বারহমাসা

বারহমাসা (হিন্দি: बारहमासा, অনুবাদ 'বারো মাস') ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় একটি কাব্যিক ধারা[১][২][৩] যা মূলত ভারতীয় লোক ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত।[৪] এই কাব্যিক ধারায় সাধারণত একজন বিরহী মহিলার তার অনুপস্থিত প্রেমিক বা স্বামীর জন্য যে আকাঙ্ক্ষা তার বর্ণনা করা হয় এবং এর সাথে উপযুক্ত চিত্রকল্প সংযোজন করা হয় যাতে মৌসুমী আচার অনুষ্ঠানের পটভূমিতে বিরহী মহিলার মানসিক অবস্থা বর্ণনা করা হয়।[৫][৬] হিন্দু চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুসারে মাসের অগ্রগতির বর্ননা হল এই শিল্প ধারার একটি মৌলিক উপাদান। তবে এই শিল্পধারার কিছু ব্যতিক্রম আছে যেখানে মাসের সংখ্যা বারো (হিন্দি: बारह, উর্দু: بارہ) না হয়ে চার বা আট মাসের এক বছর বিবেচনা করা হয়, যা চৌমাসাস, চয়মাসাস এবং অষ্টমাস (যথাক্রমে চার, ছয় এবং আট মাসের চক্র)নামে পরিচিত লোক ঐতিহ্য। এগুলি বারহমাসারই ভিন্ন প্রকরণ।[৭]
বারহমাসা মূলত একটি মৌখিক ঐতিহ্য। ভারতীয় কবিদের অগনিত দীর্ঘ কবিতা, মহাকাব্য এবং আখ্যান এই বারহমাসা ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত।[৮] এই কাব্যিক ঐতিহ্যে আধুনিক ইন্দো-আর্য ভাষাগুলির মধ্যে— হিন্দি, উর্দু, বাংলা, গুজরাটি, রাজস্থানী ভাষা, বিহারী ভাষা, পাঞ্জাবি ইত্যাদি ভাষারই প্রাধান্য দেখা যায়। কিছু আদিবাসীদের লোককাব্যকেও বারহমাসা কাব্যিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত করা হয়।[৯]
উৎপত্তি
[সম্পাদনা]ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]বারহমাসা শব্দটি দুটি হিন্দি শব্দের সংমিশ্রণে সৃষ্ট। বারাহ ( হিন্দি: बारह , উর্দু: بارہ )যার অর্থ বারো সংখ্যা এবং মাসা ( হিন্দি: मास , উর্দু: ماہ )যার আক্ষরিক অর্থ মাস। [১০] বাংলায় বারোমাসি শব্দটিও এই বারহমাসা কাব্যিক বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। [১১]
সাহিত্য
[সম্পাদনা]
হিন্দি-উর্দু
[সম্পাদনা]বরাহমাস এবং ছয়টি ঋতুর বর্ননা আওয়াধি প্রেম উপাখ্যান, [১২] রাজস্থানী রাসস ('গাথা') যেমন নলহা কবির বিসালদেব-রাস [৮] ইত্যাদিতে বিশেষভাবে [১৩] সেইসাথে বিখ্যাত ব্রজভাষা কবি কেশবদাসের রচনায়, [১৪] তুলসীদাস এবং সুরদাসের কয়েকটি ভক্তিমূলক রচনা যেগুলি প্রধানত রাম - কৃষ্ণের উপাসনাকে কেন্দ্র করে রচিত, তাতেও বারাহমাস কাব্যধারার প্রভাব পাওয়া গেছে। [১৫] [১০]
বারাহমাস ধারার প্রভাব প্রথমে হিন্দি কাব্যসাহিত্যের অংশ ছিল এবং পরে তা ধীরে ধীরে উর্দু সাহিত্যেও অন্তর্ভুক্ত হয়। ওরসিনির মতে ১৮৬০ সালে উত্তর ভারতে এর ব্যাপক প্রচার দেখা যায়। [১৬]
বাংলা
[সম্পাদনা]বাংলায় মঙ্গল-কাব্য নামে পরিচিত ভক্তিমূলক সাহিত্যে বারোমাসি ধারার প্রভাব দেখা গেছে। চন্দ্রাবতীর হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণের অনুবাদেও বারোমাসি ধারার অন্তর্ভুক্তিকরন করা হয়েছিল। এই কাব্যের একটি অংশে বর্ননা করা হয়েছে যে সীতা সারা বছর ধরে রামের সাথে তার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করছেন। [১১]সেই অংশে বারোমাসি ধারার প্রভাব স্পষ্ট।
ফার্সি
