স্বরগ্রাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
১২ টি উপসুর বিশিষ্ট ক্রোম্যাটিক স্কেলে ঊর্ধ্বক্রম এবং অধঃক্রম এই শব্দ সম্পর্কে Play 
সি-মূল স্কেলে বিরামের বিন্যাস এই শব্দ সম্পর্কে Play 

স্বরগ্রাম হচ্ছে আপেক্ষিক কম্পাঙ্কের এক বিশেষ স্কেল। যদি কোন কাঁপতে থাকা উৎস সরল ছন্দিত গতিতে কাঁপতে থাকে এবং তা থেকে একটি মাত্র কম্পাঙ্কের শব্দ সৃষ্টি হয় তবে তাকে সুর বলে। আর যে সমস্ত সুরের সমষ্টি শ্রুতিমধুর সংগীতের দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোই স্বর। স্বর সৃষ্টিকারী সর্বনিম্ন কম্পাঙ্কের সুরকে মূল সুর এবং বেশি কম্পাঙ্কের স্বরকে উপসুর বলে। উপসুরের কম্পাঙ্ক মূল সুরের সরল গুণিতক হলে তাকে সমমেল বলে। যে বিশেষ উপসুরের কম্পাঙ্ক মূল সুরের দ্বিগুণ তাকে দ্বিতীয় সমমেল বা অষ্টক বলে। দুই বা ততোধিক সুরের মিলনে শ্রুতিমধুর শব্দ সৃষ্টি হলে তাকে সমসঙ্গতি আর না হলে তাকে বিষম সঙ্গতি বলে। ক্রমবর্ধমান কম্পাঙ্কের কতগুলো সমসঙ্গতি সুর, যাদের শেষ সুর আদি সুরের অষ্টক, তাকে স্বরগ্রাম বলে।[১][২] লক্ষণীয় যদি কোন যৌগিক স্বরের কম্পাঙ্ক ১০,১২,২০,২৮,৩০,৩৬,৪০ হয় তবে এখানে ১০ কম্পাঙ্ক মূল সুরের, বাকি গুলো উপসুরের, তবে এদের মধ্যে ২০,৩০,৪০ উপসুর এবং সমমেল কারণ এরা মূল সুরের সরল গুণিতক। ২০,৩০,৪০ কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট সমমেলকে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় এবং চতুর্থ সমমেল বলে। ১০ কে প্রথম সমমেল ও বলা হয়।

দ্বিমাত্রিক স্বরগ্রাম[সম্পাদনা]

একটি বিশেষ সুর ও তার এক অষ্টক উপসুরের মধ্যে সম সঙ্গতিপূর্ণ বিভিন্ন কম্পাঙ্কের আর ছয়টি সুর সন্নিবেশ করে যে স্বরগ্রাম প্রস্তুত করা হয় তাকে দ্বিমাত্রিক স্বরগ্রাম বলে।

অর্থাৎ এই স্বরগ্রাম সাতটি ক্রমবর্ধমান কম্পাঙ্ক দ্বারা গঠিত। এদের সাধারণত C D E F G A B C দ্বারা সূচিত করা হয়। উপমহাদেশে এদের নাম ‘’’সা রে গা মা পা ধা নি সা’’’ এবং পাশ্চাত্যে এদের নাম যথাক্রমে ‘’’do re mi fa sol la si do’’’। এদের কম্পাঙ্ক যথাক্রমে ২৫৬, ২৮৮, ৩২০, ৩৪১.৩৩, ৩৮৪, ৪২৬.৬৬, ৪৮০ এবং ৫১২। D:C, G:F এবং B:A এই অনুপাতগুলোকে প্রধান টোন বলা হয়। এরা প্রত্যেকে ৯/৮ এর সমান হওয়ায় এগুলোকে প্রধান দ্বিমাত্রিক স্কেলও বলা হয়। এই স্বরগুলো দিয়ে সবসময় সুরের মাধুর্য রক্ষা করা যায় না। তাই আরও পাঁচটি বিকৃত স্বরকে এই স্বরগ্রামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদের কড়ি ও কোমল বলে। কম্পাঙ্কের এই সামান্য পরিবর্তনকে সুর পরিমিত বলে। সা ও পা এর কোন বিকৃত স্বর নেই। মা এর বিকৃত স্বরকে কড়ি এবং অন্যান্য বিকৃত স্বরকে কোমল বলে। সুরকে আরও শ্রুতিমধুর করার জন্য তার যন্ত্রে (যেমনঃ গীটার) আরও সূক্ষ্ম স্বর তৈরি করা সম্ভব। এদের শ্রুতি বা নোট বলে। এসব শ্রুতি দিয়ে সংগীতে মোট ২২ টি স্বর বিবেচনা করা হয়।[১][৩]

