সুকান্ত ভট্টাচার্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সুকান্ত ভট্টাচার্য (Sukanto Bhattacharya)
Suakanta Bhattacharya.jpg
সুকান্ত ভট্টাচার্য
জন্ম (১৯২৬-০৮-১৫)১৫ আগস্ট ১৯২৬
মৃত্যু ১৩ মে ১৯৪৭(১৯৪৭-০৫-১৩) (২০ বছর)
জীবিকা কবি
জাতীয়তা ভারতীয়
জাতি বাঙালি
সময়কাল ১৯৪০-১৯৪৭
উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ ছাড়পত্র (১৯৪৭) পূর্বাভাস (১৯৫০) ঘুম নেই (১৯৫০)

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৫ই আগস্ট, ১৯২৬ - ১৩ই মে, ১৯৪৭) বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি।

জন্ম ও পরিবার[উৎস সম্পাদনা]

পিতা-নিবারন ভট্টাচার্য, মা-সুনীতি দেবী। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট মাতামহের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রীটের বাড়ীতে,কালীঘাট,কলকাতায় তার জন্ম।। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার, বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার, উনশিয়া গ্রামে। এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম। বেলেঘাটা দেশবন্ধ স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুনাচল বসু। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুনাচল বসুকে লেখা। অরুনাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখতেন। সুকান্তের ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলেও সরলা বসু তাকে সেই অভাব কিছুটা পুরন করে দিতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়ীতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। পাশের বাড়ীটিতে এখনো বসবাস করেন সুকান্তের একমাত্র জীবিত ভাই বিভাস ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের নিজের ভাতুষ্পুত্র।

প্রগতিশীল রাজনীতি[উৎস সম্পাদনা]

সুকান্ত ভট্টাচার্যকে উৎসর্গিত ফলক, কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। সেই বছর আকাল নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। কৈশোর থেকেই সুকান্ত যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে | পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা | ১৯৪১ সালে সুকান্ত কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরের যোগদান করেন। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিল আর তাঁর সেই গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। সুকান্তকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেমন কেবল মাত্র কবি ছিলেন না, সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তাঁর ছিলো অবাধ বিচরণ। তেমনি সুকান্তও ঐ বয়সেই লিখেছিলেন কবিতা ছাড়াও, গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। তাঁর ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি পাঠেই বেশ বোঝা যায় ঐ বয়সেই তিনি বাংলা ছন্দের প্রায়োগিক দিকটিই শুধু আয়ত্বে আনেন নি, সে নিয়ে ভালো তাত্বিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন।

সাহিত্যকর্ম[উৎস সম্পাদনা]

আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী। মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তাঁর ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তার কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন।তার কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের সংকচিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতায় প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো: ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও লৈখিক দক্ষতায় অনন্য। সাধারণ বস্তুকেও সুকান্ত কবিতার বিষয় করেছেন। বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি উঠে এসেছে তার কবিতায়। সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবেলা করার সাহস সুকান্তের কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়। সুকান্তের কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তার বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান বলে দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশসহ সে সময়ের বড় বড় কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তার বয়সিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তার পরিণত ভাবনায়। ভাবনাগত দিকে সুকান্ত তার বয়স থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন।

মৃত্যু[উৎস সম্পাদনা]

একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ছিলেন কমুনিষ্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচারটুকু তিনি করলেন তাতে তাঁর শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলিকাতার ১১৯ লাউডট ট্রিষ্ট্রের রেড এড কিওর হোমে মৃত্যুবরণ করেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন মাত্র মাত্র ২১ বছরের আর লেখালেখি করেন মাত্র ৬/৭ বছর। সামান্য এই সময়ে নিজেকে মানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাঁর রচনা পরিসরের দিক থেকে স্বল্প অথচ তা ব্যাপ্তির দিক থেকে সুদূরপ্রসারী।

সংশ্লিস্ট স্থান[উৎস সম্পাদনা]

  • বাংলাদেশের ফরিদপুরের কোঠালিপাড়ায় সুকান্তের পৈতৃক বাড়ি।
  • বেলেঘাটার '৩৪ হরমোহন ঘোষ লেন এর বাড়ি'।

গ্রণ্থ তালিকা[উৎস সম্পাদনা]

