ইসলামি সমাজতন্ত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Islamic socialism থেকে পুনর্নির্দেশিত)

সমাজতন্ত্রের অধিক আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় আকার তৈরির জন্য বিভিন্ন মুসলিম নেতারা ইসলামী সমাজতন্ত্রের (Islamic socialism) ধারণা তৈরি করেন। মুসলিম সমাজতন্ত্রীগণ বিশ্বাস করেন যে, কুরআনমুহাম্মদের (সা) দেয়া শিক্ষা - বিশেষ করে জাকাত - অর্থনৈতিকসামাজিক সমতার নীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মুহাম্মাদ (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথমদিকের মদিনা কল্যাণ রাষ্ট্রের থেকে তারা অনুপ্রেরণা লাভ করেন। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার মাধ্যমে আধুনিক ইসলামী সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। মুসলিম সমাজতান্ত্রিক নেতাগণ জনগণের থেকে আসা রাজনৈতিক বৈধতায় বিশ্বাস রাখেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

কোন কোন মুসলিম আলেম, যেমন মুহাম্মাদ শারকাওয়ি এবং সামি আয়াদ হান্না এর মতে, মুহাম্মাদ (সা) এর সাহাবী আবুযর আল-গিফারি (রা)হচ্ছেন ইসলামী সমাজতন্ত্রের পথিকৃৎ।[১][২][৩][৪][৫] ওসমানের(রা) খিলাফতের সময় শাসক শ্রেণীর সম্পদের পরিমাণ অধিক বৃদ্ধি পায়।তিনি এর বিরোধিতা করেন; এবং সম্পদের সমভাবে সুষমবণ্টনের দাবি তোলেন। প্রথম মুসলিম খলিফা আবু বকর(রা) সর্বসাধারণের জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে ভাতার ব্যবস্থা করেন।নিয়ম অনুসারে, সকল পুরুষ, নারী ও শিশুকে বছরে দশ দিরহাম করে দেয়া হতো। পরে এটি বাড়িয়ে ২০ দিরহাম করা হয়।[৬]

ওয়াইসি আন্দোলন হচ্ছে সোভিয়েত সরকারের একটি প্রথম দিকের সমর্থকগোষ্ঠীর আন্দোলন। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় প্রথম পরিক্ষামূলক ইসলামী কমিউন তৈরি করা হয়। সেই সময় মুসলিম সোশ্যালিস্ট কমিটি অফ কাজানেরও এ বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

আধুনিক সময়ে, ইসলামী সমাজতন্ত্রকে দুইভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা: বামপন্থী এবং ডানপন্থী। বামপন্থী শাখায় সিয়াদ বারে, হাজি মিসবাচ, আলি শারিয়াতি, ইয়াসির আরাফাত, এবং জালাল আল-ই আহমাদের নাম উল্লেখযোগ্য। তারাপ্রলেতারিয়েত আন্তর্জাতিকতাবাদ ও ইসলামী শরিয়াহ এর সমর্থন করেন; এবং মুসলিমদেরকে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক অথবা মার্ক্সবাদী আন্দোলনে অংশ নিতে উৎসাহিত করে। ডানপন্থী সমাজতন্ত্রীগণ আল্লামা ইকবাল, আগুস সেলিম, জামাল উদ্দিন আফগানি, মুসা আল-সদর, এবং মাহমুদ শালতুত মতাদর্শগতভাবে তৃতীয় অবস্থানবাদের সাথে ঘনিষ্ঠ। তারা কেবল সামাজিক ন্যায়বিচার, সামাজিক সমান অধিকার ও সার্বজনীন সমতাই চান না, একই সাথে ইসলামী পুনর্জাগরণ এবং শরিয়তের প্রয়োগ চান। তারা একই সাথে শ্রেণী সংঘাতের ধারণাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে নারাজ; অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন তার দক্ষিণ সীমান্তের মুসলিম সমাজতান্ত্রিকদের বিপ্লবকে প্রথমে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এটি সেসময়কার পুঁজিবাদী শক্তির নজরও কেড়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর বাকু এর সভায় রাশিয়ার প্রতিনিধিগণ মুসলিম অঞ্চলের 'জাতীয় সমাজতন্ত্র' ধারণাকে অস্বীকার করেন। তারা যুক্তি হিসেবে বলেন, এরকম জাতীয় সমাজতন্ত্রের অস্তিত্ব, সামগ্রিক বিপ্লবের জন্য অবাস্তব এবং ক্ষতিকর। তারা এটাকে রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকিস্বরূপ মনে করে। রাশিয়ার বলশেভিকগণ তাদের নিজ প্রভাব বলয়ের পাশে অন্য কোন নতুন বিপ্লবী প্রচেষ্টা নিয়ে অসন্তুষ্ট হন। জাতীয় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তারা বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেন।[৭]

