হরমোন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বামে: পূর্নবয়স্ক নারীর শরীরে হরমোনের ক্রিয়া (১) ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন, (২) লুটেনাইজিং হরমোন, (3) প্রোজেস্টেরন, (4) ইসট্রোজেন। ডানে: পাতা থেকে শিকড়ের এরাবিডোসিস থালিয়ানায় অক্সিন পরিবাহিত হচ্ছে

হরমোন (ইংরেজি: Hormone, গ্রিক: ὁρμή) যে জৈব-রাসায়নিক তরল যা শরীরের কোনো কোষ বা গ্রন্থি থেকে শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশে নিঃসরিত হয়ে রক্তরস বা ব্যাপন প্রক্রিয়ায় উৎপত্তিস্থল থেকে দূরে বাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং ক্রিয়ার পর ধ্বংস প্রাপ্ত হয় তাদের হরমোন বলে।[১] হরমোন কথার অর্থ হল 'জাগ্রত করা'বা 'উত্তেজিত করা'।

প্রাণী, গাছ এবং ফাঙ্গির সঠিক বৃদ্ধির জন্য হরমোনের প্রয়োজন রয়েছে। উৎপাদিত জায়গা হতে পরিবাহিত হয়ে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার কারনে বিভিন্ন প্রকারের রেনুর শ্রেনীকে হরমোন বলা যায়। যে সমস্ত পদার্থকে হরমোন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় তার মধ্যে রয়েছে স্টেরয়েড জাতীয় যেমন ইসট্রোজেন, অ্যামাইনো এসিড যেমন অক্সিন, আইকোসানয়েড জাতীয় যেমন প্রোস্টাগ্লানডিন, প্রোটিন জাতীয় যেমন ইনসুলিন এবং গ্যাস জাতীয় যেমন ইথাইলিন।

শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও কোষের মধ্যে যোগাযোগ করে হরমোন। শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং আচরণিক কাজ যেমন পরিপাক, শ্বাস প্রশ্বাস, ঘুম, দৈহিক বৃদ্ধি, চলাফেরা, প্রজনন ইত্যাদি কাজে হরমোনের ব্যপক ভূমিকা রয়েছে।[২][৩] গাছের মধ্যে হরমোন ব্যপক ক্রিয়া করে থাকে প্রায় সব রকমের বৃদ্ধি থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ এবং বয়োবৃদ্ধ হওয়া[৪]

কোষীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রনে হরমোন বিশেষ রিসেপ্টর প্রোটিনসহকারে প্রেরণ করে ফলে কোষের সাথে মিশে তা কোষের কার্যক্রম পরিবর্তন করে। এটি কোষের সাথে মেশার ফলে সংকেত পাঠায় জিনে যা থেকে জিন বুঝতে পারে কোন প্রোটিনগুলো বাড়াতে হবে। হরমোন দ্রুত, জিনগত নয় এমন পদ্ধতিতেও কাজ করে থাকে যার ফলে জিনের সাথে সমন্বয় সাধিত হয়।[৫] জলে দ্রবীভূত হরমোন যেমন পেপটাইড সাধারণত কোষের উপরিভাগে কাজ করে সেকেন্ড মেসেনজার হিসেবে। লিপিড দ্রবীভূত যেমন স্টেরয়েড সাধারণত কোষের প্লাজমা মেমব্রেন ভেদ করে নিউক্লিয়াসের সাথে কাজ করে। এক্ষেত্রে গাছের পাওয়া যায় এমন একটি হরমোন যার নাম ব্রাসিনোস্টেরয়েড হল ব্যতিক্রম যেটি লিপিড দ্রবীভূত হয়েও কোষের উপরিভাগে কাজ করে।[৬]

মেরুদন্ডি প্রাণীদের মধ্যে এন্ডোক্রিন গ্রন্থি বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি হল বিশেষায়িত প্রত্যঙ্গ যা এন্ডোক্রিন সংকেত বহন ব্যবস্থায় হরমোন নিঃসরণ করে থাকে। "এন্ডোক্রিন" মানে হল রক্তে যা সরাসরি মিশে যায়। বেশিরভাগ হরমোনই নিসৃত হয় এন্ডোক্রিন গ্রন্থি থেকে।.এর বিপরীত হল "এক্সোক্রিন" বা বহিঃক্ষরা, এই হরমোন নিঃসৃত হয় শরীর মধ্যস্থ বিভিন্ন নালী এবং ডাক্ট দিয়ে। এক্সোক্রিন গ্রন্থি হতে উৎপাদিত কিছু হরমোন শরীরের বাইরে নিঃসৃত হয় যেমন ঘর্মগ্রন্থি, থুথু গ্রন্থি ইত্যাদি।

