মধ্যমাঠের খেলোয়াড়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ফুটবল মাঠে অন্য খেলোয়াড়দের মাঝে মধ্যমাঠের খেলোয়াড়ের অবস্থান

ফুটবলে মিডফিল্ড বা মধ্যমাঠ এমন একটি অবস্থান যেটি আক্রমণভাগ ও রক্ষণভাগের মাঝামাঝি (চিত্রে নীল রঙ দিয়ে দেখানো হয়েছে)। মিডফিল্ডার বা মধ্যমাঠের খেলায়াড় হচ্ছেন মধ্যমাঠে খেলা খেলোয়াড় যিনি আক্রমণভাগ ও রক্ষণভাগ দুটি অংশকেই সহায়তা করেন। তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে বিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে ট্যাক্‌লের মাধ্যমে বলের নিয়ন্ত্রণ নেয়া এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের কাছে নিয়মিত বলের জোগান দেয়া এবং সম্ভব হলে গোল করা। কোন কোন মিডফিল্ডারেরা অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল অবস্থানেও খেলে থাকেন এবং অনেকে আবার মধ্যমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যবর্তী দেয়াল ভাঙতেও ওস্তাদ। দলে প্রয়োজন অনুযায়ী মিডফিল্ডারের সংখ্যা বিভিন্ন হতে পারে।

অসাধারণ মিডফিল্ডারের কয়েকটি গুণাবলী থাকে যেমন: তারা ট্যাক্‌লিং, ড্রিব্‌ল, শ্যুট, পাস দেয়া প্রভৃতিতে দক্ষতা। সাধারণত দলে একজন মূল মিডফিল্ডার থাকেন যিনি বিপক্ষ দলের বর্ম ভেদের চেষ্টা করে সুযোগ তৈরি করেন। বাকী মিডফিল্ডারেরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করতে চেষ্টা করেন। সাধারণত যেকোন প্রান্তে উইঙ্গার বা বিশেষজ্ঞ সাইড মিডিফিল্ডারেরা আক্রমণের দায়িত্বে থাকেন।

একজন ভাল মিডফিল্ডারের লড়াই করার ক্ষমতা থাকতে হবে ও তাকে সৃষ্টিশীলও হতে হবে। মিডফিল্ডের সাহায্য ছাড়া একজন ভাল স্ট্রাইকার যেমন আক্রমণ শানাতে পারেনা, তেমনি রক্ষনভাগকেও প্রতি আক্রমণের জবাব দিতে ব্যস্ত থাকতে হয়। যেহেতু মিডফিল্ডারেরা মাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের দায়িত্বে থাকেন, সেহেতু খেলার জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হচ্ছেন তারাই।

মিডফিল্ডারদের মাঠে সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ করতে হয় কেননা তাদেরকে রক্ষন ভাগের ডাকেও সাড়া দিতে হয় আবার আক্রমণভাগকে সহায়তা করতেও সচেষ্ট থাকতে হয়।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার[সম্পাদনা]

সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা খেলায় বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকেন। বিশেষ করে কোন আক্রমনের সূচনায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাঠে তাদের অবস্থান তাদেরকে খেলার সর্ববিষয়ে নজর রাখার সুযোগ করে দেয়, এবং তাদের অঞ্চল থেকেই খেলার অধিকাংশ আক্রমনের সূচনা ঘটে। মাঠের এই অংশটিকে একটি দলের “ইঞ্জিন ঘর” হিসেবেও অ্যাখ্যায়িত করা হয়, কারণ বিখ্যাত দলগুলো সুদক্ষ এবং ক্ষমতাসম্পন্ন মিডফিল্ডার ছাড়া খুব কমই সফলতা পেয়েছে।

"বক্স-টু-বক্স" মিডফিল্ডার[সম্পাদনা]

সবচেয়ে প্রগতিশীল বহুমুখি মিডফিল্ডারদের বোঝাতে বক্স-টু-বক্স শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডাররা ডিফেন্সিভ এবং অ্যাটাকিং উভয় ভূমিকাই পালন করতে পারেন।[১] তারা সাধারণত ট্যাকলিং, পাসিং, শুটিং এবং বল দখলে দক্ষ হয়ে থাকেন। এ ধরণের মিডফিল্ডারদের মধ্যে ইয়াইয়া তোরে, স্টিভেন জেরার্ড উল্লেখযোগ্য।

ওয়াইড মিডফিল্ডার[সম্পাদনা]

খেলার মাঠে লেফট এবং রাইট মিডফিল্ডারদের ভূমিকা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মতই। তবে তার মাঠের টাচলাইনের খুব নিকটে অবস্থান করে। রাইট মিডফিল্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলেন ডেভিড বেকহ্যাম[২] বর্তমানে ৪-৪-২ বা ৪-৪-১-১ ফরমেশনে রাইট, সেন্ট্রাল এবং লেফট মিডফিল্ডারদের দেখা যায়।[৩]

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার[সম্পাদনা]

