ভি. পি. মেনন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভি. পি. মেনন
ভি. পি. মেনন.jpg
উড়িষ্যার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর
কাজের মেয়াদ
৬ মে ১৯৫১ – ১৭ জুলাই ১৯৫১
পূর্বসূরীআসাফ আলি
উত্তরসূরীআসাফ আলি
ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব
কাজের মেয়াদ
১৯৪৭ – ১৯৫১
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্মভাপ্পালা পাঙ্গুনি মেনন
(১৮৯৩-০৯-৩০)৩০ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩
ওট্টাপালাম, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে কেরালা)
মৃত্যু৩১ ডিসেম্বর ১৯৬৫(1965-12-31) (বয়স ৭২), কুক টাউন, বেঙ্গালুরু
জাতীয়তা ভারত
পেশাবেসামরিক কর্মচারী

রাও বাহাদুর ভপ্পালা পাঙ্গুনি মেনন, সিএসআই, সিআইই (৩০ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩ – ৩১ ডিসেম্বর ১৯৬৫) ছিলেন একজন ভারতীয় অসামরিক কর্মচারী, যিনি সরদার প্যাটেলের অধীনে রাজ্য মন্ত্রণালয়ে ভারত সরকারের সচিব ছিলেন।

ভাইসরয় এবং ভারতের গভর্নর-জেনারেল ওয়াভেলের দ্বারা নিয়োগের মাধ্যমে তিনি গভর্নর-জেনারেল (পাবলিক) এর সচিব এবং পরে মন্ত্রিসভার সচিব হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে সংবিধানিক উপদেষ্টা[১][২] এবং শেষ তিনটি ধারাবাহিক ভাইসরয় (লিনলিথগো, ওয়াভেল এবং মাউন্টব্যাটেন)দের রাজনৈতিক সংস্কার কমিশনারও ছিলেন। ১৯৪৮ সালের মে মাসে, ভিপি মেননের উদ্যোগে দেশীয় রাজ্য গুলির রাজপ্রমুখ এবং রাজ্য বিভাগের মধ্যে দিল্লিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার শেষে রাজপ্রমুখরা ভারত সরকারকে ক্ষমতা প্রদানের নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ভারত সরকার আইন ১৯৩৫ দ্বারা সপ্তম তফসিলে এই আইন পাস করেন।

তিনি ভারতের দেশভাগ এবং রাজনৈতিক সংহতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।[৩] পরবর্তী জীবনে তিনি মুক্তবাজারমুখী স্বতন্ত্র পার্টির সদস্য হন।

প্রারম্ভিক জীবন এবং কর্মজীবন[সম্পাদনা]

কেরালার একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ছেলে মেনন রেলওয়ের স্টোকার, কয়লা খনিতে এবং বেঙ্গালুরু তামাক কোম্পানিতে ক্লার্কের কাজ করেছেন । মেনন প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিস (পিসি) যোগ দেন [৪] ১৯১৪ সালে। তিনি ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সংস্কার অফিসে ভারত সরকারের সহকারী সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে তিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত সহকারী সেক্রেটারি, ১৯৩৫ থেকে ১৯৪০-এর উপ-সচিব, ১৯৪১ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত ভারত সরকারের যুগ্ম-সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ভালো ভাবে কাজ করার মাধ্যমে মেনন ব্রিটিশ ভারতে সর্বোচ্চ পরিবেশনকারী ভারতীয় অফিসার হয়ে উঠেন।

লর্ড মাউন্টব্যাটেন, এন। গোপালস্বামী আইয়ানগর এবং ভিপি মেনন ৩০ মে, ১৯৮৮-তে একটি পার্টিতে হায়দ্রাবাদ প্রশ্নে আলোচনা করছেন।

মেনন ১৯৪৫ সালের জুন মাসে সিমলা সম্মেলনে যুগ্মসচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ব্রিটিশ ভাইসরয়ের রাজনৈতিক সংস্কার কমিশনার নিযুক্ত হন।