হরমোন প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯০২ সালে। সেটি ছিল সিক্রেটিন হরমোন। ১৯০৫ সালে হরমোন শব্দটি ব্যবহৃত হয়।[৭]

সূচনা এবং সারাংশ[সম্পাদনা]

হরমোনের সংকেত প্রেরণ ও গ্রহণ ব্যবস্থায় নিম্নোক্ত ধাপগুলো দেখা যায়:[৮]

  1. একটি বিশেষ জৈববিশ্লেষণ হয় একটি বিশেষ কোষে (হরমোনের জন্য)
  2. সংরক্ষন এবং নিঃসরণ হয়
  3. যে কোষের জন্য হরমোনটি তৈরি হয়েছে তা পরিবাহিত হওয়া
  4. সম্পর্কিত কোষের মেমব্রেন বা আন্তঃকোষীয় গ্রহণকারক প্রোটিন ব্যবস্থায় হরমোনটিকে চিহ্ণিত করা
  5. কোষীয় সংকেত পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রহণকৃত হরমোন রিলে এবং এম্প্লিফাই করা হয়। এই ব্যবস্থায় কোষীয় সাড়া জাগায়। তখন মূল কোষটি প্রেরিত সংকেত যে কোষকে পাঠানো হয়েছে তা গ্রহণ করেছে কিনা তা বুঝতে পারে। যার ফলে মূল কোষে হরমোনের উৎপাদন কমে যায়। এই ব্যবস্থা হল হোমিওস্টেটিক নেগেটিভ ফিডব্য্যক লুপের একটি উদাহরণ।
  6. সর্বশেষ ধাপে হরমোনটি ভেঙ্গে জৈব যোগে পরিবর্তিত হয়

হরমোন উৎপাদন করে এমন কোষগুলো হল বিশেষ কোষ যেগুলো আন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতে থাকে যেমন থাইরয়েড গ্রন্থি, জরায়ু এবং টেস্টিস। হরমোন তাদের উৎপাদিত কোষ হতে এক্সিসাইটোসিস ব্যবস্থা বা অন্য কোষীয় মেমব্রেন পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবাহিত হয়। উপরোক্ত প্রক্রিয়াটি খুবই সাধারণ হরমোন সংকেত প্রেরণ ব্যবস্থার সারসংক্ষেপ। নির্দিষ্ট হরমোন যে কোষ গ্রহণ করে তা বিভিন্ন টিস্যুতে অবস্থিত বিভিন্ন প্রকারের কোষ হতে পারে যেমন ইনসুলিন যেটি নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। একই হরমোনের প্রতি বিভিন্ন টিস্যু বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

এপিনেফ্রাইন (অ্যাড্রেনালিন), একটি ক্যানকোলামিন ধরনের হরমোন

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

১) হরমোন একরকম স্টেরয়েড জৈব রাসায়নিক পদার্থ যা নিঃসৃত স্থান থেকে দূরবর্তী স্থানে সঞ্চিত হয়।

2) নিদিষ্ট স্থান ছাড়া দেহের অন্য কোথাও হরমোন সঞ্চিত হয় না।

৩) হরমোন জীবদেহে রাসায়নিক সমন্বয়কারী অথাৎ কেমিক্যাল হিসেবে কাজ করে।

৪) ধারাবাহিকভাবে রক্তে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি বা কম থাকলে নানারকম সমস্যা দেখা যায়।

৫) হরমোন রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে রাসায়নিক সংযোগ স্থাপন করে।

কাজ[সম্পাদনা]

মানব দেহে প্রভাব[সম্পাদনা]

হরমোন আমাদের দেহে নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ মধ্যে রাসায়নিক সংযোগ স্থাপনের কাজ করে। মানব দেহে হরমোনের নিম্নোক্ত প্রভাব দেখা যায়:[৯]

  • দেহের বৃদ্ধি
  • ঘুম-জাগরণের চক্র এবং অন্যান্য সার্কেডিয় ছন্দ সম্পন্ন করে (রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ, হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম বজায় রাখা ইত্যাদি)
  • মুড সুইং - মেজাজের ছন্দপতন, বিভিন্ন আবেগের নিয়ন্ত্রণ
  • এপপটোসিস (কোষের মৃত্যুব্যবস্থা) প্রবর্তন বা ধ্বংসকরণ
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা চালু এবং বন্ধ করা
  • বিপাকীয় কার্য সম্পাদন
  • প্রজনন, যুদ্ধ/আক্রমণ, পলায়ন এবং অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য শরীরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা
  • শরীরকে জৈবিক নতুন ধাপের জন্য তৈরী করা যেমন বয়ঃসন্ধি, সন্তান লালন-পালন এবং মেয়েদের রজঃস্রাব
  • প্রজননের ধারা নিয়ন্ত্রন এবং তৈরী করা
  • ক্ষুধা তৈরী ও খাদ্য হজম
  • শরীরকে মারাত্মক ক্ষতি থেকে রক্ষা যেমন ঘাম তৈরি, অজ্ঞান হয়ে পড়া।

