আমীমুল ইহসান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী
Bare Dada.png
জন্ম ১৯১১
বিহার প্রদেশের মুঙ্গের জেলার অন্তর্গত পাঁচনা গ্রামে , হিন্দুস্তান
মৃত্যু ১৯৭৪ সালের ২৭ অক্টোবর (১৩৯৫ হিজরীর ১০ই শাওয়াল)
ঢাকা
আগ্রহ ইলমে তফসীর এবং উসূলে তফসীর, ইলমে হাদীস এবং উসূলে হাদীস, ইলমে ফিকহ এবং উসূলে ফিকহ

মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) (আরবি: مفتى سيد محمد عميم الاحسان بركتى‎)। (উর্দু: مفتى_عميم_الاحسا_ن مفتى سيد محمد عميم الاحسان بركتى) তিনি ছিলেন একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও মুফতী। ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের বহু উচ্চ মানসম্পন্ন গ্রন্থাবলীর রচয়িতা ও সংকলক [১]। তিনি বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের সর্বপ্রথম খতীব (১৯৬৪-১৯৭৪) ছিলেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

জন্ম[সম্পাদনা]

হযরত মুফতী সাহেব (রহ.) ১৯১১ সালের ২৪ জানুয়ারী (১৩২৯ হিজরী ২২ মুহাররম) রোজ সোমবার বিহার প্রদেশের মুঙ্গের জেলার অন্তর্গত পাঁচনা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হাকিম আবদুল মান্নান (রহ.) এবং মা সৈয়দা সাজেদা। তিনি চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন। পিতা ও মাতা উভয় সূত্রেই তিনি (নাজিবুত্তারাফাইন)। জন্মের পর মুফতী সাহেবের নাম রাখা হয় ‘ মুহাম্মাদ ’ এবং লকব আমীমুল ইহসান । স্বয়ং মুফতী সাহেব (র) বলেন, ‘‘আমার চাচা মাওলানা সাইয়্যেদ আবদুদ দাইয়ান (র) আমাকে বলিয়াছেন যে, আমার দাদী সাহেবা আমার জন্মের কয়েক মাস পূর্বে এক মুবারক স্বপ্ন দেখেন, যাহাতে আমার লকব আমীমুল ইহসান রাখিবার জন্য সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল।’’‘আত-তাশাররূফ লি আল-আদাবিত তাসাওউফ’ গ্রন্থে হযরত মুফতী সাহেব নিজেই উক্ত ঘটনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তাঁহার চাচাও অনুরূপ স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। তাঁহার পরবর্তী জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই সুসংবাদপ্রাপ্ত নাম সার্থক প্রমাণিত হইয়াছিল। আল্লামা মুফতী সাহেবের দাদা সাইয়্যেদ নূরুল হাফেয আল-কাদেরী (র) একজন কামেল সাধক ছিলেন। তিনি কুরআন করীমে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন। তিনি মাওলানা মোহাম্মদ আলী আল-কাদেরী আল মোজাদ্দেদী আল মুংগেরীর একজন খলীফা ছিলেন। [২]:

বংশ-পরিচয়[সম্পাদনা]

মহান চরিত্রের অধিকারী হযরত আল্লামা মুফতী সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (র) তাঁর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে নিজ বংশ-পরিচয় রেখে গিয়েছেন। এর মাধ্যমে এবং তার নসবনামা থেকে যতদূর জানা যায় কারবালার শোকাবহ ঘটনার পর আহলে বাইতের সদস্যরা বিশেষ করে সাইয়্যেদ ইমাম হোসাইন এর একমাত্র পুত্র যিনি কারবালার যুদ্ধে অসুস্থ থাকার কারনে যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে পারেন নি এবং জীবিত বেচে যান ইমাম যয়নুল আবেদিন (রঃ)। সেই ইমাম যয়নুল আবেদিন এর সন্তানদের অনেকেই ইয়ামানে বসবাস শুরু করেন। তাদেরই সেই সাইয়্যেদ বংশের কোনো বুজুর্গ ব্যক্তি হিন্দুস্তানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। তাঁদের বংশধারাতেই হযরত আল্লামা মুফতী সাহেবের পূর্বপুরুষগণ জন্মগ্রহণ করেন। ‘আত তাশাররুফ লি আল-আদাবিত তাসাওউফ’ নামের প্রসিদ্ধ তাসাওফ শাস্ত্রের একটি আরবি গ্রন্থে তিনি স্বয়ং তাঁর বংশ পরিচয় উল্লেখ করেছেন। তাঁর বংশ-তালিকা বা নসবনামা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা) বিনতে সাইয়েদুল মুরসালিন ওয়ান নবীঈন জনাবে রাসূলে আকরাম সাল্লালল্লাহু আলাইহে ওয়া সালল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই কারণে তাঁর পূর্ব-পুরুষগণ নামের পূর্বে ‘সাইয়্যেদ’ শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। [৩]:

