হাতশেপসুত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হাতশেপসুত (ইংরেজি: Hatshepsut; উচ্চরণ: /hætˈʃɛpsʊt/)[৪] প্রাচীন মিশরের অষ্টাদশ রাজবংশের পঞ্চম ফেরাউন ছিলেন। তার নামের অর্থ "মহৎ নারীদের প্রধান"[৫]মিশরীয়ভূত্ত্ববিদরা তাকে সাধারনভাবে সর্বাপেক্ষা সফল ফেরাউনদের একজন হিসেবে গণ্য করেন। তিনি মিশরীয় রাজবংশের অন্যান্য নারীদের থেকে তার রাজত্বকাল অনেক দীর্ঘতর ছিল। ঐতিহাসিকভাবে তিনি দ্বিতীয় মহিলা ফেরাউন ছিলেন। প্রথম মহিলা ফেরাউন ছিলেন সোবেকনেফেরু.[৬]। হাতশেপসুত ১৪৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের সিংহাসনে বসেন। তিনি দ্বিতীয় থুতমোসের প্রধান স্ত্রী ছিলেন। দ্বিতীয় থুতমুসের মৃত্যুর পর মিশরের শাসনভার চলে আসে তার পুত্র তৃতীয় থুতমোস এর উপর। কিন্তু তৃতীয় থুতমোসের বয়স তখন মাত্র দুই বছর। বিমাতা হাতশেপসুত তৃতীয় থুতমোস এর সাথে যৌথভাবে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন।

হাতশেপসুত প্রথম থুতমোস এবং তার প্রধান স্ত্রী আহমোসের একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন।[৭] তার স্বামী দ্বিতীয় থুতমোস, প্রথম থুতমোস এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী মুতনোফ্রেতের সন্তান ছিলেন। মুতনোফ্রেত রাজকন্যা হিসেবে অভিহিত হতেন। ধারণা করা হয় তিনি প্রথম আহমোসের কন্যা ছিলেন। হাতশেপসুত এবং দ্বিতীয় থুতমোসের নেফেরুরে নামে কন্যা সন্তান ছিল। তৃতীয় থুতমোসের মায়ের নাম আইসেত। তিনি দ্বিতীয় থুতমসের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন।

মিশরবিদদের মতে হাতশেপসুত ফেরাউনদের মধ্যে সবচেয়ে সফল শাসক ছিলেন এবং মিশরীয় রাজবংশের অন্য কোন নারীর অপেক্ষা দীর্ঘতর সময় শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। মিশরবিদ জেমস হেনরি ব্রেস্টেড বলেন, হাতশেপসুত, "ইতিহাসের প্রথম মহীয়সী নারী যার সম্পর্কে আমরা জানতে পেরেছি।"[৮]

শাসন কাল[সম্পাদনা]

অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে জাহাজে করে পান্ট থেকে গাছ মিশরে নিয়ে আসা হচ্ছে লাগানোর জন্য—হাতশেপসুতের সমাধি মন্দির থেকে প্রাপ্ত

হাতশেপসুতের রাজত্বের সময়সীমা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রাচীন নথিতে লিপিবদ্ধ থাকলেও আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে প্রাথমিক ধারণা ছিল হাতশেপসুত শুধুমাত্র আনুমানিক ১৪৭৯ থেকে ১৪৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পর্যন্ত সহ-শাষক হিসাবে মিশরে রাজত্ব করেন এবং শাষণকালের সপ্তম থেকে একুশতম বৎসর পর্যন্ত শাসনভার তৃতীয় থুতমোসের ছিল।[৯] কিন্তু বর্তমানে মিশরবীদদের মতে হাতশেপসুত ফেরাউনের মত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।[১০][১১]

