ট্রাফালগার স্কয়ার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

টেমপ্লেট:Infobox UK property

ট্রাফালগার স্কয়ার (ইংরেজি: Trafalgar Square) ইংল্যান্ডের সেন্ট্রাল লন্ডনে অবস্থিত একটি সাধারণ জনগণের মিলনস্থল এবং পর্যটক আকর্ষণ সৃষ্টিকারী স্থানবিশেষ। এ স্থানটির পূর্ব নাম ছিল চেরিং ক্রস। এর কেন্দ্রস্থলে নেলসন'স কলাম রয়েছে যার চতুর্পার্শ্বে চারটি সিংহ ভাস্কর্য বিদ্যমান। এছাড়াও, এখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মূর্তি ও ভাস্কর্য্য রয়েছে। রাজনৈতিক সমাবেশ, বিক্ষোভ, সামাজিক মিলনমেলা হিসেবে নববর্ষের প্রাক্কালে জনসাধারণের একত্রিত হওয়া অন্যতম ঘটনারূপে চিহ্নিত।

নামকরণ[সম্পাদনা]

১৮০৫ সালে সংঘটিত ব্রিটিশ নৌবাহিনী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিখ্যাত ট্রাফালগারের যুদ্ধে বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে এ নামকরণ করা হয়। এ চত্ত্বরের প্রকৃত নাম ছিল কিং উইলিয়াম দ্য ফোর্থস্‌ স্কয়ার। কিন্তু জর্জ ল্যাডওয়েল টেলর ট্রাফালগার স্কয়ার নাম পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করেন।[১]

১৮২০ সালে ৪র্থ জর্জ স্থপতি জন ন্যাশের সাথে যুক্ত হয়ে এ চত্ত্বরের মান উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। ন্যাশ তাঁর চেরিং ক্রস ইম্প্রুভমেন্ট স্কীমের আওতাধীনে চত্ত্বর পরিস্করণে অগ্রসর হন। স্কয়ারের বর্তমান অবকাঠামোটি ১৮৪৫ সালে স্যার চার্লস ব্যারী কর্তৃক পূর্ণাঙ্গতা পায়।

রাজমুকুটধারী রাণীর নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়ে আছে। গ্রেটার লন্ডন অথরিটি কর্তৃক এটি পরিচালিত হয়। এছাড়াও ওয়েস্টমিনিস্টার সিটি কাউন্সিল কর্তৃক স্কয়ারের চারপাশের রাস্তা নিয়ন্ত্রিত হয়।[২]

ফোয়ারা[সম্পাদনা]

নতুন লাইট এমিটিং ডায়োড বা লেড প্রযুক্তির মাধ্যমে আলোকসজ্জ্বার দৃশ্য

১৮৪০-এর দশকে স্থাপিত স্কয়ারটি তৈরীর সময় ফোয়ারা ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য্যের বিষয়টি তেমন স্পষ্ট ছিল না। পরবর্তীতে জায়গার স্বল্পতা এবং বিক্ষুদ্ধপূর্ণ সমাবেশের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে ভাবিয়ে তোলে। ন্যাশনাল গ্যালারীর পিছনে আর্টেজিয় কূপ খনন করে স্টিম ইঞ্জিনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে এর পরিবর্তে পাথরের জলপূর্ণ গর্ত বা ব্যাসিন এবং পাম্প বসানো হয়।

নতুন ফোয়ারা নির্মাণের জন্য স্যার এডউইন লাতইয়েন্সের নকশা ব্যবহার করা হয়। এতে £৫০,০০০ পাউন্ড স্টার্লিংয়েরও অধিক পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। পুরনো ফোয়ারা বা ঝরনাগুলোকে কানাডা সরকারকে উপহারের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়। এ ফোয়ারাগুলো বর্তমানে অটোয়া এবং রেজিনা এলাকায় রয়েছে।[৩][৪]

বর্তমানে পশ্চিম দিকে লর্ড জেলিকো এবং পূর্ব দিকে লর্ড বিটি'র স্মৃতিরক্ষার্থে ফোয়ারাগুলোর নামকরণ করা রয়েছে।[৫]

নতুন পাম্পের সাহায্যে ৮০ ফুট বা ২৪ মিটার উচ্চতায় পানিকণা আকাশে উত্তোলন করা হয়।[৬] লাইট এমিটিং ডায়োড বা লেড প্রযুক্তিও পুণঃস্থাপন করা হয়। এর ফলে বৈদ্যুতিক খরচও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। আসন্ন ২০১২ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্‌সের কথা চিন্তা করে প্রথমবারের মতো প্রকল্প আকারে নিয়ে অনেক ধরণের রঙের সমারোহ ঘটানো হয়েছে এতে।[৩] নতুন আলোকসজ্জ্বাকল্পে আরো কম বিদ্যুতের প্রয়োজন এবং কার্বন ফুটপ্রিন্টের পরিমাণও ৯০% কমিয়ে দেবে।[৬]

রাজনৈতিক সমাবেশ[সম্পাদনা]

২৩ জানুয়ারি, ২০১০ সালে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনের অধীনে সংবাদচিত্র কর্মীদেরকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দৃশ্য।

স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের পরপরই ট্রাফালগার স্কয়ার রাজনৈতিক সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে। কর্তৃপক্ষ প্রায়শঃই তা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চালায়। ১৮৩৯ সালে ফোয়ারা যুক্ত হওয়ায় জনগণের ভীড় অনেকাংশেই কমে যায়। কিন্তু মূল পরিকল্পনায় জনগণের ভীড় হবার সম্ভাবনাসহ ফোয়ারা যুক্ত হবার বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল।