. ছাড়পত্র

. আগামী

. রবীন্দ্রনাথের প্রতি

. চারাগাছ

. খবর

. ইউরোপের উদ্দেশ্যে

. প্রস্তুত

. প্রার্থী

. একটি মোরগের কাহিনী

. সিঁড়ি

. কলম

. দুরাশা মৃত্যু

. আগ্নেয়গিরি

. ঠিকানা

. লেনিন

. অনুভব

. কাশ্মীর

. সিগারেট

. দেশলাই কাঠি

. বিরতি

. চিল

. চট্টগ্রামঃ ১৯৪৩

. মধ্যবিত্ত’৪২

. সেপ্টেম্বর’৪৬

. ঐতিহাসিক

. শত্রু এক

. মজুরদের ঝড়(ল্যাংস্টন হিউজ)

. ডাক

. বোধন

. রানার

. মৃত্যুজয়ী গান

. কনভয়

. ফসলের ডাকঃ১৩৫১

. কৃষকের গান

. এই নবান্নে

. আঠারো বছর বয়স

. হে মহাজীবন

. শুরুতেই

. বিক্ষোভ

. পয়লা মে-র কবিতাঃ১৯৪৬

. পরিখা

. সব্যসাচী

. উদ্বীক্ষণ

. বিদ্রোহের গান

. অনন্যেপায়

. অভিবাদন

. জনতার মুখে ফোটে বিদ্যুৎবাণী

. কবিতার খসড়া

. আমরা এসেছি

. একুশে নভেম্বরঃ১৯৪৬

. দিন বদলের পালা

. মুক্ত বীরদের প্রতি

. প্রিয়তমাসু

. ছুরি

. সূচনা

. অদ্বৈত

. মণিপুর

. দিকপ্রান্তে

. চিরদিনের

. নিভৃত(অনিশ্চিত পৃথিবীতে অরণ্যের ফুল)

. বৈশম্পায়ন

. নিভৃত(বিষন্ন রাত প্রসন্ন দিন আনো)

. কবে

. অলক্ষ্যে

. মহাত্মাজীর প্রতি

. পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে

. পরিশিষ্ট

. মীমাংসা

. অবৈধ

. ১৯৪১ সাল

. রোমঃ১৯৪৩

. জনরব

. রৌদ্রের গান

. দেওয়ালী

. পূর্বাভাস

. হে পৃথিবী

. সহসা

. স্মারক

. নিবৃত্তির পূর্বে

. স্বপ্নপথ

. সুতরাং

. বুদ্বুদমাত্র

. আলো অন্ধকার

. প্রতিদ্বন্দ্বী

. আমার মৃত্যুর পর

. স্বতঃসিদ্ধ

. মুহূর্ত (ক)

. মুহূর্ত (খ)

. তরঙ্গ ভঙ্গ

. আসন্ন আঁধারে

. পরিবেশন

. অসহ্য দিন

. উদ্যোগ

. পরাভব

. বিভীষণের প্রতি

. ঘুম ভাঙার গান

. হদিশ

. দেয়ালিকা

. প্রথমবার্ষিকী

. তারুণ্য

. মৃত পৃথিবী

. দূর্মর

. অভিযান(১৩৫০ সাল)

. সূর্যপ্রনাম(১৩৪৮ সাল)

. বইয়ের শেষে সচিত্র মঞ্চ নির্দেশনা।

. অতি কিশোরের ছড়া

. এক যে ছিল

. ভেজাল

. গোপন খবর

. জ্ঞানী

. মেয়েদের পদবী

. বিয়েবাড়ির মজা

. রেশনকার্ড

. খাদ্য-সমস্যার সমাধান

. পুরানো ধাঁধা

. ব্ল্যাক-মার্কেট

. পৃথিবীর দিকে তাকাও

. সিপাহী বিদ্রোহ

. আজব লড়াই

  • হরতাল (১৩৬৯ ব. )

. হরতাল

. লেজের কাহিনী(সোভিয়েট শিশুসাহিত্যিক ডি বিয়াঙ্কির ‘টেইলস’ গল্পের অনুবাদ)

. ষাঁড়-গাধা ছাগলের কথা

. দেবতাদের ভয়(ব্যাঙ্গার্থক নাটিকা)

. রাখাল ছেলে

  • গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫ ইং)

.বেশ কয়েকটি গানের সংকলন।

  • আকাল (১৯৪৪ ইং)

তথ্যসূত্র[উৎস সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[উৎস সম্পাদনা]