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) তাঁর পিতা ও চাচার নিকট থেকে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। মাত্র তিন মাস সময়ের মধ্যে তাঁর চাচা সাইয়্যেদ আব্দুদ দাইয়্যানের (রহ.) নিকট হতে পূর্ণ ত্রিশ পারা কুরআন খতম করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা সাইয়্যেদ আবদুদ দাইয়ান সাহেব তাঁহাকে ফার্সি ভাষায় বিশেষ জ্ঞান দান করেন। পাঞ্জাবের মহান সাধক সাইয়্যেদ আল্লাহ ইয়ার শাহ্ কাদেরীর (মৃ. ১১৫৩ হি.) বংশধর হযরত সাইয়্যেদ আবু মুহাম্মাদ বারকত আলী শাহ্ (রহ.) কলকাতায় বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত মোহাদ্দেস, ফকীহ, সূফী ও আল্লাহ প্রদত্ত কাশ্ফ জ্ঞানের অধিকারী। মুফতী সাহেবের শিক্ষার প্রতি এমন অদম্য স্পৃহা দেখে তাঁর পিতা তাকে সাইয়্যেদ বারাকাত আলী শাহ (রহ.)-এর দরবারে নিয়ে যান। শাহ সাহেব নিজ ভক্ত মুরীদদের সাথে আসা শিশু আমীমুল ইহসান কে দেখে মুগ্ধ হন। মাত্র দু বছরের ব্যবধানে মুফতী সাহেব হযরত বারকাত আলী শাহ (রহ.)-এর নিকট থেকে আরবী ব্যাকরণের (মীজান মুন্শায়ের) প্রাথমিক জ্ঞান রপ্ত করেন এবং পাশাপাশি উচ্চতর ফার্সী সাহিত্য ও তাজবীদের প্রাথমিক জ্ঞান গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে মুফতী সাহেব (রহ.) হযরত শাহ বারকাত আলী শাহ (রহ.)-এর মুরীদ হন। তাই মুফতী সাহেব নিজের নামের শেষে ‘বারকাতী’ কথাটি যুক্ত করেন।মাত্র দশ বৎসর বয়সে তিনি তাঁর ভাবী শ্বশুর উক্ত ওলীআল্লাহ হযরত সাইয়্যেদ বারকাত আলী শাহ্র নিকট কুরআন মাজীদের অনুবাদ, সূফী মতবাদ সম্পর্কিত পুস্তক-পুস্তিকা, ইলমে সরফ, তফসীর, হেসনে হাসিন ও ফার্সি সাহিত্যের উচ্চতর গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করেন।

উচ্চশিক্ষা[সম্পাদনা]

১৯২৬ সালে পনের বছর বয়সে মুফতী সাহেব কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে আলিম পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ফাযিল ও ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন এবং “মুমতাজুল মুহাদ্দিসিন” উপাধি প্রাপ্ত হন তিনি আলিম পরীক্ষায়ও হাদীস বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। ১৯৩৪ সালে তিনি তাঁর শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মাওলানা মুফতী মুশতাক আহমেদ কানপুরী (রহ.) সাহেব এর নিকট থেকে ‘মুফতী’ সনদ লাভ করেন। তখন থেকে তিনি ‘মুফতী’ খেতাবে আখ্যায়িত হন।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

হযরত আল্লামা মুফতী সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আমীমুল ইহসান (র) ১৩৪৬ হিজরীতে তাঁর আব্বাজানের ওফাতের দুই মাস পূর্বে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। এই সম্পর্কে তিনি ‘ফেকহুস সুনান ওয়াল আসার’ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, “আমার পিতা আমাকে তাঁর জামা পরিধান করান, তাঁহর তাবাররুকাত দান করেন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন ইন্তেকালের মাত্র দুই মাস পূর্বে।” ১৯২৭ সালে মুফতীসাহেব পিতৃহীন হয়ে পড়েন। পিতার জীবিত সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। উল্লেখ্য মুফতী সাহেবের বড় ভাই সাইয়্যেদ আযীমুশ্শান কলকাতা মাদ্রাসা আলিয়ার ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। পিতা হযরত সাইয়্যেদ আবদুল মান্নানের ইন্তেকালের পর ছোট ভাই বোনের লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব, পিতার চিকিৎসালয় ও পারিবারিক প্রেস পরিচালনা, গৃহ সংলগ্ন (জালুয়াটুলীস্থ) মসজিদের ইমামের দায়িত্ব প্রভৃতি তাঁর উপর ন্যস্ত করা হয়। আল্লাহর অসীম দয়ায় তিনি নবীন হলেও এসব দায়িত্ব অত্যন্তসুষ্ঠুভাবে ও কৃতিত্বের সাথে পালন করেন।

কলকাতার নাখোদা মসজিদ ও মাদ্রাসায় মুফতী সাহেব[সম্পাদনা]

