লিয়ার লেভিন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

লিয়ার লেভিন একজন মাকির্ন চলচ্চিত্র পরিচালক ও আলোকচিত্র শিল্পী এবং মার্কিন টিভি সাংবাদিক। তিনি ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন। তখন তিনি ঘূর্ণি-উপদ্রুত মানুষকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন যা দুর্গতদের সাহায্যে তহবিল সংগ্রহে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। । এরপর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের বার্তায় ব্যথিত হয়ে পুনরায় বাংলাদেশে আসেন। মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী লাখ লাখ শরণার্থীর দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে তিনি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। লিয়ার লেভিন প্রায় ছয় সপ্তাহ পশ্চিম বাংলায় থেকে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধফ্রন্টের ছবি তোলেন। পরে ২২ ঘণ্টার ফুটেজ নিয়ে তিনি ‘জয় বাংলা’ নামে ৭২ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। কিন্তু কোনো স্পন্সর না পাওয়ায় ছবিটি পরিত্যক্ত হয়। দুই দশকের বেশি সময়ের পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ লিয়ার লেভিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর তোলা ফুটেজগুলো সংগ্রহ করেন। তাঁরা লিয়ার লেভিনের ফুটেজকে নবরূপায়ণ দেন ‘মুক্তির গান’ ছবিতে। লেভিনের এই প্রয়াসে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের তাৎপর্যপূর্ণ দিক দালিলিকভাবে ফুটে ওঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ ধারণ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ সম্পর্কে ভয়েস অফ আমেরিকা-র এক সাক্ষাৎকারে লিয়ার লেভিন বলেন- "১৯৭০ সালের সাইক্লোনকে কেন্দ্র করে আমি যে তথ্যচিত্রটি তৈরি করি, তার মাধ্যমে ঘুর্ণিঝড়ে দুর্গত লোকজনের সাহায্যের জন্যে চাঁদা তোলা হয়। আমার স্ত্রীও এতে যুক্ত ছিলেন।"

১৯৭১ এ তিনি একটি ছবি তৈরির পরিকল্পনা করেন, উদ্দেশ্য ছিল যারা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের বর্বরতার শিকার হয়েছে , তাদের সাহায্য করা। বিশেষত শরণার্থীদের সাহায্যে অর্থ সংগ্রহ করা। তিনি তখন তার কোম্পানি বন্ধ করে কিছু অর্থ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। লিয়ার লেভিন প্রায় ছয় সপ্তাহ পশ্চিম বাংলায় থেকে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধফ্রন্টের ছবি তোলেন।

বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা নামক একটি দল তখন সারাদেশ ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন । লেভিন জুড়ে যান এদের সাথে। তাদের সঙ্গে ট্রাকে করে ঘুরে বেড়ান। তখন পরিকল্পনা ছিল , তাদের গানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্প এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগে তখনকার পুর্ব পাকিস্তানের অবস্থার কথা শোনানো হবে। এর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সহিংসতার কথাও বলা হবে। এভাবে তিনি প্রায় ২২ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন ।পরে সেই ফুটেজ নিয়ে তিনি জয় বাংলা নামে ৭২ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। কিন্তু আর্থিক সহায়তার অভাবে তা আর মুক্তির আলো দেখেনি।

মুক্তির গান চলচ্চিত্র[সম্পাদনা]

চিত্র:'মুক্তির গান' চলচিত্রের একটি দৃশ্য.jpg
'মুক্তির গান' চলচিত্রের একটি দৃশ্য

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময়ের পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ লিয়ার লেভিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর তোলা ফুটেজগুলো সংগ্রহ করেন। যেগুলো পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছবি নির্মাণে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করে।

তারেক মাসুদের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে লিয়ার লেভিন বলছেন, "মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা এর প্রধান ছিলেন মাহমুদুর রহমান বেণু। যিনি ঐ সময়ে আমার ধারণ করা চিত্রের মূল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আবার তারেক মাসুদের চাচাতো ভাই। তাঁর এবং অন্যান্যদের মাধ্যমেই তারেক তাকে নিউ ইয়র্কে খুজে বের করেন এবং ঐ ফুটেজগুলো চান।"

১৬ মি মি এ তোলা এই ছবিটি বস্তুত সুপার সিক্সিটিন পর্যায়ের এবং এর প্রাযৌক্তিক মান ছিল ব্যতিক্রম ধর্মী। তাই এর মান রক্ষা করা এবং ছবিটি যে লিয়ার লেভিনই তুলেছেন সেটা নিশ্চিত করতে তারেক মাসুদকে তিনি বিশেষভাবে বলেন। তবে এর বিনিময়ে তিনি কিছুই চাননি।

লেভিনের বানানো ৭২ মিনিটের 'জয় বাংলা' মুক্তির মুখ না দেখলেও তারেক মাসুদের হাতে সম্পাদিত হয়ে তা মুক্তির গান শিরোনামে আত্মপ্রকাশ করে ।

তারেক মাসুদ চলচিত্র যাত্রা নামক নিবন্ধ সংকলনে লিয়ার লেভিন-আমাদের মুক্তির সারথি শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন - "শুধু লিয়ার লেভিনের ফুটেজ নয়, মুক্তির গান এর জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা ,ইংল্যান্ড , ফ্রান্স , ভারত সহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর ফুটেজ সংগ্রহ করেছি । তবে সেগুলো দেখে মনে হয়েছে , লিয়ারের কাজের সামনে লাখো ঘণ্টার ফুটেজও কিছুনা। তাঁর ফুটেজ ও সহযোগিতায় ' 'মুক্তির গান' এর অস্থিমজ্জা দাঁড়িয়েছে।"

সম্মাননা[সম্পাদনা]

২০১৩ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের এই মহান বন্ধুকে ঢাকায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মাননা প্রদান করেন।