বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাকৃত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(প্রাকৃত ভাষা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
এই চিত্রটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তিকে চিত্রিত করে

প্রাকৃত ভাষা বলতে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে লোকমুখে প্রচলিত স্বাভাবিক ভাষাগুলিকে বোঝায়। সংস্কৃত থেকেই উদ্ভব হয় প্রাকৃতের। সংস্কৃত ভাষা সাধারণ মানুষের মুখে বিকৃত তথা সহজীকৃত হয়ে প্রাকৃতে পরিণত হয়েছে।[] প্রাকৃত ভাষাগুলি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের ইন্দো-ইরানীয় শাখার ইন্দো-আর্য শাখার প্রাচীন নিদর্শন। এগুলি সংস্কৃতের মত মার্জিত সাহিত্যিক ভাষা ছিল না। তবে পরবর্তীকালে সংস্কৃতের মত এগুলিও মৃত ভাষায় পরিণত হয়।

প্রাকৃত ভাষাগুলির মধ্যে পালি ভাষা বৌদ্ধ সাহিত্যের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হত। প্রাকৃত ভাষাগুলি থেকেই নানা বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক ইন্দো-আর্য ভাষাগুলির উদ্ভব হয়েছে। মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা, অসমীয়া, বিহারী, ও ওড়িয়া ভাষা; শৌরসেনী প্রাকৃত ভাষা থেকে পশ্চিমী হিন্দি ও পাঞ্জাবি ভাষা; অর্ধমাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে পূর্বী হিন্দি; এবং মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত থেকে মারাঠি ভাষার উদ্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়। ২০২৪ সালের ৩রা অক্টোবর প্রাকৃত ভাষাকে ভারত সরকার কর্তৃক ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।

উৎপত্তি

[সম্পাদনা]

বৈদিক ভাষা --> সংস্কৃত ভাষা --> প্রাকৃত

বৈদিক ভাষা , সংস্কৃত ভাষার আদি রূপ । বিখ্যাত বৈয়াকরণবিদ পাণিনি বৈদিক ভাষাকে অনুশাসনে বেঁধে 'সংস্কৃত' করে মার্জিত শিষ্ট লেখ্য ভাষায় পরিণত করে সংস্কৃত ভাষা তৈরি করেন।[]

সুকুমার সেনের মতে, বৈদিক ভাষার কথ্য রূপের ক্রমশ সহজীভবন আর সংস্কৃতের সহজীভবন - এ দুটি উৎস থেকে প্রাকৃত তৈরি হয়েছে। []

বৈদিক ভাষা ক্রমশ সরল হয়ে সংস্কৃত ভাষায় পরিবর্তিত হয়। তার পরে, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী হতে, ভারতীয় আর্য ভাষার কাঠামো পরিবর্তন হয়ে প্রাকৃতে পরিণত হল।[] 'প্রাকৃত” বা 'প্রাকৃত ভাষা” কথাটির আসল তাৎপর্য প্রকৃতির অর্থাৎ জনগণের কথ্য ও বোধ্য ভাষা। যেমন, শিষ্ট সমাজের “শুদ্ধ” ভাষা “সংস্কৃত” । সংস্কৃত প্রাকৃতে পরিণত হলে প্রধানত তিন বিষয়ে পরিবর্তন দেখা গেল- (১) ধ্বনিতে, (২) শব্দ ও ধাতু-রূপে, এবং (৩) পদ-যোগে।[]প্রাকৃত ভাষার স্থিতিকাল প্রায় দেড় হাজার বছর-খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।[]

সংস্কৃতের তুলনায় প্রাকৃত কোথায় আলাদা তা কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখানো যেতে পারে। []

১. যুক্তব্যঞ্জন অধিকাংশ ক্ষেত্রে যুগ্মধ্বনিতে পরিণত হয়েছে-ধর্ম > ধর্ম্ম, কার্য > কজ্জ, অষ্ট > অষ্ঠ।

২. শব্দের আদিতে যুক্তব্যঞ্জন থাকলে তা একক ধ্বনি হয়ে গেছে-ব্রাহ্মণ > বমহণ, গ্রহণ > গহণ, দ্বাদশ > দুবাদস।

৩. পদের মধ্যের বা শেষের একক ব্যঞ্জনটি অল্পপ্রাণ হলে লুপ্ত হয়েছে, মহাপ্রাণ হলে তা হ্-তে পরিণত হয়েছে-শেফালিকা > সেহালিআ, লোক> লোঅ ,লঘু > লহু।

৪. পদের আদিতে বা মধ্যে ঐ-কার থাকলে তা হয়েছে এ-কার, এবং ঔ-কার থাকলে হয়ে ও-কার-বৈদ্য > বেজ, তৈল > তেল; পৌর> পোর।

৫. শব্দরূপে এবং ধাতুরূপে সংস্কৃতের দ্বিবচন প্রাকৃতে সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে।

৬. আত্মনেপদী ধাতুর প্রয়োগ নিয়ে নিয়েছে পরস্মৈপদী।[]

সংজ্ঞা

[সম্পাদনা]

আধুনিক পণ্ডিতগণ দুটি ধারণাকে বোঝাতে "প্রাকৃত" শব্দটি ব্যবহার করেছেন:

  • প্রাকৃত ভাষা: নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত সাহিত্যিক ভাষার একটি দল
  • প্রাকৃত ভাষা: প্রাকৃত ভাষাগুলির মধ্যে একটি, যা একাকী পুরো কবিতার প্রাথমিক ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হত

কিছু আধুনিক পণ্ডিতের মধ্যে 'প্রাকৃত' র মুদ্রকের নিচে সমস্ত মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, আবার অন্যরা বর্ণ, ধর্ম এবং ভূগোলের বিভাজন দ্বারা সংস্কৃত ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই ভাষাগুলির স্বাধীন বিকাশের উপর জোর দেয়।