১৯৩৪ সালে মুফতী সাহেবকে কলকাতার বৃহত্তর জামে মসজিদ “নাখোদা মসজিদ” এর সহকারী ইমাম ও মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৩৫ সালে তাকে ‘নাখোদা মসজিদ’ এর মাদ্রাসার দারুল ইফতার প্রধান মুফতীর দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যাকল্পে প্রায় লক্ষাধিক ফাতওয়া প্রদান করেন। এ সময় তার সুনাম ও যশ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি নাখোদা মসজিদের ও দারুল ইফতার দায়িত্ব প্রশংসনীয়ভাবে পালন করেন। এইজন্য ১৯৩৫ সালে কলকাতা সরকার তাকে একটি বিশেষ সীলমোহর প্রদান করে যাতে লেখা ছিল গ্রান্ড মুফতী অফ কলকাতা Grand Mufti of Calutta । তখন থেকে আজ অবধি তিনি অধিক সমাদৃত হন মুফতী-এ-আযম উপাধি এর মাধ্যমে।

কলকাতার কাজী পদে হযরত মুফতী সাহেব[সম্পাদনা]

১৯৩৭ সালে বৃটিশ সরকার হযরত মুফতী সাহেবকে মধ্য কলকাতার কাজী পদে নিয়োগ করেন। এই সময় তিনি একাধারে নাখোদা মসজিদের ইমামত, মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসায় অধ্যাপনার দায়িত্ব এবং কাজী পদের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করিতে থাকেন। ১৯৪৩ সালে মাদ্রাসায়ে আলিয়ায় অধ্যাপনার কাজে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এইসব কাজ যথারীতি পালন করেন। ১৯৪০ সালে তিনি আঞ্জুমানে কুররায়ে বাংলার (বাংলার ক্বারী সমিতি) সভাপতি নিযুক্ত হন।

আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা[সম্পাদনা]

১৯৪৩ সালে মুফতী সাহেব কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৩ সাল থেকে ভারত বিভাগ (১৯৪৭) পর্যন্ত তিনি টাইটেল কামিল ক্লাসে হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ এবং ফাযিল শ্রেণীতে উর্দু-ফার্সী শিক্ষা দিতেন। ১৯৪৭ সালে আলিয়া মাদ্রাসা ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে তিনি এই দেশে হিজরত করে আসেন। তখন তিনি নতুনভাবে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপনার কাজে জড়িত হন। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সরকার তাকে ধর্মীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত করেন। ১৯৫৫ সালে আলিয়া মাদ্রাসার হেড মাওলানা, মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী অবসর গ্রহণের পর মুফতী সাহেব অস্থায়ীভাবে সেই পদে নিয়োগ পান। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত মুফতী সাহেব স্থায়ীভাবে সেই পদে নিযুক্ত ছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় কর্মরত অধ্যাপক হিসাবে মুফতী সাহেব ব্যাখ্যাসহ বুখারী শরীফ পড়াইতেন। তাঁর নিজের উক্তি হইতে জানা যায়, তিনি কমপক্ষে পঁচিশবার বুখারী শরীফের মতো সিহাহ্ সিত্তাহ্র অন্যতম সুবৃহৎ কিতাবটি প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত পড়িয়েছেন। হাজার হাজার হাদীস তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল। হাদীসের ওস্তাদ হিসাবে তাঁর পাণ্ডিত্য-প্রতিভা অল্প সময়ের মধ্যেই আলেম সমাজে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দ্বীনী কিতাব প্রণয়ন এবং ধর্মীয় কাজে সময় দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় ১৯৬৯ সালের ১ই অক্টোবর উক্ত পদ হতে অবসর গ্রহণ করেন।

কলকাতা থেকে ঢাকায় হিজরত[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর মুফতী-এ আযম সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ২২ তারিখে হিজরত করে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। তখন তিনি আলিয়া মাদ্রাসার পাশেই থাকতেন। মুফতী সাহেবের ঢাকায় আগমনের বছর খানেকের মাথায় ১৯৪৮ সালের ফ্রেবুয়ারী মাসের ৫ তারিখে ঢাকায় আসেন তারই ছোট ভাই সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নোমান বারকাতী (রহ.)।

ঢাকায় বসবাস ও মসজিদ নির্মান[সম্পাদনা]

