আযীযুর রহমান কায়েদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হযরত কায়েদ সাহেব হুজুর (রহ.)
আযীযুর রহমান কায়েদ.jpg
ব্যক্তিগত
জন্ম১৯১৩
বাসন্ডা , বর্তমান নেছারাবাদ গ্রাম, ঝালকাঠি জেলা, বরিশাল বিভাগ
মৃত্যু২৮ এপ্রিল ২০০৮(2008-04-28) (বয়স ৯৫)
কম্ফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা
ধর্মইসলাম
জাতীয়তাবাংলাদেশী
সন্তানপুত্র: মাওলানা খলীলুর রহমান নেছারাবাদী (দা.বা. আ.) তিনি তার পিতার দেয়া দায়িত্ব "তামাম মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য কাজতিনি সর্ব প্রথম বাংলাদেশের সকল আলেম,ওলামাসহ সকল মুসলিম উম্মাহকে দল,মত, ছেলেছেলা নির্বিশেষে সকল কে "আল ইত্তেহাদ মায়ার ইখতেলাফ" তথা মতানৈক্যসহ ঐক্যের আহ্বান করেন এবং বাংলাদেশের সকল দলের আলেমদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তিনি সকলকে নিয়ে আলোচনাসভা করেন । তিনি একজন সুফী সাধক , মাদারজাত (জন্মগত আল্লাহর ওলী) ওলী
যেখানের শিক্ষার্থীভোলা আলিয়া মাদ্রাসা, ছারছিনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসা , কলকাতা আলিয়া মাদরাসা
যে জন্য পরিচিতইসলামী চিন্তাবিদ, ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ , ঐক্যের আহ্বায়ক , মুহাক্কেক আলেম
কাজশিক্ষকতা, ছারছিনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসা
প্রতিষ্ঠানবাংলাদেশ হিযবুল্লাহ জমিয়াতুল মুছলিহীন (ইসলামী ঐক্য সংগঠন), দশফান্ড,
মুসলিম নেতা
শিক্ষকশাহ সুফী নেছার উদ্দিনআহম্মদ (রহ.)
শিক্ষার্থী
ওয়েবসাইটatr.tv, [[ https://www.atr.tv/]] [[১]],[[২]], [[৩]]

পূর্ণনাম: মাওলানা আযীযুর রহমান নেছারাবাদী হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর (রহ.) (জন্ম ১৯১৩- মৃত্যু ২৮ এপ্রিল, সোমবার ২০০৮) বাংলাদেশের অন্যতম ইসলামী ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন।[১] যিনি সংক্ষেপে কায়েদ সাহেব হুজুর নামেও পরিচিত।[২] তিনি ঝালকাঠি জেলা, এমনকি পুরো বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক।[৩][৪][৫][৬] বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিয়া মাদ্রাসা ঝালকাঠি এন.এস.কামিল মাদরাসা তিনি ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[৩][৭]

জন্ম ও বাল্যকাল[সম্পাদনা]

আযীযুর রহমান কায়েদ ১৯১৩ সালে মতান্তরে ১৯১৫সালে ঝালকাঠি জেলার বাসন্ডা (বর্তমান নেছারাবাদ গ্রাম) গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী মফিজুর রহমান এবং মাতা মোসাম্মৎ জিন্নাতুন নেছা। তিনি ঝালকাঠির বাসন্ডা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

কায়েদ নিজ গ্রামে স্থানীয় মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর ১৯৩০ সালে ভোলা আলিয়া মাদ্রাসায় জামাতে দাহমে শ্রেণীতে ভর্তি হন। এরপর ১৯৩৬ সালে ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসায় জামাতে পাঞ্জমে শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৪০ সালে ফাজিল পরীক্ষায় এই মাদ্রাসা থেকে সারা দেশের সম্মিলিত মেধায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে। ১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কলকাতা মাদ্রাসায় অধ্যায়ন কালে তিনি আনজুমানে আল ইসলাহ নামে একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসার তৎকালীন সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র ছিলেন। তিনি কলকাতা আলিয়ার ফাস্টবয় ছিলেন । তিনি একাধারে দক্ষ মুফতী মুহাদ্দিস,মুফাসসির ,মুফাক্কির, সাহিত্যিক, হাদীসবিশারৎ,আরবীভাষাবিৎ,ইতিহাসবিৎ,মানতীকবিৎ ও অলংকারশাস্ত্রবিৎসহ ইসলামী শরিয়তের সকল শাস্ত্রে দক্ষ অভিজ্ঞ ছিলে। তিনি ছিলেন আত্মপ্রচার বিমুখ। তাই তার এই সকল যোগ্যতার কথা তার মৃত্যুরপূর্বে কেউ জানতো না। তার মৃত্যুর পরে এগুলোজানা যায়। ্

