বিশ্বনাথ কবিরাজ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বিশ্বনাথ কবিরাজ ছিলেন একজন সংস্কৃত আলঙ্কারিক, প্রসিদ্ধ কবি, পণ্ডিত, সুবক্তা এবং কথা সাহিত্যিক। তিনি অলংকারশাস্ত্র বিষয়ক তার শ্রেষ্ঠ কর্ম সাহিত্যদর্পন-এর জন্য আজও বিখ্যাত হয়ে আছেন। [১] তিনি কলিঙ্গের (বর্তমান উড়িষ্যা) পরপর দু'জন গঙ্গাবংশীয় শাসক– রাজা চতুর্থ নরসিংহ দেব এবং রাজা চতুর্থ নিশঙ্ক ভানুদেবের শাসনামলে সাহিত্যিক উচ্চতায় আরোহণ করেছিলেন। তাঁর জন্ম তারিখের সঠিক তারিখ না পাওয়া যাওয়ায় এই দুজন শাসকের শাসনামলকে (১৩৭৮–১৪৩৪) বিশ্বনাথের জীবনের খন্ডাংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বনাথ কবিরাজের বাঙালিত্ব সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ গবেষকের মতে তিনি প্রথমে বঙ্গের অধিবাসী ছিলেন। গবেষকদের মধ্যে তার জীবনকাল আনুমানিক ১৩০০-১৩৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। [২]

পারিবারিক ইতিহাস[সম্পাদনা]

বিশ্বনাথ কবিরাজ একটি বিখ্যাত পণ্ডিত এবং কবি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা নারায়ণ দাস কলিঙ্গের আরও বড় সংস্কৃত কবি জয়দেব রচিত বৈষ্ণব ঐতিহ্যের সর্বাধিক সুপরিচিত সংস্কৃত রচনা গীতগোবিন্দম্ সম্পর্কে একটি মন্তব্য লিখেছিলেন। নারায়ণ দাসের ভাই চণ্ডীদাসও সংস্কৃত আলংকারিক মাম্মাথার লেখা কাব্যপ্রকাশ-এর উপর মন্তব্য লিখেছিলেন। বিশ্বনাথের বাবা চন্দ্রশেখরও কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন।

বিশ্বনাথ এবং তাঁর পিতা উভয়ই কলিঙ্গের রাজ দরবারে যুদ্ধ ও শান্তি মন্ত্রীর (সন্ধিবিগ্রহিকা মহাপাত্র) উপাধি পেয়েছিলেন।

বিশ্বনাথের পুত্র অনন্ত দাসও বিশ্বনাথ কবিরাজের রচিত সাহিত্যদর্পন-এ মন্তব্য ও টীকা লিখেছিলেন।

সাহিত্যকর্ম[সম্পাদনা]

তিনি ছিলেন বহুমুখী ক্ষমতাসম্পন্ন সাহিত্যিক। নন্দনতত্ত্ব অধ্যয়ন ও গবেষণা ছাড়াও তিনি সাহিত্যের সমস্ত শাখায় - কবিতা, গদ্য, সমালোচনা এবং নাটকে অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। তিনি সংস্কৃতপ্রাকৃত ভাষায় সমানভাবে সাহিত্য রচনা করেছেন। মনে করা হয়েছে তিনি প্রায় আঠারোটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি প্রশস্তি রত্নাবলী নামক একটি কাব্য ষোলটি ভাষায় রচনা করেছিলেন।

তাঁর কয়েকটি প্রধান রচনার মধ্যে রয়েছে চন্দ্রকাল নাটিকা (নাটিকা), প্রভাবতী পরিণয় (নাটক), রাঘব বিলাস (দীর্ঘ কবিতা), রাঘব বিলাপ (কবিতা), কুবলায়স্ব চরিত (প্রাকৃত ভাষার কবিতা), প্রশস্ত রত্নাবলি (ষোলটি ভাষায় রচিত কাব্য), নরসিংহ বিজয় (কবিতা), সাহিত্যদর্শন (অলংকারশাস্ত্র বিষয়ক), কাব্যপ্রকাশ দর্শন (সমালোচনা গ্রন্থ), কামসবাদ (কবিতা), এবং লক্ষ্মীস্তব (স্তব/শ্লোক)।

সাহিত্যদর্পণ[সম্পাদনা]

সাহিত্যদর্পণ বিশ্বনাথের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা এবং তর্কসাপেক্ষে ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্র বিষয়ক অন্যতম বিস্তৃত রচনা। অ্যা হিস্ট্রি অফ সংস্কৃত পয়েটিক্স (সংস্কৃত কাব্যের ইতিহাস) গ্রন্থের লেখক পি ভি কানের মতে, বিশ্বনাথ ১৩৮৪ খ্রিস্টাব্দের আগেই সাহিত্যদর্শন রচনা করেছেন।

সাহিত্যদর্পণ বইটি পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বেশি পঠিত এবং আলোচিত সংস্কৃত অলঙ্কারগ্রন্থ। বইটি এখনো বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিষয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। [২]

