ফজলে হাসান আবেদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ফজলে হাসান আবেদ
Fazle Hasan Abed.jpg
ফজলে হাসান আবেদ
জীবিকা সংগঠক, সমাজকর্মী
জাতীয়তা বাংলাদেশী
জাতি বাঙালি
নাগরিকত্ব বাংলাদেশ Flag of Bangladesh.svg
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার নাইটহুড, র‌্যামন মাগাসেসে পুরস্কার পুরস্কার


স্যার ফজলে হাসান আবেদ, কেসিএমজি (জন্ম:২৭ এপ্রিল, ১৯৩৬) একজন বাংলাদেশী সমাজকর্মী এবং বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারী সংগঠন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অসামান্য ভূমিকার জন্য তিনি র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার মাহবুবুল হক পুরস্কার এবং গেটস ফাউন্ডেশনের বিশ্ব স্বাস্থ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। দারিদ্র বিমোচন এবং দরিদ্রের ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইটহুডে[১] ভূষিত করে।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধনাঢ্য ভূস্বামী। তাঁর মায়ের নাম সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন ঐ অঞ্চলের অনেক বড় জমিদার। ফজলে হাসান আবেদের পরিবারের সবাই ছিলেন শিক্ষিত। দাদারা ছিলেন চার ভাই। তাঁরা সকলেই কলকাতা গিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে ও পরে ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি শেল অয়েল কোম্পানীতে অর্থনৈতিক কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন।[২]

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

ফজলে হাসান আবেদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণী থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে দেশভাগের ঠিক আগে তাঁর বাবা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে হবিগঞ্জ থেকে গ্রামের বাড়ি বানিয়াচংয়ে চলে আসেন। পরবর্তীতে তিনি চাচার চাকুরীস্থলে ভর্তি হন কুমিল্লা জেলা স্কুলে। সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই লেখাপড়া করেন। এরপর চাচা জেলা জজ হিসেবে পাবনায় বদলি হওয়ায় তিনিও চাচার পাবনায় চলে যান এবং পাবনা জেলা স্কুলে ভর্তি হোন। সেখান থেকেই ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৪ সালে এইচএসসি পাস করেন ঢাকা কলেজ থেকে। সেবছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি স্কটল্যান্ডে গিয়ে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হন। নেভাল আর্কিটেকচারের কোর্স ছিল চার বছরের। দুবছর লেখাপড়া করে কোর্স অসমাপ্ত রেখে ১৯৫৬ সালে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি ছেড়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে ভর্তি হন অ্যাকাউন্টিংয়ে। এখানে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিংয়ের উপর চার বছরের প্রফেশনাল কোর্স পাশ করেন ১৯৬২ সালে। এ ছাড়া তিনি ১৯৯৪ সালে কানাডার কুইনস ইউনিভার্সিটি থেকে 'ডক্টর অব ল' এবং ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে 'ডক্টর অব এডুকেশন' ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়াকালীন সময়ে ১৯৫৮ সালে ফজলে হাসান আবেদের মায়ের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তিনি লন্ডনে চাকরিতে যোগদান করেন। কিছুদিন চাকরি করার পর চলে যান কানাডা। সেখানেও একটি চাকরিতে যোগ দেন। পরে চলে যান আমেরিকা১৯৬৮ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে তিনি শেল অয়েল কোম্পানির হেড অব ফাইন্যান্স পদে যোগদান করেন। এখানে চাকরির সময় সত্তরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়। ফজলে হাসান আবেদ উপদ্রুত এলাকা মনপুরায় গিয়ে ত্রাণকাজ পরিচালনা করেন। এর চারমাস পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে তিনি আর চাকরিতে ফিরে যাননি।

ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

১৯৭০ সালে ফজলে হাসান আবেদ বাংলাদেশের ভয়াবহ ঘূর্ণীঝড়ে আক্রান্ত দুঃস্থ মানুষের সাহায্যে ত্রাণ কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্র্যাকের জন্ম। যুদ্ধের পর সিলেটেরশাল্লায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাসরত লোকজনকে দেখতে গেলেন। সেখানে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি শাল্লায় কাজ করবেন। এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের দরিদ্র, অসহায়, সবহারানো মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনকল্পে শুরু করলেন 'Bangladesh Rehabilitation Assistance Committee' সংক্ষেপে যা 'BRAC' নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালে সাময়িক ত্রাণকার্যক্রমের গণ্ডি পেরিয়ে ব্র্যাক যখন উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করে, তখন 'BRAC'-এই শব্দসংক্ষেপটির যে ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়, সেটি হল 'Bangladesh Rural Advancement Committee'। বর্তমানে ব্যাখ্যামূলক কোনো শব্দসমষ্টির অপেক্ষা না রেখে এই সংস্থা শুধুই 'BRAC' নামে পরিচিত। কবি বেগম সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, কাজী ফজলুর রহমান, আকবর কবীর, ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী, এস আর হোসেন এবং ফজলে হাসান আবেদ, এই সাতজনকে নিয়ে ১৯৭২ সালে ব্র্যাকের গভর্নিং বোর্ড গঠিত হল। বোর্ড ফজলে হাসান আবেদকে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করে। কবি বেগম সুফিয়া কামাল হলেন ব্র্যাকের প্রথম চেয়ারম্যান। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাকের চেয়ারপারসন পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

ব্র্যাকের অন্যান্য কার্যক্রম[সম্পাদনা]

  • উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম
  • কারুশিল্পীদের পণ্য বিপণন কেন্দ্র ‌'আড়ং'
  • অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি (সিএফপিআর-টিইউআর)
  • ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
  • ব্র্যাক ব্যাংক

পুরস্কার[সম্পাদনা]

  • র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, সামাজিক নেতৃত্বের জন্য , ১৯৮০[৩]
  • জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার মাহবুব-উল-হক পুরস্কার ২০০৪, সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকার জন্য।[৪]
  • সুইডেনের ওলফ পাম পুরস্কার, ২০০১। "দারিদ্র বিমোচন ও দরিদ্র মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্য।" [৫]
  • দারিদ্র বিমোচনে বিশেষ ভূমিকার জন্য ব্রিটেন কর্তৃক ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে "নাইটহুডে" ভূষিত।[৬]
  • এন্ট্রাপ্রেনিওর ফর দ্য ওয়ার্ল্ড পুরস্কার (২০০৯) [৭]
  • ওয়াইজ পুরস্কার। [৮]
  • ইউনেস্কো নোমা পুরস্কার (১৯৮৫)
  • এ্যালান শন ফেইনস্টেইন ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার পুরস্কার (১৯৯০)
  • ইউনিসেফ মরিস পেট পুরস্কার (১৯৯২)
  • গ্লেইটসম্যান ফাউন্ডেশন পুরস্কার (২০০৩)
  • জাতীয় আইসিএবি (২০০৪)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Knight Commander of the Most Distinguished Order of St Michael and St George" (KCMG)
  2. THE STARS OF ASIA -- FINANCIERS: Fazle Hasan Abed, BusinessWeek, July 8, 2002.
  3. 1980 Ramon Magsaysay Award for Community Leadership - Fazle Hasan Abed, Ramon Magsaysay Foundation.
  4. Fazle Hasan Abed wins UNDP Award, The Daily Star, 18 October, 2004.
  5. ওলফ পাম পুরস্কার, ওলফ পাম সেন্টার. সুইডিয় ভাষার পুরস্কার সম্মাননায় বলা হয়েছে, Fazle Hasan Abed, Bangladesh, grundare av BRAC (Bangladesh Rural Advancement Committee). För hans arbete med att bekämpa fattigdom och stärka de fattigas, särskilt kvinnornas, makt över sina liv.
  6. Bangladesh NGO head gets UK award
  7. ওয়ার্ল্ড এন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ পুরস্কার দৈনিক প্রথম আলো, ০১ ডিসেম্বর ২০১২.
  8. দৈনিক সকালের খবর

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]