নদীভাঙন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
নদীভাঙনের কবলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পদ্মা নদীসংলগ্ন মনপুরা চর

নদীভাঙন, এক প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদীর সমুদ্রে গিয়ে পড়ার সময় সাধারণত সমুদ্রের কাছাকাছি হলে তীব্র গতিপ্রাপ্ত হয়। তখন পানির তীব্র তোড়ে নদীর পাড় ভাঙতে থাকে। নদীর পানির স্রোতে নদীর পাড় ভাঙার এই অবস্থাকে নদীভাঙন বলে।

বিবরণ[সম্পাদনা]

পানিচক্রের প্রভাবে পর্বতের গায়ে বরফ জমে, সেই বরফ গলা পানি পর্বতের গা থেকে নেমে আসে। এভাবে নদীর সৃষ্টি হয়। নদীর এই পানি সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। সাধারণত সমুদ্রের কাছাকাছি অংশে নদীর পানি তীব্র গতিতে ছুটে চলে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে উজানে তীব্র বৃষ্টিপাত হলেও নদীর পানি বেড়ে যায়। তখন নদীতে স্রোতও বেড়ে যায়। নদীর এই তীব্র স্রোত ভাটার দিকে চলার পাশাপাশি নদীর পাড় আঘাত করতে থাকে। পানির এই ক্রমাগত তীব্র আঘাতে নদীতীরবর্তী ভূভাগ ক্ষয় হতে থাকে। একসময় মাটি ক্ষয় হতে হতে যখন উপরের মাটির ভার সহ্য করতে পারে না, তখন উপরের অক্ষয় মাটিসহ নদীপাড়ের বিশাল অংশ বা চাড়া নদীর মধ্যে ভেঙে পড়ে। এসব কারণে ভাঙন এলাকায় নদীর পানি হয় গলিত মাটিপূর্ণ, ঘোলা।

আরো একটি কারণে এমনটা হতে পারে। সাধারণত নদী, তার পানির গতিপথে কোনো বাধা পেলে তাতে তীব্র আঘাত করে। নদী, গতিপথ বদলাবার সময় যেদিকে গতি বদলায়, সেদিকের পাড়ে বারবার তীব্রগতিতে আঘাত করতে থাকে। সাধারণত উপকূল এলাকা পলিগঠিত হওয়ায়, নরম পলিমাটির স্তর সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ভেঙ্গে পড়ে। এভাবে নদী একদিকের পাড় ভাঙতে থাকলেও অপর দিক থেকে গতি বদলে নেয় বলে অপর দিকে গলিত পলিমাটি নিয়ে জমা করতে থাকে। তাই নদীভাঙনের মাধ্যমে নদীর একপাড় ভাঙে, আরেক পাড় গড়ে।

বাংলাদেশের নদীভাঙন[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে, সাধারণত বর্ষাকালে উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাতের দরুন নদীর পানি বেড়ে যায় এবং তা প্রচন্ড গতিতে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। এসময় উপকূলীয় অঞ্চলের নদীসংলগ্ন স্থলভাগে পানির তীব্র তোড়ে সৃষ্টি হয় নদীভাঙনের। বাংলাদেশে এটা স্বাভাবিক চিত্র হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় তা আর স্বাভাবিক বলে পরিগণিত হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যমতে, পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন অব্যাহত আছে। আরও প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে কৃষি জমির এক বিরাট অংশ নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে।[১] অথচ এর বিপরীতে যে চর জেগে উঠছে, তা অপ্রতুল।[১]

ভোলা[সম্পাদনা]
উপগ্রহের তথ্যানুযায়ী তৈরি করা হাতিয়া ও ভোলার ভূমিগঠন ও ভাঙনের চিত্র

বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS) উপগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, ১৯৭৩-২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভোলার মূল ভূভাগ থেকে ২৪০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় ভোলার উত্তর-পূর্ব দিকে ভাঙনের প্রবণতা বেশি। যদিও একই সময়ে ৭০ বর্গ কিলোমিটার নতুন চর ভোলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু ভাঙনের তুলনায় তা যৎসামান্য। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, ২০০৪-২০০৮ -এই চার বছর ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে, আর ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে তা সর্বোচ্চ হয়েছে।[২]

কোপেনহেগেনে জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (২০০৯) বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনগুলির একটিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন অব্যাহত আছে। এবং আরও প্রায় ৫০০ কিলোমিটার জুড়ে নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে।[২]

ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নেরর একটি অংশের নাম ঘর রাজাপুর, অন্য অংশটির নাম বাহির রাজাপুর। বাহির রাজাপুরে ৬ বছর আগেও (পরিপ্রেক্ষিত ২০০৯) ১৭টি গ্রাম ছিলো; ভাঙনের ফলে তা এসে ঠেকেছে মাত্র ৬টিতে। পাশাপাশি ২০০৯ সালে ভাঙন কবলিত ছিলো সীতারাম এবং উত্তর রামদাসপুর। মনপুরা উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে বিগত ১৫ বছরের তুলনায় ২০০৯ সালের ভাঙনের হার বেশি (পরিপ্রেক্ষিত ২০০৯)।[২]

হাতিয়া[সম্পাদনা]
সহায়ক নিবন্ধ: হাতিয়া উপজেলা

২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রেক্ষাপটে হাতিয়ার উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাংশের তমরদ্দি, চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়ন এবং সুখচর ও নলচিরার অবশিষ্টাংশ ব্যাপক ভাঙনের কবলে রয়েছে। নদীভাঙনের পর হাতিয়া উপজেলা পরিষদ ১৯৮৫-৮৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান উপজেলা সদর ওছখালিতে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। ভাঙনের কবলে ইতোমধ্যেই রাজকুমার সাহার হাট, মনু বেপারির হাট, হিজিমিজির বাজার, নায়েবের হাট, সাহেবের হাট, নলচিরা বাজার, সাহেবানী বাজার, চৌরঙ্গী বাজার, জাইল্লা বাজার, মফিজিয়া বাজার, নলচিরা নতুন বাজার ও ভুঞার হাট মেঘনাগর্ভে হারিয়ে গেছে। হাতিয়া উপজেলা সরকারি কমিশনার (ভূমি) অফিসসূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভাঙনের কবলে উপজেলার সাগরদি, চরবাটা, মাইজচরা, চর হাসান-হোসেন, চরকিং, উত্তর চরকিং, কাউনিয়া, চরবগুলা, চরআমানুল্লাহ, দক্ষিণ চরআমানুল্লাহ মৌজাগুলো মেঘনাগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া আরো ২০টি মৌজার বেশিরভাগই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।[২]

হাতিয়া যে হারে ভাঙছে, সে হারে নতুন জমি হাতিয়ার সাথে যুক্ত হচ্ছে না। সিইজিআইএস-এর উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষিত মত হলো ১৯৭৩-২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হাতিয়ার মূল ভূভাগ থেকে ১৫০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। দেখা যায়, হাতিয়ার চারদিকই ভাঙছে, তবে প্রবণতা বেশি উত্তরদিকে। পলি জমে দক্ষিণ-পশ্চিমে সাত বর্গকিলোমিটার জমি যুক্ত হলেও ভাঙনের তুলনায় তা যৎসামান্য।[২]

নিঝুম দ্বীপ[সম্পাদনা]
সহায়ক নিবন্ধ: নিঝুম দ্বীপ

নিঝুম দ্বীপে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা বন ধ্বংসের পথে। নদীভাঙন ছাড়াও ঘূর্ণিঝড় আইলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই কৃত্রিম উপকূলীয় বনটি। দিনে দিনে বনটি ছোট হয়ে আসছে। এই বন বিলুপ্ত হলে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বঙ্গোপসাগরের আগ্রাসনে টিকতে পারবে না দ্বীপের ২২,০০০-এরও বেশি মানুষ, আর ২০,০০০-এর মতো হরিণ[৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিসেম্বর ১৩, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ)। "জলবায়ু পরিবর্তনের গ্রাসে বাংলাদেশ"। বিশেষ সংখ্যা দৈনিক প্রথম আলো (প্রিন্ট)। ঢাকা। পৃষ্ঠা ৪ ও ৮।  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য);
  2. শিশির মোড়ল, নেয়ামতউল্লাহ, মানিক মজুমদার (১৩ ডিসেম্বর ২০০৯)। "ভাঙনে ছোট হচ্ছে ভোলা, হারিয়ে যাবে হাতিয়া"। বিশেষ সংখ্যা, দৈনিক প্রথম আলো (প্রিন্ট)। ঢাকা। পৃষ্ঠা ৩ ও ৮। 
  3. শিশির মোড়ল (ডিসেম্বর ১৩, ২০০৯)। "জলবায়ু-বিপন্ন মানুষের কথা"। বিশেষ সংখ্যা, দৈনিক প্রথম আলো (প্রিন্ট)। ঢাকা। পৃষ্ঠা ৮। 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]