[সম্পাদনা]ফার্সি ভাষায় প্রাচীনতম এবং একমাত্র সাহিত্য যাতে বারাহমাসা ধারার প্রভাব দেখা গেছে সেটি সাদ-ই-সালমান রচিত। কবি লাহোরে বসবাস করতেন। তাই সম্ভবত ভারতীয় লোক্কথা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু এর বিষয়বস্তু কোনো নারীর আকাঙ্ক্ষা বা প্রেমিকদের মিলন নয়। ইরানি মাস পারভারদিন এর বর্ননা এতে পাওয়া যায়। [১২]
গুজরাটি
[সম্পাদনা]উনিশ শতকের গোড়ার দিকে গুজরাটে কবি-সাধক ব্রহ্মানন্দ বারাহমাস ধারার পুনর্গঠন করেন এবং স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ের ধর্মতত্ত্বকে এই ধারার সাথে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর রচনাগুলি বৃহত্তর কৃষ্ণ-ভক্তি কাব্যের অন্তর্গত। [১৭]
চিত্রকলা
[সম্পাদনা]ভারতীয় চিত্রকলাতেও বারাহমাস ধারার বিশেষ প্রভাব দেখা গেছে। 'বুন্দি চিত্রকলা বিদ্যালয়'-এর শিল্পীরা ও বিভিন্ন চিত্রকলা শিক্ষালয় এই ধারাটি ব্যবহার করে বছরের বিভিন্ন মাসকে চিত্রিত করে বেশ কিছু ক্ষুদ্রাকৃতির চিত্র অংকন করেন। জাতীয় জাদুঘর, নয়াদিল্লিতে প্রায় ১৩৮টি বারহমাসা চিত্রকর্ম রয়েছে। এই পেইন্টিংগুলির বেশিরভাগই ১৮ শতকের শেষ থেকে ১৯শতকের শুরুর দিকের সময়কালে অঙ্কিত। [১৮]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Raheja, Gloria Goodwin (২০১৭)। ""Hear the Tale of the Famine Year": Famine Policy, Oral Traditions, and the Recalcitrant Voice of the Colonized in Nineteenth-Century India" (ইংরেজি ভাষায়)। ডিওআই:10.1353/ort.2017.0005। আইএসএসএন 1542-4308 – Project MUSE এর মাধ্যমে।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}:|hdl-access=এর জন্য|hdl=প্রয়োজন (সাহায্য); উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য) - ↑ Raeside, I. M. P. (১৯৮৮)। "Bārahmāsā in Indian literatures. Songs of the twelve months in Indo-Aryan literatures. By Charlotte Vaudeville with a foreword by T. N. Madan. pp. xvi, 139. DelhiMotilal Banarsidass, 1986. (Revised and enlarged English edition, first pub. in French, 1965.) Rs. 70." (ইংরেজি ভাষায়): ২১৮। ডিওআই:10.1017/S0035869X00164652। আইএসএসএন 2051-2066।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য) - ↑ Dwyer, Rachel; Dharampal-Frick, Gita (২০১৬)। "Monsoon"। Key Concepts in Modern Indian Studies (English ভাষায়)। NYU Press। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৭৯৮-২৬৮৩-৪ – Project MUSE এর মাধ্যমে।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক) - ↑ Wadley, Susan Snow (২০০৫)। Essays on North Indian Folk Traditions (ইংরেজি ভাষায়)। Orient Blackswan। পৃ. ৫৭। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮০২৮-০১৬-০।
- ↑ Orsini, Francesca (২০১০)। "Barahmasas in Hindi and Urdu"। Before the divide: Hindi and Urdu literary culture। Orient BlackSwan। পৃ. ১৪৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৫০-৩৮২৯-০। ওসিএলসি 490757928।
- ↑ Claus, Peter J.; Diamond, Sarah (২০০৩)। South Asian Folklore: An Encyclopedia : Afghanistan, Bangladesh, India, Nepal, Pakistan, Sri Lanka (ইংরেজি ভাষায়)। Taylor & Francis। পৃ. ৫২। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৯৩৯১৯-৫।