প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ দ্বারা লিখিত ইন্ডিয়াঃ এ, পোর্টেট ,যা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি জীবনীগ্রন্থ,তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ভিপি মেননের স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেলে তিনি তার কেরালার বন্ধুদের সাথে দক্ষিণ ভারতে চলে এসেছিলেন। দুই বন্ধু, যারা এক দম্পতি ছিলেন, তারাই তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং তাঁর দুই পুত্র-পানগুন্নি অনন্তান মেনন এবং পানগুন্নি শঙ্করন মেননকে বড় করতে সহায়তা করেছিলেন। স্বামী মারা গেলে মেনন তার বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন। [৫]

মেননকে ১৯৪১ সালে তার জন্মদিনে রাও বাহাদুর উপাধি দেওয়া হয়েছিল এবং সিআইই পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল । [৬] ১৯৪৬ সালের জন্মদিন সম্মানে সিএসআই নিযুক্ত হন। [৭]

ভারত ভাগ[সম্পাদনা]

মেনন ছিলেন ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেনের রাজনৈতিক উপদেষ্টা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে বিরোধের কারণে যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভেঙে পড়েছিল, তখন মেনন মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ভারতীয় নেতাদের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন, মুসলিম লীগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতকে দুটি স্বাধীন দেশ -ভারতপাকিস্তান নামে বিভক্ত করতে ।

এই সময়কালে মেননের সম্পৃক্ততা সরদার প্যাটেলের নজর কেড়েছিল, যিনি ১৯৪৭ সালে ভারতের উপ-প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে স্থির হয়েছিল।

ভিপি মেনন লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং যোধপুরের মহারাজা হনবন্ত সিংয়ের মধ্যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকেই হানবন্ত সিং ভারতে যুক্ত হবার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তিনি স্বাক্ষর করার পরে এবং ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন চলে যাওয়ার পরে, কেবল মেননই তাঁর সাথে ঘরে ছিলেন। মহারাজা একটি ২২ ক্যালিবারের পিস্তল বের করে মেননের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,- 'আমি তোমার আদেশ গ্রহণ করতে রাজি নই'। মেনন তাকে বলেছিল যে তাকে হুমকি দিয়ে তিনি খুব মারাত্মক ভুল করবেন এবং কোনও অবস্থাতেই এই চুক্তি বাতিল করতে পারবেন না। [৮]

ভারতের একত্রীকরণ[সম্পাদনা]

ভিপি মেনন উড়িষ্যার এ শ্রেণিবদ্ধ রাজ্যের শাসকদের সাথে কথা বলছেন।

ভারতের স্বাধীনতার পরে, মেনন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে রাজ্য মন্ত্রকের সেক্রেটারি হয়েছিলেন, যার সাথে তিনি বিশ্বাসের বন্ধন গড়ে তুলেছিলেন। প্যাটেল মেননের রাজনৈতিক প্রতিভা এবং কাজের নীতিকে শ্রদ্ধা করেছিলেন। মেনন তার কাজের প্রতি সম্মান অর্জন করেছিলেন যা একজন সরকারি কর্মচারী তার রাজনৈতিক উর্ধ্বতনের কাছ থেকে প্রয়োজন।

মেনন প্যাটেলের সাথে ভারতের রাজনৈতিক সংহতকরণের জন্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন:৫৬৫ টিরও বেশি রাজ্যগুলি ভারতের ইউনিয়নে একীভূত হয়েছিল ।রাজ্য মন্ত্রক এবং বিভিন্ন ভারতীয় রাজকুমারদের মধ্যে কূটনীতি পরিচালনা করেছিল। প্যাটেলের দূত হিসাবে কাজ করেছিলেন এবং অনিচ্ছাকৃত রাজকুমার ও শাসকদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। প্যাটেল কূটনীতিতে মেননের দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেন এবং মেনন কোনও নির্দেশনা অমান্য করলেও তিনি তা প্রশ্ন করতেন না ।

ভিপি মেনন পতিয়ালা এবং পূর্ব পাঞ্জাব স্টেটস ইউনিয়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন।