মুহাম্মদ নখশবকেই প্রথম শিয়া ইসলাম ও ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রের মিলনের কৃতিত্ব দান করা হয়।[৮] নকশবের আন্দোলনটি এই যুক্তির উপর ভিত্তি করে ছিল যে, যেহেত্য ইসলাম এবং সমাজতন্ত্র উভয়ই সামাজিক সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার অর্জন করতে চায়। কাজেই এই দুটো পরস্পরের সাথে অসামঞ্জস্য নয়। তিনি ন্যায়শাস্ত্র এর নীতি নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন, এবং তার থিসিজে তিনি এই বিষয়ে উল্লেখ করেছেন।[৯] ১৯৪৩ সালে নখশব একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল মুভমেন্ট অফ গড-ওয়ারশিপিং সোশ্যালিস্ট (ঈশ্বর উপাসনাকারী সমাজতন্ত্রীদের আন্দোলন)। যে ছয়টি সংগঠন মিলে ইরানের ন্যাশনাল ফ্রন্ট গঠন করেছিল, তাদের মধ্যে এই সংগঠনটি ছিল অন্যতম।[১০] এই সংগঠনটি তৈরি হয় দুটি দলকে একত্র করে। এদের একটি ছিল, দার আল-ফানাউন এর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নখশবের চক্র, আর একটিতেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ২৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে জালায়েদ্দিন আশতিয়ানির চক্র। এই সংগঠনটি প্রথমদিকে দেশপ্রেমী মুসলিমদের লিগ নামে পরিচিত ছিল। এই সংগঠনটির আদর্শ ছিল ধর্মীয় অনুভূতি, জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা।[১১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Oxford Encyclopedia of the Modern Islamic World। New York: Oxford University Press। ১৯৯৫। পৃষ্ঠা 19আইএসবিএন 0-19-506613-8ওসিএলসি 94030758 
  2. "Abu Dharr al-Ghifari"Oxford Islamic Studies Online। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০১০ 
  3. And Once Again Abu Dharr। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০১১ 
  4. Hanna, Sami A.; George H. Gardner (১৯৬৯)। Arab Socialism: A Documentary Survey। Leiden: E.J. Brill। পৃষ্ঠা 273–274। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০১০ 
  5. Hanna, Sami A. (১৯৬৯)। "al-Takaful al-Ijtimai and Islamic Socialism"The Muslim World59 (3–4): 275–286। ডিওআই:10.1111/j.1478-1913.1969.tb02639.x। সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  6. "Social Wage - Medialternatives"। সংগ্রহের তারিখ ৪ মে ২০১৫ 
  7. Alexandre A. Bennigsen (১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮০)। Muslim National Communism in the Soviet Union: A Revolutionary Strategy for the Colonial World। University of Chicago Press। পৃষ্ঠা 76। আইএসবিএন 978-0-226-04236-7। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৩ 
  8. Abrahamian, Ervand. Iran between Two Revolutions. Princeton studies on the Near East. Princeton, N.J.: Princeton University Press, 1982. p. 463
  9. Rāhnamā, ʻAlī. An Islamic Utopian: A Political Biography of Ali Shari'ati. London: I.B. Tauris, 1998. p. 26.
  10. "Archived copy" (PDF)। ২০১১-০৭-১৯ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-১০ 
  11. Rāhnamā, ʻAlī. An Islamic Utopian: A Political Biography of Ali Shari'ati. London: I.B. Tauris, 1998. p. 25.