থেটিস
| থেটিস | |
|---|---|
| নেরেইডস গোষ্ঠীর সদস্য | |
কিশোর ট্রাইটনকে সঙ্গে নিয়ে থেটিসের মূর্তি | |
| আবাস | সমুদ্র |
| ব্যক্তিগত তথ্য | |
| মাতাপিতা | নেরেউস ও ওশেনিড ডোরিস |
| সহোদর | নেরেইড, নেরিতেস |
| সঙ্গী | পেলেউস |
| সন্তান | আকিলিস |
থেটিস ছিলেন গ্রিক পুরাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাঁর পরিচয় বিভিন্ন কাহিনিতে ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি প্রধানত একজন সমুদ্র-অপ্সরা, জলদেবী এবং সমুদ্রের প্রাচীন দেবতা নেরেউসের পঞ্চাশ কন্যার অন্যতম নেরেইড হিসেবে পরিচিত।
ধ্রুপদি গ্রিক পুরাণে থেটিসকে নেরেউস ও ডোরিসের কন্যা এবং টেথিসের নাতনি বলা হয়েছে। কিছু কাহিনিতে তাঁর মধ্যে টেথিসের বৈশিষ্ট্যও প্রতিফলিত হয়। নেরেইডদের মধ্যে তিনিই প্রায়শই নেতৃত্ব দেন এবং তাঁদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁকে মেটিসের সঙ্গেও অভিন্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাচীন যুগের একটি মাত্র খণ্ডিত লিখিত উৎসে থেটিসের উপাসনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া কবি আলকমানের একটি প্রাচীন স্তোত্রে তাঁকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক পসানিয়াস-সহ বিভিন্ন প্রাচীন লেখকের বিবরণ থেকে জানা যায়, ইতিহাসের পরবর্তী সময়েও কিছু অঞ্চলে দেবী হিসেবে থেটিসের পূজা প্রচলিত ছিল।
ট্রয় যুদ্ধসংক্রান্ত পুরাণচক্রে থেটিস ও গ্রিক বীর পেলেউসের বিবাহকে যুদ্ধের অন্যতম সূচনাকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের সন্তান ছিলেন বিখ্যাত বীর আকিলিস।
থেটিসের অন্যতম উপাধি ছিল হ্যালোসিদনে, যার অর্থ ‘সমুদ্রে লালিত’ বা ‘সমুদ্রজাত দেবী’।[১]
দেবী হিসেবে
[সম্পাদনা]বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ উপাদানে থেটিসকে মূলত আকিলিসের জননী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে কিছু প্রমাণ থেকে ধারণা করা হয় যে, প্রাচীন গ্রিসের আর্কাইক যুগে তিনি সমুদ্রদেবী হিসেবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিলেন।
থেটিস নামটির প্রাক-আধুনিক ব্যুৎপত্তি গ্রিক টিথেমি (‘স্থাপন করা’ বা ‘প্রতিষ্ঠা করা’) শব্দ থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হতো। এ কারণে ধ্রুপদি গ্রিকরা তাঁকে সম্ভবত প্রাচীনকালের কোনো প্রতিষ্ঠাতা বা রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত দেবী হিসেবে কল্পনা করত। তবে আধুনিক গবেষক ভাল্টার বুর্কার্ট মনে করেন, থেটিস নামটি মূলত টেথিস নামের একটি রূপান্তরিত দ্বিরূপ।[২]
আকিলিসের মৃত্যুর পর থেটিসকে আর তাঁর পুত্রের অমরত্বের জন্য জিউসের কাছে প্রার্থনা করতে হয় না। কারণ, এর আগেই থেটিস তিনজন অলিম্পীয় দেবতার সঙ্গে বিরোধের সময় জিউসকে সাহায্য করেছিলেন, যার ফলে তাঁদের মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে থেটিস আকিলিসকে কৃষ্ণসাগরের শ্বেত দ্বীপ লেউকে নিয়ে যান। এই দ্বীপটিকে এলিসিয়ামের একটি বিকল্প রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেখানে আকিলিস মৃত্যুকে অতিক্রম করে এক অমর অস্তিত্ব লাভ করেন এবং ঐতিহাসিক যুগ পর্যন্ত সেখানে তাঁর উপাসনা প্রচলিত ছিল।[৩]
