বিষয়বস্তুতে চলুন

শেমীয় ভাষাসমূহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Semitic languages থেকে পুনর্নির্দেশিত)
শেমীয়
ভৌগোলিক বিস্তারপশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, আফ্রিকার শৃঙ্গ, মাল্টা
ভাষাগত শ্রেণীবিভাগআফ্রো-এশীয়
  • শেমীয়
প্রত্ন-ভাষাপ্রত্ন-শেমীয়
উপবিভাগ
আইএসও ৬৩৯-২/sem
গ্লটোলগsemi1276[]
{{{mapalt}}}
শেমীয় ভাষাগুলোর আধুনিক বণ্টন

শেমীয় ভাষাগুলোর আনুমানিক ঐতিহাসিক বণ্টন

শেমীয় ভাষাসমূহ (ইংরেজি: Semitic languages) হল আফ্রো–এশীয় ভাষাপরিবারের একটি শাখা। আরবি, আমহারীয়, তিগ্রিনিয়া, অরামীয়, ইব্রীয়, মাল্টীয়, আধুনিক দক্ষিণ আরব্য ভাষাসমূহের পাশাপাশি আরও বহু প্রাচীন ও আধুনিক ভাষা এই শাখার অন্তর্ভুক্ত। এসব ভাষায় পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা,[] আফ্রিকাশৃঙ্গ,[][] মাল্টা[] এবং উত্তর আমেরিকা, ইউরোপঅস্ট্রেলেশিয়ার বড় অভিবাসী ও প্রবাসী সম্প্রদায় মিলিয়ে ৪৬ কোটিরও বেশি মানুষ কথা বলে। এই পরিভাষাটি প্রথম ১৭৮০-এর দশকে গ্যোটিঙেন ইতিহাস বিদ্যালয়ের সদস্যরা ব্যবহার করেন, যারা বাইবেলের আদিপুস্তকে বর্ণিত নোহের তিন পুত্রের একজন শেম (שם) থেকে এর নামকরণ করেন।

আরবি এখন পর্যন্ত শেমীয় ভাষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, যার সব রূপ মিলিয়ে ৪১১ মিলিয়ন মাতৃভাষী বক্তা রয়েছে[] এবং এটি আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাতৃভাষা। অন্যান্য শেমীয় ভাষার মধ্যে রয়েছে আমহারীয় (৩৫ মিলিয়ন মাতৃভাষী বক্তা),[] তিগ্রিনিয়া (৯.৯ মিলিয়ন বক্তা),[] ইব্রীয় (৫ মিলিয়ন মাতৃভাষী বক্তা),[][][১০] তিগ্রে ( মিলিয়ন বক্তা),[১১] এবং মাল্টীয় (৫,৭০,০০০ বক্তা). আরবি, আমহারীয়, ইব্রীয়, তিগ্রিনিয়া ও মাল্টীয় জাতীয় ভাষা হিসেবে সরকারি মর্যাদা পেয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ায় শেমীয় ভাষার লিখিত নিদর্শন খুব প্রাচীনকাল থেকেই পাওয়া যায়। পূর্ব শেমীয় আক্কাদীয় (যা অশূরীয় ও বাবিলীয় নামেও পরিচিত) এবং ইব্লীয় ভাষার পুঁথিসমূহ (যেগুলো সুমেরীয় কীলকাকার লিখন পদ্ধতি থেকে অভিযোজিত লিপিতে লেখা) যথাক্রমে মিসপতামিয়া ও উত্তর-পূর্ব ল্যভঁতে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সাল থেকে পাওয়া যায়। এর আগের কেবলমাত্র প্রত্যয়িত ভাষাগুলো হল সুমেরীয়এলমীয় (খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ থেকে ৫৫০), যেগুলো উভয়ই দ্বৈপভাষা (language isolates) এবং মিসরীয় (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০), যা আফ্রো-এশীয় পরিবারের একটি সহোদর শাখা, শেমীয় ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তাদের অংশ নয়। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ সালে মিসপতামিয়া ও উত্তর ল্যভঁতে ইমোরীয় ভাষার আবির্ভাব ঘটে, এরপর পারস্পরিকভাবে বোধগম্য কনানীয় ভাষাসমূহ (যার মধ্যে ইব্রীয়, ফৈনীকীয়, মোয়াবীয়, ইদোমীয়, অম্মোনীয় এবং সম্ভবত ইক্রোণীয়, অমালেকীয়সুতীয় অন্তর্ভুক্ত), এখনও প্রচলিত অরামীয় ও উগারিতীয় ভাষার উদ্ভব ঘটে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে।

