নোবেল পুরস্কার ২০১৬

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ হতে ঘোষণা করার ঐতিহ্যকে মেনে ২০১৬ সালে বিভিন্ন বিষয়ের জন্য নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় ৷

চিকিৎসাশাস্ত্র[সম্পাদনা]

চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পেয়েছেন জাপানের ইয়োশিনোরি ওসুমি। প্রাণিকোষ কীভাবে নিজের উপাদানকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে, তা আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। ইউশিনোরি ওসুমি দেখিয়েছেন, পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে কোষ কীভাবে সুস্থ থাকে। সুইডেনের নোবেল কমিটি বলে, ক‌্যানসার থেকে শুরু করে পারকিনসনসের মতো জটিল রোগ কেন হয়, তা বুঝতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুরস্কার হিসেবে তিনি ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার পাবেন।

পদার্থবিজ্ঞান[সম্পাদনা]

তত্ত্বের মধ্য দিয়ে পদার্থের টপোলজিক্যাল দশার দিশা দেখিয়ে চলতি বছর পদার্থে নোবেল পেয়েছেন তিন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস এই পুরস্কারের জন্য ডেভিড জে ফাউলেস, এফ ডানকেন হোলডেইন ও জে মাইকেল হসট্রলিজের নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই তিন বিজ্ঞানী ‘এক অজানা জগতের দুয়ার উন্মোচন’ করেছেন, যেখানে পদার্থ বিচিত্র দশায় বদলে যেতে পারে।

এই গবেষণায় তারা সুপার কন্ডাক্টর, সুপার ফ্লুইড ও পালতা ম্যাকগনেটিক ফিল্মের আচরণ বুঝতে উচ্চতর গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তাদের এই পথ দেখানো গবেষণার ফলে ইলেক্ট্রনিক্সে নতুন সম্ভাবনার আশা তৈরি হয়েছে। রীতি অনুযায়ী আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে তিন বিজ্ঞানীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পুরস্কারের ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনারের অর্ধেক পাবেন থুলেস। বাকিটা হোলডেইন ও হসট্রলিজ ভাগ করে নেবেন। গত শতকের সত্তরের দশকের শুরুতে সুপার কন্ডাকটর (খুবই নিম্ন তাপমাত্রায় যেসব বস্তু বিদ্যুৎ পরিবহন করে) বা সুপার ফ্লুইডের সরু স্তরে বিদ্যুৎ পরিবহন সম্ভব না বলে চলমান তত্ত্বের বিপরীতে কাজ করেন হসট্রলিজ ও ফাইলেস। গবেষণায় খুবই নিম্ন তাপমাত্রায় সুপার কন্ডাকটরের সরু স্তরেও ইলেকট্রনের প্রবাহ বা বিদ্যুৎ পরিবহন সম্ভব দেখিয়ে তারা তার কৌশল ও অবস্থার পরিবর্তন (উচ্চ তাপমাত্রায় পরিবাহিতা বিলোপ) ব্যাখ্যা করেন।

হসট্রলিজ ও ফাইলেস মসৃণ আকৃতির সমতলীয় বা সরু স্তরের ভেতরের বস্তুকে দ্বিমাত্রিক বিবেচনা করে টপোলজির মাধ্যমে পদার্থের অবস্থা বা দশার পরিবর্তনগুলো দেখান। টপোলজি হচ্ছে জ্যামিতির এমন একটি আধুনিক শাখা বা রূপ, যার সাহায্যে বস্তুর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা যায়। টপোলজি অনুযায়ী, কোনো বস্তুর প্রসারণ বা মোচড় বা আকৃতির পরিবর্তন হলেও সেই বস্তুর বৈশিষ্ট্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। বস্তুর বৈশিষ্ট্য কেবল কতগুলো পূর্ণ ধাপেই পরিবর্তিত হবে। এক্ষেত্রে বস্তুকে ছিঁড়ে ফেলা বা খণ্ডিত করা হলে তার বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়ে যাবে। পরবর্তীতে হোলডেইন টপোলজির ধারণার মাধ্যমে আরও সরু, যাকে প্রায় একমাত্রিক ধরা যেতে পারে, এমন বস্তুর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন। এই টপোলজিক্যাল দশা ও দশা পরিবর্তনের তাত্ত্বিক আবিষ্কার করাতেই এবারের পুরস্কার তিন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর বলে নোবেল কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। কমিটির বিচারকরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের ইলেকট্রনিক্স ও সুপারকন্ডাকটর বা ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষেত্রে টপোলজিক্যাল বস্তু ব্যবহারযোগ্য হতে পারে এখন আশা জেগেছে ৷