স্পেনীয় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সার্হিও বুস্কেতস (মাঝখানে) ইতালীয় ফরোয়ার্ড মারিও বালোতেল্লির (বামে) শট রুখে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা হোল্ডিং মিডফিল্ডার হলেন তারা, যারা দলে রক্ষণভাগকে সাহায্য করার জন্য রক্ষণভাগের সামনে অবস্থান করেন। এই বিশেষজ্ঞ মিডফিল্ডারদের দায়িত্ব হচ্ছে বিপক্ষ দলের আক্রমণ প্রতিহত করা, তাদের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নেয়া এবং অধিকতর আক্রমণাত্নক মিডফিল্ডারকে বলের যোগান দেয়া। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে বলের নিয়ন্ত্রণ আদায় করার পর আক্রমণের সূচনা করা। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা অনেক সময় ফুল-ব্যাক বা সেন্টার-ব্যাকের দায়িত্বও পালন করেন, যখন এই অবস্থানের খেলোয়াড়রা আক্রমণভাগে যোগ দেওয়ার জন্য মাঠে উপড়ের দিকে চলে যান।[৪] এই ধরণের মিডফিল্ডারদের ৪–২–৩–১ এবং ৪–৪–২ ডায়মন্ড ফরমেশনে দেখা যায়।[৫] এধরণের খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষের আক্রমন প্রতিহত করার পাশাপাশি আক্রমণের সূচনাও করেন।

চিরাচরিত প্লেমেকার[সম্পাদনা]

ফুটবলে একজন প্লেমেকারের দলের আক্রমনাত্মক খেলার ধারা নিয়ন্ত্রন করেন। প্লেমেকাররা সাধারণত নম্বর ১০ বা ৮ হয়ে থাকেন। একজন প্লেমেকারের সবচেয়ে ভাল গুন হল তার খেলার ধারাটিকে বুঝতে পারার ক্ষমতা। মাঠের উপযুক্ত অবস্থানে থেকে সতীর্থদের ঠিকমত বলের যোগান দেওয়াটাও তার একটি গুরুদায়িত্ব। একজন প্লেমেকারের আরও দুটি গুন হল স্বজ্ঞা এবং সৃজনশীলতা। তাদেরকে জানতে হয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খেলোয়াড় কোথায় অবস্থান করছেন। একজন ভাল প্লেমেকার বল নিয়ন্ত্রন এবং ড্রিবলিং-এ দূর্দান্তভাবে দক্ষ হয়ে থাকেন। এছাড়া তিনি বল নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতেও সমর্থ হন, ফলে সতীর্থরা আক্রমনাত্মক দৌড় শুরু করতে পারেন। তখন প্লেমেকারের দায়িত্ব হয় চূড়ান্ত পাসটি করা, যা শেষপর্যন্ত গোলে পরিণত হতে পারে। ফুটবলে এটিকে বলা হয় কিলার বল বা ফাইনাল বল। তবে দাপ্তরিকভাবে এটিকে বলা হয় এসিস্ট বা সহায়তা। এই ধরণের খেলোয়াড়দের মধ্যে মেসুত ওজিল, কাকা, সিনজি কাগাবা, হুয়ান মাতা, স্যান্তি কাজোর্লা এবং মারিও গোঁতজে উল্লেখযোগ্য।[৬]

ডিপ-লায়িং প্লেমেকার[সম্পাদনা]

কোন কোন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারগণ যেকোন অবস্থান থেকে আক্রমণ রচনা করতে পছন্দ করেন। এ ধরনের মিডফিল্ডারগণ "ডিপ-লায়িং প্লেমেকার" নামে পরিচিত। এরা খেলাকে মাঠে ছড়িয়ে দিতে এবং যেকোন অবস্থান থেকে আক্রমণের সূচনা করতে পারেন। তবে বল রক্ষায় তাদের দুর্বলতার কারনে সাধারণত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারগণ তাদের সহযোগিতা করে থাকেন। এ ধরনের খেলোয়াড়দের মধ্যে সেস ফ্যাব্রিগাস, ইভান কাম্পো, আন্দ্রে পিরলো, জাবি আলোনসো, মাইকেল এসিয়েন (যখন তিনি ঘানার হয়ে খেলেন), জাভি হার্নান্দেজ, ডেভিড পিজারো, ইউজেনিও কোরিনি, বিকাশ ধোরাসু এবং মাইকেল ক্যারিক উল্লেখযোগ্য।

ফুটবলে অবস্থানগুলোর মধ্যে এই স্থানটি বেশ নতুন। এটিকে ফুটবলের আদি স্থান সুইপারের বিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। যদিও বলা মুশকিল কে প্রথম এই অবস্থানে খেলা শুরু করেছেন, তবে পেপ গার্দিওলা এই অবস্থানের খেলা জনপ্রিয় করেছেন বলে ধরা হয়।

অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার[সম্পাদনা]

নীল বৃত্তে চিহ্নিত একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের দুইটি সাম্ভব্য অবস্থান।

অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার এমন একজন মিডফিল্ডার যিনি সাধারণ মিডফিল্ডারদের সামনে থেকে আক্রমন ভাগের খেলোয়াড়দের বলের যোগান দেন এবং কখনও কখনও নিজেরাও আক্রমন পরিচালনা করেন। একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার চমত্‍কার কলাকৌশন, পাসিং এবং ড্রিবলিং এর অধিকারী হন।

