লা শাতেলিয়ার নীতি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

লা শাতেলিয়ার নীতি (ইংরেজি : Le Chatelier's Principle), যা সাম্য নীতি বলেও পরিচিত, রাসায়নিক সাম্যাবস্থার কোনো নিয়ামকের পরিবর্তন ঘটালে বিক্রিয়ার পরিণতি কী হবে, তা নির্দেশক একটি নীতি। নীতিটিকে হেনরি লুই লা শাতেলিয়ার নামক একজন ফরাসি রসায়নবিদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও কার্ল ব্রাউন নামক একজন পদার্থবিদও স্বতন্ত্রভাবে এরকম একটি নীতি বর্ণনা করেছিলেন।

লা শাতেলিয়ার নীতিটি অনেকটা এরকম-

কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া রাসায়নিক সাম্যাবস্থায় থাকাকালীন যদি বিক্রিয়ার তাপ, চাপ বা ঘনমাত্রার পরিবর্তন করা হয়, তবে সাম্যের অবস্থান এমনভাবে পরিবর্তিত হবে যেন তাপ, চাপ বা ঘনমাত্রার পরিবর্তনের ফলাফল প্রশমিত হয়।

অর্থাৎ কথাটি এমনভাবে বলা যায় যে, সাম্যাবস্থার পরিবর্তন হলে কোনো রাসায়নিক উভমূখী বিক্রিয়া তার অবস্থা এমনভাবে পরিবর্তন করবে, যাতে এর পরিবর্তনের ফলাফ্ল প্রশমিত হয় অর্থাৎ বিক্রিয়াটি পুর্বের মতো সাম্যাবস্তায় ফিরে যাবে।

রসায়নশাস্ত্রে এ নীতিটি খুব গুরূত্বপুর্ণভাবে ব্যাবহৃত হয়। অনিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রন, লস বা ক্ষতি কমানো ইত্যাদি এ নীতির সাহায্যে করা যায়।

লা শাতেলিয়ার নীতির মূলনীতি[সম্পাদনা]

সাধারণত উভমূখী বিক্রিয়াগুলোর ক্ষেত্রে যে বিক্রিয়ায় বিক্রিয়কগুলো বিক্রিয়া করে উৎপাদে পরিণত হয়, সে বিক্রিয়াকে বলে সমুখবর্তী বিক্রিয়া আর যে বিক্রিয়ায় উৎপাদগুলো বিক্রিয়া করে ফের বিক্রিয়কে পরিণত হয়, সে বিক্রিয়াকে বলে পশ্চাৎমূখী বিক্রিয়া। সাধারণত বিক্রিয়ার শুরুতে সমুখবর্তী বিক্রিয়ার হার বেশি থাকে, কিন্তু সময় এগুলে এ বিক্রিয়ার হার কমতে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে, বিক্রিয়ার শুরুতে পশ্চাৎমূখি বিক্রিয়ার হার কম থাকে, কিন্তু সময় যতই পার হয় এ পশ্চাৎমূখি বিক্রিয়ার হার ততঅই বাড়তে থাকে।

বিক্রিয়া চলাকালীন যে সময় সাম্যাবস্থা শুরু হয়, তখন যে পরিমান সমুখবর্তী বিক্রিয়া ঘটে, ঠিক সে পরিমাণ পশ্চাৎমূখি বিক্রিয়া ঘটে অর্থাৎ যে পরিমাণ বিক্রিয়ক উৎপাদে পরিণত হয়, ঠিক সে পরিমাণ উৎপাদ বিক্রিয়কে পরিণত হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার এ সময় মনে হয় যে কোনো বিক্রিয়া সংঘঠিত হচ্ছে না অর্থাৎ মনে হবে বিক্রিয়া থেমে গেছে। কিন্তু বাস্তবে বিক্রিয়া তখনো চলমান থাকে। এ রাসায়নিক সাম্যাবস্থার সময় বিক্রিয়ার নিয়ামক তাপ, চাপ, ঘনমাত্রা ইত্যাদি যদি পরিবর্তন করে দেয়া হয়, তখন দেখা যাবে বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়। অর্থাৎ হয় বিক্রিয়ক উৎপাদন বেড়ে যায়, নাহয় উৎপাদ উৎপাদন বেড়ে যায়। এ সময় লা শাতেলিয়ার নীতিটি কাজ করে। এটি বলে যে, বিক্রিয়ার নিয়ামক পরিবর্তন করা হলে বিক্রিয়াটি নিজেকে এমনভাবে পরিবর্তন করে নেয়, যাতে বিক্রিয়াটি আবার পুর্বাবস্থায় ফিরে যায় অর্থাৎ সাম্য লাভ করে। এটিই লা শাতেলিয়ার মূলনীতি।

লা শাতেলিয়ার নীতির প্রয়োগ[সম্পাদনা]