পুরাণ
[সম্পাদনা]থেটিস ও অন্যান্য দেবতা
[সম্পাদনা]অ্যাপোলোদোরাসের নামে প্রচলিত গ্রন্থ বিব্লিওথেকা অনুসারে, জিউস ও পোসেইডন—উভয়েই থেটিসকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু থেমিসের (অন্য বর্ণনায় প্রমিথিউস বা কালখাস) একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে তাঁকে মরণশীল বীর পেলেউসের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয়।[৪] ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, থেটিসের পুত্র তার পিতার চেয়েও মহত্তর হবে। এই কারণে থেটিসকে এমন এক দেবী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি মহাজাগতিক শক্তির অধিকারিণী এবং প্রয়োজনে দেবতাদের প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাকেও নাড়া দিতে সক্ষম।[৫]
হেফাইস্টাসকে যখন অলিম্পাস থেকে নিক্ষেপ করা হয়—কোনো কোনো কাহিনিতে তাঁর খোঁড়া হওয়ার কারণে হেরা তাঁকে ফেলে দেন, আবার অন্য বর্ণনায় হেরার পক্ষ নেওয়ায় জিউস তাঁকে নির্বাসিত করেন—তখন ওশেনিড ইউরিনোমে ও নেরেইড থেটিস তাঁকে উদ্ধার করেন। তাঁরা তাঁকে আগ্নেয় দ্বীপ লেমনোসে আশ্রয় দেন, যেখানে তিনি তাঁদের জন্য কামারের কাজ করতেন। ইলিয়াড-এ এই গুহাটির চারপাশ দিয়ে অবিরাম প্রবাহিত ওকেয়ানোসের ফেনিল ও গুঞ্জনময় স্রোতের বর্ণনা পাওয়া যায়।
থেটিস একজন বীরের রক্ষক ও লালনকারিণী (কুরোট্রোফোস) হিসেবে পুরোপুরি সফল না হলেও, দেবতাদের সহায়তাকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা হোমার বারবার উল্লেখ করেছেন। ডায়োমিডেস বর্ণনা করেন যে, লাইকুর্গাস যখন অলিম্পীয় দেবতাদের সহায়তায় ডায়োনিসোসকে বিতাড়িত করেন, তখন তিনি পালিয়ে এরিথ্রেয়ান সাগরে থেটিসের কাছে আশ্রয় নেন। সেখানে সমুদ্রশৈবালের শয্যায় থেটিস তাঁকে রক্ষা করেন।
এই ঘটনাগুলো থেটিসকে এমন এক প্রাচীন দেবী হিসেবে তুলে ধরে, যাঁর সম্পর্ক মানুষের জগতের আগের এক দেবীয় অতীতের সঙ্গে যুক্ত। অলিম্পীয় দেবতাদের মধ্যেও যে ধরনের অক্ষুণ্ণ নিরাপত্তা বিরল, থেটিস তার অধিকারিণী ছিলেন। ইলিয়াড-এ যেখানে চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে সাধারণত জিউসের কথাই বলা হয়, সেখানে থেটিসের এই ভূমিকা মহাজাগতিক শক্তির আরেকটি বিকল্প কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।[৬]
আরেকটি কাহিনিতে, থেটিস ও মিডিয়া থেসালিতে কে অধিক সুন্দরী—এ নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। বিচারক হিসেবে তাঁরা ক্রিটের রাজা ইডোমেনেউসকে মনোনীত করেন। ইডোমেনেউস থেটিসের পক্ষেই রায় দেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে মিডিয়া সমগ্র ক্রিটবাসীকে মিথ্যাবাদী বলে অভিশাপ দেন এবং ঘোষণা করেন যে তারা আর কখনো সত্য কথা বলতে পারবে না।[৭]
পেলেউসের সঙ্গে বিবাহ


একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে জিউস জানতে পারেন যে, থেটিসের পুত্র তার পিতার চেয়েও মহাশক্তিশালী হবে। যেহেতু জিউস নিজেই একসময় তাঁর পিতা ক্রোনোসকে অপসারণ করে দেবতাদের শাসক হয়েছিলেন, তাই তিনি আশঙ্কা করেন যে থেটিসের পুত্রও ভবিষ্যতে একই কাজ করতে পারে। এই কারণে জিউস ও তাঁর ভাই পোসেইডন সিদ্ধান্ত নেন যে থেটিসের বিবাহ কোনো দেবতার সঙ্গে নয়, বরং একজন মরণশীল মানুষের সঙ্গে হবে। তাঁদের পছন্দ ছিল ঐয়াকাসের পুত্র পেলেউস। কিন্তু থেটিস প্রথমে এই বিবাহে সম্মত হননি।
সমুদ্রের প্রাচীন দেবতা প্রোটেউস পেলেউসকে পরামর্শ দেন, থেটিস যখন নিদ্রিত থাকবেন তখন তাঁকে শক্ত করে ধরে রাখতে। কারণ, মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি নানা রূপ ধারণ করবেন। সত্যিই থেটিস আগুন, জল, হিংস্র সিংহী ও বিষধর সাপসহ বিভিন্ন রূপ ধারণ করেন।[৮] কিন্তু পেলেউস তাঁকে ছাড়েননি। অবশেষে থেটিস আত্মসমর্পণ করেন এবং তাঁকে বিবাহ করতে সম্মত হন।
পেলেউস ও থেটিসের সন্তান ছিলেন আকিলিস। পরবর্তীকালে পেলেউস মিরমিডনদের রাজা হন।
গ্রিক পুরাণে বর্ণিত আছে, থেটিস ও পেলেউসের বিবাহ পেলিয়ন পর্বতে, কাইরনের গুহার নিকটে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই বিবাহে প্রায় সকল দেব-দেবী উপস্থিত ছিলেন। ভোজের আয়োজন করা হয়, অ্যাপোলো বীণা বাজান এবং মিউজরা গান পরিবেশন করেন।
বিবাহ উপলক্ষে দেবতারা নবদম্পতিকে নানা উপহার দেন। কাইরন পেলেউসকে একটি পালিশ করা অ্যাশ কাঠের বর্শা উপহার দেন, যার ফলাটি হেফাইস্টাস নির্মাণ করেছিলেন এবং অ্যাথেনা সেটিকে মসৃণ করেছিলেন। অ্যাফ্রোদিতি প্রেমদেব এরোসের অলংকরণযুক্ত একটি পাত্র, হেরা একটি রাজকীয় চাদর এবং অ্যাথেনা একটি বাঁশি উপহার দেন। থেটিসের পিতা নেরেউস তাঁকে এক ঝুড়ি ‘দিব্য লবণ’ উপহার দেন, যা অতিভোজনের পরও ক্ষুধা ও হজমে সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হতো। এছাড়া জিউস নবদম্পতিকে আরকের ডানা প্রদান করেন, যা পরে থেটিস তাঁর পুত্র আকিলিসকে দেন। অন্যদিকে পোসেইডন পেলেউসকে তাঁর অমর অশ্ব বালিয়ুস ও জ্যান্থুস উপহার দেন।[৯]

তবে বিবাহে কলহের দেবী এরিসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এতে অপমানিত হয়ে তিনি অনুষ্ঠানে একটি সোনার আপেল নিক্ষেপ করেন, যার ওপর লেখা ছিল—‘সর্বাধিক সুন্দরীর জন্য’। এই আপেলকে কেন্দ্র করেই দেবীদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়, যা পরে প্যারিসের বিচার এবং শেষ পর্যন্ত ট্রয় যুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
আর্গোনটদের অভিযানের কাহিনি নিয়ে হেলেনীয় যুগের কবি রোডসের অ্যাপোলোনিয়াস রচিত আর্গোনটিকা অনুসারে, থেটিস তাঁর পুত্র আকিলিসকে অমর করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রতি রাতে তিনি আগুনে আকিলিসের নশ্বর অংশ পুড়িয়ে ফেলতেন এবং দিনে তাঁর দেহে অ্যামব্রোসিয়া মাখিয়ে দিতেন। এক রাতে পেলেউস থেটিসকে শিশুটিকে আগুনে ধরে থাকতে দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন।
পেলেউসের চিৎকার শুনে থেটিস আকিলিসকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তিনি ঝড়ো বাতাসের মতো প্রাসাদ ত্যাগ করে সমুদ্রে ফিরে যান এবং প্রবল ক্রোধে আর কখনও পেলেউসের কাছে ফিরে আসেননি।