১৯৪৭-৪৮ এর কোন এক সময় জনৈক এক ব্যক্তি সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নোমান বারকাতী (রহ.)-কে বর্তমান মসজিদে মুফতী-এ আযম-এর বর্ণনা দিয়ে বলল, সেখানে একটি মসজিদের মতো ইমারত আছে। আপনি যদি আপনার ভাইয়ের সাথে সেই মসজিদটির ব্যাপারে চিন্তা করেন তবে খুব ভাল হয়। প্রথমে হযরত নোমান বারকাতী (রহ.) নিজে উক্ত ব্যক্তির সাথে এসে এই জায়গা পরিদর্শন করেন। যখন তিনি দেখে বুঝতে পারেন এটি একটি মসজিদ ছিল তখন হযরত নোমান বারকাতী সাহেব বিষয়টি তার শ্রদ্ধেয় বড় ভাইকে জানান। এরপর একদিনে উভয় ভাই মিলে মসজিদ দেখতে আসেন। উভয় ভাই মিলে যখন মসজিদ দেখতে আসেন তখন আল্লাহর ঘরের এই ভগ্নদশা দেখে ব্যথিত হন এবং উদ্যোগ নেন নবরূপে এটিকে মসজিদ হিসেবে গড়ে তোলার। তারা এখানে এসে মসজিদকে পরিষ্কার করেন ও নামাযের উপযোগী করে তোলেন। তখন অনেক দিন পর এই মসজিদে আযান দেন হযরত সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নোমান বারকাতী (রহ.)। আর ইমামতি করেন মুফতী আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.)। তাঁদের সেই الله اكبر ধ্বনির তাকবীর এত বছর আর এই মসজিদে বুলন্দ করণের আজ অবধি সেই الله اكبر এর তাকবীর জারি আছে। বলাবাহুল্য এই দুই ভাইয়ের অসীম দৃঢ়তা ও প্রাণান্তর চেষ্টার ফলেই আস্তাকুড়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে মুফতী-এ আযম। মুফতী সাহেব হুজুর এই মসজিদের নাম দিয়েছিলেন নকশবন্দী মসজিদ। হয়। তবে ১৯৯৪ সালে মসজিদকে যখন সম্পূর্ণ নতুন ভিত্তি দিয়ে গড়া হয় সেই সময় থেকে মহল্লাবাসীর উদ্যোগে এই মসজিদের নাম রাখা হয় মসজিদে মুফতী-এ আযম। উল্লেখ্য মুফতী সাহেবে হুজুর এই মসজিদের খেদমতের জন্য মসজিদ সংলগ্ন একটি বাড়ী ক্রয় করেন এবং আমৃত্যু সেখানেই বসবাস করেন। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তানে) কাবা শরীফের গেলাফ প্রস্তুত করা হয়। তখন সেই গেলাফটি ঢাকায় আনা হয় প্রদর্শনীর জন্য। ঢাকায় কাবা শরীফের গেলাফ প্রদর্শনীর সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মুফতী সাহেবের সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ গোফরান বারকাতী (রহ.)।

দুই বাংলার ঈদগাহতে ইমামতির গৌরব অর্জন[সম্পাদনা]

মুফতী সাহেবের একটি অনন্য অর্জন রয়েছে যে তিনি দুই বাংলার ঈদগাহতে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা থাকার সময় ১৯৪৭ সালে তিনি কলিকাতার ঈদগাহে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৫৫ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় হেড মাওলানার পদে উন্নীত হবার পর তৎকালীন ঢাকার প্রধান ঈদগাহ পুরানা পল্টন ময়দানে ঈদের জামাতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং কয়েক বছর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। [৪]:

বায়তুল মুকাররমের প্রধান খাতীব ও ইমাম[সম্পাদনা]

১৯৬৪ সালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররম প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন কমিটির চেয়ারম্যান ইয়াহিয়া বাওয়ানীর অনুরোধে এবং মসজিদ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে তিনি সেই মসজিদের খতীব এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত এই মহান দায়িত্ব কৃতিত্ব সহকারে পালন করেন। হযরত মুফতী সাহেব (রহ.) প্রতি শুক্রবার সেখানে জুমার নামাজ পড়াতেন এবং আরবীতে স্বরচিত খুৎবা পড়তেন। খুৎবার বঙ্গানুবাদ পূর্বেই শ্রোতাদেরকে শোনানো হত। অভিনব পদ্ধতিতে অনর্গল বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় তাঁর খুৎবা প্রদানের অপূর্ব দৃষ্টান্ত বাস্তবিকই বিরল ব্যাপার। আরবদেশ থেকে আগত অনেক উচ্চশিক্ষিত আলেম ও রাষ্ট্রনায়ক তাঁর খুৎবা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে যেতেন।

তাসাউফ এর পথে মুফতী-এ আযম[সম্পাদনা]

মুফতী-এ আযম সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) যেমন একজন হাক্কানী আলেমে দ¦ীন ছিলেন তেমনি ইলমে তাসাউফ এর প্রাণপুরুষ ছিলেন। নিজ প্রাথমিক জীবনে তিনি তার চাচা হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আব্দুদ দাইয়্যান বারাকাতী এবং শশুর সাইয়্যেদ আবু মুহাম্মাদ বারকত আলী শাহ এর কাছ থেকে বিভিন্ন তরীকতের ইজাজাত গ্রহন করেন। ঢাকায় আগমনের পর তার সুহৃদ হযরত শাহ সাইয়েদ আবদুস সালাম আহমদ (রহ.) তাকে বায়আত প্রার্থীদের মুরিদ করিতে অনুরোধ করেন। এর ফলে তিনি নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদীয়া বারকাতীয়া তরীকা প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। হযরত মুফতী সাহেব নকশবন্দিয়া মোজাদ্দেদিয়া তরীকার মহান সাধকগণের উসিলা দিবার সময় নামের আদ্যাক্ষর বিশিষ্ট ফার্সী কবিতাটি (শাজরা শরীফ) মনমাতানো আবেগাপ্লুত কন্ঠে পরতেন।

জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য সাধনা[সম্পাদনা]

