গান্ধী টুপি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নেহরুর জীবন, ১৯৫০র দশকের প্রাচীরপত্র, ১৯২৯ - ১৯৫৫-এর সময় গান্ধী টুপি পরিহিত

গান্ধী টুপি (হিন্দি: गांधी टोपी) হল একটি সাদা সাইডক্যাপ (এমন টুপি যাকে ভাঁজ করে রাখা চলে)। এর সামনের ও পেছনের দিকটি তীক্ষ্ণ এবং মধ্যভাগ প্রশস্ত। এটি খাদি কাপড় দিয়ে তৈরি। ভারতীয় নেতা মহাত্মা গান্ধীর নামানুসারে এর নাম রাখা হয়েছে, তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় প্রথম এর ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তোলেন। সাধারণত ভারতীয় স্বাধীনতা সক্রিয় কর্মীরা এটি পরিধান করতেন, স্বাধীন ভারতে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এটি একটি প্রতীকী ঐতিহ্য হয়ে উঠেছিল।

উৎপত্তি[সম্পাদনা]

১৯২০ সালে গান্ধী টুপি পরা মহাত্মা গান্ধীর বিরল ছবি

১৯২০-২২ সাল নাগাদ অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকে ভারতে গান্ধী টুপির উদ্ভাবন হয়েছিল।[১]সেই সময় থেকে এটি কংগ্রেসের আদর্শ পোশাক হয়ে উঠেছিল। ১৯২১ সালে, ব্রিটিশ সরকার গান্ধী টুপির ব্যবহার নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। ১৯২০-২১ সালে গান্ধী নিজে শুধুমাত্র এক বা দুই বছরের জন্য এই টুপি পরেছিলেন।[২]

গান্ধীর স্বদেশে বোনা খাদির ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক ছিল তাঁর সাংস্কৃতিক গর্বের বার্তার প্রতীক। স্বদেশী পণ্যের ব্যবহার (ইউরোপে উৎপাদিত পণ্যের বিরোধিতা করে) ছিল স্বনির্ভরতা এবং ভারতের গ্রামীণ জনতার সঙ্গে সংহতির প্রতীক। গান্ধীর অধিকাংশ অনুসারী এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সদস্যরা প্রায় সকলেই এই টুপিটি ব্যবহার করতেন। সেই সময়ে যে কোনো ব্যক্তিই যখন এই টুপি পরতেন, তখন তিনিই স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হয়ে যেতেন।

১৯০৭ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে, "নিগ্রো" হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ (গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন ভারতীয়দেরও বলা হত) দক্ষিণ আফ্রিকার কারাগারের বন্দীদের কারাগারে একই ধরনের টুপি পরতে হত। দক্ষিণ আফ্রিকার কারাগারে থাকার সময় গান্ধীকে "নিগ্রো" হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছিল এবং তাঁকে এই জাতীয় টুপি পরতে হয়েছিল। গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হেনরি পোলাকের ধারণা অনুযায়ী সেইখান থেকেই গান্ধী টুপির উৎপত্তি।[৩]

১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সদস্যরা নতুন দিল্লিতে একটি মিছিল করছেন

যাইহোক, কাকা কালেলকারকে লেখা একটি চিঠিতে গান্ধী বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, কিভাবে তিনি কাশ্মীরি টুপির উপর ভিত্তি করে তাঁর সাদা টুপির কল্পনা করেছিলেন।[৪]

স্বাধীনতার পর[সম্পাদনা]

স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম প্রজন্মের ভারতীয় রাজনীতিবিদরা প্রায় সর্বজনীনভাবেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সদস্য ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর গান্ধী টুপি একটি মানসিক গুরুত্ব পেয়েছিল, এটি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং তাঁর মতো ভারতীয় নেতারা নিয়মিত পরতেন। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং মোরারজী দেশাইয়ের মতো পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীরা এই ঐতিহ্যকে অব্যাহত রেখেছিলেন। ভারতীয় সংসদের অধিকাংশ সদস্য (বিশেষ করে রাজনীতিবিদ এবং কংগ্রেস দলের কর্মী) খাদি পোশাক এবং গান্ধী টুপি পরতেন। ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন বা ২৬শে জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবস ঘোষণা করার সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ টুপিটি পরেছিলেন।

জওহরলাল নেহরুকে সবসময় এই টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখা যেত। ১৯৬৪ সালে, একটি মুদ্রা প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে নেহরুকে টুপি পরিহিত দেখানো হয়নি। এটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে আরেকটি নেহেরু মুদ্রা প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে তাঁকে টুপি পরিহিত দেখানো হয়।