কিছু পুরাণকাহিনিতে বলা হয়েছে, পেলেউসের বাধার কারণে থেটিস আকিলিসকে সম্পূর্ণ অবিনশ্বর করতে পারেননি। তাঁর যে গোড়ালিটি তিনি আগুনে দগ্ধ করে অমর করার আগেই থেমে যেতে বাধ্য হন, সেটিই অরক্ষিত থেকে যায়। এই কাহিনির সঙ্গে ডিমিটার ও শিশু ডেমোফুনকে আগুনের মাধ্যমে অমর করার প্রচেষ্টারও মিল রয়েছে।
অন্য একটি জনপ্রিয় রূপ, যা প্রথম রোমান কবি স্তাতিয়ুস-এর অসমাপ্ত মহাকাব্য আকিলেইড-এ পাওয়া যায়, সেখানে বলা হয়েছে যে থেটিস আকিলিসকে স্টিক্স নদীতে ডুবিয়ে অবিনশ্বর করার চেষ্টা করেন। স্টিক্স ছিল পাতাললোক হেডিসের পাঁচটি নদীর একটি। কিন্তু আকিলিসকে তিনি যে গোড়ালি ধরে পানিতে ডুবিয়েছিলেন, সেই অংশ নদীর জলে স্পর্শ করেনি। ফলে গোড়ালিটি দুর্বলই থেকে যায় এবং পরবর্তীকালে সেটিই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।
পরে পেলেউস আকিলিসকে শিক্ষার জন্য কাইরনের কাছে পাঠান। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, থেটিসের পুত্র হয় দীর্ঘ কিন্তু গৌরবহীন জীবন লাভ করবে, নয়তো অল্পায়ু হলেও অমর খ্যাতি অর্জন করবে।
ট্রয় যুদ্ধ শুরু হলে থেটিস পুত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে স্কাইরোস দ্বীপের রাজা লাইকোমেদেসের রাজদরবারে এক কন্যার ছদ্মবেশে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু আগামেমননের পুরোহিত কালখাস ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, আকিলিসকে ছাড়া গ্রিকরা ট্রয় জয় করতে পারবে না। তখন আগামেমনন ওডিসিউসকে তাঁকে খুঁজে আনার দায়িত্ব দেন।
লাইকোমেদেস ছিলেন থেটিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং স্কাইরোস আকিলিসের আবাসভূমির কাছাকাছি হওয়ায় ওডিসিউস প্রথমেই সেখানে যান। তিনি বুঝতে পারেন যে রাজদরবারের কন্যাদের একজন আসলে পুরুষ। তখন তিনি শত্রুর আকস্মিক আক্রমণের ভান করেন। অন্য সবাই আতঙ্কিত হলেও আকিলিস স্বভাবগত বীরত্বে অস্ত্র তুলে নিতে ছুটে যান। এভাবেই তাঁর পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায়।
পুত্রের ভাগ্য আর বদলানো সম্ভব নয় বুঝতে পেরে থেটিস হেফাইস্টাসকে আকিলিসের জন্য ঢাল ও বর্ম নির্মাণের অনুরোধ করেন।
হেলেনীয় যুগের ইতিহাসকার ফাইলারখুস একটি ভিন্ন কাহিনি বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, হেফাইস্টাস অস্ত্র নির্মাণের বিনিময়ে থেটিসের সঙ্গে সহবাসের শর্ত দেন। থেটিস শর্তটি মেনে নেন। অস্ত্র নির্মাণ শেষ হলে তিনি নিজেই বর্মটি পরে দেখেন, কারণ তাঁর দেহের গঠন আকিলিসের সঙ্গে প্রায় একই রকম ছিল। এরপর থেটিস হেফাইস্টাসের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পালিয়ে যান। তাঁকে ধরতে না পেরে হেফাইস্টাস তাঁর হাতুড়ি নিক্ষেপ করলে সেটি থেটিসের গোড়ালিতে আঘাত করে। পরে থেটিস থেসালির একটি নগরে আরোগ্য লাভ করেন, এবং সেই ঘটনার স্মরণে নগরটির নাম হয় থেটিডিয়াম।[১০]
ইলিয়াড ও ট্রয় যুদ্ধ
[সম্পাদনা]

ট্রয় যুদ্ধের ঘটনাবলিতে থেটিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের সূচনাকারী প্যারিসের বিচার তাঁর ও পেলেউসের বিবাহ অনুষ্ঠানে সংঘটিত হওয়ার পাশাপাশি, যুদ্ধজুড়েই তিনি বারবার বারোজন অলিম্পীয় দেবতা এবং তাঁর পুত্র আকিলিসের কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেন।