সংগীত সংক্রান্ত শব্দ[সম্পাদনা]

ত্রয়ীঃ তিনটি শব্দের কম্পাংকের অনুপাত ৪:৫:৬ হলে এরা মিলিত হয়ে একটি মধুর সুর উৎপন্ন করে। একে ত্রয়ী বলে। সা, গা, পা এবং মা,ধা, সা নিয়ে ত্রয়ী গঠিত হয়।

স্বরসংগতিঃ যদি শব্দের কম্পাংকের অনুপাত ৪:৫:৬:৮ হয় অর্থাৎ ত্রয়ীর সাথে এর নিম্নতম কম্পাংকের অষ্টক যুক্ত হয় তবে এক প্রকার শ্রুতিমধুর শব্দের উৎপত্তি হয়। এরূপ সমন্বয়কে স্বরসংগতি বলে।

সমতানঃ কতগুলো শব্দ মিলিত হয়ে যদি ঐকতানের সৃষ্টি করে তবে তাকে সমতান বলে।

স্বর-মাধুর্যঃ কতগুলো শব্দ যদি একের পর এক ধ্বনিত হয়ে একটি সুমধুর সুরের সৃষ্টি করে তবে তাকে স্বর-মাধুর্য বা মেলোডি বলে। পাশ্চাত্য সংগীত স্বর-মাধুর্যকে ভিত্তি করে ত্রয়ী ও স্বর-সংগতি সমন্বয়ে গীত হয়। কিন্তু বাংলাদেশীভারতীয় সংগীত স্বর-মাধুর্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।[৩]

সলো বা একক সঙ্গিতঃ একটিমাত্র বাদ্যযন্ত্র বাজালে যে সুরের সৃষ্টি হয় বা একই ব্যক্তি সংগীত পরিবেশন করলে যে সংগীত হয় তাকে সলো বলে।

অর্কেস্ট্রাঃ যখন একাধিক বাদ্যযন্ত্র একই সাথে বাজিয়ে একটি সমতান বা একটি স্বর-মাধুর্য অথবা একই সঙ্গে সমতান ও স্বর-মাধুর্য সৃষ্টি করে তখন সেটাকে অর্কেস্ট্রা বলে।

সুর-বিরাম[সম্পাদনা]

দুটি সুরের কম্পাংকের অনুপাতকে সুর-বিরাম বা সুর বিভেদ বা সুরানুপাত বলে। এর দ্বারা কম্পাংকগুলোর তীক্ষ্ণতার পার্থক্য বোঝা যায়। ক, খ, গ ও ঘ নামক সুরের কম্পাংক যথাক্রমে ১, ২, ৩, ৪ হলে ‘’’খ ও ক’’’, ‘’’গ ও খ’’’, ‘’’ঘ ও গ’’’ এর সুর-বিরাম যথাক্রমে ২, ৩/২, ৪/৩। ‘’’ঘ ও ক’’’ এর সুর-বিরাম হচ্ছে ৪= ২ X ৩/২ X ৪/৩। অতএব দেখা যাচ্ছে যেকোনো দুইটি সুরের বিরাম এগুলোর মধ্যবর্তী বিরামগুলোর গুণফলের সমান। যদি দুটি শব্দের কম্পাংকের পরিবর্তনে তাদের কম্পাংকের অনুপাতের পরিবর্তন না ঘটে তবে শব্দের পার্থক্য বোঝা যায় না। বিভিন্ন সুর-বিরামকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন-

১:১ সমায়ন, ২:১ অষ্টক, ৩:১ পঞ্চক, ৫:৪ তীব্র বা গুরু তিস্রক, ৬:৫ লঘু তিস্রক, ৩:২ গুরু পঞ্চক, ৫:৩ গুরু ষষ্ঠক, ৮:৫ লঘু ষষ্ঠক, ৮:৯ গুরু সুর, ১০:৯ লঘু সুর, ১৬:১৫ অর্ধ সুর। [২][৩]

সংগীতগুণ[সম্পাদনা]

প্রকৃতি অনুযায়ী শব্দকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ১। সুরযুক্ত শব্দ এবং ২। সুরবর্জিত শব্দ। উৎসের কম্পন নিয়মিত বা পর্যাবৃত্ত হলে যে শব্দের সৃষ্টি হয় তাকে সুরযুক্ত শব্দ বলে। উৎসের কম্পন অনিয়মিত বা অপর্যাবৃত্ত হলে যে শব্দের সৃষ্টি হয় তাকে সুরবর্জিত শব্দ বলে। সুরযুক্ত শব্দের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যথা- ১। তীব্রতা বা প্রাবল্য, ২। তীক্ষ্ণতা এবং ৩। গুণ বা জাতি।

তীব্রতা[সম্পাদনা]

শব্দ সঞ্চালনের অভিমুখে লম্বভাবে স্থাপিত কোন বস্তুর উপর কোন বিন্দুর চারদিকে একক ক্ষেত্রফল দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ শক্তি প্রবাহিত হয় তাকে তীব্রতা বা প্রাবল্য বলে। এটি তরঙ্গের বিস্তার ও কম্পাংকের উভয়ের বর্গের সমানুপাতিক। উৎস বড় আকারের হলে মাধ্যমের বেশি আয়তনকে কাঁপাতে পারবে, ফলে শব্দের তীব্রতা বেড়ে যাবে। মাধ্যমের ঘনত্ব বেশি হলে শব্দের তীব্রতা বেড়ে যায়। উৎস থেকে শব্দ যত দূরে যায় তত বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পরে। ফলে একক ক্ষেত্রফলে শব্দের পরিমাণ কমে যায়। তাই তীব্রতাও কমে যায়। তীব্রতা দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। উৎসের নিকট বেশি ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোন বস্তু থাকলে পরবশ কম্পনের ফলে অনুনাদ সৃষ্টি হয়। ফলে শব্দের তীব্রতা বেড়ে যায়। এজন্যই তারের বাদ্যযন্ত্র ফাঁকা কাঠের বাক্সের উপর রাখা হয় যাতে কাঠের বাক্স ও এর ভেতরের ফাঁপা অংশের বায়ুতে পরবশ কম্পন সৃষ্টি হয়। উৎসের নিকট উপযুক্ত প্রতিফলক থাকলেও শব্দের তীব্রতা বেড়ে যায়।[৩]

তীক্ষ্ণতা[সম্পাদনা]

যে বৈশিষ্ট্যের দ্বারা সুরযুক্ত শব্দের বা স্বরগ্রামের একই তীব্রতার চড়া শব্দ ও খাদের শব্দের পার্থক্য বোঝা যায় তাকে তীক্ষ্ণতা বলে। মোটা শব্দের তীক্ষ্ণতা কম ও চড়া শব্দের তীক্ষ্ণতা বেশি। কম্পাংক বাড়লে তীক্ষ্ণতা বাড়ে এবং কম্পাংক কমলে তীক্ষ্ণতা কমে। যেহেতু বেগ= কম্পাংক X তরঙ্গ দৈর্ঘ্য, যদি শব্দের বেগ স্থির রাখতে হয় তাহলে কম্পাংক বাড়লে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমতে থাকে। তীক্ষ্ণতা সুরযুক্ত শব্দের বৈশিষ্ট্য। আলোর বিভিন্ন রঙের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য তথা কম্পাংক বিভিন্ন, তেমনি বিভিন্ন তরঙ্গ দীর্ঘবিশিষ্ট শব্দের তীক্ষ্ণতাও বিভিন্ন । এজন্য তীক্ষ্ণতাকে কখনও কখনও সুরের বর্ণ বলা হয়।

গুণ বা জাতি[সম্পাদনা]

শব্দের যে বৈশিষ্ট্য দ্বারা একই তীব্রতা ও তীক্ষ্ণতাসম্পন্ন সুরযুক্ত শব্দের পার্থক্য নিরূপণ করা যায় তাকে জাতি বা গুণ বলে। একই সুরে অর্থাৎ তীব্রতা ও তীক্ষ্ণতায় যদি বাঁশি, বেহালা , এস্রাজ, হারমোনিয়াম বাজতে থাকে তবুও একজন শ্রোতা এই গুণের জন্য কোনটা বাঁশির শব্দ, কোনটা হারমোনিয়ামের তা বলে দিতে পারবেন।[৩]


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র- গনি, সুশান্ত, মজিবর, রোজারিও।
  2. পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র- গিয়াস, মমিন, হাসান, মাহেরা।
  3. পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র- গনি, সুশান্ত, অচিন্ত্য।