তিনি সাধারণত দলের আক্রমন ভাগের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একদম স্ট্রাইকারদের পেছনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড অবস্থানে খেললে তাকে “প্লেইং ইন দ্য হোল” বা “ডিপ লাইং ফরোয়ার্ড” বলা হয়, ঐতিহ্যগতভাবে তাকে নম্বর ১০ বলা হয়। একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের মূল দায়িত্ব হল নিজ দলের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, এমনকি নিজেও গোল করা। ফুটবলে এই অবস্থানটিকে প্লেমেকারও বলা হয়।[৭]

বর্তমান সময়ের সেরা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারদের মধ্যে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সেস ফ্যাব্রিগাস, মেসুত ওজিল, ডেভিড সিলভা, কেভিন-প্রিন্স বোয়াতেং, ওয়েসলি স্নেইডার, সামির নাসরি, লুকা মদ্রিচ, সান্তি কাজোরলা, জ্যাক উইলশেয়ার এবং মারিও গোটজে উল্লেখযোগ্য।

ফলস নম্বর-১০ বা ‘‘সেন্ট্রাল উইঙ্গার’’[সম্পাদনা]

ফলস নম্বর-১০ বা “সেন্ট্রাল উইঙ্গার”[৮] আধুনিক ফুটবলে একটি নতুন ধরণের মিডফিল্ডার অবস্থান। একজন চিরাচরিত প্লেমেকার যেখানে স্ট্রাইকারের পেছনে মাঠের মাঝখানে অবস্থান কর স্ট্রাইকারকে সহায়তা করেন, সেখানে একজন ফলস নম্বর-১০ মাঠের মাঝখানে অবস্থান করে উইঙ্গার এবং ফুলব্যাক উভয়দেরকেই সহায়তা করা। ফলস নম্বর-১০ সাধারণত একজন চিরাচরিত উইঙ্গার যারা মাঠের মাঝখানে খেলে থাকেন। ফলস নম্বর-১০ এর কারণে একটি দল মাঠের মাঝখানে অধিক মিডফিল্ডারের সুবিধা পেয়ে থাকে। ম্যাথিউ ভ্যালবুয়েনা এধরণের খেলোয়াড়দের একটি উদাহরণ। অলিম্পিক মার্শেই বা ফ্রান্সের হয়ে খেলার সময় তিনি সেন্ট্রাল উইঙ্গার হিসেবে খেলেন।[৯] আরেকটি ভাল উদাহরণ আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, যখন তিনি বার্সেলোনা বা স্পেনের হয়ে খেলেন। রিয়াল মাদ্রিদের জার্মান প্লেমেকার মেসুত ওজিলকেও “সেন্ট্রাল উইঙ্গার” হিসেবে গন্য করা হয়।[১০] এছাড়া লিওনেল মেসিও বার্সেলোনা বা আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সময় কখনও কখনও এই অবস্থানে খেলে থাকেন।[১১]

উইঙ্গার[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Box to box Bowyer"বিবিসি (লন্ডন)। ২৯ এপ্রিল ২০০২। সংগৃহীত ১ মার্চ ২০১৩ 
  2. Taylor, Daniel (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০)। "Milan wrong to play David Beckham in central midfield says Sir Alex Ferguson"দ্য গার্ডিয়ান (ইংল্যান্ড)। সংগৃহীত ৭ অক্টোবর ২০১৩ 
  3. "Formations guide"বিবিসি স্পোর্ট (লন্ডন)। সংগৃহীত ৭ অক্টোবর ২০১৩ 
  4. Cox, Michael (৩ মার্চ ২০১০)। "Analysing Brazil's fluid system at close quarters"। zonalmarking.net। সংগৃহীত ৭ অক্টোবর ২০১৩ 
  5. Cox, Michael (২৯ জুলাই ২০১০)। "Teams of the Decade #11: Valencia 2001-04"। zonalmarking.net। সংগৃহীত ৭ অক্টোবর ২০১৩ 
  6. http://dictionary.reference.com/browse/playmaker
  7. "Football / Soccer Positions"। Expert Football। ২১ ডিসেম্বর ২০১২। সংগৃহীত ৪ মার্চ ২০১৩ 
  8. "Introducing…the central winger?"। Zonal Marketing। ৩ ডিসেম্বর ২০১০। সংগৃহীত ১৪ মে ২০১৩ 
  9. "Spain 1-1 France: Deschamps’ formations witch results in late France dominance"। Zonal Marketing। ১৭ অক্টোবর ২০১২। সংগৃহীত ১৪ মে ২০১৩ 
  10. "Germany 2-1 Holland: German flexibility outwits the static Dutch midfield"। Zonal Marketing। ১৪ জুন ২০১২। সংগৃহীত ১৪ মে ২০১৩ 
  11. "Tactics: The ‘false 10’ – a clarification"। ২৬ জানুয়ারি ২০১২। সংগৃহীত ১৪ মে ২০১৩