একটি হরমোন অন্যান্য হরমোনকে নিঃসৃত ও উৎপাদন করার বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণ করে। শরীর মধ্যস্থ অভ্যন্তরীন কার্যপরিবেশ হরমোন সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যাকে হোমিওস্টেসিস বলে।

সংকেতের প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

হরমোন কোথায় নিঃসৃত হচ্ছে তার উপর হরমোনের কাজ নির্ধারিত হয়, কারণ তারা বিভিন্নভাবে নিঃসৃত হয়।[১০] সব হরমোনই একটি কোষ থেকে নিঃসৃত হয় না এবং রক্তেও মিশে না যদি না এর কোন নির্দিষ্ট গ্রহণকারী থাকে। প্রধান হরমোন সংকেতগুলো হল:

সংকেতের প্রকারভেদ - হরমোন
নং প্রকার বিবরণ
অন্তঃক্ষরা রক্তে নিঃসৃত হবার পর সুনির্দিষ্ট কোষে কাজ করে
প্যারাক্রিন নিকটবর্তী কোষে কাজ করে এবং রক্ত পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রয়োজন হয় না
অটোক্রিন যে কোষ থেকে নিঃসৃত হয় তাকেই প্রভাবিত করে এবং জৈবিক পরিবর্তন সাধিত করে
ইন্ট্রাক্রিন যে কোষ থেকে সংশ্লেষণ হয় তাদের মধ্যেই আন্তঃকোষীয় কাজ করে

বিভিন্ন হরমোনের পুরো নাম[সম্পাদনা]

TRH- থাইরোট্রফিন রিলিজিং হরমোন

ARH- অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিক রিলিজিং হরমোন

SRH - সোমাটোট্রফিন রিলিজং হরমোন

GH - গ্রোথ ইনহিবিটিং হরমোন

GnRH - গোনাডোট্রফিন রিলিজিং হরমোন

PRH - প্রোল্যাকটিন রিলিজিং হরমোন

PIH - প্রোল্যাকটিন ইনহিবিটিং হরমোন

MRH - মেলানোসাইট রিলিজিং হরমোন

MIH - মেলানোসাইট ইনহিবিটিং হরমোন

MSH- মেলানোসাইট স্টিমুলেটিং হরমোন

TSH - থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন

ACTH - অ্যাড্রেনো কর্টিকো ট্রফিক হরমোন

GH - গ্রোথ হরমোন

STH - সোমাটোট্রফিক হরমোন

GTH - গোনাডোট্রফিক হরমোন

FSH - ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন

LH - লিউটিনাইজিং হরমোন

ICSH -ইন্টারস্টিসিয়াল সেল স্টিমুলেটিং হরমোন

ADH - অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Shuster M (২০১৪-০৩-১৪)। Biology for a changing world, with physiology (Second সংস্করণ)। New York, NY। আইএসবিএন 9781464151132ওসিএলসি 884499940 
  2. Neave N (২০০৮)। Hormones and behaviour: a psychological approach। Cambridge: Cambridge Univ. Press। আইএসবিএন 978-0521692014lay summaryProject Muse 
  3. "Hormones"MedlinePlus। U.S. National Library of Medicine। 
  4. "Hormone - The hormones of plants"Encyclopedia Britannica (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০১-০৫ 
  5. Ruhs S, Nolze A, Hübschmann R, Grossmann C (জুলাই ২০১৭)। "30 Years of the Mineralocorticoid Receptor: Nongenomic effects via the mineralocorticoid receptor"। The Journal of Endocrinology234 (1): T107–T124। ডিওআই:10.1530/JOE-16-0659অবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 28348113 
  6. Wang ZY, Seto H, Fujioka S, Yoshida S, Chory J (মার্চ ২০০১)। "BRI1 is a critical component of a plasma-membrane receptor for plant steroids"। Nature410 (6826): 380–3। ডিওআই:10.1038/35066597পিএমআইডি 11268216 
  7. Hirst, BH (২০০৪), "Secretin and the exposition of hormonal control", J Physiol, 560: 339, পিএমআইডি 15308687 
  8. Nussey S, Whitehead S (২০০১)। Endocrinology: an integrated approach। Oxford: Bios Scientific Publ.। আইএসবিএন 978-1-85996-252-7 
  9. Lall S (২০১৩)। Clearopathy। India: Partridge Publishing India। পৃষ্ঠা 1। আইএসবিএন 9781482815887 
  10. Molina PE (২০১৮)। Endocrine physiology। McGraw-Hill Education। আইএসবিএন 9781260019353ওসিএলসি 1034587285 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Signal transduction