রাসায়নিক সাম্যাবস্থা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

রাসায়নিক সাম্যাবস্থা হল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার এমন একটি পরিস্থিতি যাতে বিক্রিয়ক ও উৎপাদের পরিমাণের মাত্রা অপরিবর্তিত থাকে। [১] সাধারণত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন সম্মুখ বিক্রিয়ার গতিবেগ, পশ্চাৎ বিক্রিয়ার গতিবেগের সমান থাকে। এ অবস্থায় সম্মুখ ও বিপরীত বিক্রিয়ার হার শুন্য না হলেও অর্থাৎ বিক্রিয়া বন্ধ না থাকলেও বিক্রিয়ক ও উৎপাদ একই পরিমাণে তৈরি হওয়ার জন্য এদের স্থির বলে মনে হয়। এ প্রক্রিয়াটিকে গতিশীল সাম্যাবস্থা বা ডিনামিক ইকুইলিব্রিয়াম বলে কেননা এ সময় প্রকৃতঅর্থে বিক্রিয়া সংগঠিত হতে থাকে।[২]

রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে যখন বিক্রিয়কসমূহ একসাথে মিশিয়ে কোন পাত্রে রাখা হয় (এবং প্রয়োজনে উত্তাপ দেয়া হয়), তখন সবটুকু বিক্রিয়ক উৎপাদে পরিণত হয় না। কিছু সময় পর (যে সময়ের পরিমাণ সেকেণ্ডের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ হতে পারে অথবা মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বেশি হতে পারে) তারা এমন একটি বিন্দুতে এসে পৌছাবে যখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বিক্রিয়ক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ উৎপাদের সাথে সহাবস্থান করবে, যার আর নড়চড় হবে না। এই অবস্থাকেই বলা হয় রাসায়নিক সাম্যাবস্থা।

সূচনা[সম্পাদনা]

রাসায়নিক সাম্যাব্স্থার ধারণার বিকাশ ঘটে যখন বারথোলেট (১৮০৩) দেখান যে রাসায়নিক বিক্রিয়াসমূহ উভয় দিক থেকে সুগম্য। যে কোন বিক্রিয়া যেমন:

বিক্রিয়াটিকে সাম্যাবস্থায় পৌছাতে হলে সম্মুখ ও বিপরীত বিক্রিয়ার হার সমান হতে হবে। এই রাসায়নিক সমীকরণে দ্বিমুখী তীর চিহ্ন সাম্যাবস্থা নির্দেশ করে, এ ও বি হল বিক্রিয়ক, এস ও টি উৎপাদ এবং α, β, στ stoichiometric সূচক। সাম্যাবস্থার অবস্থান ডানদিকে দূরবর্তী ধরা হয় যদি প্রায় সকল বিক্রিয়ক উৎপাদে পরিণত হয় এবং বামদিকে দূরবর্তী ধরা যায় খুব অল্প পরিমাণ বিক্রিয়ক উৎপাদ হয়।

গুল্ডবার্গ এবং ভাগে (১৮৬৫), বারথোলেটের ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ভরক্রিয়া সূত্র নীতির প্রস্তাব করেন।। তা হল:

যেখানে A, B, S ও T হল সক্রিয় ভর, অর্থাৎ প্রতি লিটার দ্রবণে পদার্থটির যত মোল দ্রবীভূত থাকে তা এবং k+ ও k হল হার ধ্রুবকসমূহ. যেহেতু সম্মুখ ও পশ্চাৎবর্তী হার সমান:

এবং হার ধ্রুবকের অনুপাও সমান, যা সাম্য ধ্রুবক বা বিক্রিয়ার সাম্যাংক হিসেবে পরিচিত.

ধারণা মতে, উৎপাদসমূহ লব গঠন করে। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ভরক্রিয়ার সূত্র কেবল একধাপ বিক্রিয়ার জন্য প্রযোজ্য এবং সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয় কেননা হার সমীকরণগুলো সাধারণত stoichiometry অনুসরণ করে না। সম্মুখ ও বিপরীত দিকের অনুপাতের সাম্যতা এর একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ, যদিও এটিই সাম্যাবস্থা ঘটার কারণ ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়।

এই ডিরাইভেশনের ব্যর্থতা ব্যতীত, বিক্রিয়ার সাম্য ধ্রুবক একটি ধ্রুবকই বটে যা বিভিন্ন বিক্রিয়ক উপাদানের কার্যাবলী থেকে স্বাধীন, অবশ্য এটি তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল যা ভাণ্ট হফ ইকুয়েশন এ পরিলক্ষিত হয়। বিক্রিয়ায় প্রভাবক যুক্ত করলে তা সম্মুখ ও বিপরীত বিক্রিয়াকে সমানভাবে প্রভাবিত করে ফলে সাম্য ধ্রুবকে এর কোন প্রভাব দেখা যায় না। প্রভাবক দুটি বিক্রিয়াকেই গতি দান করবে এবং এর ফলে সাম্যাবস্থায় পৌছার গতিকে ত্বরান্বিত করবে। যদিও দৃষ্টিগোচর সাম্যাবস্থা কনসেনট্রেশন ধ্রুবক থাকে, তারপরও বিক্রিয়াসমূহ মলিকিউলেও সংগঠিত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরুপ, ইথানোয়িক এসিড পানিতে মিশ্রিত করে ইথানয়েট এবং [[হাইড্রোনিয়াম আয়ন তৈরির ক্ষেত্রে:

CH3CO2H + H2O CH3CO2 + H3O+

একটি প্রোটন ইথানোয়িক এসিডের অণু থেকে লাফিয়ে পানির মলিকিউলে চলে যেতে পারে এবং তা থেকে ইথানোয়িক আয়নে চলে গিয়ে আরেকটি ইথানোয়িক এসিডের অণু তৈরি করতে পারে এবং ইথানোয়িক এসিডের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখতে পারে। এটি গতিশীল সাম্যাবস্থার আরেকটি উদাহরণ। সাম্যাবস্থাসমূহ, অন্যান্য থার্মোডিনামিক্সের মত, পরিসাংখিক ঘটনা, যা মাইক্রোস্কোপিক আচরণের গড়।

লা শাতেলীয়ে নীতি একটি প্রয়োজনীয় নীতিমালা যা সাম্যাবস্থার উপর বিক্রিয়ার নিয়ামক পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করে। যদি একটি গতিশীল সাম্যাবস্থাকে তার নিয়ামক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রভাবিত করা হয়, তবে সাম্যাবস্থার অবস্থান এমনভাবে বদলে যাবে যাতে নিয়ামক পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমিত হয়। যেমন: অতিরিক্ত S যোগ করলে তা বেশি পরিমাণ উৎপাদ তৈরি করবে এবং সিস্টেমটি তখন বিপরীতমুখী বিক্রিয়ার হার ত্বরান্বিত করে সাম্যাবস্থাকে পিছন দিকে ঠেলে দেবে (যদিও সাম্য ধ্রুবকের মান অপরিবর্তিত থাকবে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Atkins, Peter; De Paula, Julio (২০০৬)। Atkins' Physical Chemistry (8th সংস্করণ)। W. H. Freeman। পৃ: 200–202। আইএসবিএন 0-7167-8759-8 
  2. International Union of Pure and Applied Chemistry. "chemical equilibrium". Compendium of Chemical Terminology Internet edition.