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

কায়েদ শিক্ষকতা পেশা দিয়ে তার কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টানা ২৫ বছর তিনি ছারছিনা দারুসসুন্নাত আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা ও ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি দক্ষিণ বাংলার একজন পীর ছিলেন।[৮]

বিখ্যাত ছাত্রসমূহ[সম্পাদনা]

তিনি শিক্ষকতা অবস্থায় যেসকল বিখ্যাত ছাত্র তার থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন, তারা হলেন,

অবদান[সম্পাদনা]

কায়েদ সাহেব জীবনের অনবদ্য প্রচেষ্টা ছিলো এদেশের সকল মুসলমানকে একত্রিত করা। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার অপূর্ব এক সূত্র আবিষ্কার করেছেন, সেটা হলো ‘আল ইত্তিহাদ মায়াল ইখতিলাফ এর অর্থ হচ্ছে মতনৈক্য সহ ঐক্য। তার এই মতবাদ সেই সময়ে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। মতনৈক্যসহ ঐক্য এই আহ্বান সকলের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি গঠন করেছিলেন জমিয়াতুল মুসলিহীন নামে একটি সংগঠন।[৪] ১৯৯৭ সালে তার উদ্যোগে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সর্বদলীয় ইসলামী সম্মেলনের আয়োজন করা হয় ঝালকাঠিতে। মূলত এই ঐক্য সম্মেলন ছিল ১৯৫২ ও ১৯৭০ সালের পশ্চিম বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের ঐক্যের ডাকের ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত রূপ।

তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসরে যাওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারী সমাজের উন্নয়নের জন্যও তিনি অবদান রেখেছেন। তার নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কামিল মাদরাসা, ঝালকাঠি এন.এস.কামিল মাদরাসাকে তিনি বহুমুখী কমপ্লেক্সে পরিণত করেছেন। ৪২টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এই বহুমুখী কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি এলাকায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য, বিচার কার্য চালানো জন্য ও ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলেন। যেমনঃ

  • হিজবুল্লাহ দারুল কাজা (সালিসি আদালত বা বিচার বিভাগ),
  • ছাত্র হিজবুল্লাহ,
  • আদর্শ সমাজ বাস্তবায়ন কমিটি
  • হিজবুল্লাহ শ্রমিক সমিতি
  • তোলাবায়ে হিজবুল্লাহ
  • হিজবুল্লাহ দুর্নীতি উচ্ছেদ কমিটি (১৯৭৩)
  • আনজুমানে ইত্তিহাদুল মুসলিমিন (মুসলিম ঐক্য সংস্থা ১৯৬৭)
  • বাংলাদেশ হিজবুল্লাহ জমিয়াতুল মুসলিহিন (ইসলামী ঐক্য সংগঠন)

তিনি ছিলেন কর্মপ্রাণ মানুষ, সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন সময় বুদ্ধি, উৎসাহ ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। তিনি সবার উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে একটি কবিতা বলতেন, আজো এই কবিতা ঐ অঞ্চলের মানুষের মুখে শোনা যায়,

দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

তিনি মনে করতেন, বিভক্ত জাতি দিয়ে ইসলাম কায়েম করা যাবেনা। তাই নিজেদের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মত পার্থক্য থাকলেও তা নিয়েই রাষ্ট্র ও ধর্মের বৃহৎ স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।[৯] তিনি প্রায়ই বলতেন, "আমাদের সংগ্রাম তিন শ্রেণীর বিরুদ্ধে, ভণ্ড মুসলিম, ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক ও জালেম, কারন এরাই আমাদের সমাজ ও ইসলাম ধ্বংস করছে। তিনি চরমপন্থা অপছন্দ করতেন, সন্ত্রাসবাদকে তিনি ঘৃণা করতেন, এবং এর সমালোচনা করেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজকে তিনি কখনোই সমর্থন করতেন না। বরং কোন গোষ্ঠীর খারাপ কর্মের বিরুদ্ধে তিনি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা বলতেন। তবে অত্যাচারী সরকার বা সম্প্রদায়কে প্রশ্রয় দিতেন না , এদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলতেন।