হযরত মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহঃ) ছিলেন এমনই “বাহরুল উলূম” (ইলমের সাগর) যাকে আল্লাহপাক দ্বীনে ইসলামের ইলমর ফায়েজ ও বারাকাত দিয়ে ধন্য করেন। হযরত মুফতী সাহেব ইসলামের আসল খিদমত করেছেন অসংখ্য দ্বীনী কতিাব রচনার মাধ্যমে। তিনি নিজ জীবনে ২০০ এর অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। নিচে তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু কিতাবের নামের তালিকা দেয়া হল। [৫]:

ইলমে তফসীর এবং উসূলে তফসীর[সম্পাদনা]
Ershadat Wa Mamulat.JPG
  1. ইতহাফুল আশরাফ বি হাশিয়াতিল কাশশাফ
  2. আল ইহসানুস সারী বিত তাওযিহ ই তাফসিরই সহীহিল বুখারী
  3. আত তানবীর ফি উসূলিত তাফসির
  4. আত- তাবশীর ফি শরহিত তানবীর ফি উসূলিত তাফসির
ইলমে হাদীস এবং উসূলে হাদীস[সম্পাদনা]
الفقه السنن والا شار
মীযানুল আখবার
  1. আল ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার
  2. মানাহিজুস সুআদা
  3. উমদাতুল মাযানী বি তাখরিজে আহাদীস মাকাতিবুল ইমামুর রাব্বানী
  4. আল আরবাঈন ফিস্ সালাত
  5. আল-আরবাঈন ফিল মাওয়াকিত
  6. আল আরবাঈন ফিস্ সালাতি আলান নবী (সা),
  7. জামে জাওয়ামেউল কালাম
  8. ফিহিরস্তত কানযুল উম্মাল
  9. মুকাদ্দামায়ে সুনানে আবু দাউদ
  10. মুকাদ্দামায়ে মারাসিলে আবু দাউদ,
  11. লাইল ওয়ান নাহার
  12. মীযানুল আখবার
  13. মিয়ারুল আসার
  14. হাশিয়ায়ুস সাদী
  15. তোহফাতলি আখিয়ার
  16. তালিকাতুল বারকতী
  17. তালখীসুল মারাসিল
  18. আসমাউল মুদিল্লীন ওয়াল মুখতালিতীন,
  19. কিতাবুল ওয়ায়েযীন
  20. মিন্নাতুল বারী
ইলমে ফিকহ এবং উসূলে ফিকহ[সম্পাদনা]
তরীকায়ে হজ্জ
  1. ফাতাওয়ায়ে বারকাতীয়া
  2. তরীকায়ে হজ্জ,
  3. আল কুরবাহ ফিল কুরা,
  4. হাদিয়াতুল মুসাল্লীন
  5. আত¦নবীহ লীল ফকীহ
  6. লুববুল উসূল
  7. মালাবুদ্দা লিল ফকীহ
  8. আত- তারীফাতুল ফিকহিয়্যাহ
  9. উসূলুল কারখী
  10. উসূলুল মাসায়েলীল খিলাফিয়্যাহ
  11. কাওয়ায়েদুল ফিকহ
  12. আদাবুল মুফতী,
  13. তুহফাতুল বারকাতী বি-শরহে আদাবুল মুফতী
সীরাত[সম্পাদনা]
  1. আওজায়ুস সিয়ার
  2. আনফাউস সিয়ার
  3. সীরাতে হাবিবে ইলাহ
  4. রেসালা-হায়াতে আবদুস সালাম
  5. ইলমে তাসাওউফ
  6. রেসালায়ে তরীকাত
  7. আততাশাররুফ লি আদাবিত তাসাওউফ
তারীখ (ইতিহাস)[সম্পাদনা]
  1. তারীখে ইসলাম
  2. তারিখে আম্বিয়া
  3. তারিখে ইলমে হাদীস
  4. তারীখে ইলমে ফেকাহ
  5. আল হাভী ফি যিকরিত তাহাভী
  6. তারিফুল ফুনুন ওয়া হালাতে মুসান্নেফিন
  7. নাফয়ে আমীম
ইলমে নাহু ও শরফ (ব্যাকরণবিদ্যা)[সম্পাদনা]
  1. মুকাদ্দমাতুন নাহু
  2. নাহু ফারসী
ওয়াজ ও মিলাদ[সম্পাদনা]
  1. মজুমায়ে খুতবাত
  2. মজুমায়ে ওয়াজ
  3. ওয়াজিফায়ে সাদিয়া বারকাতীয়া
  4. শাজারা শরীফা
  5. সিরাজাম মুনীরা ও মিলাদ নামা
উর্দু সাহিত্য[সম্পাদনা]
  1. আদবে উর্দু,
  2. শরহে শিকওয়াহ ওয়া জওয়াবে শিকওয়াহ
বিবিধ[সম্পাদনা]
  1. মুযীলুল গাফলাহ আন সিমতিল কিবলাহ
  2. মুয়াল্লেমুল মীকাত
  3. নিযামুল আওকাত
  4. ধোপঘড়ি
  5. ওয়াসিয়াতনামা

