বিষয়বস্তুতে চলুন

রকিব হাসান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রকিব হাসান
জন্মআবুল কাশেম মোহাম্মদ আবদুর রকিব
(১৯৫০-১২-১২)১২ ডিসেম্বর ১৯৫০
কুমিল্লা, বাংলাদেশ
মৃত্যু১৫ অক্টোবর ২০২৫(2025-10-15) (বয়স ৭৪)
পেশালেখক, অনুবাদক
জাতীয়তাবাংলাদেশি
নাগরিকত্ব বাংলাদেশ
উল্লেখযোগ্য রচনাতিন গোয়েন্দা

আবুল কাশেম মোহাম্মদ আবদুর রকিব (১২ ডিসেম্বর ১৯৫০ – ১৫ অক্টোবর ২০২৫), যিনি রকিব হাসান হিসেবেই পরিচিত[][] ছিলেন একজন বাংলাদেশী গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা, যে সিরিজটি শুরুতে লেখক রবার্ট আর্থার এর থ্রি ইনভেস্টিগেটরস অবলম্বনে রচিত হয়েছে। তার লেখা এই কিশোর সিরিজটি প্রথম আলো পত্রিকার জরিপে বাংলাদেশের কিশোরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঠযোগ্য সিরিজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।[] মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামে সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখেছিলেন। এছাড়াও আবু সাঈদ ছদ্মনামটিও ব্যবহার করেছেন গোয়েন্দা রাজু সিরিজটি লেখার সময়।[] এছাড়া জুল ভার্নের বইগুলো অনুবাদ করেন শামসুদ্দীন নওয়াব ছদ্মনামে।[]

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

[সম্পাদনা]

রকিব হাসানের জন্ম কুমিল্লাতে, ১৯৫০ সালে। তার সার্টিফিকেট নাম ছিল “আবুল কাশেম মোহাম্মদ আবদুর রকিব”। একাধিক নামের কারণ তিনি তার বাবার একমাত্র ছেলে আর তার বাবা এক ছেলের মধ্যে অন্যদের নামের ছোঁয়া রাখতে চেয়েছিলেন। এই বড় নামের পরে হাসান বলেও ডাকতেন তার বাবা।[]

পিতার চাকরিগত বদলির কারণে শৈশব–কৈশোর কেটেছে ফেনীতে। তার পিতা সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন এবং বাড়িতে সব সময় সংবাদপত্র, পত্রিকা ও বই ঘুরত। এর প্রভাবেই খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে। সেখান থেকেই স্কুলজীবন শেষ করে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন।[] বিএসসি পাস করেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে।[]

ছোটবেলা থেকেই বই–পড়া ও ছাপার অক্ষরের প্রতি তার গভীর আসক্তি ছিল; পাঠাগার আর পুরোনো বইয়ের দোকান ঘুরে ঘুরে নানান বাংলা–ইংরেজি বই পড়তেন। তার সার্টিফিকেট–নাম “আবুল কাশেম মোহাম্মদ আবদুর রকিব”; পরে সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী প্রচ্ছদে “রকিব হাসান” নামটি স্থির করেন। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বহুপাঠে মগ্ন ছিলেন—শরৎচন্দ্র, নীহাররঞ্জন, স্বপনকুমার থেকে জিম করবেট, কেনেথ অ্যান্ডারসন ইত্যাদির অনুবাদ ও আসল রচনাও পড়তেন।[] ফেনী শহরে সে সময় বই সংগ্রহ করা কঠিন ছিল, কিন্তু তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক, যিনি বিদ্যালয়ের পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করেছিলেন নানা বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে। সেই পাঠাগারে নিয়মিত যেতেন রকিব। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, স্বপনকুমার, দেবেন্দ্র ভট্টাচার্য, দস্যু বাহরাম, দস্যু মোহন—এই ধারার গল্পগুলো তাঁর কল্পনাশক্তিকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। একইসঙ্গে তিনি জিম করবেট ও কেনেথ অ্যান্ডারসনের শিকার কাহিনি, আর্থার কোনান ডয়েল, এডগার রাইস বারোজ, রবার্ট লুই স্টিভেনসন প্রমুখের অভিযাত্রিক ও রহস্যধর্মী রচনায় মুগ্ধ হন।