- ↑ Alam, Muzaffar (২০০৩)। "The Culture and Politics of Persian in Precolonial Hindustan"। Literary Cultures in History: Reconstructions from South Asia (English ভাষায়)। University of California Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২০-৯২৬৭৩-৮।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক) - 1 2 Orsini, Francesca (২০১০)। "Barahmasas in Hindi and Urdu"। Before the divide : Hindi and Urdu literary culture। Orient BlackSwan। পৃ. ১৪৭। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৫০-৩৮২৯-০। ওসিএলসি 490757928।
- ↑ Wadley, Susan Snow (২০০৫)। Essays on North Indian Folk Traditions (ইংরেজি ভাষায়)। Orient Blackswan। পৃ. ৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮০২৮-০১৬-০।
- 1 2 Srivastava, P.K. (২০১৬)। "Separation and Longing in Viraha Barahmasa": ৪৩–৫৬।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য) - 1 2 Bose, Mandakranta; Bose, Sarika Priyadarshini (২০১৩)। A Woman's Ramayana: Candrāvatī's Bengali Epic (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃ. ৩০–৩২। আইএসবিএন ৯৭৮-১-১৩৫-০৭১২৫-৭।
- 1 2 Pandey, Shyam Manohar (১৯৯৯)। "Brahamasa in Candayan and in Folk Traditions"। Studies in early modern Indo-Aryan Languages, Literature, and Culture : research papers, 1992–1994, presented at the Sixth Conference on Devotional Literature in New Indo-Aryan Languages, held at Seattle, University of Washington, 7–9 July 1994। Entwistle, A. W.। Manohar Publishers & Distributors। পৃ. ২৮৭, ৩০৩, ৩০৬। আইএসবিএন ৮১-৭৩০৪-২৬৯-১। ওসিএলসি 44413992।
- ↑ Vaudeville, Charlotte (১৯৮৬)। Bārahmāsā in Indian Literatures: Songs of the Twelve Months in Indo-Aryan Literatures (ইংরেজি ভাষায়)। Motilal Banarsidass। পৃ. ১২। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-০১৮৫-১।
- ↑ Sodhi, Jiwan (১৯৯৯)। A Study of Bundi School of Painting (ইংরেজি ভাষায়)। Abhinav Publications। পৃ. ৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭০১৭-৩৪৭-২।
- ↑ Vaudeville, Charlotte (১৯৮৬)। Bārahmāsā in Indian Literatures: Songs of the Twelve Months in Indo-Aryan Literatures (ইংরেজি ভাষায়)। Motilal Banarsidass। পৃ. ৪১। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-০১৮৫-১।
- ↑ Orsini, Francesca (২০১০)। Before the divide: Hindi and Urdu literary culture। Orient BlackSwan। পৃ. ১৬৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৫০-৩৮২৯-০। ওসিএলসি 490757928।
- ↑ Swaminarayan Hinduism : tradition, adaptation and identity। Williams, Raymond Brady., Trivedi, Yogi. (1st সংস্করণ)। Oxford University Press। ২০১৬। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৯০৮৬৫৭-৩। ওসিএলসি 948338914।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অন্যান্য (লিঙ্ক) - ↑ Beach, Milo Cleveland (১৯৭৪)। "Rajput Painting at Bundi and Kota": ৫৫–৫৬। ডিওআই:10.2307/1522680। আইএসএসএন 1423-0526। জেস্টোর 1522680।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য)