মার্কসবাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মার্কসবাদ (ইংরেজি: Marxism) ঊনবিংশ শতাব্দীর দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং বিপ্লবী কার্ল মার্কসফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক অনুশীলন ও সামাজিক তত্ত্ব। এই তত্ত্বে সামাজিক পরিবর্তনের দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিতে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও শ্রেণি-সম্পর্ককে ভিত্তি করে সমাজ বিশ্লেষণের বিশ্বদর্শন ও প্রক্রিয়া বয়ান করা হয়েছে। মার্কসবাদী প্রক্রিয়াকে পদ্ধতিগত অর্থনৈতিক পরিবর্তনে শ্রেণিসংগ্রামের ভূমিকা এবং পুঁজিবাদের বিকাশের সমালোচনা ও বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক ও সামজিক-রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা ও প্রয়োগে ব্যবহার করা হয়।

প্রয়োগিক বিবেচনায় মার্কসবাদ হচ্ছে মালিক শ্রেণির তথা বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন তথা মজুরি-দাসত্ব থেকে প্রলেতারিয়েতের বা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ। এটি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও বৈপ্লবিক সাধনক্রিয়ার সামগ্রিক রূপ। ঊনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংরেজি অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসি সমাজতন্ত্র রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মার্কসবাদ সে সবের বৈধ উত্তরাধিকার।[১] । হেগেলের দর্শন, অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডোর অর্থনীতি তত্ত্ব এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে তিনি সমাজের সমালোচনা করেন যেটাকে তিনি বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী দাবি করেন। Capital: A Critique of Political Economy (ডাস কাপিটাল) বইয়ে তার চিন্তার সুসংগত বহিপ্রকাশ ঘটে।

মার্কসবাদের মর্মার্থ[সম্পাদনা]

এমিল বার্ণসের মতে মার্কসবাদ হলো এই জগৎ, জীবন এবং তারই অংশ মানব সমাজ সম্পর্কে সাধারণ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত। যে সব অস্পষ্ট ধারণা এতদিন প্রচলিত ছিলো এবং এখনও আছে মার্কসীয় তত্ত্ব সে সবগুলির বিরোধী। মার্কসের তত্ত্ব তাঁর সমসাময়িক সমাজের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়। মার্কসীয় রাজনীতি তত্ত্ব অর্থনীতি, ইতিহাস ও সামাজিক তত্ত্বের পটভূমিতেই বিবেচ্য। তত্ত্ব হিসেবে মার্কসবাদের কোনো শেষ সীমারেখা নেই; ইতিহাসের যত অগ্রগতি হয় এবং মানুষ অধিকতর পরিমাণে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকে ততই মার্কসবাদ সমৃদ্ধ হতে থাকে।[২]

সার্বিক দেখা[সম্পাদনা]

একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হচ্ছে উৎপাদনের উপায়ের সামাজিক মালিকনা। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে উৎপাদনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তিগত মুনাফা তৈরি নয়, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল সদস্যদের বৈষয়িক ও আত্মিক সন্তুষ্টিকরণ।[৩] অর্থাৎ সমাজতন্ত্রে উৎপাদন হচ্ছে ব্যবহারের জন্য। যেমন এঙ্গেলস লক্ষ্য করেছেন: "উৎপন্ন দ্রব্য যেখানে প্রথমে উৎপাদককে ও পরে দখলকারীকে দাসত্ববন্ধনে বাঁধে, দখলের সেই পুঁজিবাদী পদ্ধতির জায়গায় তখন আসে দখলের এমন এক পদ্ধতি আধুনিক উৎপাদন-উপায়ের চরিত্র যার ভিত্তি; একদিকে উৎপাদন সচল ও সম্প্রসারণের উপায়স্বরূপ প্রত্যক্ষ সামাজিক দখল, এবং অন্যদিকে জীবিকা নির্বাহ ও উপভোগের উপায়স্বরূপ প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত দখল।"[৪]

ঐতিহাসিক ভিত্তি[সম্পাদনা]

রাষ্ট্রিক অর্থনীতিতে মার্কসবাদের পূর্বসূরি হলেন ইংরেজ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ এবং ডেভিড রিকার্ডো। তাঁরা দেখান যে সমাজের সমস্ত সম্পদের মূল উৎস হলও শ্রম এবং তাতে করে বৈজ্ঞানিক অর্থনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। উনিশ শতকের মহান কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্রী সাঁ সিমোঁ শার্ল ফুরিয়ে এবং রবার্ট ওয়েন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন এবং ভবিষ্যৎ সমাজের প্রধান প্রধান দিকের একটা ছবি দেন। তবে তা প্রতিষ্ঠার পথ দেখান কাল্পনিক পথে। জার্মান দর্শন, ব্রিটিশ অর্থনীতি এবং কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র রূপে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ যা কিছু সৃষ্টি, তার বৈধ উত্তরাধিকারী হলও মার্কসবাদ। তবে মার্কস, এঙ্গেলস তাঁদের তাত্ত্বিক পূর্বসূরিদের ধারাবাহকই ছিলেন না, তাঁরা বিচার করে সেগুলি ঢেলে সাজিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন নতুন মতবাদ। তাঁদের মতবাদে প্রকাশ পায় সবচেয়ে প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক শ্রেণী, প্রলেতারিয়েতের মৌলিক স্বার্থ। মেহনতিদের সামাজিক মুক্তির ইতিহাসে তাঁরা সত্যিকারের এক বিপ্লব ঘটান।[৫]

ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো|ভিত্তি-উপরিকাঠামোর দ্বন্দ্ব[সম্পাদনা]

মার্কসবাদের মতে উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হলো ভিত্তি, আর ভিত্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা হলো উপরিকাঠামো। মার্কসবাদী রাজনীতি অনুসারে, আগে ভিত্তি, পরে উপরিকাঠামো; আগে অর্থনীতি, পরে সংস্কৃতি। মানুষের জীবন চর্চার ক্ষেত্রে ভিত্তিটাই হলো প্রাথমিক বা মুখ্য উপাদান, আর উপরিকাঠামো হলো গৌণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অবশ্য এখানে উল্লেখ্য যে, ভিত্তি-উপরিকাঠামোর সম্পর্কটা যান্ত্রিক নয়, পরন্তু দ্বান্দ্বিক। অর্থাৎ ভিত্তি উপরিকাঠামোকে গড়ে তোলে, আবার উপরিকাঠামোও ভিত্তির উপর ক্রিয়া করে_এরা পরস্পরকে যুগপৎ দ্বান্দ্বিকভাবে প্রভাবিত করে। মার্কসীয় রাজনীতি ভিত্তি-উপরিকাঠামোকে এইরূপ দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের জায়গা থেকে দেখে থাকে।[৬]

ধারনাসমূহ[সম্পাদনা]

ঐতিহাসিক বস্তুবাদ[সম্পাদনা]

"সমাজ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত নয়, কিন্তু আন্তঃসম্পর্কের যোগফলকে প্রকাশ করে, সেই সম্পর্কগুলোর ভেতরেই ব্যক্তিগণ দাঁড়ায়।"

ইতিহাসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্ব [৮] হচ্ছে সমাজব্যাখ্যার পদ্ধতি। মার্কসের কাছে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরণের জন্যই সমাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভূত হয়।[৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. এম. আর. চৌধুরী সম্পাদিত; আবশ্যকীয় শব্দ-পরিচয়, প্রকাশক: হেলাল উদ্দীন, ঢাকা; এপ্রিল, ২০১২; পৃষ্ঠা-৪৯-৫০।
  2. মো. আবদুল ওদুদ (দ্বিতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ২০১৪)। রাষ্ট্রদর্শন। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃ: ৪৮২। আইএসবিএন 978-98-43300-90-4 
  3. অনুপ সাদি, সমাজতন্ত্র, ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃষ্ঠা ৪৮,৫২
  4. ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, কল্পস্বর্গ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, বিদেশি ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা-৭৩
  5. ভ. বুজুয়েভ ও ভ. গরোদনভ, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-৩৬-৩৭।
  6. সুজিত সেন, মার্কসবাদ তাত্ত্বিক রূপরেখা, মিত্রম, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ জুন, ২০০৯, পৃষ্ঠা ১০, ISBN: 978-93-80036-007.
  7. Grundrisse: Foundations of the Critique of Political Economy, by Karl Marx & Martin Nicolaus, Penguin Classics, 1993, ISBN 0-14-044575-7, pg 265
  8. Evans, p. 53; Marx's account of the theory is the Preface to A Contribution to the Critique of Political Economy (1859). [১]. Another exposition of the theory is in The German Ideology. It, too, is available online from marxists.org.
  9. শোভনলাল দত্তগুপ্ত ও উৎপল ঘোষ, মার্কসীয় সমাজতত্ত্ব পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুন ২০১৪, পৃষ্ঠা ৩৯।

বিবলিওগ্রাফি[সম্পাদনা]

  • {{cite book |title=My Life: A Spoken Autobiography|last=Castro, Fidel
  • Coltman, Leycester (২০০৩)। The Real Fidel Castro। New Haven and London: Yale University Press। আইএসবিএন 978-0-300-10760-9 
  • Green, Sally (১৯৮১)। Prehistorian: A Biography of V. Gordon Childe। Bradford-on-Avon, Wiltshire: Moonraker Press। আইএসবিএন 0-239-00206-7 
  • Lenin, Vladimir (১৯৬৭ [১৯১৩])। Karl Marx: A Brief Biographical Sketch with an Exposition of Marxism। Peking: Foreign Languages Press।  Available online at here [২]
  • Marx, Karl (১৮৪৯)। Wage Labour and Capital। Germany: Neue Rheinische Zeitung।  Available online here [৩]
  • Trigger, Bruce G. (২০০৭)। A History of Archaeological Thought (Second Edition)। New York: Cambridge University Press। আইএসবিএন 978-0-521-60049-1 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

সাধারণ উৎসসমূহ[সম্পাদনা]

ভূমিকার প্রবন্ধসমূহ[সম্পাদনা]

মার্কসবাদী ওয়েবসাইটসমূহ[সম্পাদনা]