ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা

From উইকিপিডিয়া
Jump to navigation Jump to search
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চূড়ান্ত পতাকা

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৬০০ এবং ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ইংল্যান্ড থেকে গ্রেট ব্রিটেন এবং গ্রেট ব্রিটেন থেকে যুক্তরাজ্যে পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে পতাকাটিও পরিবর্তিত হয়। প্রথমদিকে এটি লাল ও সাদা ডোরাকাটা দাগযুক্ত ছিল যার উপরের বামদিকের কোণাটি ছিল ইংল্যান্ডের পতাকাযুক্ত। পরবর্তীতে জাতির বিকাশের সাথে সাথে পতাকাটি যথাক্রমে ১৭০৭ এবং ১৮০১ সালে গ্রেট ব্রিটেনের পতাকা এবং যুক্তরাজ্যের পতাকা অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে হালনাগাদ করা হয়েছিল। এটি স্টার অফ ইন্ডিয়া সিরিজের পতাকা দ্বারা সফল হয়েছিল।

ইংরেজ নিয়ন্ত্রণ[edit]

কোম্পানির প্রথম পতাকা

১৬০০ সালে রানী প্রথম এলিজাবেথ কর্তৃক ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য করার রাজকীয় সম্মতি পাওয়ার পর ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে কোণায় ইংল্যান্ডের পতাকাযুক্ত তেরোটি লাল এবং সাদা স্ট্রাইপের একটি পতাকা গ্রহণ করে।[১] স্ট্রাইপের সংখ্যা হিসেবে ১৩ কে গ্রহণ করার কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেশ কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার ছিলেন ফ্রিম্যাসনস, এবং তেরো সংখ্যাটি ফ্রিম্যাসনরিতে শক্তিশালী বলে বিবেচিত।[২] তবে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন সংখ্যার স্ট্রাইপের কথা বলা হয়েছে।

দূর-প্রাচ্যে বাণিজ্য করার সময় পতাকাটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য প্রথম সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেন্ট জর্জ'স ক্রস ব্যবহারের কারণে। জাপানে ১৬১৬ সালে কোম্পানির জাহাজগুলিকে বন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কারণ পতাকাটিতে ব্যবহৃত ক্রসচিহ্নটিকে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক হিসেবে দেখা হত, যা জাপানিরা ১৬১৪ সালেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।[৩] টনকিনের ল-রাজবংশ (Lê dynasty) কোম্পানির এই পতাকার ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করে। কেননা তাঁরা বিশ্বাস করত যে ক্রসচিহ্নটি খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের একটি মাধ্যম, যার প্রচার টনকিনিরা নিষিদ্ধ করেছিল। বাণিজ্যে কোম্পানিটির প্রতিদ্বন্দ্বী, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইংরেজ কোম্পানির পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল যে ক্রসটি ইংরেজ জাতির প্রতীক, খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক নয়। তবে টনকিনিরা পতাকাটি উড়ানো নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রসটি সরানো না হয়।[৪] ১৬৭৩ সালে যখন কোম্পানিটি জাপানের সাথে বাণিজ্য পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছিল তখন তারা প্রাথমিকভাবে ঘোষণা করে যে তারা তাদের পতাকা পরিবর্তন করবে না। তবে স্থানীয় পরামর্শ এবং জাপানি কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ ব্যাখ্যা চাওয়ার পর সংস্থাটি দূর-প্রাচ্যে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে লাল এবং সাদা স্ট্রাইপযুক্ত একটি পতাকা ব্যবহার করা শুরু করে, তবে তাতে ইংল্যান্ডের পতাকা ছিল না।[৩]

১৬৮২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের বাটাভিয়ায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদল কর্তৃক পতাকা ছিড়ে ফেলার অভিযোগে ইংরেজ ও ডাচ সরকারের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই পতাকাটি। যদিও ডাচরা অঞ্চলটিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করেছিল, তবে সেটি কোনও ফলাফল বয়ে আনেনি, কারণ অভিযোগকারী ব্যক্তি বাটাভিয়ার উপস্থিত ছিলেন না। এবং কোম্পানির পরিচালক বা ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস কারোরই ডাচদের সাথে সামরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা ছিল না।[৫]

গ্রেট ব্রিটেন[edit]

১৬৬৪ এবং ১৮০১ সালের মধ্য়ে প্রচলিত পতাকা

১৬০৩ সালে, স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস যখন ইংরেজ সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মুকুটকে একত্রিত করলেন। সেসময় তিনি সংযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য উভয় জাতির একটি সম্মিলিত পতাকা তৈরি করেন। তবে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট এবং স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্ট ঐক্যবদ্ধ হতে নারাজ ছিল এবং আশা করেছিল যে দেশদুটো আলাদা থাকবে। কিং'স কালারস হিসাবে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য জেমস গ্রেট ব্রিটেনের পতাকাটির ব্যবহার অব্যাহত রেখেছিলেন।[৬] ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইংল্যান্ডের পতাকার সাথে তাদের নিজস্ব চিহ্নের ব্যবহার বজায় রাখে। ১৬৬৮ সালে, রাজা দ্বিতীয় চার্লস বোম্বাই পরিচালনার ভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে ন্যস্ত করেন। এরপর কোম্পানিটি কিং'স কালার্স সহ একটি নতুন পতাকা গ্রহণ করেছিল।যেমনটি দেখানো হয়েছিল বোম্বাইয়ের দুর্গের জন্যঃ সেখানকার জন্য প্রধানত নীলরংযুক্ত (যাতে সাদা ও লাল রং ও ছিল) একটি নতুন পতাকা তৈরি করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল "যদি সেখানে কিং'স কালারস রাখা হয়; 'যদি তা না হয় তবে সাদা এবং লালই যথেষ্ট হবে'''।[৭]পরবর্তীতে রাণী অ্যানের নির্দেশে অ্যাক্টস অব ইউনিয়ন ১৭০৭ দ্বারা কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন গঠিত হওয়ার পর কিং'স কালারসই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেট ব্রিটেনের পতাকা হিসাবে গৃহীত হয়েছিল।[৮]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার সাথে তুলনা[edit]

গ্র্যান্ড ইউনিয়ন পতাকা

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পতাকা গ্র্যান্ড ইউনিয়ন পতাকাকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে ধারণা করা হয়। কারণ দুটি পতাকার নকশা একইরকম ছিল।[৯] এই সাদৃশ্যের জন্য অসংখ্য উৎসকে দায়ী করা হয়। পেন্সিল্‌ভেনিয়াবেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন একবার একটি বক্তৃতাতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা হিসাবে কোম্পানির পতাকা গ্রহণ করাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি ভার্জিনিয়ার জর্জ ওয়াশিংটনকে বলেছিলেন, "যদিও আপনার পতাকাটি বিস্তৃত নকশার ক্ষেত্রে নতুন হওয়ার প্রয়োজন আছে, তবে এটির উপাদানগুলির সম্পূর্ণ নতুন হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যে একটি পতাকা ব্যবহার করা হচ্ছে, আমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকাটির কথাই বলছি।"[১০] এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতোই ক্রাউনের প্রতি আমেরিকার আনুগত্য এবং স্ব-শাসিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছিল। কিছু ঔপনিবেশিকও ধারনা করেছিলেন যে কোম্পানিটি মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধে একটি শক্তিশালী মিত্র হতে পারে, কারণ ব্রিটিশ সরকারের কর নীতির বিরুদ্ধে তাদের লক্ষ্য ও অসন্তোষের বিষয়বস্তু একই ছিল। ঔপনিবেশিকরা তাই কোম্পানিকে সমর্থন জানিয়ে কোম্পানির পতাকা উড়িয়ে দেন।[১১]

তবে, গ্র্যান্ড ইউনিয়ন পতাকাটি যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকার সরাসরি উত্তরসুরী - এই তত্ত্ব প্রমাণের অভাবে সমালোচিত হয়েছে।[১২] অন্যদিকে, সাদৃশ্যটি সুস্পষ্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যক্রম এবং ভারতে কোম্পানির শাসনের অধীনস্থ প্রশাসন সম্পর্কে অবগত ছিলেন।[১২]

যুক্তরাজ্য[edit]

১৮০১ সালে গ্রেট ব্রিটেন ও কিংডম অব আয়ারল্যান্ড একীভূূত হয়ে ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড গঠনের ফলে সেন্ট প্যাট্রিকের ক্রসকে অন্তর্ভুক্ত করতে ইউনিয়নের পতাকাটির পরিবর্তন করা হয়। সেই অনুসারে কোণায় নতুন পতাকা প্রদর্শন করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা নবায়ন করা হয়েছিল।[১৩]

১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে জাতীয়করণ এবং ভারতের অভ্যন্তরে তাদের সমস্ত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে ভারত সরকার আইন ১৮৫৮ পাস করে, যেখানে তারা আইনত ব্রিটিশ রাজের অংশ হিসাবে বিবেচিত হয়। এইভাবে কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত করা হয় এবং তাদের পতাকাটি সরকারীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।[১৪]

তথ্যসূত্র[edit]

  1. Preble, George (১৮৭২)। Our Flag: Origin and Progress of the Flag of the United States of America, with an Introductory Account of the Symbols, Standards, Banners and Flags of Ancient and Modern Nations। J Munsell। পৃষ্ঠা 155। 
  2. Hartmann, Thom (২০১০)। Unequal Protection: How Corporations Became ""People"" – and How You Can Fight Back। Berrett-Koehler Publishers। পৃষ্ঠা 68। আইএসবিএন 978-1605095608 
  3. Fawcett, Sir Charles (১৯৩৭)। "The Striped Flag of the East India Company, and its connexion with the American 'Stars and Stripes'": 449–476। doi:10.1080/00253359.1937.10657258 
  4. Anh Tuan, Hoang (২০০৭)। Silk for Silver: Dutch-Vietnamese relations, 1637–1700। BRILL। পৃষ্ঠা 195। আইএসবিএন 978-9047421696 
  5. Bowen, H. V. (২০০২)। The Worlds of the East India Company। Boydell & Brewer। পৃষ্ঠা 54। আইএসবিএন 978-1843830733 
  6. A.C. Fox-Davies, The Art of Heraldry: An Encyclopædia of Armory (1904), p. 399
  7. "Saltires and Stars & Stripes"The Economic Times। ২০১৪-০৯-২২। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৫-২৩ 
  8. "History of the British Flag"। U.S. National Park Service। ২০১৬-০৩-১৬। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৫-২৩ 
  9. Fawcett, Sir Charles (১৯৩৭)। "The Striped Flag of the East India Company, and its connexion with the American 'Stars and Stripes'": 449–476। doi:10.1080/00253359.1937.10657258 
  10. Johnson, Robert (২০০৬)। Saint Croix 1770–1776: The First Salute to the Stars and Stripes। AuthorHouse। পৃষ্ঠা 71। আইএসবিএন 978-1425970086 
  11. Horton, Tom (২০১৪)। "Exposing the Origins of Old Glory's stripes"। History's Lost Moments: The Stories Your Teacher Never Told You। Trafford Publishing। আইএসবিএন 978-1490744698 
  12. "Saltires and Stars & Stripes"The Economic Times। ২০১৪-০৯-২২। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৫-২৩ 
  13. Van Dyke, Paul (২০১৫)। Images of the Canton Factories 1760–1822: Reading History in Art। Hong Kong University Press। পৃষ্ঠা 69। আইএসবিএন 978-9888208555 
  14. Keith, A.B.। "A Constitutional History Of India 1600–1935"। San Diego State University। ২০০৮-০৮-২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৫-২৩ – Wayback Machine-এর মাধ্যমে।