শেমীয় ভাষা লেখার জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ লিপি হল আবজাদ — এক ধরনের অশব্দীয় বর্ণমালা লিপি যা কিছু বা সব স্বরধ্বনি বাদ দেয়, যা এই ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব, কারণ শেমীয় ভাষায় অর্থবহনকারী প্রধান উপাদান হল ব্যঞ্জনধ্বনি। এর মধ্যে উগারিতীয়, ফৈনীকীয়, অরামীয়, ইব্রীয়, সুরীয়, আরবি এবং প্রাচীন দক্ষিণ আরব্য লিপি অন্তর্ভুক্ত। ইথিওপিয়াইরিত্রিয়ার শেমীয় ভাষা লেখার জন্য ব্যবহৃত গেয়েজ লিপি প্রকৃতপক্ষে একটি আবুগিদা বা শব্দীয় বর্ণমালা লিপি—একটি পরিবর্তিত আবজাদ, যেখানে সব সময় ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত বিশেষক চিহ্নের মাধ্যমে স্বরধ্বনি নির্দেশ করা হয়, যা অন্যান্য শেমীয় ভাষার লিপি থেকে ভিন্ন, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বা প্রারম্ভিক শিক্ষার জন্য স্বরচিহ্ন ব্যবহার করা হয়। মাল্টীয় একমাত্র শেমীয় ভাষা যা লাতিন লিপিতে লেখা হয় এবং ইউরোপীয় সংঘের একমাত্র শেমীয় দাপ্তরিক ভাষা

শেমীয় ভাষাসমূহ তাদের অসংযোজক রূপতত্ত্বের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ, ক্রিয়ামূলগুলো নিজে শব্দাংশ বা শব্দ নয়, বরং পৃথক ব্যঞ্জনধ্বনির সমষ্টি (সাধারণত তিনটি, যাকে ত্রিবর্ণমূল বলা হয়)। শব্দ গঠিত হয় মূল ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর মাঝখানে স্বরধ্বনি বসিয়ে, কেবল উপসর্গ বা প্রত্যয় যোগ করে নয়, যদিও উপসর্গ ও প্রত্যয় প্রায়ই যুক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আরবিতে “লেখা” অর্থের মূল ধাতু হল ক-ত-ব (ك-ت-ب/k-t-b)। এই মূল থেকে স্বরধ্বনি বসিয়ে এবং কখনও ব্যঞ্জনধ্বনি যোগ করে শব্দ গঠিত হয়, যেমন: كِتاب kitāb “বই”, كُتُب kutub “বইগুলো”, كاتِب kātib “লেখক”, كُتّاب kuttāb “লেখকেরা”, كَتَب kataba “তিনি লিখলেন”, يكتُب yaktubu “তিনি লেখেন”, ইত্যাদি। অথবা ইব্রীয়তে সমতুল্য ধাতু k-t-b/כתב থেকে গঠিত হয় כַתָב katav "তিনি লিখলেন", יִכתוב yichtov "তিনি লিখবেন", כותֵב kotev "তিনি লেখেন" বা "লেখক", מִכתָב michtav "চিঠি", הִכתִיב hichtiv "তিনি নির্দেশ দেন", ইত্যাদি। ইব্রীয় ভাষায় কাফ হরফটি কখনও কখনও পূর্ববর্তী অক্ষরের ওপর নির্ভর করে খাফ (/x/) হয়ে যায়।