হাতশেপসুত প্রায় ২২ বছর প্রাচীন মিশরে রাজত্ব করেছেন বলে বর্ণ করেছেন। জোসেফাস এবং জুলিয়াস আফ্রিকানাস দুই জনেই মানেথোর রাজার তালিকায় অ্যামেসিস বা আমেনসিস নামক একজন মহিলার কথা উল্লেখ করেছেন। উক্ত বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে তা হাতশেপসুত বলেই ধারণা করা হয়। জোসেফাস হাতশেপসুতের শাসন ২১ বছর নয় মাস [১২] বলে উল্লেখ করেছেন। আফ্রিকানাস অবশ্য হাতশেপসুতের শাসনকাল ২২ বছর বলে উল্লেখ করেন। থুতমোস ২২ বছর বয়সে প্রথমবারের মত বিদেশ অভিযানে লিপ্ত হন। ধারণা করা হয় হাতশেপসুতের শাসনামল এর আগেই সমাপ্ত হয়েছিল।[১৩]

যদিও হাতশেপসুতের শাসুনামল কবে থেকে শুরু হয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় নি। ধারণা করা হয় তার পিতার শাসনামল শুরু হয় ১৫২৬ অথবা ১৫০৬ খ্রীস্টপূর্বে।[১৪] কিন্তু প্রথম এবং দ্বিতীয় থুতমোসের শাসনামলের স্থায়ীত্ব ঠিক কতদিন ছিল তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নি। যদি শাসনামল কম ধরা হয় তাহলে প্রথম থুতমোস বা তার পিতার [১৫]শাসনের পর তিনি ১৪ শাসন করেন। আর যদি শাসনামল দীর্ঘ কাল ধরা হয় তাহলে তার পিতা রাজা হওয়ার পর ২৫ বছর।[১৪] সেই হিসেবে ধারণা করা হয় হাতশেপসুত ক্ষমতা ১৫১২ খ্রীস্টপূর্বে অথবা ১৪৭৯ খ্রীস্টপূর্বে গ্রহণ করেন।

ফেরাউন হিসাবে হাতশেপসুতের প্রথম পরিচয় প্রকাশ পায় রামোস এবং হাতনোফের সমাধিতে। এই সমাধিগুলোতে প্রাপ্ত ধন-সম্পত্তির মধ্যে একটি মাটির পাত্রে "সপ্তম বৎসর" কথাটি ছাপা ছিল।[১৬]

একই সমাধি থেকে প্রাপ্ত আরেকটি পাত্রে "গডের স্ত্রী হাতশেপসুত" সিল ছাপা ছিল। আরও দুইটি পাত্রে "দি গুড গডেস মাৎকারে"[১৭]। যা থেকে এটাই অনুধাবন হয় যে শাসনামলের সপ্তম বছরে এসে হাতশেপসুত মিশরের রাণী হিসেবে নয় বরং রাজা হিসেবে পরিচিত হয়ে ছিলেন।[১৭]

মূখ্য অর্জন[সম্পাদনা]

বাণিজ্যপথ[সম্পাদনা]

হাতশেপসুত মন্দির সামনে একটি গাছ, পান্ট বাণিজ্য অভিযানে এই গাছ আনা হয়েছিল বলে মন্দিরের গায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিক্সসের আমলে (দ্বিতীয় অন্ত্রবর্তী আমলে) মিশরের যে বাণিজ্যপথগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে অষ্টাদশ রাজবংশের সম্পদ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেন হাতশেপসুত। তিনি পান্ট এ অভিযানের প্রস্তুতি এবং তহবিল গঠনে সহায়তা করেন। ধারণা করা হয় শাসনামলের নবম বৎসরে তিনি পান্টে বাণিজ্যিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তার নামে ৭০ ফুট (২১ মিটার) লম্বা পাঁচটি জাহাজে নাবিক এবং ৩০ জন বৈঠাবাহক সহ ২১০ জন পুরুষ পান্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পান্ট থেকে লোবান, গন্ধরস সহ অনেক বাণিজ্যিক পণ্য ক্রয় করা হয়।