হযরত মুফতী সাহেবের অনেক গ্রন্থ মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকাভুক্ত। তাঁর প্রধান কিতাবসমূহ যেমনÑ ফিকহুস সুনানে ওয়াল আসার, সীরাতে হাবিবে ইলাহ, তারীখে ইলমে ফিকাহ, তারীখে ইসলাম, তারীখে ইলমে হাদীস, আদাবুল মুফতী, কাওয়ায়েদুল ফিকাহ, মীযানুল আখবার, মিয়ারুল আসার প্রভৃতি মিসরের জামে আল আজহার, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দসহ, পাকিস্তান সিরিয়া, মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের সকল কওমী, আলিয়া মাদ্রাসা গুলোতে পাঠ্য বই হিসাবে পড়ানো হয়।

এছাড়াও তার রচিত “কিতাবুল আওকাত” এর উপর ভিত্তি করেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তাঁর রচিত নামাযের সময়সূচি অনুযায়ী বর্তমানে সারা বাংলাদেশে নামাযের সময় ও ওয়াক্ত নির্ধারণ করা হয়। হযরত মুফতী সাহেব একজন বই প্রেমিক মানুষ ছিলেন। কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও যিকির এর মাঝেই নিয়মিত কিছু সময়ই দ্বীনি কিতাব অধ্যয়ন করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে ছিল সাড়ে তিন হাজারের অধিক বিভিন্ন ইসলামী কিতাব, এরমধ্যে কিছু প্রাচীন ও দুর্লভ কিতাব তিনি সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর পীর ও মুর্শীদ এবং শশুর সাইয়্যেদ আবু মুহাম্মাদ বারকত আলী শাহ (রহঃ) এর নিকট থেকে। হযরত মুফতী সাহেবের ছাত্ররা এইজন্য গর্ব করে বলত আলিয়া মাদ্রাসার লাইব্রেরীর চেয়ে অধিক বই মুফতী সাহেবের কাছে আছে।

দৈনন্দিন জীবন[সম্পাদনা]

হযরত আল্লামা মুফতী সাহেব শেষ রাতে শয্যা ত্যাগ করে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। অতঃপর ফজরের জামা’আতে শরীক হতেন। নামায সমাপ্তির পর নিজ বিশেষ কক্ষে প্রবেশ করতেন। তথায় খাজেগাঁ, তাসবীহ-তাহলীল এবং তিলাওয়াতে কালামে পাক ইত্যাদি পর্ব সম্পাদন করতেন। সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত করতেন। ইশরাক পর্যন্ত এরূপ করতেন। অতঃপর ইশরাক আদায় করে বিশ্রাম কক্ষে কিছু সময় বিশ্রাম নিতেন। তারপর প্রাতরাশ করতেন। তাঁর নাস্তা ছিল সাধারণ, রুটি, গোস্ত, মুরগীর গোস্ত, ডিম কম পরিমাণ খাসির গোস্ত, সকালে রুটি, দুপুরে ভাত এবং রাতে রুটি, সাঁঝের বেলা নাস্তার কোন বাদ্যবাধকতা ছিল না। তবে তা চলত। পান খাওয়ার অভ্যাস ছিল। নাস্তার পর এক ঘন্টা সময় ভালভাবে ঘুমানোর চেষ্ট করতেন। নিদ্রা ত্যাগ করে ওযূ সমাপন করে সালতুত দোহা পড়তেন। অতঃপর বিশেষ কক্ষে প্রত্যাবর্তন করতেন ও সাড়ে নয়টা পর্যন্তলেখা পড়ায় আত্মনিয়োগ করতেন। এ সময় তিনি কুরআনে এক মঞ্জিল হিফজুল বাহার ও কিছু ওয়াযীফা কালামও পড়তেন। অতঃপর সাড়ে নয়টা হতে দশটার কাছাকাছি সময় মাদ্রাসায়ে চলে যেতেন। মাদ্রাসা থেকে অবসর গ্রহণ করার পর (নভে. ১৯৫৯) সাক্ষাতৎপ্রার্থীদেরকে সাক্ষা দিতেন। কোন সময় হাদীস ও তাফসীর অধ্যয় করতেন। কিছু লিখতেন। অতঃপর আরবী শিক্ষায় আগ্রহী কিছু ছাত্রকে তালীম দিতেন। সাড়ে বারোটা পর্যন্তএভাবে চলত। অতঃপর মধ্যা‎হ্ন ভোজের আয়োজন চলত। হূযুর মসজিদে চলে যেতেন, যুহর নামায সমাপ্তির পর ঘরে ফিরে এসে মধ্যা‎হ্ন ভোজের অংশ গ্রহণ করতেন। তিনি জীবনে কখনো বাম পাশে শোননি। অতঃপর তিনটার দিকে শয্যা ত্যাগ করতেন। সাড়ে তিনটার দিকে পাঠকক্ষে প্রবেশ করে পুস্তক অধয়্যন ও লিখায় মনোনিবেশ করতেন। আসর পর্যন্তএরূপ করতেন। আসর নামায সামপন করে পুনারায় পাঠকক্ষে ফিরে আসতেন এবং দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ দিতেন ও বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ গ্রহন করতেন। এ সময় খতমে খাজেগাঁর এক মজলিস বসত। কোন সময় তাফসীর করতেন। মাগরিবের পর, সকাল বেলা ও আসরের পর এ তিন সময় সাক্ষাৎ প্রার্থীদেরকে সাক্ষাৎ দিতেন। মাগরিবের পর খতমে খাজেগাঁর মজলিসও বসত। ইশার পর শয্যা গ্রহণ করতেন। তিনি সচরাচর রাত দশটার মাঝেই শয্যা গ্রহণ করতেন। তাঁর দরবারে আলিম উলামা, আধুনিক শিক্ষিত, সাধারণ সকল পর্যায়ের লোকদের আগমন ঘটত।[৬]:

হজ্জ পালন[সম্পাদনা]

হযরত আল্লামা মুফতী সাহেব (রহঃ) জীবনে তিনবার বায়তুল্লাহর হজ্জে মবরূর পালন করেন। সর্বপ্রথম এবং ফরয হজ্জ আদায় করেন ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে, ১৯৬৮ সালে তিনি দ্বিতীয়বার সস্ত্রীক এবং ১৯৭১ সালে তৃতীয় হজ্জ পালন করেন।

পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

হযরত মুফতী সাহেবের আদব ও আখলাকে সন্তুষ্ট হয়ে সাইয়্যেদ আবু মুহাম্মাদ বারকত আলী শাহ সাহেব ১৯২২ সনে তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা সাইয়্যেদা মায়মুনার সঙ্গে নিকাহ করান। অল্প দিন পরই ১৯২৯ সালে তার এই সহধর্মীনি ইন্তেকাল করেন। হযরত মুফতী সাহেবের এই স্ত্রী থেকে এক কন্যা সাইয়্যেদা সুলতানা খাতুন এর জন্ম হয়েছিল, ছোট বয়সেই তার ইন্তেকাল হয়। অতঃপর তিনি ১৯৩০ সনে দ্বিতীয়বার সাইয়্যেদা ফাতেমার সঙ্গে নিকাহ করেন। ১৯৩৭ ঈসায়ী সনে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীও ইন্তেকাল করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি তৃতীয়বারের মত দ্বিতীয়া স্ত্রীর ভগ্নিকে সাইয়্যেদা খাদিজাকে বিবাহ করেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর এই স্ত্রী ১৯৮৫ সনের ১৮ জানুয়ারি মোতাবেক ১৪০৫ হিজরীর ২৫ রবিউস সানী ইন্তেকাল করেন।হযরত মুফতী সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী থেকে এক পুত্র এবং এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। পুত্র সাইয়্যেদ মুনায়েম জন্মের কিছুদিন পরেই তার ইন্তেকাল হয়। আর মেয়ে সাইয়েদা আমেনা খাতুনই ছিলেন মুফতী সাহেবের সন্তানদের মধ্যে একমাত্র সন্তান যিনি তাঁর ওফাত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। ১৪১১ হিজরী মোতাবেক ১৯৯১ সালে তিনি এই নশ্বর দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৭৪ সালের ২৭ অক্টোবর (১৩৯৫ হিজরীর ১০ই শাওয়াল) হযরত মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকতী এ দুনিয়াবাসীকে বিদায় জানিয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে জান্নাতবাসী হন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর ইন্তেকাল কোন সাধারণ মানুষের ইন্তেকাল নয়, বরং একজন “বাহরুল উলূম” এর ইন্তেকাল ছিল। তাঁর জানাযায় লাখো মানুষের ঢল নামে। বায়তুল মুর্কারম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত তাঁর নামাযে জানাযায় ইমামতি করেন নারিন্দার মরহুম পীর সাহেব হযরত সাইয়্যেদ নযরে ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) । ইন্তেকালের পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলুটোলা মসজিদের দক্ষিণ পাশের কামরায় তাঁকে কবরস্থ করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই মসজিদটি এখন তাঁরই নামে “মসজিদে মুফতী-এ আযম” নামে পরিচিত। তাঁর মাযার ফলকের উপর খোদাই করা করে লেখা রয়েছে এই ফার্সী কবিতা।

هرگز نميرِ دانكه دل ارر نده شدبه عشق ثبت است برجريده عالم دوام ما

যাদের মনপ্রাণ পরম মাওলার প্রেমে বিভোর থাকে তাদেরকে কোন অবস্থায় মৃত বলে ধারণা করবে না। তারা কিয়ামত পর্যন্ত আছেন, জীবন্ত ও প্রাণবন্ত।

মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকতীর মাযার
মাযার ফলক
মাযার ফলক

ইসলামের সেবায় ও দাওয়াতি কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে (১৪০৫ হিজরী) মুফতী সাহেবকে মরণোত্তর স্বর্ণপদক ও সনদ দান করেন। মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে এই বিশ্বনন্দিত আলেম এর জীবন ও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দান করুন। (আমীন)

মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) এর বংশ-তালিকা বা নসবনামা[সম্পাদনা]