রসায়ন[সম্পাদনা]

আণবিক যন্ত্র (মলিকুলার মেশিনস) নিয়ে কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে রসায়নে নোবেল পেলেন জ্যঁ-পিয়ের সভেজ, স্যার ফ্রেজার স্টডার্টবেন ফেরিঙ্গা। দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মলিকুলার মেশিনস বা আণবিক যন্ত্রের নকশা ও সংশ্লেষে অবদান রাখায় তিন বিজ্ঞানী এই পুরস্কার পাচ্ছেন। এই আণবিক যন্ত্র নিয়ন্ত্রণযোগ্য, ন্যানোমিটার আকৃতির কাঠামো যা রাসায়নিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তি ও গতিতে রূপ দিতে পারে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রসায়নবিদেরা সুইচ থেকে শুরু করে মোটর পর্যন্ত আণবিক যন্ত্র তৈরি করতে পারেন। পুরস্কার হিসেবে তিন বিজ্ঞানী পাচ্ছেন ৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার বা নয় লাখ ৩১ হাজার মার্কিন ডলার। তিনজন গবেষকের মধ্যে স্যার ফ্রেশার স্টডডার্ট স্কটল্যান্ডের, জাঁ পিয়েরে সভেজ ফ্রান্সের ও বার্নাড ফেরিঙ্গা নেদারল্যান্ডসের নাগরিক।

শান্তি[সম্পাদনা]

নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস৷ পাঁচ দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে তাঁর সরকার ফার্ক গেরিলাদের সঙ্গে যে শান্তিচুক্তি করেছিল তার জন্যই তাঁকে এ পুরস্কার দেয়া হলো৷ চুক্তিটি অবশ্য গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে৷ তবে নোবেল শান্তি কমিটি মনে করে, শান্তি স্থাপনের জন্য ঐতিহাসিক এই উদ্যোগই বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়ার উপযুক্ত৷

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস রসায়নে নোবেল পুরস্কারের জন্য ব্রিটিশ নাগরিক অলিভার হার্ট ও ফিনল‌্যান্ডের বেঙ্কট হলস্ট্রম এর নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটি বলেছেন, কন্ট্রাক্ট থিওরি নিয়ে এই দুই গবেষকের কাজ উচ্চপদের ব‌্যক্তিদের কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে বেতন নির্ধারণের মত বিষয় বুঝতে সহায়ক হয়েছে। নোবেল পুরস্কারের ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার এই দুই গবেষকের মধ‌্যে ভাগ করে দেওয়া হবে ৷ভোক্তার ভোক্তার রুচি বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্য নির্মূলের পথ দেখানোয় গতবছর অর্থনীতির নোবেল পান ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অর্থনীতিবিদ অ্যাঙ্গাস ডিটন।

সাহিত্য[সম্পাদনা]

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন গায়ক ও গীতিকার রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান, সংগীত বিশ্ব যাকে চেনে বব ডিলান নামে। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ১১৩তম লেখক হিসেবে তার নাম ঘোষণা করেন রয়‌্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে ডিলানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হবে পুরস্কারের ৮০ লাখ ক্রোনার। বব ডিলান একাধারে গায়ক, গীতিকার, লেখক, সুরকার, কবি এবং ডিস্ক জকি যিনি পাঁচ দশক ধরে জনপ্রিয় ধারার সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত। বব ডিলনের শ্রেষ্ঠ কাজের মধ্যে অনেকগুলো ১৯৬০ দশকে রচিত হয়েছে। এসময় তিনি আমেরিকান অস্থিরতার প্রতীক বিবেচিত হতেন। তার কিছু গান, যেমন "Blowin' in the Wind" and "The Times They Are a-Changin'", যুদ্ধবিরোধী জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ১৯৫৫-১৯৬৮ সালের আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তার সর্বশেষ অ্যালবা‍ম, Christmas In The Heart(২০০৯), মুক্তি পেয়েছে । রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন একে পরবর্তীকালে বর্ষসেরা অ্যালবাম হিসেবে সম্মানিত করেছে।

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের শেষ ইচ্ছা অনুসারে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবতার কল্যাণে অবদানের জন্য প্রতি বছর চিকিৎসা, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।