হাতশেপসুতের অভিযাত্রীরা পান্ট থেকে ৩১টি গন্ধরসের গাছ নিয়ে আসেন। বিদেশ থেকে গাছ এনে রোপণের চেষ্ঠা এটাই প্রথম রেকর্ড। তিনি এই গাছগুলো তার সমাধি মন্দিরে লাগিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। মিশরিয়রা পান্ট থেকে আরও অনেক পণ্য নিয়ে আসেন যার মাঝে ছিল লোবানও।[১৮] লোবান গুড়ো করে হাতশেপসুত চোখের কাজল তৈরি করতেন। এটাই ধূপের প্রথম নথিভুক্ত ব্যবহার বলে ধারণা করা হয়।[১৯]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Queen Hatshepsut"। Phouka। সংগৃহীত ১৩ এপ্রিল ২০০৮ 
  2. Wilford, John Noble (২৭ জুন ২০০৭)। "Tooth May Have Solved Mummy Mystery."New York Times। সংগৃহীত ২৯ জুন ২০০৭। "A single tooth and some DNA clues appear to have solved the mystery of the lost mummy of Hatshepsut, one of the great queens of ancient Egypt, who reigned in the 15th century B.C." 
  3. "Tooth Clinches Identification of Egyptian Queen"Reuters। জুন ২৭, ২০০৭। সংগৃহীত ১৩ এপ্রিল ২০০৮ 
  4. "Hatshepsut"Dictionary.com। সংগৃহীত ২৭ জুলাই ২০০৭ 
  5. Clayton, Peter. Chronicle of the Pharaohs, Thames & Hudson Ltd, 1994. p. 104
  6. Wilkinson, Toby (২০১০)। The Rise and Fall of Ancient Egypt। London: Bloomsbury। পৃ: 181, 230। আইএসবিএন 9781408810026 
  7. Martin, G. (২০১২-১২-২৩)। African Political Thought (ইংরেজি ভাষায়)। Springer। আইএসবিএন 9781137062055 
  8. "QUEEN HATSHEPSUT (1500 B.C.)"nbufront.org 
  9. Dodson, Aidan; Dyan, Hilton (২০০৪)। The Complete Royal Families of Ancient Egypt। Thames & Hudson। পৃ: ১৩০। আইএসবিএন 0-500-05128-3 
  10. Fletcher, Joann (২০১৩)। The Search For Nefertiti। Hachette UK। পৃ: ১৫৬। আইএসবিএন 9781444780543 
  11. Stiebing Jr., William H. (২০১৬)। Ancient Near Eastern History and Culture। Routledge। পৃ: ১৭৭। আইএসবিএন 9781315511160 
  12. টেমপ্লেট:Cite Josephus
  13. Steindorff, George; Seele, Keith (১৯৪২)। When Egypt Ruled the East। University of Chicago। পৃ: ৫৩। 
  14. Grimal, Nicolas (১৯৮৮)। A History of Ancient Egypt। Librairie Arthéme Fayard। পৃ: ২০৪। 
  15. Gabolde, Luc (1987), La Chronologie du règne de Tuthmosis II, ses conséquences sur la datation des momies royales et leurs répercutions sur l'histoire du développement de la Vallée des Rois, SAK 14: pp. 61–87.
  16. Tyldesley, Joyce (১৯৯৬)। Hatchepsut: The Female Pharaoh (hardback সংস্করণ)। Penguin Books। পৃ: ৯৯। আইএসবিএন 0-14-024464-6 
  17. Tyldesley, Hatchepsut, p. 99.
  18. Njoku, Raphael Chijioke (২০১৩)। The History of Somalia। ABC-CLIO। পৃ: 29–31। আইএসবিএন 0313378576 
  19. Isaac, Michael (২০০৪)। A Historical Atlas of Oman। The Rosen Publishing Group। পৃ: ১৪। আইএসবিএন 0823945006। সংগৃহীত সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৪ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]