সাহিত্যদর্শন বইটি প্রধানত দুটি উপায়ে অলঙ্কারশাস্ত্রের পূর্বের কাজগুলির চেয়ে পৃথক। প্রথমত, প্রথমবারের মতো, এটি একটি গ্রন্থে, শ্রাব্য দিক (কাব্য) এবং (নাট্যকলা) উভয়ই একই সাথে বর্ণিত হয়েছে । বিশ্বনাথের আগে, আলংকারিকরা তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র একটি দিকেই (কাব্য অথবা নাট্যকলা) সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, যদিও তারা প্রায়ই অন্য দিকটিও উল্লেখ করেছিলেন।

এছাড়াও এই বিষয়টিতে পূর্বের লেখকরা তাদের নিজস্ব চিন্তাচেতনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু বিশ্বনাথ কবিরাজ ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রের সমস্ত ধারা সম্পর্কেই আলোচনা করেছেন।

সাহিত্যদর্পণ বইয়ে তিনি কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছিলেন বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম্ অর্থাৎ সরস বাক্যই হলো কাব্য। [২] কবিতার সংজ্ঞা দেওয়ার সময় আধুনিক সমালোচকরা প্রায়ই এই সংজ্ঞাটি ব্যবহার করেন। প্রথম শতাব্দীর পর থেকে সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের ক্ষেত্রে 'রস' একটি জটিল ধারণা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যাকে শতাব্দী পরে টি এস এলিয়ট 'অবজেক্টিভ করেলেটিভ' বলে অভিহিত করেছেন।

সাহিত্যদর্পণ বইটিতে দশটি অধ্যায় রয়েছে। এগুলো হল কাব্যস্বরূপ, বাক্যস্বরূপ, রস, কাব্যভেদ, ব্যঞ্জনা, দৃশ্য ও শ্রব্য কাব্য, কাব্যদোষ, গুণ, রীতি ও অলঙ্কার। বইটির প্রথম অধ্যায়ে কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাক্য বা রচনা কী তা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর তৃতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে - 'রস' সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর মধ্যে রয়েছে ষষ্ঠ (নাট্যকলা সম্পর্কিত অধ্যায়), নবম এবং দশম অধ্যায়। নবম অধায়ে 'রীতি' অর্থাৎ বাক্য শৈলীর সম্পর্কিত আলোচনা এবং দশম অধ্যায়ে বিভিন্ন তত্ত্ব উদাহরণ সহ ব্যাখ্যা করা হয়। [২]

অনেক সমালোচকই সাহিত্যদর্পন বইটিকে একটি মৌলিক রচনা না বলে সংকলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবুও বইটির কঠোর সমালোচকেরাও সম্মত হন যে এটি নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে সর্বাধিক বিস্তৃত কাজ। অনেকেই মনে করেন যে ভারতের বৃহৎ অংশে (কাশ্মীর থেকে দাক্ষিণাত্য) বইটির জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এর সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য রচনাশৈলী।

বিশ্বনাথ কবিরাজের উপর গবেষণা[সম্পাদনা]

দিল্লির সাহিত্য অকাদেমি সম্প্রতি ‘ভারতীয় সাহিত্যের নির্মাতাগণ’ ধারাবাহিকের অধীনে বিশ্বনাথ কবিরাজের জীবন ও রচনা সম্পর্কিত একটি বই প্রকাশ করেছে। ১৭২ পৃষ্ঠার এই বইটি লিখেছেন প্রখ্যাত লেখক ও শিল্প, ধর্ম ও ভাষার দার্শনিক অধ্যাপক অনন্ত চরণ শুকলা।

বইটিতে বিশ্বনাথ কবিরাজের কাব্যচর্চার একটি বিস্তৃত বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে এর ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন, সংস্কৃত কাব্যিকদের বিকাশের পূর্ববর্তী সময় থেকে তাঁর প্রবেশের আগ পর্যন্ত সমীক্ষা এবং বিশ্বনাথের মূল আগ্রহের বিষয় কবিতার সংজ্ঞা, গঠন এবং সমাপ্তির বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে।

বইটিতে বিশ্বনাথের জীবন ও কর্মের বিস্তৃত ভূমিকা সহ দুটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে যা সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্য সরবরাহ করে। প্রথম অধ্যায়ে তার সংস্কৃত কাব্য রচনা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিশ্বনাথের কবিতা তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ও তাঁর কবিতাগুলির জটিল কাঠামো ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Sri Caitanya Caritamrita Antya-lila ch1 v134"। www.vedabase.net। ৮ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১১ Acknowledging Visvanatha Kaviraja as the author of Sahitya-darpana
  2. ঘোষ, মনোরঞ্জন। "বিশ্বনাথ কবিরাজ"bn.banglapedia.orgবাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-২৭ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

  • বিশ্বনাথ কবিরাজ, লেখক: অনন্ত চরণ শুক্লা, সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশিত ভারতীয় সাহিত্যের নির্মাতাগণ ধারাবাহিকের অংশ, প্রকাশকাল: ২০১১
  • হিস্ট্রি অফ সংস্কৃত পয়েটিক্স (ইংরেজি), লেখক: পি ভি ক্যান
  • সাহিত্যদর্পণ (ইংরেজি অনুবাদ), লেখক: বিশ্বনাথ কবিরাজ

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]