পাদটীকা

[সম্পাদনা]
  1. আরবি বিশ্বের বৃহত্তম ভাষাগুলোর একটি; পশ্চিম এশিয়াআফ্রিকায় প্রায় ৪১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ মাতৃভাষা এতে হিসেবে কথা বলে[] এবং সম্ভবত আরও প্রায় ৬ কোটি মানুষ এটি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।[]
  2. আমহারীয় প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ মাতৃভাষা হিসেবে কথা বলে, এবং সম্ভবত আরও প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ এটি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। আফ্রিকা মহাদেশে সম্ভবত কেবল আরবি, সোয়াহিলি, হাউসা ও অরোমোর পরেই এর অবস্থান; আরবির পর এটি জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শেমীয় ভাষা। এটি ইথিয়পিয়ার লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও সংবিধানস্বীকৃত জাতীয় ভাষা এবং প্রাথমিক স্তরে ইথিয়পিয়ার সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাদানের জাতীয় ভাষা।[]
  3. তিগ্রিনিয়াকে তিগ্রে ভাষার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়—যদিও ভাষাগুলো আত্মীয়া। তিগ্রে আমহারীয়ের মতোই উত্তর ইথিয়পীয় শেমীয় ভাষা। এটি ইথিয়পিয়ার তিগ্রে প্রদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা এবং ইরিত্রিয়ার উচ্চভূমি অঞ্চলে (আক্কেলে গুজাই, সেরায়ে ও হামাসিয়েন প্রদেশ; যেখানে রাষ্ট্রের রাজধানী আসমারা অবস্থিত) প্রচলিত। এই এলাকার বাইরে তিগ্রিনিয়া ইথিয়পিয়ার তাম্বিয়েন ও ওলকাইত ঐতিহাসিক জেলা এবং ইরিত্রিয়ার মাসসারা ও কেরেন প্রশাসনিক জেলাতেও প্রচলিত—যেগুলো যথাক্রমে এর বিস্তারের দক্ষিণ ও উত্তর সীমা নির্দেশ করে। ১৯৯৫ সালে তিগ্রিনিয়াভাষীর সংখ্যা আনুমানিক ৪০ লক্ষ ধরা হয়েছিল; এর মধ্যে ১৩ লক্ষ ইরিত্রিয়ায় বসবাস করতেন (দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ)। ২০০৮ সালে এই সংখ্যা আনুমানিক ৫০ লাখে পৌঁছয়।[] ইব্রীয় ভাষায় প্রায় ~৫০ লক্ষ মাতৃভাষী/প্রথমভাষী (L1) বক্তা রয়েছে,[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] গুরাগে ভাষাসমূহে প্রায় ১৫ লক্ষ বক্তা রয়েছে,[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তিগ্রে ভাষায় আনুমানিক ~১০.৫ লক্ষ বক্তা রয়েছে[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এবং অরামীয় ভাষায় প্রায় ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার থেকে ১০ লক্ষ বক্তা কথা বলে, যাদের অধিকাংশই অশূরীয়[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
  4. মাল্টীয় ভাষায় প্রায় ৪ লক্ষ ৮৩ হাজার বক্তা রয়েছে।

    তথ্যসূত্র

    [সম্পাদনা]
    1. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Semitic"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
    2. 1 2 টেমপ্লেট:E28
    3. Owens 2013, পৃ. 2।
    4. Hudson ও Kogan 1997, পৃ. 457।
    5. Hudson ও Kogan 1997, পৃ. 424; Austin 2008, পৃ. 74
    6. টেমপ্লেট:E28
    7. Eberhard, David M.; Simons, Gary F.; Fennig, Charles D. (২০২৫)। "Tigrinya"Ethnologue, 28th ed.। SIL International। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২৫
    8. "Hebrew"UCLA Language Materials Project। University of California। ১১ মার্চ ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১ মে ২০১৭
    9. Dekel 2014
    10. "Hebrew"Ethnologue। ১৪ মে ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ জুলাই ২০১৮
    11. টেমপ্লেট:E28