ট্রয় যুদ্ধের নবম বছরে হোমারের ইলিয়াড শুরু হয় আগামেমনন ও আকিলিসের বিরোধ দিয়ে। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্রিসেইস, যিনি লির্নেসোসের রাজপুত্র মিনেসের স্ত্রী ছিলেন। আকিলিস তাঁকে বন্দি করে নিজের দাসী করেছিলেন। পরে আগামেমননের দাবির মুখে আকিলিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্রিসেইসকে তাঁর হাতে তুলে দেন। এতে আকিলিস নিজেকে অপমানিত মনে করেন এবং হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য তাঁর মাতা থেটিসের কাছে প্রার্থনা করেন।[১১]
থেটিস আকিলিসকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে বলেন, যতক্ষণ না তিনি জিউসের সঙ্গে কথা বলে আসেন। আকিলিস মায়ের নির্দেশ মেনে নেন।[১২] পরে থেটিস জিউসের কাছে গিয়ে আকিলিসের পক্ষে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন। জিউস তাঁর অনুরোধে সম্মতি দেন এবং মাথা নত করে শপথের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেন, যা দেবতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচিত ছিল।[১৩]
পরে, যুদ্ধক্ষেত্রে আকিলিসের বর্ম পরে লড়াই করতে গিয়ে প্যাট্রোক্লোস নিহত হলে থেটিস শোকাহত পুত্রকে সান্ত্বনা দিতে আসেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে দেবশিল্পী হেফাইস্টাস নির্মিত নতুন বর্ম এনে দেবেন এবং ততক্ষণ পর্যন্ত আকিলিসকে যুদ্ধে না যাওয়ার নির্দেশ দেন।
থেটিসের অনুপস্থিতিতে দেবী হেরার পাঠানো বার্তাবাহক আইরিস আকিলিসকে যুদ্ধে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আকিলিস মায়ের আদেশের কথা স্মরণ করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।[১৪]

এদিকে থেটিস হেফাইস্টাসের কাছে গিয়ে আকিলিসের জন্য নতুন অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণের অনুরোধ জানান। হেফাইস্টাস প্রথমে একটি অপূর্ব ঢাল নির্মাণ করেন, এরপর তৈরি করেন বক্ষবর্ম, শিরস্ত্রাণ এবং পায়ের বর্ম।[১৫]
নতুন বর্ম নিয়ে ফিরে এসে থেটিস দেখেন, প্যাট্রোক্লোসের মৃত্যুশোকে আকিলিস এখনও ভেঙে পড়ে আছেন। আকিলিস আশঙ্কা করেন, তিনি যুদ্ধে গেলে প্যাট্রোক্লোসের দেহ পচে যাবে। তখন থেটিস তাঁর নাকে অ্যামব্রোসিয়া ও অমৃত প্রয়োগ করে দেহটিকে পচন থেকে রক্ষা করেন।[১৬]
নতুন বর্ম পরে আকিলিস যুদ্ধে হেক্টরকে হত্যা করেন। কিন্তু এরপর তিনি হেক্টরের মৃতদেহ অপমান ও বিকৃত করতে থাকেন। নয় দিন ধরে এই অবস্থা চলার পর দেবতারা থেটিসকে অলিম্পাসে ডেকে পাঠান। তাঁরা জানান যে, হেক্টরের মৃতদেহ ফিরিয়ে না দেওয়ায় দেবতারা আকিলিসের ওপর ক্রুদ্ধ। থেটিস আকিলিসের কাছে গিয়ে দেবতাদের বার্তা পৌঁছে দেন এবং তাঁকে মুক্তিপণের বিনিময়ে হেক্টরের দেহ ফিরিয়ে দিতে রাজি করান। এর ফলে আকিলিস দেবতাদের ক্রোধ এড়াতে সক্ষম হন।[১৭]
লাকোনিয়া ও অন্যান্য স্থানে উপাসনা
[সম্পাদনা]