মেনন প্যাটেল এর সাথে জুনাগড়হায়দরাবাদ বিরোধী রাজ্যগুলির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও কাজ করেছিলেন। পাশাপাশি নেহেরু ও প্যাটেলকে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ও কাশ্মীর বিরোধের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন । মন্ত্রিসভা ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের ভারতে প্রবেশের জন্য মেননকে পাঠিয়েছিল।

সরদার প্যাটেলের নির্দেশে মেনন পরবর্তীকালে "দ্য স্টোরি অফ দ্য ইন্টিগ্রেশন অফ দ্য ইন্ডিয়ান স্টেটস " নামে একটি বই লিখেছিলেন। যাতে প্রতিটি রাজ্যের জন্য তাদের নেওয়া নীতি গুলি তাদের কাজের ভিত্তিতে বর্ণনা করা হয়েছে।।

[৯][১০]

পরবর্তী বছরগুলি[সম্পাদনা]

প্যাটেল এবং মেননের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল বিরল ধরণের। তিনি সরদার প্যাটেলের ডান হাত ছিলেন এবং স্বাধীন ভারতের সংহতকরণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রায় প্রতিটি ভারতীয় রাজনীতিবিদই সরকারি কর্মচারীদের প্রতি বিরূপ ছিলেন[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] , কারন তারা ব্রিটিশ রাজ্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশ আমলে কংগ্রেস নেতাদের কারাগারে বন্দীর ভূমিকার কারনে অনেক কংগ্রেসই তার সুযোগ-সুবিধাগুলি ছিনিয়ে নেওয়া বা এগুলি একসাথে ছাড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছিলেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] নেহেরু নিজে তাঁর অধীনে কাজ করা সরকারি কর্মচারীদের কথা শুনতে নারাজ ছিলেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তিনি 1951 সালে অল্প সময়ের জন্য ওড়িশার (তৎকালীন উড়িষ্যা) রাজ্যপাল ছিলেন । এভাবে, ১৯৫০ সালে প্যাটেলের মৃত্যুর পরে মেনন নিজেই সদ্য গঠিত ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভারতের রাজনৈতিক সংহতকরণ, ভারত বিভাগ সম্পর্কিত 'দ্য স্টোরি অফ দ্য ইন্টিগ্রেশন অফ ইন্ডিয়া' বইটি লেখেন। পরে তিনি স্বতন্ত্র পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কখনও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। মেনন ৭২ বছর বয়সে ১৯৬৫ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর মারা যান।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে[সম্পাদনা]

ভারতীয় রাজনীতিবিদ বল্লভভাই প্যাটেলের জীবন অবলম্বনে ১৯৯৩ সালে সর্দার ছবিতে ভারতীয় অভিনেতা আশীষ বিদ্যার্থী মেনন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ২০১৩ সালে, আদি ইরানি এবিপি নিউজে প্রধানমন্ত্রীর (টিভি সিরিজ) ভিপি মেনন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

২০২০ সালে, তাঁর নাতনি নারায়ণী বসু তাঁর জীবনী লিখেছিলেন, যার নাম ভিপি মেনন: দ্য আনসং আর্কিটেক্ট অফ মডার্ন

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]

  1. "V P Menon – The Forgotten Architect of Modern India" (PDF)Forgotten Raj। ১৩ এপ্রিল ২০১১। ২৬ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০১১ 
  2. "V P Menon – The Forgotten Architect of Modern India"। সংগ্রহের তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ 
  3. "How Vallabhbhai Patel, V P Menon and Mountbatten unified India"। ৩১ অক্টোবর ২০১৭। 
  4. Copland, Ian (২০০২)। The Princes of India in the Endgame of Empire, 1917-1947। Cambridge University Press। আইএসবিএন 9780521894364 
  5. India - a portrait by Patrick French - page 13
  6. London Gazette, 6 June 1941
  7. London Gazette, 13 June 1946
  8. India - a portrait by Patrick French (page 10)
  9. Menon, V.P. (১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫)। The story of the integration of the Indian states। Longman Greens and Co। 
  10. Menon, V.P.। "Pdf copy of the book "The Story of the Integration of the Indian States"" (PDF)BJP E-Library। Bharatiya Janata Party। ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১৯