তিনি ভালো জিনিস যে কোন ধর্মের থেকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেননা। স্রষ্টাকে নিবেদিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানগুলো তিনি নিজে গাইতেন। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ক্যাসেট তৈরি করে শুনতেন ও বিক্রি করার আদেশ দিতেন। নকুল কুমার বিশ্বাসের অনেক সমাজ-সংস্কার ও ইসলামিক গানও তিনি পছন্দ করতেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

আযীযুর রহমান কায়েদ ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুবরণের খবর শুনে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ভিড় জমান ঝালকাঠির নেছারাবাদে। তার নামাজে জানাযায় দশ বর্গকিলোমিটার জুড়ে প্রায় পাচ লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছিল।

তার দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকান্ডের জন্য সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ থেকে সম্মাননা পেতেন।[১০][১১] ঝালকাঠি অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে খুব সম্মান করেন। কায়েদ যখন ঢাকায় কমফোর্ট হাসপাতালে অসুস্থাবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন তখন ঝালকাঠির সকল মন্দিরে তার জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল।[৬]

দর্শনীয় দরবার শরীফ[সম্পাদনা]

ইসলাম পন্থীদের জন্য ঐক্যের প্লাটফর্ম হিসেবে জমিয়াতুল মুসলিহীন নামে যে সংগঠন তিনি রেখে গেছেন, পরবর্তীতে তার দায়িত্ব পালন করছেন কায়েদের পুত্র অধ্যক্ষ মাওলানা খলীলুর রহমান নেছারাবাদী।[৫] মাওলানা আযীযুর রহমান কায়েদ একজন সুফি-সাধক পীর ছিলেন, তার জীবিত থাকাকালীন সময় থেকেই তার বাড়িতে একটি নেছারাবাদী দরবার শরীফ নামে একটি আত্ম্যাধিক প্রতিষ্ঠান গরে তোলেন। সেখানে প্রতি বছর ইসলামিক আলোচনার বার্ষিক ইসলামী জালসার আয়োজন করা হয়। এই জালসায় কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম হয়ে থাকে।[৩][১২][১৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "ঝলকাঠি - RANGE DIG OFFICE, BARISHAL"www.barishalrange.police.gov.bd। ২০২১-০৬-০৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  2. "কায়েদ সাহেব হুজুরের দরবার শরীফ"সরকারি ওয়েবসাইট। ৩ জুন ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২১ 
  3. থেকে, মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ, ঝালকাঠি। "নেছারাবাদ দরবারের মাহফিল শুরু"DailyInqilabOnline। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  4. "আযীযুর রহমান নেছারাবাদীর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত"Daily Nayadiganta। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  5. "নেছারাবাদের বার্ষিক মাহফিলের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  6. "আযীযুর রহমান নেছারাবাদীর ইন্তেকাল বার্ষিকী আজ"আলোকিত ঝালকাঠি (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২১-০৪-২৮। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  7. "আলিমে দেশসেরা ঝালকাঠির এনএস কামিল মাদ্রাসা"Jugantor (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  8. "নেছারাবাদ দরবার শরীফে দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল শুরু"Ajker Crime Times (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২১-০২-২৩। ২০২১-০৬-০৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  9. "ঝালকাঠির নেছারাবাদ দরবারের মাফিলে বক্তারা কলেমার ভিত্তিতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খেদমত করতে হবে | Daily Matobad"matobad.eurotelbd.net। ২০২১-০৬-০৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  10. "সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রূপকার ছিলেন আল্লামা কায়েদ"dhakapost.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  11. "বানারীপাড়ার কাউন্সিলর প্রার্থী সুমন খান'র কায়েদ সাহেব হুজুর (রাঃ)'র মাজার জিয়ারত - Daily Sylhet News" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  12. ঝালকাঠি, মোঃ আল-আমিন (২০২০-০২-২০)। "কায়েদ কেবলার দরবার শরীফে দুই দিনব্যাপী ওয়াজ-মাহফিল"gramerkagoj.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 
  13. "নেছারাবাদ দরবার শরীফে দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল শুরু । বরিশালটাইমস" (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২১-০২-২২। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৩ 

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]