ফারাও দ্বিতীয় পেপির দীর্ঘ রাজত্বকালের (২২৭৮ - ২১৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) শেষের দিকে আভ্যন্তরীন গণ্ডোগোল মাথাচাড়া দেয়; তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে যে সংগ্রাম শুরু হয় তা কিছুদিনের মধ্যেই গোটা দেশকেই গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

অবসান[সম্পাদনা]

আধুনিক গবেষণা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নীল নদের নিয়মিত বাৎসরিক বন্যা ব্যাহত গেলে, তার প্রভাব মিশরীয় সভ্যতার উপর ব্যাপকভাবে পড়ে; সম্ভবত তার ফলেই পুরাতন রাজত্বের পতন ত্বরাণ্বিত হয়।[৭][৮] মোটামুটি ২২০০ - ২১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে এর ফলে নীল নদের স্বাভাবিক নিয়মিত বন্যা প্রায় বন্ধই হয়ে যায়।[৯] দুই থেকে তিন দশক ধরে এই পরিস্থিতি চলার ফলে গোটা দেশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে যায়; কেন্দ্রীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।[১০] সে' সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এইধরনের প্রভাব অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতা, যেমন সুমেরসিন্ধু সভ্যতার উপরও লক্ষ করা সম্ভব।

কেন্দ্রীয় প্রশাসন ভেঙে পড়লে প্রথম অন্তর্বর্তী যুগের সূচনা ঘটে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Shaw, Ian, ed. (2000). The Oxford History of Ancient Egypt. Oxford University Press. p. 479. ISBN 0-19-815034-2.
  2. Sir Alan Gardiner, Egypt of the Pharaohs, Oxford University Press 1964. ISBN: 978-0195002676 p. 91
  3. Dodson, Aiden; Hilton, Dyan (2004). The Complete Royal Families of Ancient Egypt. London: The American University in Cairo Press. ISBN 0500051283.
  4. J. H. Breasted, Ancient Records of Egypt, Part One, Chicago 1906, পৃঃ - ২৮২ - ৩৯০।
  5. J. H. Breasted, Ancient Records of Egypt, Part One, Chicago 1906, পৃঃ - ৩১০।
  6. J. H. Breasted, Ancient Records of Egypt, Part One, Chicago 1906, পৃঃ - ৩৫০ - ৩৫৪।
  7. Lonnie G. Thompson u. a.: "Kilimanjaro Ice Core Records. Evidence of Holocene Climate Change in Tropical Africa". In: Science 298 (2002), S. 589–593, doi:10.1126/science.1073198
  8. Russell Drysdale u. a.: "Late Holocene drought responsible for the collapse of Old World civilizations is recorded in an Italian cave flowstone". In: Geology 34 (2006), S. 101–104, doi:10.1130/G22103.1
  9. Jean-Daniel Stanley; et al. (2003). "Nile flow failure at the end of the Old Kingdom, Egypt: Strontium isotopic and petrologic evidence". Geoarchaeology. 18 (3): 395–402. doi:10.1002/gea.10065
  10. Hassan, Fekri. "The Fall of the Egyptian Old Kingdom" BBC History. সংগৃহীত ২৭ জুলাই, ২০১৮।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]