  1. হযরত আল্লামা মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকতী (র)
  2. ইবনে মৌলভী আবুল আযিম সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আবদুল মান্নান (র)
  3. ইবনে সাইয়্যেদ নূরুল হাফেয আল-কাদেরী (র)
  4. ইবনে সাইয়্যেদ মীর শাহমত আলী (র)
  5. ইবনে মাওলানা সাইয়্যেদ মীর মোযাফফর আলী (র)
  6. ইবনে সাইয়্যেদ মীর সাবের আলী (র)
  7. ইবনে সাইয়্যেদ মীর গোলাম আলী (র)
  8. ইবনে সাইয়্যেদ মীর ওয়াহেদ হোসাইন (র)
  9. ইবনে সাইয়্যেদ জীরগ (র)
  10. ইবনে সাইয়্যেদ রুকন উদ্দিন (র)
  11. ইবনে সাইয়্যেদ শাহ্ জামালুদ্দিন (র)
  12. ইবনে সাইয়্যেদ আহমদ জাজনেরী (র)
  13. ইবনে আমিরুল হজ্জ সাইয়্যেদ বদরুদ্দিন মাদানী (র)
  14. ইবনে সাইয়্যেদ আলী মাসউদ মাদানী (র)
  15. ইবনে সাইয়্যেদ আবুল ফাতাহ মোহাম্মদ ইব্রাহীম (র)
  16. ইবনে সাইয়্যেদ মোহাম্মদ ফেরাস (র)
  17. ইবনে সাইয়্যেদ আবুল ফারাহ (র)
  18. ইবনে সাইয়্যেদ দাউদ বুজুর্গ (র)
  19. ইবনে সাইয়্যেদ হোসাইন জায়েদুল জিন্দি (র)
  20. ইবনে সাইয়্যেদ আবুল হাসান ফারেস (র)
  21. ইবনে সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আকবর (র)
  22. ইবনে সাইয়্যেদ ওমর (র)
  23. ইবনে সাইয়্যেদ আলী আদান (র)
  24. ইবনে সাইয়্যেদ আশরাফ (র)
  25. ইবনে সাইয়্যেদ মোহাম্মদ (র)
  26. ইবনে ইমাম যায়েদ (র) (শহীদ, ১২১ হি.)
  27. ইবনে ইমাম আলী যয়নুল আবেদিন (র)
  28. ইবনে সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হোসাইন (রা)
  29. ইবনে হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা) ওয়া সাইয়েদাতুন নেসা আহলুল জান্নাহ ফাতেমাতুজ যাহরাতুল (রা) বতুল বিনতে হযরত মুহাম্মাদুর রাসুলল্লাহ সাল্লালল্লাহু আলাইহে ওয়া সালল্লাম ।

মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) এর খলিফাবৃন্দ[সম্পাদনা]

  1. আলহাজ্ব সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নোমান বারকাতী (মেজ ভাই)
  2. আলহাজ্ব মাওলানা কাজী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ গোফরান বারকাতী (ছোট ভাই)
  3. মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ ইমরান (চাচাত ভাই ও ভগ্নিপতি)
  4. আলহাজ্ব সৈয়দ মুহাম্মাদ মুসলিম আমীমী (জামাতা)
  5. আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মাদ সালেম ওয়াহেদী (ভাগ্নে)
  6. আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল গনি
  7. মাওলানা আবদুল কাদের
  8. আলহাজ্ব মুহাম্মাদ মইজ-উদ্দিন
  9. আলহাজ্ব আযিয আহমদ
  10. আলহাজ্ব হাফেয আবদুল হাকেম
  11. আলহাজ্ব মাওলানা লোকমান আহমদ আমীমী
  12. আলহাজ্ব কারী মোহাম্মদ আবিদ
  13. আলহাজ্ব ডা: মনসুর রহমান
  14. আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবদুল মুনয়েম
  15. জনাব ফযলে এলাহী

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ঈদে মিলাদুন্নবী ও মিলাদ মাহফিল, মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ সাফওয়ান নোমানী, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাঈমুল ইহসান, বারকাতী, পৃষ্ঠা নম্বর ১৮২
  2. ঈদে মিলাদুন্নবী ও মিলাদ মাহফিল, মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ সাফওয়ান নোমানী, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাঈমুল ইহসান, বারকাতী, পৃষ্ঠা নম্বর ১৮২ ।
  3. সিরাজাম মুনীরা , সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাঈমুল ইহসান বারকাতী, পৃষ্ঠা নম্বর ৮৭ প্রকাশনায়: মুফতী আমীমুল ইহসান একাডেমী ।
  4. মসজিদে মুফতী-এ-আযম গৌরব-উজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য , সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাঈমুল ইহসান বারকাতী, পৃষ্ঠা নম্বর ৪৮ প্রকাশনায়: মুফতী আমীমুল ইহসান একাডেমী ।
  5. সিরাজাম মুনীরা , সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাঈমুল ইহসান বারকাতী, পৃষ্ঠা নম্বর ৯৩-৯৬ প্রকাশনায়: মুফতী আমীমুল ইহসান একাডেমী ।
  6. মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান: জীবন ও অবদান, ড. এ. এফ এম আমীনুল হক, পৃষ্ঠা নম্বর ৯৩-৯৬, প্রকাশনায়: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ।