বিষয়বস্তুতে চলুন

ইলিয়াড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ইলিয়াড
হোমার রচিত
প্রথম খণ্ডের ৪৬৮–৪৭৩ লাইনের শিলালিপি। আনুমানিক ৪০০-৫০০ খ্রিস্টাব্দের মিশরের এই নিদর্শনটি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
প্রকৃত শিরোনামἸλιάς
অনুবাদকজর্জ চ্যাপম্যান এবং অন্যান্য
রচনাআনুমানিক ৬৭০/৬৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (মৌখিকভাবে রচিত)
আনুমানিক ৫২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (লিখিত রূপ)
দেশপ্রাচীন গ্রিস
ভাষাহোমারীয় গ্রিক
উপজীব্যট্রোজান যুদ্ধ
ধরনমহাকাব্য
ইংরেজিতে প্রকাশ১৫৯৮
পঙক্তি15,693
পরবর্তীওডিসি
ছন্দড্যাকটাইলিক হেক্সামিটার
পূর্ণ পাঠ্য
উইকিসংকলনে ইলিয়াড
আধুনিক গ্রিক উইকিসংকলনে ইলিয়াড

ইলিয়াড (প্রাচীন গ্রিক: Ἰλιάς; আক্ষ.'ইলিয়ন (ট্রয়) সম্পর্কিত কবিতা') হলো প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের দুই প্রধান মহাকাব্যের একটি, যার রচয়িতা হিসেবে হোমার-কে স্বীকৃত দেওয়া হয়। এটি বিশ্বসাহিত্যের প্রাচীনতম বিদ্যমান রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা বর্তমান সময়েও পাঠকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওডিসি-র মতো এই মহাকাব্যটিও ২৪টি খণ্ডে বিভক্ত এবং ড্যাকটাইলিক হেক্সামিটার ছন্দে রচিত। এর সর্বাধিক প্রচলিত সংস্করণে মোট ১৫,৬৯৩টি পঙ্ক্তি বা লাইন রয়েছে। ইলিয়াড-কে প্রায়শই ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি গ্রিক মহাকাব্য চক্রের (Epic Cycle) একটি কেন্দ্রীয় অংশ।[]

মহাকাব্যটির পটভূমি গ্রিক নগররাষ্ট্রসমূহের একটি জোটের মাধ্যমে ট্রয় নগরী দশ বছরব্যাপী অবরোধের বা ট্রোজান যুদ্ধ-র শেষের দিককার ঘটনাপ্রবাহ। বিশেষ করে, এতে যুদ্ধের শেষ কয়েক সপ্তাহের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। এতে শ্রেষ্ঠ বীর অ্যাকিলিস এবং রাজা অ্যাগামেমনন-এর মধ্যকার তীব্র বিবাদ থেকে শুরু করে ট্রোজান রাজপুত্র হেক্টর-এর মৃত্যু পর্যন্ত অ্যাকিলিসের ক্রোধের (μῆνις) বিবর্তন চিত্রিত হয়েছে।[][] এই আখ্যানটি যুদ্ধের ময়দানের বিশাল দৃশ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়।

ইলিয়াড এবং ওডিসি সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে বা সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে হোমারীয় গ্রিক ভাষায় রচিত হয়েছিল, যা মূলত আয়োনিক গ্রিক ও অন্যান্য উপভাষার একটি সাহিত্যিক সংমিশ্রণ।[] প্রাচীনকালে হোমারের লেখকত্ব নিয়ে খুব কমই সন্দেহ পোষণ করা হতো,[] যদিও সমকালীন গবেষণায় মহাকাব্যটির রচনাশৈলী নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কের একটি বড় অংশ হলো—ইলিয়াড এবং ওডিসি স্বতন্ত্রভাবে রচিত হয়েছিল কি না এবং সেগুলো মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে নাকি লিখিত আকারে টিকে ছিল।[] প্রাচীন গ্রিসের বিভিন্ন উৎসবে (যেমন প্যানাথেনিয়া) 'র‍্যাপসোড' নামে পরিচিত পেশাদার আবৃত্তিকাররা এই মহাকাব্যটি পাঠ করতেন।[][]

কবিতাটির প্রধান বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে 'ক্লিওস' (যশ বা খ্যাতি), অহংকার, নিয়তি এবং ক্রোধ।[] এটি মূলত একটি বিয়োগান্তক ও গম্ভীর মেজাজের রচনা হলেও এর মধ্যে কৌতুক ও হাসির উপাদানও বিদ্যমান। মহাকাব্যটিকে প্রায়শই একটি "বীরত্বগাথা" হিসেবে অভিহিত করা হয়, যেখানে যুদ্ধ, সহিংসতা এবং বীরত্বের আদর্শকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। এতে প্রাচীন যুদ্ধকৌশল ও অস্ত্রশস্ত্রের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তবে যুদ্ধের পাশাপাশি ট্রয় নগরীর প্রাচীরের অন্তরালে এবং গ্রিক শিবিরের সামাজিক ও পারিবারিক দিকগুলোও এতে উঠে এসেছে। এছাড়া অলিম্পাস পর্বতের বারো দেবদেবী এই মহাকাব্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; তারা রণক্ষেত্রে তাদের প্রিয় যোদ্ধাদের সাহায্য করেন এবং ব্যক্তিগত বিবাদে হস্তক্ষেপ করেন।[১০] মানুষের মতো আবেগপ্রবণ করে দেবতাদের চিত্রায়ণ প্রাচীন গ্রিক দর্শকদের কাছে তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আরও মূর্ত করে তুলেছিল।


পৌরাণিক গ্রিসের মানচিত্র

ইলিয়াড গ্রিক মহাকাব্য। প্রাচীন গ্রিসের ইলিওন শহরের নামানুসারে এই মহাকাব্যের নামকরণ করা হয়। মহাকবি হোমার এই মহাকাব্যের রচয়িতা। এটি গ্রিক ভাষায় রচিত ও ২৪ টি সর্গে বিভক্ত। এর বিষয় ট্রয়ের যুদ্ধ। এতে ১৬,০০০ পঙ্‌ক্তি কবিতা আছে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় এক নারীকে কেন্দ্র করে যার নাম হেলেন। যুদ্ধে গ্রীকদের সেরা বীর ছিল অ্যাকিলিস আর ট্রয় পক্ষে ছিল হেক্টর। যুদ্ধ যখন শেষ পর্যায় তখন হেক্টর অ্যাকিলিস কর্তৃক নিহত হন এবং এর মাধ্যমে মূলত ট্রয়বাসীর পরাজয় নিশ্চিত হয়। যুদ্ধ শেষে গ্রিক সেনারা সুরক্ষিত ও সাজানো নগরী ট্রয় জ্বালিয়ে দেয়।

ইলিয়াড কাব্যের পরবর্তী খণ্ড হিসেবে ওডিসির উল্লেখ করা হয়। এটিও হোমারের রচনা বলে ধারণা করা হয়। এই দুটি কাব্য পাশ্চাত্য সাহিত্যের সবচেয়ে পুরাতন রচনা হিসেবে গণ্য এবং এর লিখিত রূপ খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীর বলে ধারণা করা হয়।[১১] আধুনিক গ্রহণযোগ্য সংস্করণে ইলিয়াডের ১৫,৬৯৩টি ছত্র রয়েছে। এটি আইওনিক গ্রিক ও অন্যান্য উপভাষার সংমিশ্রণে গঠিত হোমারীয় গ্রিক ভাষায় রচিত। মাইকেল এন ন্যাগলারের মতে, ইলিয়াড ওডিসির থেকেও জটিলতর মহাকাব্য।[১২]

কাহিনী সংক্ষেপ

[সম্পাদনা]

প্রারম্ভিক বর্ণনা (১ম–৪র্থ খণ্ড)

[সম্পাদনা]

উৎস:[]

ইলিয়াড-এর শুরুর পঙ্ক্তিমালা

মহাকাব্যটি শুরু হয় কাব্যদেবীর (Muse) আবাহনের মধ্য দিয়ে। কাহিনীর ঘটনাবলি ট্রোজান যুদ্ধের শেষের দিকে সংঘটিত হয়, যা ট্রয় নগরীর অধিবাসী এবং অবরোধকারী আকীয়দের মধ্যে চলছিল। আকীয় বাহিনী বিভিন্ন গ্রিক রাজ্যের সেনাবাহিনী নিয়ে গঠিত ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন নিজ নিজ রাজা বা রাজপুত্ররা। মাইসিনির রাজা অ্যাগামেমনন এই সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নয় বছর যুদ্ধের পর, গ্রিক সেনাবাহিনী (আকীয়রা) ট্রয়ের মিত্র শহর ক্রাইসি লুণ্ঠন করে। যুদ্ধের সময় আকীয়রা ক্রাইসেইস এবং ব্রিসেইস নামে দুই রূপবতী তরুণীকে বন্দি করে। সেনাপতি অ্যাগামেমনন ক্রাইসেইসকে নিজের পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন এবং আকীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা অ্যাকিলিস ব্রিসেইসকে নিজের দাবি করেন।

অ্যাপোলোর পুরোহিত ক্রাইসেস তার কন্যা ক্রাইসেইসের মুক্তির বিনিময়ে অ্যাগামেমনন ও আকীয়দের প্রচুর ধনসম্পদ প্রদানের প্রস্তাব দেন। অধিকাংশ আকীয় এই প্রস্তাবে রাজি থাকলেও অ্যাগামেমনন তা প্রত্যাখ্যান করেন। ক্রাইসেস তখন অ্যাপোলোর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং অ্যাপোলো আকীয় শিবিরে এক ভয়াবহ মহামারী বা প্লেগ পাঠান। মহামারীর নবম দিনে, মিরমিডন বাহিনীর নেতা এবং গ্রিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা (aristos achaion) অ্যাকিলিস এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সভা ডাকেন। চাপের মুখে অ্যাগামেমনন ক্রাইসেইসকে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে রাজি হন, কিন্তু এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি অ্যাকিলিসের দাসী ব্রিসেইসকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সমবেত আকীয় বাহিনীর সামনে অ্যাগামেমননের এই সিদ্ধান্তকে চরম অপমান হিসেবে গণ্য করে অ্যাকিলিস ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা করেন যে, তিনি এবং তার সৈন্যরা আর অ্যাগামেমননের পক্ষে যুদ্ধ করবেন না। ওডিসিউস ক্রাইসেইসকে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দেন এবং অ্যাপোলো মহামারী বন্ধ করেন।

ইতিমধ্যে অ্যাগামেমননের দূতরা ব্রিসেইসকে নিয়ে যায়। অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে অ্যাকিলিস তার মা থেটিসের কাছে প্রার্থনা করেন, যিনি ছিলেন একজন সমুদ্রপরী ও গৌণ দেবী।[১৩] অ্যাকিলিস তার মাকে জিউসের কাছে অনুনয় করতে বলেন যেন ট্রোজানরা আকীয়দের পিছু হটিয়ে তাদের জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার উপক্রম করে। কেবল তখনই অ্যাগামেমনন বুঝতে পারবেন যে আকীয়দের জন্য অ্যাকিলিস কতটা অপরিহার্য এবং তার হারানো সম্মান ফিরিয়ে দেবেন। থেটিস তা-ই করেন এবং জিউস তাতে সম্মত হন। জিউস এরপর অ্যাগামেমননের কাছে একটি স্বপ্ন পাঠান, যা তাকে ট্রয় আক্রমণ করতে প্ররোচিত করে। অ্যাগামেমনন সেই স্বপ্ন অনুযায়ী কাজ করেন, তবে প্রথমে তিনি আকীয় সেনাদের মনোবল পরীক্ষা করার জন্য তাদের বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। যুদ্ধের নয় বছর পর সেনাদের মনোবল এমনিতেই ভেঙে পড়েছিল। ফলে পরিকল্পনাটি হিতে বিপরীত হয় এবং দেবী অ্যাথিনার অনুপ্রেরণায় ওডিসিউসের হস্তক্ষেপে সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হওয়া থেকে রক্ষা পায়। ওডিসিউস সাধারণ সৈনিক থারসাইটিসকে প্রহার করে দমন করেন, যে অ্যাগামেমননের যুদ্ধের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করছিল।

আকীয়রা ট্রোজান প্রান্তরে দলবদ্ধভাবে মোতায়েন হয়। আকীয়দের এই সমাবেশের খবর রাজা প্রয়ামের কাছে পৌঁছালে ট্রোজানরাও যুদ্ধের ময়দানে পাল্টা অগ্রসর হয়। দুই বাহিনী মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগে, ট্রয়ের বীর ও ভাই হেক্টরের প্ররোচনায় প্যারিস ঘোষণা করেন যে, মেনিলাউসের সাথে একক যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি করতে চান। এখানেই সমগ্র যুদ্ধের মূল কারণটি ব্যাখ্যা করা হয়: মেনিলাউসের স্ত্রী এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী হেলেনকে প্যারিস মেনিলাউসের স্পার্টার বাড়ি থেকে অপহরণ করেছিলেন। মেনিলাউস ও প্যারিস দ্বৈরথ যুদ্ধে রাজি হন; শর্ত থাকে যে বিজয়ী হেলেনকে লাভ করবেন। যুদ্ধে প্যারিস পরাজিত হতে চললে দেবী অ্যাফ্রোডাইটি তাকে উদ্ধার করেন এবং মেনিলাউস তাকে হত্যা করার আগেই তাকে হেলেনের কক্ষে পৌঁছে দেন।

দেবতারা যুদ্ধটি এখানেই শেষ হওয়া উচিত কি না তা নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু হেরা জিউসকে ট্রয়ের সম্পূর্ণ ধ্বংসের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি করান। অ্যাথিনা ট্রোজান ধনুর্ধর প্যান্ডারাসকে প্ররোচিত করেন মেনিলাউসকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়তে। মেনিলাউস আহত হন এবং এর ফলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং এতে অনেক আকীয় ও ট্রোজান প্রাণ হারান।

গ্রিক ও ট্রোজান বীরদের দ্বৈরথ (৫ম–৭ম খণ্ড)

[সম্পাদনা]

উৎস:[]

যুদ্ধের এক পর্যায়ে ডায়োমিডিস প্যান্ডারাসসহ অনেক ট্রোজানকে হত্যা করেন এবং ঈনিয়াসকেও পরাজিত করেন। ঈনিয়াস নিহত হওয়ার ঠিক আগে অ্যাফ্রোডাইটি তাকে উদ্ধার করেন, কিন্তু ডায়োমিডিস আক্রমণ চালিয়ে দেবীর কবজিতে আঘাত করে তাকে জখম করেন। এরপর অ্যাপোলো ডায়োমিডিসের মুখোমুখি হন এবং তাকে দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার জন্য সতর্ক করেন, যা ডায়োমিডিস উপেক্ষা করেন। অ্যাপোলো তখন ডায়োমিডিসকে দমনের জন্য যুদ্ধের দেবতা অ্যারিসকে পাঠান। হেক্টরসহ অনেক বীর ও সেনাপতি যুদ্ধে যোগ দেন এবং উভয় পক্ষের সমর্থক দেবতারা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। অ্যাথিনার অনুপ্রেরণায় ডায়োমিডিস শেষ পর্যন্ত অ্যারিসকেও আহত করেন এবং তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেন।


হেক্টর ট্রোজানদের পুনরায় সংগঠিত করেন এবং তাদের শোচনীয় পরাজয় ঠেকান। ডায়োমিডিস এবং ট্রোজান বীর গ্লকাস দ্বৈরথের মাঝপথে নিজেদের পূর্বপুরুষদের বন্ধুত্বের কথা জানতে পেরে যুদ্ধ থামিয়ে দেন। গ্লকাসের মুখে বেলেরোফনের কাহিনী শুনে তারা একে অপরের প্রতি সম্মান জানিয়ে অসম মূল্যের উপহার বিনিময় করেন। হেক্টর শহরে প্রবেশ করে তার মা হেকিউবাকে প্রার্থনা ও তর্পণ করার অনুরোধ জানান, প্যারিসকে যুদ্ধে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং নগরপ্রাচীরের ওপর স্ত্রী অ্যান্ড্রোম্যাকি ও পুত্র অ্যাস্টিয়ানাক্সের কাছ থেকে বিদায় নেন। এরপর তিনি পুনরায় যুদ্ধে যোগ দেন। হেক্টর মহাবীর আয়াক্সের সাথে দ্বৈরথে লিপ্ত হন, কিন্তু রাত নেমে আসায় যুদ্ধ স্থগিত হয় এবং উভয় পক্ষ নিজ নিজ শিবিরে ফিরে যায়। ট্রোজানরা হেলেনকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়। প্যারিস হেলেনকে বাদে তার সাথে আনা সম্পদ এবং অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যা গ্রিকরা প্রত্যাখ্যান করে। উভয় পক্ষ মৃতদেহ সৎকারের জন্য একদিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এই অবসরে আকীয়রা তাদের শিবির ও জাহাজ রক্ষার জন্য একটি প্রাচীর ও পরিখা নির্মাণ করে।

গ্রিকদের বিপর্যয় (৮ম–১৫শ খণ্ড)

[সম্পাদনা]

উৎস:[][]

ইলিয়াড, ৮ম খণ্ড, ২৪৫–২৫৩ পঙ্ক্তি, গ্রিক পাণ্ডুলিপি, ৫ম শতাব্দীর শেষভাগ বা ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শুরুর দিক

পরদিন সকালে জিউস দেবতাদের যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়। ট্রোজানরা আধিপত্য বিস্তার করে এবং আকীয়দের তাদের নবনির্মিত প্রাচীরের পেছনে পিছু হটতে বাধ্য করে। হেরা ও অ্যাথিনাকে গ্রিকদের সাহায্য করতে বাধা দেওয়া হয়। ট্রোজানরা গ্রিক প্রাচীরে চূড়ান্ত আঘাত হানার আগেই রাত নেমে আসে। তারা পরদিন ভোরে আক্রমণের অপেক্ষায় ময়দানেই শিবির স্থাপন করে এবং তাদের অসংখ্য প্রহরা-অগ্নির আলোয় রণক্ষেত্রটি তারার মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

ইতিমধ্যে আকীয়রা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়। অ্যাগামেমনন নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং ওডিসিউস, আয়াক্স ও ফিনিক্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান। তারা ব্রিসেইসকে ফিরিয়ে দেওয়াসহ প্রচুর উপঢৌকনের বিনিময়ে অ্যাকিলিসকে যুদ্ধে ফেরার অনুরোধ জানান। অ্যাকিলিস ও তার সখা প্যাট্রোক্লাস প্রতিনিধি দলকে অভ্যর্থনা জানালেও অ্যাকিলিস ক্ষোভের সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মনে করেন তার অপমানের তুলনায় এই ক্ষতিপূরণ নগণ্য। তিনি ঘোষণা করেন যে, ট্রোজানরা যদি তার জাহাজে আগুন দেওয়ার উপক্রম করে কেবল তখনই তিনি যুদ্ধে ফিরবেন। প্রতিনিধি দলটি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।


সেই রাতেই ওডিসিউস ও ডায়োমিডিস গোপনে ট্রোজান ব্যুহে প্রবেশ করেন, ট্রোজান গুপ্তচর ডলোনকে হত্যা করেন এবং ট্রয়ের মিত্র থ্রেসীয় শিবিরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান। সকালে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয় এবং অ্যাগামেমনন, ডায়োমিডিস ও ওডিসিউস সবাই আহত হন। অ্যাকিলিস তার শিবির থেকে প্যাট্রোক্লাসকে পাঠান গ্রিকদের ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ নিতে। সেখানে প্রবীণ রাজা নেস্টরের একটি আবেগপূর্ণ বক্তব্যে প্যাট্রোক্লাস ব্যথিত হন। নেস্টর প্যাট্রোক্লাসকে অনুরোধ করেন যেন তিনি অ্যাকিলিসকে যুদ্ধে ফেরার জন্য রাজি করান, অথবা অ্যাকিলিস নিজে না এলে প্যাট্রোক্লাস যেন অ্যাকিলিসের বর্ম পরে সৈন্যদলের নেতৃত্ব দেন।

ট্রোজানরা পায়ে হেঁটে আকীয় প্রাচীর আক্রমণ করে। হেক্টর এক অশুভ লক্ষণের সতর্কতা উপেক্ষা করে সেই ভয়াবহ আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। আকীয়রা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে, প্রাচীরের দরজা ভেঙে যায় এবং হেক্টর ভেতরে প্রবেশ করেন। গ্রিকরা পিছু হটে নিজেদের জাহাজের কাছে আশ্রয় নেয়।

পসেইডন গ্রিকদের এই দশা দেখে ব্যথিত হন এবং জিউসের আদেশ অমান্য করে তাদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গ্রিকদের মনোবল চাঙ্গা করেন এবং তারা ট্রোজানদের হঠিয়ে দিতে শুরু করে। যুদ্ধে পসেইডনের ভ্রাতুষ্পুত্র অ্যামফিমাকাস নিহত হলে পসেইডন ক্রিটের রাজা ইডোমেনিয়াসকে দৈব শক্তি দান করেন। উভয় পক্ষের অনেক সৈন্য প্রাণ হারায়। ট্রোজান ভবিষ্যৎদ্রষ্টা পলিডামাস একটি অশুভ সংকেত দেখে হেক্টরকে পিছু হটার পরামর্শ দিলেও তিনি তা কানে তোলেননি।

হেরা জিউসকে মোহিত করে ঘুম পাড়িয়ে দেন, যাতে পসেইডন নির্বিঘ্নে গ্রিকদের সাহায্য করতে পারেন। ট্রোজানরা পুনরায় ময়দানের দিকে পিছু হটে যায়। আয়াক্স হেক্টরকে আহত করেন এবং তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ট্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। জিউস জেগে উঠে পসেইডনের হস্তক্ষেপ দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তবে তিনি হেরাকে আশ্বস্ত করেন যে, হেক্টরের হাতে প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুর পর ট্রয়ের পতন সুনিশ্চিত। পসেইডনকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ডেকে নেওয়া হয় এবং জিউস ট্রোজানদের সাহায্য করার জন্য অ্যাপোলোকে পাঠান। ট্রোজানরা আবারও গ্রিক প্রাচীর ভেদ করে এবং যুদ্ধ এবার সরাসরি গ্রিক জাহাজের কাছে পৌঁছে যায়।

প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু (১৬শ–১৮শ খণ্ড)

[সম্পাদনা]

উৎস:[]

হিফাস্টাসের কর্মশালায় অ্যাকিলিসের নতুন অস্ত্রের জন্য অপেক্ষমাণ থেটিস, পম্পেই থেকে প্রাপ্ত ফ্রেস্কো, ১ম শতাব্দী

প্যাট্রোক্লাস আর সহ্য করতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে অ্যাকিলিসের কাছে যান। তিনি অ্যাকিলিসের একগুঁয়েমির জন্য তাকে তিরস্কার করেন এবং তার পরিবর্তে তাকে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি অ্যাকিলিসের বর্ম পরে যুদ্ধে যেতে চান যাতে শত্রুরা তাকে অ্যাকিলিস ভেবে ভুল করে। অ্যাকিলিস শেষ পর্যন্ত রাজি হন এবং প্যাট্রোক্লাসকে নিজের বর্ম ধার দেন। তবে তিনি প্যাট্রোক্লাসকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন যেন ট্রোজানদের পিছু হটিয়ে দিয়েই তিনি ফিরে আসেন এবং কোনোভাবেই ট্রয়ের প্রাচীর পর্যন্ত তাদের তাড়া না করেন। অ্যাকিলিস আশা প্রকাশ করেন যে, সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে তিনি এবং প্যাট্রোক্লাস মিলে ট্রয় জয় করবেন।


প্যাট্রোক্লাস মিরমিডনদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছান ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ট্রোজানরা প্রথম গ্রিক জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এই আকস্মিক আক্রমণে ট্রোজানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। প্যাট্রোক্লাস ট্রোজানদের অন্যতম প্রধান মিত্র এবং জিউসের পুত্র সার্পেডনকে হত্যার মাধ্যমে তার আক্রমণ শুরু করেন। তবে অ্যাকিলিসের নির্দেশ উপেক্ষা করে প্যাট্রোক্লাস ট্রয়ের ফটক পর্যন্ত শত্রুদের তাড়া করেন, যেখানে স্বয়ং অ্যাপোলো তাকে থামিয়ে দেন। যুদ্ধে প্যাট্রোক্লাস হেক্টরের রথচালক ক্যাব্রিওনেসকে হত্যা করেন, কিন্তু অ্যাপোলো ও ইউফোরবোসের আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং পরিশেষে হেক্টরের হাতে নিহত হন।

হেক্টর মৃত প্যাট্রোক্লাসের শরীর থেকে অ্যাকিলিসের বর্ম খুলে নেন। আকীয়রা প্যাট্রোক্লাসের মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য ট্রোজানদের সাথে লড়াই শুরু করে, কারণ হেক্টরের নির্দেশে ট্রোজানরা দেহটি ট্রয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। অ্যান্টিলোকাসকে অ্যাকিলিসের কাছে সংবাদ পাঠাতে পাঠানো হয় এবং মৃতদেহ উদ্ধারে তার সাহায্য চাওয়া হয়।

প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুর সংবাদ শুনে অ্যাকিলিস শোকে এতটাই ভেঙে পড়েন যে মহাসাগরের তলদেশ থেকে তার মা থেটিস তার কান্নার শব্দ শুনতে পান। থেটিস নিজেও শোকাতুর হন, কারণ তিনি জানতেন যে হেক্টরকে হত্যা করলে অ্যাকিলিসের নিজের মৃত্যুও অনিবার্য। নিজের ভাগ্যের কথা জেনেও অ্যাকিলিস প্যাট্রোক্লাসের হত্যার প্রতিশোধ নিতে হেক্টরকে মারার শপথ নেন।

অ্যাকিলিসকে প্যাট্রোক্লাসের দেহ উদ্ধারে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করা হয়, কিন্তু তার কাছে তখন কোনো বর্ম ছিল না। অ্যাথিনার দেওয়া এক উজ্জ্বল জ্যোতিতে ভাস্বর হয়ে অ্যাকিলিস আকীয় প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়ে ক্রোধে গর্জন করেন। তার এই রুদ্রমূর্তি দেখে ট্রোজানরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং এই সুযোগে আকীয়রা প্যাট্রোক্লাসের দেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। পলিডামাস আবারও হেক্টরকে শহরের ভেতরে পিছু হটার পরামর্শ দেন; কিন্তু হেক্টর আবারও তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ট্রোজানরা রাত কাটানোর জন্য ময়দানেই শিবির স্থাপন করে।

মর্মাহত অ্যাকিলিস প্যাট্রোক্লাসের জন্য শোক পালন করেন। এদিকে থেটিসের অনুরোধে হিফাস্টাস অ্যাকিলিসের জন্য একটি নতুন বর্ম সেট তৈরি করেন, যার মধ্যে ছিল এক অপূর্ব কারুকার্যময় ঢাল[১৪]

অ্যাকিলিসের ক্রোধ (১৯শ–২৪শ খণ্ড)

[সম্পাদনা]

উৎস:[]

ভুলসি-র ফ্রাঁসোয়া সমাধি থেকে প্রাপ্ত ফ্রেস্কোর অংশ, যেখানে ট্রোজান বন্দিদের বলিদানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। বাম থেকে ডানে: অ্যাগামেমনন, প্যাট্রোক্লাসের প্রেতাত্মা, ভ্যান্থ, অ্যাকিলিস (এক বন্দির শিরশ্ছেদ করছেন), চারুন, মহাবীর আয়াক্স, একজন বন্দি এবং কনিষ্ঠ আয়াক্স। ৩৫০–৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ

সকালে থেটিস অ্যাকিলিসের জন্য নতুন বর্ম নিয়ে আসেন এবং তাকে প্যাট্রোক্লাসের দেহের ওপর কাঁদতে দেখেন। অ্যাকিলিস যুদ্ধের জন্য সজ্জিত হন এবং আকীয় যোদ্ধাদের একত্রিত করেন। অ্যাগামেমনন অ্যাকিলিসকে ব্রিসেইসসহ প্রতিশ্রুত সকল উপহার প্রদান করেন, কিন্তু অ্যাকিলিস সেগুলোর প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি। আকীয়রা খাবার গ্রহণ করলেও অ্যাকিলিস তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার ঘোড়া জ্যান্থোস অ্যাকিলিসের আসন্ন মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করে; কিন্তু অ্যাকিলিস তাতে ভ্রুক্ষেপ করেন না। অটোমেডন রথ চালালে অ্যাকিলিস রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

জিউস দেবতাদের ওপর থেকে হস্তক্ষেপের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং দেবতারা উভয় পক্ষকে সাহায্য করতে শুরু করেন। শোক ও ক্রোধে জ্বলতে থাকা অ্যাকিলিস অসংখ্য ট্রোজানকে হত্যা করেন। তিনি নদীর ধারে অর্ধেক ট্রোজান বাহিনীকে নিধন করেন এবং মৃতদেহের স্তূপে নদীর স্রোত বন্ধ হয়ে যায়। নদী দেবতা স্ক্যাম্যান্ডার অ্যাকিলিসের মুখোমুখি হন এবং তাকে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার নির্দেশ দেন, কিন্তু অ্যাকিলিস তা মানতে অস্বীকার করেন। তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং পরিশেষে হিফাস্টাসের অগ্নিকুণ্ডের দাপটে স্ক্যাম্যান্ডার পিছু হটতে বাধ্য হন। দেবতারাও নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। ট্রয়ের বিশাল ফটক খুলে দেওয়া হয় পলায়নপর ট্রোজানদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য এবং অ্যাপোলো একজন ট্রোজানের ছদ্মবেশ ধরে অ্যাকিলিসকে শহরের দিক থেকে দূরে সরিয়ে নেন। যখন অ্যাপোলো নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন, ততক্ষণে হেক্টর বাদে বাকি সব ট্রোজান শহরের ভেতর নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।


পিতা প্রিয়াম এবং মাতা হেকিউবার অনুনয় সত্ত্বেও হেক্টর অ্যাকিলিসের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে অ্যাকিলিস যখন কাছে আসেন, তখন হেক্টর ভয় পেয়ে যান এবং শহরের চারপাশে দৌড়াতে শুরু করেন। অ্যাকিলিস তাকে ধাওয়া করেন। পরিশেষে অ্যাথিনা হেক্টরের ভাই ডিফোবাসের রূপ ধরে তাকে থামান এবং তাকে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে প্ররোচিত করেন। সংক্ষিপ্ত এক দ্বৈরথের পর অ্যাকিলিস হেক্টরের গলায় বর্শা বিদ্ধ করেন। মৃত্যুর আগে হেক্টর অ্যাকিলিসকে মনে করিয়ে দেন যে তার মৃত্যুও আসন্ন। অ্যাকিলিস হেক্টরের দেহ থেকে বর্ম খুলে নেন এবং তার মৃত্যু নিয়ে উপহাস করেন। এরপর তিনি হেক্টরের মৃতদেহকে তার রথের পেছনে বেঁধে শহরের চারপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে তাকে চরম অপমান করেন। হেকিউবা এবং প্রিয়াম বিলাপ করেন এবং প্রিয়াম নিজে অ্যাকিলিসের মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করেন। হেক্টরের স্ত্রী অ্যান্ড্রোম্যাকি এই সংবাদ শুনে প্রাচীরের কাছে আসেন এবং নিচের দৃশ্য দেখে মুর্ছা যান। সমগ্র ট্রয় নগরী শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে।

প্যাট্রোক্লাসের প্রেতাত্মা অ্যাকিলিসের স্বপ্নে এসে তাকে দ্রুত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার অনুরোধ জানায় যাতে তার আত্মা পাতালপুরীতে প্রবেশ করতে পারে। প্যাট্রোক্লাস তাদের উভয়ের অস্থি যেন একটি পাত্রে একসাথে রাখা হয় সেই ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অ্যাকিলিস তাতে রাজি হন এবং প্যাট্রোক্লাসের দেহ দাহ করা হয়। আকীয়রা একদিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ক্রীড়ার আয়োজন করে এবং অ্যাকিলিস বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করেন।

অ্যাকিলিস শোকে নিমজ্জিত হয়ে দিনের পর দিন প্যাট্রোক্লাসের জন্য বিলাপ করেন এবং রথের পেছনে বেঁধে হেক্টরের মৃতদেহ টেনে নিয়ে যান। হেক্টরের মরদেহের প্রতি এই অবমাননা দেখে জিউস ক্ষুব্ধ হন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে এটি প্রিয়ামের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। হার্মিসের নেতৃত্বে প্রিয়াম অলক্ষ্যে প্রচুর উপহারবাহী একটি গাড়ি নিয়ে আকীয় শিবিরে পৌঁছান। তিনি অ্যাকিলিসের হাঁটু জড়িয়ে ধরে তার পুত্রের মৃতদেহ ভিক্ষা করেন। প্রিয়ামের শোকে অ্যাকিলিস বিচলিত হন এবং অবশেষে তার ক্রোধ শান্ত হয়। যুদ্ধের কারণে তাদের উভয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তারা একসাথে বিলাপ করেন। অ্যাকিলিস হেক্টরের দেহ ফিরিয়ে দিতে রাজি হন এবং ট্রোজানদের ১২ দিন সময় দেন যেন তারা যথাযথভাবে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। হেক্টরের দেহ ফেরত দেওয়ায় প্যাট্রোক্লাসের প্রতি কোনো অমর্যাদা হলো কি না তা ভেবে অ্যাকিলিস তার সখার কাছে ক্ষমা চান। ভোজের পর প্রিয়াম হেক্টরের দেহ নিয়ে ট্রয়ে ফিরে যান। হেক্টরকে সমাহিত করা হয় এবং পুরো শহর তার জন্য শোক পালন করে।

প্রধান চরিত্রাবলি

[সম্পাদনা]

গ্রিক বাহিনী

[সম্পাদনা]
  • আগামেনন - মাইসিনির রাজা ও গ্রিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। অ্যাট্রিউসের পুত্র, মেনেলাউসের ভাই ও ক্লাইটেমনেস্ট্রার স্বামী।
  • অ্যাকিলিস - মর্তের রাজা পেলেউস ও সাগরদেবী থেটিসের পুত্র, বীর যোদ্ধা, ফিদিয়ার মারমিডন জাতির নেতা।
  • অডিসিউস - ইথাকার রাজা ও গ্রিক সাহসী বীর।
  • বড় অ্যাজাক্স - টেলামানের পুত্র এবং সালামিস দ্বীপের রাজা ও সালামিস যোদ্ধাদের নেতা।
  • মেনেলাউস - স্পার্টার রাজা, আগামেমননের ভাই ও হেলেনের স্বামী।
  • ডায়োমিডাস - টাইডিউসের পুত্র ও আর্গসের রাজা।
  • ছোট অ্যাজাক্স - অলিয়াসের পুত্র ও লুক্রিয়ানদের দলপতি।
  • প্যাট্রোক্লাস - মেনোটিয়াসের পুত্র এবং আকিলিসের ঘনিষ্ঠ সহচর।
  • নেস্টর - নেলেউসের পুত্র ও পাইলসের রাজা। আগামেমননের বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা।

ট্রয় বাহিনী

[সম্পাদনা]

ট্রয়ের পুরুষ চরিত্রগুলো হলঃ

  • হেক্টর - রাজা প্রায়াম ও রানী হেকাবীর পুত্র, অ্যান্ডোমাকির স্বামী এবং ট্রয় বাহিনীর প্রধান যোদ্ধা ও সেনাপতি।
  • ইনিয়াস - দেবী আফ্রোদিতি ও অ্যাঙ্কাউসিজের পুত্র এবং হেক্টরের চাচাতো ভাই।
  • প্যারিস - রাজা প্রায়াম ও রানী হেকাবীর পুত্র, ট্রয়ের যুবরাজ এবং হেলেনের প্রেমিক ও অপহরণকারী।
  • ডেইফোবাস - হেক্টর ও প্যারিসের ভাই।
  • প্রায়াম - ট্রয়ের রাজা।
  • পলিডেমাস - ট্রয়ের একজন কৌশলী ও চিন্তাশীল যুদ্ধবিশারদ।
  • সার্পেডন - দেবরাজ জিউসের পুত্র, লাইসিয়াম দলের অধিনায়ক, প্যাট্রোক্লাসের হাতে নিহত হন।
  • গ্লকাস - হিপোলোকাসের পুত্র, সার্পেডনের বন্ধু ও লাইসিয়াম দলের সার্পেডনের পরেই তার স্থান।
  • ইউরফোরবাস - প্যাট্রোক্লাসকে আহত করা প্রথম ট্রয় যোদ্ধা।
  • ডোলন - ধনাঢ্য ট্রয় যুবক ও গ্রিক ক্যাম্পে গোয়েন্দা।
  • এন্টিনর - রাজা প্রায়ামের উপদেষ্টা, যিনি হেলেনকে ফিরিয়ে দেওয়ার উপদেশ দেন।
  • এজনর - এন্টিনরে পুত্র ও ট্রয় যোদ্ধা, যে আকিলিসের বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছিল।
  • পলিডোরাস - প্রায়াম ও লাওথোর পুত্র।
  • প্যান্ডারাস - লাইকাওনের পুত্র ও প্রখ্যাত তীরন্দাজ কিন্তু বিশ্বাসঘাতক।

ট্রয়ের নারী চরিত্রগুলো হলঃ

  • হেকাবি - রাজা প্রায়ামের স্ত্রী, হেক্টর, ক্যাসান্ড্রা, প্যারিস, হেলেনাস ও ডিওফোবাসের মাতা।
  • হেলেন - জিউসের কন্যা, মেনেলাউসের স্ত্রী, এবং প্যারিস কর্তৃক অপহৃত।
  • অ্যান্ড্রোমাকি - হেক্টরের স্ত্রী ও এস্টিয়ানাক্সের মাতা।
  • ক্যাসান্ড্রা - প্রায়াম ও হেকাবির কন্যা, হেক্টর ও প্যারিসের বোন।
  • ব্রিসেইস - লির্নেসাসের ব্রিসেইসের কন্যা। আকিলিসের কাছ থেকে আগামেমনন তাকে অন্যায়ভাবে নিয়ে গেলে তাদের দুজনের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়।

দেবদেবী

[সম্পাদনা]

প্রধান দেবদেবী:

  • জিউস - দেবতাদের রাজা। মর্ত ও ভূমণ্ডলের অধিপতি। নির্দলীয়।
  • হেরা - দেবরাজ জিউসের স্ত্রী ও গ্রিক পুরাণের স্বর্গের রানী। তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • আর্তেমিস - অরণ্যচারী দেবী। তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • অ্যাপোলো - ভবিষ্যদ্বাণী, কাব্য ও সঙ্গীতের দেবতা। তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • হেডিস - পাতালপুরীর দেবতা। নির্দলীয়।
  • আফ্রোদিতি - প্রেমের দেবী। তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • আরেস - তিনি প্রথমে গ্রিক ও পরে ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • অ্যাথিনা - জ্ঞান বিজ্ঞান, যুদ্ধ ও চারুকলার দেবী। তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • হার্মিস - দেবতাদের সংবাদ বহনকারী। তিনি প্রথমে নির্দলীয় ও পরে ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • পসেইডন - সমুদ্র দেবতা। তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • হেফাইস্তোস - দেব কারিগর ও অগ্নিদেবতা। তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।

অপ্রধান দেবদেবী:

  • এরিস - তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • আইরিস - রঙধনুর দেবী। নির্দলীয়।
  • থেটিস - আকিলিসের মাতা। তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • লেটো - অ্যাপোলো ও আর্টেমিসের মাতা। তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • প্রটেউস - তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • স্ক্যামেন্ডার - তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • ফোবোস - তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • ডেইমোস - তিনি ট্রয় বাহিনীর সমর্থন করেন।
  • হাইপনোস - তিনি গ্রিক বাহিনীর সমর্থন করেন।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Fantuzzi, et al., The Greek Epic Cycle and Its Ancient Reception - A Companion, 2015.
  2. 1 2 3 4 Homer, Iliad, Volume I, Books 1–12, translated by A. T. Murray, revised by William F. Wyatt, Loeb Classical Library 170, Cambridge, MA, Harvard University Press, 1924.
  3. 1 2 3 4 Homer, Iliad, Volume II - Books 13–24, translated by A. T. Murray, revised by William F. Wyatt, Loeb Classical Library 171, Cambridge, MA, Harvard University Press, 1925.
  4. "Who was Homer?"The British Museum
  5. Dunn 2020
  6. Fowler 2004a, পৃ. 220–232।
  7. Plato, Ion, translated by Harold North Fowler, W. R. M. Lamb, Loeb Classical Library, 164, Cambridge, MA, Harvard University Press, 1925.
  8. Ready ও Tsagalis 2018
  9. Hammond 1987, পৃ. i–xxxiv।
  10. Kearns, E. (2004), "The Gods in the Homeric epics", in R. Fowler (ed.), The Cambridge Companion to Homer, Cambridge, Cambridge University Press (Cambridge Companions to Literature), pp. 59–73.
  11. Vidal-Naquet, Pierre (২০০০)। "Le monde d'Homère" (হোমারের জগত)। পেরিন। পৃ. ১৯।
  12. মিরসিয়াডিস, কোসটাস (১৯৮৭)। "Approaches to teaching Homer's Iliad and Odyssey"। নিউ ইয়র্ক: মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা। ISBN 0873524993. OCLC 14932229.
  13. Homer। The Iliad। Wilson, Emily কর্তৃক অনূদিত। W. W. Norton & Company। পৃ. ১১৫।
  14. Auden, W. H., and Alan Jacobs, The Shield of Achilles, 2024.

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]