ঐ বছরের মার্চ মাসে নেলসন কলাম উন্মুক্ত হয়। ফলে কর্তৃপক্ষ এ চত্ত্বরে সংস্কারবাদী আন্দোলন বা চার্টিজম সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৮৮০-এর দশক পর্যন্ত সকল প্রকার রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের উপর সাধারণ নিষিদ্ধতা ছিল। আকস্মিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিশেষতঃ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন কর্তৃক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে পুণরায় রাজনৈতিক সমাবেশের সূচনা ঘটে।

৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৬ সালে অনুষ্ঠিত ব্ল্যাক মানডে বা কালো সোমবারে বিক্ষুদ্ধ জনতা বেকারত্বের বিরুদ্ধে সমাবেশ করে। এর ফলে পল মল এলাকায় ব্যাপক দাঙ্গা বাঁধে। ১৩ নভেম্বর, ১৮৮৭ সালে ব্লাডি সানডে বা রক্তাক্ত রবিবার নামে খ্যাত ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূচনা এ স্কয়ার থেকেই অনুষ্ঠিত হয়।

আধুনিককালে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনার ঘটে ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ সালে। ১৯৬০ সালে বার্ট্রান্ড রাসেল, রাল্ফ স্যোনম্যান, রেভারেন্ড মাইকেল স্কট প্রমূখ ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ যুদ্ধবিরোধী গ্রুপ কমিটি অব হান্ড্রেডের মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। বিক্ষুদ্ধ কর্মীরা শান্তির স্বপক্ষে এবং যুদ্ধপারমাণবিক অস্ত্রের বিপক্ষে শ্লোগান দেয়।

সাউথ আফ্রিকা হাউজের বাইরে ১৯৮০-এর দশকে ধারাবাহিকভাবে জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিককালে অর্থাৎ ১৯৯০ সালে পোল ট্যাক্স রায়ট এবং আফগানিস্তানইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ট্রাফালগার স্কয়ার অবরুদ্ধ ছিল।[৭] ৭ জুলাই, ২০০৫ সালে সংঘটিত লন্ডনে সন্ত্রাসী বোমা হামলার অব্যবহিত পরেই ব্যাপক প্রতিবাদ সমাবেশ ঘটে।[৮]

২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনের রূপরেখা প্রণয়ন সংক্রান্ত সম্মেলন চলাকালীন ক্যাম্প ফর ক্লাইমেট একশনের কর্মীরা দুই সপ্তাহের জন্য স্কয়ার দখল করে রেখেছিল।[৯]

২৬ মার্চ, ২০১১ সালে স্কয়ারটি বিক্ষোভকারীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়। যুক্তরাজ্যে বাজেট প্রণয়ন ও বাজেট কাটছাটের প্রেক্ষাপটেই এ অবরুদ্ধতা। রাতের বেলা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে আকার ধারণ করে। দাঙ্গা পুলিশ এবং প্রতিবাদকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় স্কয়ারের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।[১০]

ক্রীড়া বিষয়[সম্পাদনা]

২৬ জুন, ১৯৯৬ সালে ইউরো প্রতিযোগিতায় ইংল্যান্ডের কাছে সেমি-ফাইনালে জার্মানি পরাজিত হবার প্রেক্ষাপটে স্কয়ারে ব্যাপক দাঙ্গা বাঁধে ও অনেকেই আহত হন।[১১]

২১ জুন, ২০০২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রায় ১২,০০০ দর্শক জমায়েত হয়ে ব্রাজিল বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যেকার খেলা টেলিভিশনের বড় পর্দায় উপভোগ করেন।[১২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Trafalgar Square in history. Philip Carter, Oxford Dictionary of National Biography, Oxford University Press. (accessed 30 Nov 2010)
  2. "Trafalgar Square (Hansard, 27 November 2003)"। Hansard.millbanksystems.com। ২৭ নভেম্বর ২০০৩। সংগৃহীত ২০১১-০৯-২৬ 
  3. ৩.০ ৩.১ Kennedy, Maev (২৯ মে ২০০৯), "Trafalgar Square fountain spurts to new heights", The Guardian (London), সংগৃহীত ২৫ মে ২০১০ 
  4. "Trafalgar Square fountains", http://www.garden-fountain.co.uk/trafalgar.asp, ২০০৩, সংগৃহীত ১৬ জুলাই ২০০৯ 
  5. G. H. Gater and F. R. Hiorns (editor) (১৯৪০)। trafalgar square national "Trafalgar Square and the National Gallery"Survey of London: volume 20: St Martin-in-the-Fields, pt III: Trafalgar Square & Neighbourhood। Institute of Historical Research। সংগৃহীত ০১ মার্চ ২০১২ 
  6. ৬.০ ৬.১ "Trafalgar Square fountains cascade in colour for 2012", Evening Standard, ২৯ মে ২০০৯ 
  7. Keith Flett (৮ জানুয়ারি ২০০৫), "The Committee of 100: Sparking a new left", Socialist Worker (1933) 
  8. London falls silent for bomb dead, BBC News, ১৪ জুলাই ২০০৫ 
  9. "COP OUT CAMP OUT Âť Camp for Climate Action"। Climatecamp.org.uk। সংগৃহীত ২০১১-০৯-২৬ 
  10. "Battle for Trafalgar Square, London as violence breaks out between demonstrators and riot police"। Wikipedia Commons। সংগৃহীত ২৮ মার্চ ২০১১ 
  11. Football hooligans#England
  12. England fans mourn defeat, BBC News, ২১ জুন ২০০২