বিষয়বস্তুতে চলুন

ফ্যাসিবাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বেনিতো মুসোলিনি (বাম) এবং আডলফ হিটলার (ডান), যথাক্রমে ফ্যাসিস্ট ইতালি এবং নাৎসি জার্মানির নেতা।

ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উগ্র-ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব ঘটে। এই মতাদর্শে বিরোধীদের কোন জায়গা নেই। ফ্যাসিবাদীরা প্রায়শই সর্বগ্রাসী একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভূমিকা পালন করে। কর্তৃত্বময় শাসন ক্ষমতাই ‘ফ্যাসিবাদ’ এর মূলমন্ত্র।

ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি এবং এর তাৎপর্য

[সম্পাদনা]

ফ্যাসিবাদ শব্দটি ইতালীয় শব্দ "fascismo" থেকে উদ্ভূত, যা "fascio" শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘লাঠির বান্ডিল’, যা প্রাচীন রোমান প্রতীক "fasces" থেকে উদ্ভূত। এই প্রতীকটি একাধিক লাঠির বান্ডিলের সাথে একটি কুড়ালকে ঘিরে রাখা হতো, যা শক্তি এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

ফ্যাসিবাদের মূল আদর্শ ছিল একদলীয় শাসনব্যবস্থা, যেখানে জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদ ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন রোমান ফ্যাসেসের মতোই এটি শক্তি ও শৃঙ্খলার উপর জোর দেয়।

ফ্যাসিবাদের জন্ম এবং উন্নয়ন

[সম্পাদনা]

ফ্যাসিবাদ প্রথম উদ্ভব ঘটে ইতালিতে। ১৯১৫ সালে বেনিতো মুসোলিনি' ইতালিতে ফ্যাসেস অফ রেভোলিউশনারি অ্যাকশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ১৯১৯ সালে মুসোলিনি মিলানে ইতালীয় ফ্যাসিস অফ কমব্যাট গঠন করেন। দুই বছরের মধ্যেই এটি জাতীয় ফ্যাসিস্ট পার্টিতে রূপান্তরিত হয়।

এই শাসনব্যবস্থাটি একটি কর্তৃত্ববাদী এবং জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। এটি মানুষের স্বাধীনতাকে সীমিত করে যেখানে একক শাসক বা দলই সব ক্ষমতা ধরে রাখে।

প্রতীক ও এর তাৎপর্য

[সম্পাদনা]

ফ্যাসেস প্রতীক ঐক্যের মাধ্যমে শক্তির ধারণা প্রকাশ করে। একটি একক লাঠি সহজেই ভেঙে যায়, কিন্তু লাঠির বান্ডিল ভাঙা অনেক কঠিন। এই প্রতীকটি বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্পেনের ফ্যালাঞ্জ প্রতীক ছিল একটি জোয়ালের মাধ্যমে সংযুক্ত পাঁচটি তীর।

ফ্যাসিবাদী নেতারা, যেমন আডলফ হিটলার এবং বেনিতো মুসোলিনি, এই প্রতীককে ব্যবহার করে তাদের শক্তি ও শাসনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

বৈশিষ্ঠ্য

[সম্পাদনা]

ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক সহিংসতা সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতা এবং যুদ্ধ সহ সহিংসতার বিভিন্ন রূপকে জাতীয় পুনরুজ্জীবনের উপায় হিসেবে দেখে।[] ফ্যাসিবাদীরা প্রায়শই সর্বগ্রাসী একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভূমিকা পালন করে।[][] একজন ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদে বিশ্বাস করেন। নিজেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ দাবি করেন। তিনি সামরিক শক্তির প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধা দেখান এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করেন।[]

ফ্যাসিবাদের কয়েকটি মূল স্তম্ভ হলো একনায়ক বা নেতার অন্ধ অনুকরণ (লিডার কাল্ট), সহিংস দলীয় মিলিশিয়া বাহিনীর উপস্থিতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ তৈরি করা, আইনের শাসনকে ‘আইনের দ্বারা শাসনে’ পরিণত করা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণাকে ভীতি ও দমনের হাতিয়ার বানানো। []

ফ্যাসিবাদের মূল লক্ষ্য হলো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা হয়। এখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ মানেই কিন্তু জনগণের স্বার্থ নয় ক্ষমতায় থাকা একনায়ক ও তাঁর সমর্থক দলের সুবিধাভোগী অংশের স্বার্থকে বোঝানো হয়।[]

ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন জাতি অভিবাসী জাতি, ফ্যাসিবাদী দলগুলির রাজনৈতিক বিরোধী, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘুদের মতো " অন্যান্য "দের বিরোধিতা এবং দানবীকরণ করে।[][]দেশে যে কোন ধরণের সমস্যার জন্য ফ্যাসিস্টরা অন্যের ওপর দোষ চাপাতে পছন্দ করতেন। এজন্য তারা কাউকে না কাউকে বলির পাঠা বানাতেন। ফ্যাসিবাদী নেতারা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি হতে পারে জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনো গোষ্ঠী। এই বিভাজনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ভয় এবং ক্ষোভ ছড়ানো হয়। বিভক্ত প্রতিপক্ষকে উসকে দিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অ্যাকশন নেওয়া হয়।[] এই ধরনের দানবীকরণ ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে গণহত্যা জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ , নির্বাসন এবং গণহত্যা করতে অনুপ্রাণিত করে ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় , ফ্যাসিবাদী অক্ষশক্তির গণহত্যা এবং সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যার দিকে পরিচালিত করেছিল।

ফ্যাসিস্টরা সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরোধী ।ফ্যাসিজমকে মনে করা হতো পুঁজিবাদ বিরোধী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্ষমতা নেবার পর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করেনি ক্ষমতায় আসার পর ফ্যাসিস্টরা ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে, শ্রমিক সংগঠনগুলো ভেঙ্গে দেয়। তারা বেশি চড়াও হয়েছে সমাজতন্ত্রীদের ওপর।[১০] ফ্যাসিবাদী শাসকরা দেশের মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা শুধু এমন তথ্য প্রচার করে, যা তাদের পক্ষে যায় এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করে বিভিন্নভাবে।[১১]

ফ্যাসিবাদের প্রভাব

[সম্পাদনা]

ফ্যাসিবাদ প্রথমে ইতালিতে শুরু হলেও, এটি জার্মানি, স্পেন এবং অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মানিতে হিটলারের অধীনে নাৎসি শাসন এবং স্পেনে ফ্রাংকোর শাসন ফ্যাসিবাদী আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল।

ফ্যাসিবাদের এই ধরণগুলি বিশ্বে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়। এটি বিশ্বযুদ্ধ এবং গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটায়, যা মানুষের জীবনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে গেছে।

the sign of fasces
the killing mission of approximately 6 million jews which is called Hollocaust.

উপসংহার

[সম্পাদনা]

ফ্যাসিবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক আদর্শ নয় এটি একটি দুঃখজনক ইতিহাস, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কর্তৃত্ববাদ এবং স্বাধীনতা হরণের মধ্যে কী ক্ষতি লুকিয়ে থাকে। শক্তি এবং ঐক্যের ভুল ব্যাখ্যা মানবজাতির জন্য ধ্বংস ডেকে আনে। আমাদের উচিত এই আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যকে রক্ষা করা।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Rietbergen (2000), পৃ. 160–161।
  2. Griffin (2013), পৃ. 1–6।
  3. Mussolini (2002), পৃ. 40।
  4. "ফ্যাসিবাদী শাসকের পতন হলেও ফ্যাসিবাদ যেভাবে থেকে যায়"। প্রথম আলো। ১৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  5. "ফ্যাসিবাদের মানদণ্ডে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামল"। প্রথম আলো। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  6. "ফ্যাসিবাদী শাসকের পতন হলেও ফ্যাসিবাদ যেভাবে থেকে যায়"। প্রথম আলো। ১৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  7. (এপ্রিল ২০০৩a)। "To Expand or Not to Expand? Territory, Generic Fascism and the Quest for an 'Ideal Fatherland'"। Journal of Contemporary History৩৮ (2): ২৩৭–২৬০। ডিওআই:10.1177/0022009403038002132এস২সিআইডি 159641856
  8. Marhoefer ও The Conversation (2023)
  9. "যেভাবে সরকার ফ্যাসিবাদী হয়"। Desh Rupantor। ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  10. "ফ্যাসিবাদ কী? ফ্যাসিস্টদের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল?"। বিবিসি বাংলা। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  11. "যেভাবে সরকার ফ্যাসিবাদী হয়"। Desh Rupantor। ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]