প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রগুলোর ভিত্তিতে সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, থেটিসের উপাসনা দেবী হিসেবে খুব বিস্তৃত ছিল না। তবে লাকোনিয়া ছিল এর একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। ভ্রমণলেখক পসানিয়াস উল্লেখ করেছেন যে, প্রাচীনকালে সেখানে থেটিসের উপাসনার জন্য বিশেষ পুরোহিত্রী নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর উপাসনা একটি কাঠের পূজামূর্তি (জোয়ানন)কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, যা ওই অঞ্চলের প্রাচীনতম মন্দির নির্মাণেরও পূর্ববর্তী। পরে এক প্রভাবশালী নারীর উদ্যোগে থেটিসের উপাসনা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাঁর জন্য একটি নতুন মন্দির নির্মিত হয়। পসানিয়াসের সময়, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতেও, থেটিস সেখানে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজিত হতেন।
পসানিয়াস আরও জানান, লাসেডাইমোনীয়রা যখন মেসেনীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, তখন তাদের রাজা অ্যানাক্সান্দার মেসেনিয়া আক্রমণ করে কয়েকজন নারীকে বন্দি করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন থেটিসের পুরোহিত্রী ক্লেও। অ্যানাক্সান্দারের স্ত্রী তাঁর স্বামীর কাছে ক্লেওকে নিজের কাছে রাখার অনুমতি চান। পরে তিনি জানতে পারেন যে ক্লেওর কাছে থেটিসের কাঠের পূজামূর্তিটি রয়েছে। স্বপ্নে প্রাপ্ত এক নির্দেশের ভিত্তিতে তিনি ক্লেওকে থেটিসের মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে সেই কাঠের পূজামূর্তিটি কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হতো।[১৮]
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর স্পার্টান কবি আলকমানের একটি খণ্ডিত স্তোত্রে থেটিসকে বিশ্বস্রষ্টা বা ডেমিয়ার্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।[১৯] সেখানে বলা হয়েছে, সৃষ্টির শুরুতে তিনি প্রথমে পোরোস (‘পথ’ বা ‘গমনপথ’) এবং টেকমোর (‘সীমাচিহ্ন’ বা ‘শেষসীমা’) সৃষ্টি করেন। এরপর সৃষ্টি করেন অন্ধকার, এবং সবশেষে সূর্য ও চন্দ্র।
অনেক গবেষক থেটিসের সঙ্গে রূপপরিবর্তনে সক্ষম আরেক সমুদ্রদেবী মেটিসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। মেটিসও একসময় জিউসের প্রিয় ছিলেন, কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে তাঁর গর্ভে জন্ম নেওয়া পুত্র পিতার চেয়েও শক্তিশালী হবে।[২০]
ঐতিহাসিক হেরোডোটাস লিখেছেন যে, পারসিকরা সেপিয়াস অন্তরীপে ‘থেটিস’-এর উদ্দেশ্যে বলি দিত। তবে তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি ছিল গ্রিকদের প্রচলিত রীতিতে অন্য সংস্কৃতির এক সমুদ্রদেবীকে থেটিস নামে চিহ্নিত করার উদাহরণ। আধুনিক গবেষকদের ধারণা, হেরোডোটাস সম্ভবত পারসিক দেবী আনাহিতাকে থেটিসের সঙ্গে সমতুল্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।[২১]

চিত্রশালা
[সম্পাদনা]থেটিস, পেলেউস ও জিউস
পেলেউস ও থেটিসের বিবাহ
[সম্পাদনা]থেটিস এবং আকিলিস
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "A Dictionary of Greek and Roman biography and mythology, Halosydne"। www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০২৬।
- ↑ Burkert, The Orientalizing Revolution: Near Eastern Influence on Greek Culture in the Early Archaic Age, 1993, pp 92-93.
- ↑ Erwin Rohde calls the isle of Leuke a sonderelysion in Psyche: Seelen Unsterblickkeitsglaube der Grieche (1898) 3:371, noted by Slatkin 1986:4note.
- ↑ Pindar, Eighth Isthmian Ode.
- ↑ Slatkin 1986, p. 12.
- ↑ Slatkin 1986:10.
- ↑ Ptolemaeus Chennus, New History Book 5, as epitomized by Patriarch Photius in Myriobiblon 190.36
- ↑ Ovid:Metamorphoses xi, 221ff.; Sophocles: Troilus, quoted by scholiast on Pindar's Nemean Odes iii. 35; Apollodorus: iii, 13.5; Pindar: Nemean Odes iv .62; Pausanias: v.18.1
- ↑ Photius, Bibliotheca 190.46. Translated by John Henry Freese, from the SPCK edition of 1920, now in the public domain, and other brief excerpts from subsequent sections translated by Roger Pearse (from the French translation by Rene Henry, ed. Les Belles Lettres)
- ↑ Scholia to Pindar's Nemean Odes 4.81
- ↑ Lattimore, Richmond (2011). The Iliad of Homer. Chicago, IL: University Of Chicago Press. pp. 59–70। আইএসবিএন ৯৭৮-০২২৬৪৭০৪৯৮.।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|আইএসবিন=মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ introduction, Homer; translated by Robert Fagles; Knox, notes by Bernard (2001). The Iliad ([Repr. with revisions]. ed.). New York, N.Y.: Penguin Books. p. 91.। আইএসবিএন ০১৪০২৭৫৩৬৩.।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|আইএসবিন=মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ introduction, Homer; translated by Robert Fagles; Knox, notes by Bernard (2001). The Iliad ([Repr. with revisions]. ed.). New York, N.Y.: Penguin Books. p. 95.। আইএসবিএন ০১৪০২৭৫৩৬৩.।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|আইএসবিন=মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ introduction, Homer; translated by Robert Fagles; Knox, notes by Bernard (2001). The Iliad ([Repr. with revisions]. ed.). New York, N.Y.: Penguin Books. pp. 472–474। আইএসবিএন ০১৪০২৭৫৩৬৩.।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|আইএসবিন=মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ introduction, Homer; translated by Robert Fagles; Knox, notes by Bernard (2001). The Iliad ([Repr. with revisions]. ed.). New York, N.Y.: Penguin Books. pp. 480–487.। আইএসবিএন ০১৪০২৭৫৩৬৩.।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|আইএসবিন=মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ introduction, Homer; translated by Robert Fagles; Knox, notes by Bernard (2001). The Iliad ([Repr. with revisions]. ed.). New York, N.Y.: Penguin Books. p. 489.। আইএসবিএন ০১৪০২৭৫৩৬৩.।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|আইএসবিন=মান: অবৈধ অক্ষর পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ introduction, Homer; translated by Robert Fagles; Knox, notes by Bernard (2001). The Iliad ([Repr. with revisions]. ed.). New York, N.Y.: Penguin Books. pp. 592–593.। আইএসবিএন ০১৪০২৭৫৩৬৩।
- ↑ Pausanias, Description of Greece 3.14.4–5
- ↑ The papyrus fragment was found at Oxyrhynchus.
- ↑ M. Detienne and J.-P. Vernant, Les Ruses de l'intelligence: la métis des Grecs (Paris, 1974) pp. 127–164, noted in Slatkin 1986:14note.
- ↑ "Herodotus, The Histories, Book 7, chapter 191, section 2"। www.perseus.tufts.edu। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০২৬।
| এই নিবন্ধটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এটিকে সম্প্রসারিত করে উইকিপিডিয়াকে সাহায্য করতে পারেন। |