বিস্তৃত সংজ্ঞাটি "প্রাকৃত" শব্দটি ব্যবহার করে যে কোনও মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষা যে কোনওভাবে সংস্কৃত থেকে বিচ্যুত হয় তা বর্ণনা করতে।  আমেরিকান পণ্ডিত অ্যান্ড্রু ওলেট বলেছেন যে এই অসন্তুষ্টিহীন সংজ্ঞাটি "প্রাকৃত" এমন ভাষাগুলির জন্য একটি প্রচ্ছদ পদে পরিণত হয়েছে যেগুলি প্রাচীন ভারতে প্রকৃত নামে পরিচিত ছিল না, যেমন:

  • অশোকের শিলালিপিগুলির ভাষা
  • "স্মৃতিচিহ্ন প্রাকৃত", "লেনা প্রাকৃত", বা "স্তূপ উপভাষা" লেবেলযুক্ত ভারতের পরবর্তী শিলালিপিগুলির ভাষা
  • " সিংহলী প্রাকৃত " লেবেলযুক্ত শ্রীলঙ্কার শিলালিপির ভাষা
  • পালি, থেরবাদ বৌদ্ধ ক্যাননের ভাষা
  • বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত
  • গান্ধারী, উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে পশ্চিমা চীন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটিতে বার্চ-বাকল স্ক্রোলগুলির ভাষা আবিষ্কার করা হয়েছিল

জার্মান ইন্দোলজিস্ট রিচার্ড পিসেল এবং ওসকার ভন হিনবারের মতো কিছু পণ্ডিতের মতে, "প্রাকৃত" শব্দটি এমন একটি ছোট্ট সংকলনকে বোঝায় যা কেবলমাত্র সাহিত্যে ব্যবহৃত হত:

  • প্রাকৃতিক প্রাকৃত
    • এই ভাষাগুলি নাটকগুলিতে এককভাবে ব্যবহৃত হয়, গৌণ ভাষা হিসাবে
    • তাদের নামগুলি আঞ্চলিক সংস্থার (উদাহরণস্বরূপ শৌরসেনী, মগধী এবং অবন্তী) নির্দেশ করে, যদিও এই সংস্থাগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধারণাযুক্ত
  • প্রাথমিক প্রাকৃত
    • এই ভাষাগুলি সাহিত্যিক ক্লাসিকের প্রাথমিক ভাষা যেমন গাহা সাতসইয়ের হিসাবে ব্যবহৃত হয়
    • এর মধ্যে মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত বা "প্রাকৃত পার উৎকর্ষ " অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দন্ডিনের কাব্যদর্শ অনুসারে মহারাষ্ট্র অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এবং যেখানে রাবণ-বাহো (বা সেতুবন্ধ) এর মতো কবিতা রচিত হয়েছিল।

সংস্কৃত পণ্ডিত এসি ওলনারের মতে, অর্ধমাগধি (বা কেবল মগধী) প্রাকৃত, যা জৈন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ রচনার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত, প্রায়শই প্রকৃতের চূড়ান্ত রূপ হিসাবে বিবেচিত হয়, অন্যরা এর রূপ হিসাবে বিবেচিত হয়। প্রাকৃত ব্যাকরণীয়রা প্রথমে অর্ধমগধীর সম্পূর্ণ ব্যাকরণ দেবে এবং তার সাথে এর সাথে অন্যান্য ব্যাকরণকে সংজ্ঞায়িত করবে। এ কারণে প্রায়শই 'প্রাকৃত' পড়ানোর পাঠ্যক্রমগুলি অর্ধমাগধী শিক্ষা হিসাবে বিবেচিত হয়।

প্রকারভেদ

[সম্পাদনা]

প্রধান প্রাকৃতভাষাগুলি হল[] -

১.মহারাষ্ঠ্রী,

২.শৌরসেনী- শূরসেন( অর্থাৎ মথুরা ) অঞ্চলের কথ্য ভাষা, সংস্কৃত ভাষার প্রভাব রয়েছে।[১০]

৩.অর্ধমাগধী;

৪.মাগধী- মগধের ( অর্থাৎ দক্ষিণ বিহারের ) কথ্যভাষা[১১]

৫.পৈশাচী - শিষ্ট সাহিত্যে পৈশাচী প্রাকৃতের স্থান হয়নি, কিন্ত লোক-সাহিত্যে এর সমাদর ছিল।[১২] সুকুমার সেনের মতে পৈশাচী পালি ভাষারই নামান্তর।[১৩]


৬.অপভ্রংশ বা অবহ্ট্‌ঠ - অপভ্রংশ নামটি একাধিক মধ্য ভারতীয়-আর্য ভাষার অর্থে প্রচলিত ।[১৪] অপভ্রংশের পরবর্তী স্তরই হল অবহট্ট। অপভ্রংশের পরে অবহট্ট-তে এসে মধ্য ভারতীয়-আর্য ভাষার স্থিতিকাল শেষ হয়।[১৫]

মাগধী অপভ্রংশ বাংলার জননী।[১৬]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৮।
  2. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৬।
  3. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৬।
  4. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৭৯।
  5. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৭৯।
  6. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৮।
  7. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৮।
  8. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৮।
  9. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৯২।
  10. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৯২-৯৩।
  11. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৯৩।
  12. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৯৪।
  13. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৯।
  14. ভাষার ইতিবৃত্ত [খন্ড-৫]। সুকুমার সেন। পৃ. ৯৫।
  15. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৬৯।
  16. ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা। Subhash Bhattacharya। পৃ. ১৭২।