সাম্যাবস্থার উপর তাপের প্রভাব[সম্পাদনা]

একটি উভমূখি বিক্রিয়া বিবেচনা করা যাক-

দেখা যাচ্ছে, বিক্রিয়াটির সম্মুখমূখি অংশটি তাপ উৎপাদী অর্থাৎ যখন বিক্রিয়াটিতে নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন গ্যাস বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়া উৎপাদন করে, তখন ৯২ কিলোজুল তাপ উৎপন্ন হয়। আবার, যখন অ্যামোনিয়া ভাঙে অর্থাৎ পশ্চাৎমূখি অংশটি সম্পন্ন হয়, তখন অ্যামোনিয়া কর্তৃক ৯২ কিলোজুল তাপ শোষিত হয় অর্থাৎ পশ্চাৎমূখি অংশটি সম্পন্ন হতে ৯২ কিলোজুল তাপ লাগে। এখন, বিক্রিয়াটি ঘটার সময় তাপ প্রদান করা হলে উৎপন্ন তাপের পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবে অ্যাামোনিয়া কিছু তাপ পাবে। তাই অধিক পরিমাণে অ্যাামোনিয়া ভাঙতে শুরু করবে ও একটা সময় দেখা যাবে বিক্রিয়া পাত্রে আর কোনো অ্যামোনিয়া অবশিষ্ট থাকবে না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, সাম্যাবস্থা বাম দিকে সরে গেছে অর্থাৎ পশ্চাৎমূখি বিক্রিয়া সম্মূখমূখি বিক্রিয়ার চেয়ে বেশি হচ্ছে। আবার, যদি বিক্রিয়াপাত্র থেকে তাপ সরিয়ে নেয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে অ্যামোনিয়া নিজেকে ভাঙার জন্য পর্যাপ্ত তাপ পাচ্ছে না। কিন্তু সম্মুখমূখী বিক্রিয়া চলতে থাকবে এবং দেখা যাবে অধিক পরিমাণে অ্যামোনিয়া উৎপন্ন হবে। অর্থাৎ পুর্বের ঘটনা থেকে বলা যায়, সাম্য ডানদিকে সরে গেছে অর্থাৎ সমূখমূখী বিক্রিয়া পশ্চাৎমূখী বিক্রিয়ার চেয়ে বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ বলা যায়, তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে অধিক উৎপাদ পেতে তাপমাত্রা কমাতে হবে। উল্লেখ, উপরে উল্লেখিত বিক্রিয়াটিকে হেবার বস বিক্রিয়া বা সংক্ষেপে হেবার বিক্রিয়া বলে, যার জন্য অত্যানুকুল তাপমাত্রা ৪৫০-৫৫০° সে. ও চাপ ১৫০-২০০ atm. এ বিক্রিয়ার প্রভাবক Fe. অর্থাৎ বিক্রিয়াটিকে এভাবেও লেখা যায়-

পার্স করতে ব্যর্থ (সিনট্যাক্স ত্রুটি): {\displaystyle \ce{ N2 + 3H2 <=>[{Fe}][{450-550&nbsp;°C, 150-200 atm}] 2NH3 }}

আরেকটি বিক্রিয়ার কথা ধরা যাক -

দেখা যাচ্ছে, বিক্রিয়াটি ঘটাতে ১৮০ কিলোজুল তাপ লাগে অর্থাৎ এটি একটি তাপশোষী বিক্রিয়া। এখন বিক্রিয়ায় তাপ দেয়া হলে স্বাভাবিকভাবে সম্বিমুখমূখী ক্রিয়া বেড়ে যাবে অর্থাৎ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন মিলে নাইট্রোজেন মনো অক্সাইড তৈরি হবে। আর যদি তাপ শোষন করা হয় অর্থাৎ যথাযথ পরিমাণ তাপ না দেয়া হয়, তাহলে সম্মুখমূখী বিক্রিয়া থেমে যাবে কিন্তু পশ্চাৎমূখী বিক্রিয়া বেড়ে যাবে। অর্থাৎ বলা যায়, তাপশোষী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে অধিক উৎপাদ পেতে তাপ বাড়াতে হবে।

সাম্যাবস্থার উপর চাপের প্রভাব[সম্পাদনা]

সাম্যাবস্থার উপর চাপের প্রভাব জানার আগে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, চাপীয় প্রভাব ঘঠাতে চাইলে বিক্রিকক এবং উৎপাদের যেকোনো একটি মৌল বা যৌগকে তরল বা গ্যাসীয় হতে হবে। এটা একটা সাধারণ বিষয়, কেননা এটা বুঝাই যায় যে কঠিন পদার্থের উপর চাপের তেমন একটা প্রভাব নেই অর্থাৎ কঠিন পদার্থকে চাপ দেয়া হোক বা না দেক, এটি কঠিন-ই থেকে যায়। সাম্যাবস্থায় বিক্রিয়কের মোট মোল সংখ্যা ও উৎপাদের মোট মোল সংখ্যা যদি ভিন্ন হয়, তাহলেই কেবল বিক্রিয়ায় চাপের প্রভাব থাকবে। অর্থাৎ বিক্রিয়ক ও উতপাদের মোল সংখ্যা আভিন্ন হলে বিক্রিয়াটিতে চাপের কোনো প্রভাব থাকবে না।