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

পড়াশোনা শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রথাগত চাকরি করলেও নিয়মিত অফিস–শৃঙ্খলায় নিজেকে মানাতে পারেননি; বহু চাকরি বদলে অবশেষে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৭০–এর দশকের শেষভাগে সেবা প্রকাশনীতে যোগসূত্র তৈরি হয়। শেখ আবদুল হাকিমের মাধ্যমে কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং প্রথমে প্লট–সরবরাহ ও অনুবাদ দিয়ে পথচলা শুরু হয়। পরে তিনি রহস্য পত্রিকা পুনরায় চালুর প্রস্তাব দেন ও দীর্ঘদিন সম্পাদকীয় সহযাত্রী থাকেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন। তবে কাঠামোটি পেশাদার পর্যায়ে পৌঁছতেই স্বেচ্ছায় সরে আসেন বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন। জনপ্রিয় লেখক অবস্থা থেকেই তিনি নিউজপ্রিন্ট–পেপারব্যাক ছেড়ে হোয়াইট–প্রিন্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।[]

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

১৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ঢাকার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ডায়ালাইসিস চলাকালীন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।[][][]

লেখালেখি

[সম্পাদনা]

রকিব হাসান-এর লেখা প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে, ছদ্মনামে। স্বনামে প্রথম প্রকাশিত বইটি ছিল অনুবাদগ্ৰস্থ, “ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা”। এরপর অনুবাদ করেছেন এরিক ফন দানিকেন, ফার্লে মোয়াট, জেরাল্ড ডুরেল-এর মত বিখ্যাত লেখকদের অনেক ক্লাসিক বই। অনুবাদ করেছেন মহাক্লাসিক অ্যারাবিয়ান নাইটসএডগার রাইস বারোজ এর টারজান সিরিজ। বড়দের উপযোগী তার লেখা কিছু রহস্য উপন্যাসও খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে ছোটদের জন্য লেখা তিন গোয়েন্দা সিরিজটি। এই রবিনকে নিয়ে লিখেছেন আরও দুটাে সিরিজ ‘তিন বন্ধু’ ও ‘গোয়েন্দা কিশোর মুসা রবিন’। লিখেছেন ‘কিশোর গোয়েন্দা’ সিরিজ, ‘খুদে গোয়েন্দা’ সিরিজ, জাফর চৌধুরী ছদ্মনামে ‘রোমহর্ষক’ সিরিজ এবং আবু সাঈদ ছদ্মনামে ‘গোয়েন্দা রাজু’ সিরিজ। রকিব হাসানের রোমহর্ষক সিরিজে রেজা ও সুজা দুই ভাইয়ের এডভেঞ্চার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এই সিরিজটি থেকে তিন গোয়েন্দায় অনেকগুলো গল্প ভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া কিশোরদের জন্য বেশ কিছু ভূতের বই ও সাইন্স ফিকশনও লিখেছেন তিনি।

রকিব হাসান কেবল তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা রকিব হাসান মারা গেছেন"কিশোর আলো। ১৫ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৫
  2. "তিন গোয়েন্দার লেখক রকিব হাসানের দুটি কিডনিই নষ্ট"কালের কণ্ঠ। ১ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৫
  3. "লিখেছি অনেক, এত জনপ্রিয় হবো ভাবিনি: রকিব হাসান"দ্য ডেইলি স্টার। ১০ জুলাই ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৫
  4. "RAKIB HASSAN BIOGRAPHY"। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ নভেম্বর ২০১৭
  5. 1 2 3 4 5 "আমার কাজটাই হলো যেটা তুঙ্গে ওঠে, সেটা ছেড়ে দেওয়া— রকিব হাসান"কিশোর আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৫
  6. "রকিব হাসান -Deshebideshe"www.deshebideshe.com। সংগ্রহের তারিখ ৩১ আগস্ট ২০২০[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  7. "চলে গেলেন তিন গোয়েন্দাখ্যাত রকিব হাসান"দৈনিক প্রথম আলো। ১৫ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  8. "'তিন গোয়েন্দা' খ্যাত রকিব হাসান আর নেই"দ্য ডেইলি স্টার। ১৫ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  9. "বিদায় তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা রকিব হাসান"দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ১৫ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০২৫