পরবর্তী সময়ে, টুপিটির জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক আবেদন কমে গিয়েছিল, যদিও কংগ্রেস দলের অনেক সদস্যই সেই ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছিলেন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলি কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ঐতিহ্য থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করাটাই পছন্দ করেছিলেন। রাজনীতিবিদদের কাছে পাশ্চাত্য-শৈলীর পোশাকের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা, ভারতীয় শৈলীর পোশাক পরার গুরুত্বকেও হ্রাস করেছিল।

মহারাষ্ট্র রাজ্যের গ্রামীণ অংশে এখনো পুরুষদের দ্বারা পরিধান করা প্রতিদিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মস্তক আবরণী হিসেবে গান্ধী টুপির ব্যবহার রয়ে গেছে।[৫]

দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের প্রতিবাদ

১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের "আমার একটি স্বপ্ন আছে" (আই হ্যাভ এ ড্রিম) ভাষণে, মঞ্চে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই গান্ধী টুপি পরেছিলেন।[৬]

পুনরুত্থান[সম্পাদনা]

২০১১ সালে, মহারাষ্ট্র রাজ্যের একজন বিশিষ্ট গান্ধীবাদী আন্না হাজারে ভারতে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন শুরু করার পর গান্ধী টুপি আবারও ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল দিল্লি। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে, গান্ধী টুপি পরা হাজার হাজার লোক দিল্লির রামলীলা ময়দানে জড়ো হয়েছিল আন্না হাজারেকে তাঁর আমরণ অনশনে সমর্থন করার জন্য। এই আন্দোলন দেশের অন্যান্য অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং এই উপলক্ষে অনেক স্টেডিয়াম, কমিউনিটি সেন্টার এবং মাঠ বুক করা হয়েছিল। এই গণ-আন্দোলনে সকল বয়সী, ধর্ম এবং সামাজিক অবস্থানের (প্রধানত মধ্যবিত্ত) মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই স্লোগান দিচ্ছিল এবং গান্ধী টুপি পরেছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচনে, আম আদমী পার্টির কর্মীরা ব্যাপকভাবে গান্ধী টুপি পরিধান করেছিল এবং তাতে দলের নাম লেখা ছিল।[৭][৮] ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থকরা একই ধরণের জাফরান রঙের টুপি পরে।[৯]

কর্ণাটকের আম আদমী পার্টির উদ্বোধন উপলক্ষে বেঙ্গালুরুতে অরবিন্দ কেজরীওয়াল

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Consumption: The history and regional development of consumption edited by Daniel Miller, p. 424
  2. Gandhi was photographed wearing a turban or a round black topi in 1915 and 1918. He was photographed with the Gandhi cap in 1920. see 1915-1932 Mahatma Gandhi Photo Gallery http://www.mkgandhi.org/gphotgallery/1915-1932/index1.htm, Mahatma Gandhi, 1915 - 1920, Page 7 http://www.gandhimedia.org/cgi-bin/gm/gm.cgi?direct=Images/Photographs/Personalities/Mahatma_Gandhi/1915_-_1920&img=90. By 1924 he had given up wearing a kurta and the cap. Also see http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00routesdata/1900_1999/gandhi/gandhigods/gandhigods.html
  3. H.S.L Polak Mahatma Gandhi (London: Odham's Press, 1949) pg. 61
  4. Clothing Matters: Dress and Identity in India, Emma Tarlo,University of Chicago Press, Sep 1, 1996.82-83
  5. Bhanu, B.V (২০০৪)। People of India: Maharashtra, Part 2। Mumbai: Popular Prakashan। পৃষ্ঠা 1033, 1037, 1039। আইএসবিএন 81-7991-101-2 
  6. Tharoor, Kanishk (২০১৮-০৪-০৪)। "The Debt MLK Owed to India's Anti-Colonial Fight"The Atlantic (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০২-১৩ 
  7. "बहुरंगी हुई गांधी की टोपी"jagran.com। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০১৮ 
  8. Whitehead, Andrew (২৮ এপ্রিল ২০১৪)। "How India's iconic Gandhi cap has changed sides"। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০১৮ – www.bbc.com-এর মাধ্যমে। 
  9. Bhattacharjee, Sumit (২৪ এপ্রিল ২০১৪)। "Gandhi cap changes colours!"। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০১৮ – www.thehindu.com-এর মাধ্যমে। 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Mohandas K. Gandhi টেমপ্লেট:Clothing in South Asia