আবার ওই হেবার বস বিক্রিয়াতে আসা যাক। সুবিধার্থে বিক্রিয়াটি আবার লিখে দিচ্ছি-

এখন, বিক্রিয়াটি সাম্যাবস্থায় চাপ প্রয়োগ করলে লা শাতেলিয়ার নীতির আলোকে বিক্রিয়াটির সাম্যাবস্থার এমন পরিবর্তন হবে যাতে চাপের পরিবর্তনের ফলাফল প্রশমিত হয়। যখন বিক্রিয়ার সকল পদার্থ একই আয়তনের বিক্রিয়াপাত্রে থাকে, তখন যে গ্যাস বা তরলের মোল সংখ্যা বেশি তার চাপ বেশি হয় আর মোল সংখ্যা কম হলে চাপ কম হয়। ব্যাপারটা সহজ, মনে কর তোমার কাছে ২৫০ ml এর দুটি পাত্র আছে। এখন তুমি যদি এর একটিতে ৫০০ ml গ্যাস রাখ আর আরেকটিতে ১০০ ml গ্যাস রাখ, তাহলে দেখা যাবে যে পাত্রে ৫০০ ml গ্যাস রাখা ছিল, সে পাত্রে রক্ষিত গ্যাস পাত্রের দেয়ালে বেশি চাপ প্রয়োগ করবে আর যদি পাত্রটি নরম হয়, তাহলে দেখা যাবে পাত্রটি ফেটে গেছে! এখন, উপরের বিক্রিয়াটিতে দেখা যায়, বিক্রিয়কের মোট মোল সংখ্যা ১+৩ = ৪ আর উৎপাদের মোল সংখ্যা ২। এখন যদি চাপ বৃধি করা হয়, তাহলে দেখা যাবে বিক্রিয়াটি তার চাপ বৃদ্ধিজনিত ফলাফল প্রশমিত করার জন্য বিক্রিয়াটির গ্যাসীয় উপাদান বেশি মোল বা বেশি চাপ অংশ থেকে কম মোল বা কম চাপের অংশের দিকে যেতে থাকবে। অর্থাৎ বিক্রিয়ার সম্মুখমূখী অংশটি বৃদ্ধি পেয়ে অ্যামোনিয়া বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি করবে। অন্যভাবে বলা যাচ্ছে, সাম্য কম মোলের দিকে সরে যাবে।

এখন যদি চাপ কমিয়ে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে লা শাতেলিয়ার নীতি অনুযায়ী চাপ হ্রাসজনিত ফলাফল প্রশমিত করার জন্য (কিংবা বলা যায় চাপ বাড়ানোর জন্য) সাম্য বেশি মোল থেকে কম মোলের দিকে সরে যাবে অর্থাৎ পশ্চাৎমূখী বিক্রিয়া বেড়ে যাবে।

এ বিক্রিয়ায়, বিক্রিয়কের মোল সংখ্যা ২, উৎপাদের ও ২। তাই বিক্রিয়াটিতে চাপের কোনো প্রভাব থাকবে না।

সাম্যাবস্থার উপর ঘনমাত্রার প্রভাব[সম্পাদনা]

সকল বিক্রিয়ায় সাম্যাবস্থার উপর ঘনমাত্রার প্রভাব আছে। ঘনমাত্রা মানে হচ্ছে মোলারিটি অর্থাৎ নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থিত পদার্থের মোল সংখ্যা, এককথায় পদার্থের পরিমাণ। যদি সাম্যাবস্থায় থাকাকালীন বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা কমানো হয় অর্থাৎ বিক্রিয়ক থেকে পদার্থ কমানো হয়, তাহলে লা শাতেলিয়ার নীতি অনুযায়ী ঘনমাত্রার পরিবর্তনের ফলাফল কমানোর জন্য উৎপাদের পরিমান বাড়াতে হবে অর্থাৎ সাম্য ডান দিকে সরে যাবে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

[১]

  1. [www.https://drive.google.com/file/d/1mmrqJcr5UC2FI8o0wz86EEwcoT5e9niU/view]

[১]

  1. লা শাতেলিয়ার নীতি। ঞ্জাতীয় শিক্ষাচ্রম ও পাঠ্যপস্তক বোর্ড। ২০১৮। পৃষ্ঠা ১৬২ থেকে ১৬৫।  Authors list-এ |প্রথমাংশ1= এর |শেষাংশ1= নেই (সাহায্য)