ম্যান্টিস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

Mantodea
সময়গত পরিসীমা: ১৪৫–০কোটি ক্রিটেশিয়াস–বর্তমান
Praying mantis india.jpg
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: Animalia
পর্ব: Arthropoda
শ্রেণী: Insecta
মহাবর্গ: Dictyoptera
বর্গ: Mantodea
Burmeister, 1838
গোত্রসমূহ

নিবন্ধে দেখুন

প্রতিশব্দ
  • Manteodea Burmeister, 1829
  • Mantearia
  • Mantoptera

ম্যান্টিসেস হচ্ছে পতঙ্গের একটি বর্গ (ম্যান্টোডিয়া) যা ১৩ টি গোত্রের ২,৪০০ টির বেশী প্রজাতি ধারন করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ গোত্র হচ্ছে ম্যান্টিডী ("ম্যান্টিডস")। ম্যান্টিসরা নাতিশীতোষ্ণ এবং গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে বসবাস করে। এদের ত্রিকোণাকার মাথা এবং গোলাকার পুঞ্জাক্ষী বিদ্যমান। এদের দীর্ঘায়িত দেহে ডানা থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। লিন্তু সকল ম্যান্টোডির বৃহৎ অগ্রপদ রয়েছে যা তাদের শিকার ধরতে সাহায্য করে। তাদের ন্যায়পরায়ণ অঙ্গবিন্যাস, অগ্রপদ ভাঁজ থাকায় এদের নাম দেওয়া হয়েছে প্রেয়িং ম্যান্টিস

ম্যান্টিসের জ্ঞাতি প্রজাতি হচ্ছে উইপোকা এবং তেলাপোকা, যারা সুপারঅর্ডার ডিক্টপ্টেরায় অবস্থান করে। ম্যান্টিসরা মাঝে মাঝে লাঠি পোকাদের নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যায়, অন্যান্য লম্বা পতঙ্গ অথবা অন্যান্য অপরিচিত পতঙ্গ। ম্যান্টিসরা প্রধানত আক্রমনকারী শিকারী, কিন্তু অনেক সময় মাটিতে শিকারে বের হওয়া ম্যান্টিস দেখা যায় যা সংখ্যায় অনেক কম। এদের আয়ুষ্কাল এক বছর। ঠান্ডা আবহাওয়াতে এরা ডিম পাড়ে, পরে মারা যায়। এদের ডিম শক্ত আবরণে সুরক্ষিত থাকে এবং বসন্তকালে ডিম ফুটে। স্ত্রীজাতীয় ম্যান্টিসরা অনেক সময় স্বজাতিভক্ষন করে এবং পুরুষ ম্যান্টিসদের খেয়ে ফেলে। প্রাচীনকালে মনে করা হতো ম্যন্টিসদের অতিপ্রাকৃত শক্তি রয়েছে। বিশেষ করে প্রাচীন গ্রীস এবং প্রাচীন মিশরের মানুষ তা মনে করত। ম্যান্টিসরা পতঙ্গদের মধ্যে একমাত্র প্রজাতি যা পোষাপ্রানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

শ্রেনিবিন্যাসবিদ্যা এবং বিবর্তন[সম্পাদনা]

ম্যান্টিস ২৪০০ প্রজাতির উপরে রয়েছে বলে মনে করা হয়। এদের প্রধানত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে পাওয়া যায়, কিন্তু কিছু কিছু প্রজাতি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলেও পাওয়া যায়। ম্যান্টিসদের শ্রেনিবিন্যাসকরন নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। ম্যন্টিওস এবং লাঠি পোকা, আরশোলার সাথে এক সময় আর্থ্রোপোডা পর্বের অধীনে ছিল। ক্রিস্টেনসেন (১৯৯১) আরশোলা এবং টারমাইটদের ডিক্টপ্টেরা পর্বের ম্যান্টোডিয়া উপপর্বের অন্তর্ভুক্ত করেন। ম্যান্টোডিয়া শব্দটি প্রাচীন গ্রীক শব্দ μάντις (ম্যান্টিস) অর্থঃ দৈবজ্ঞ, এবং εἶδος (ইডোস) অর্থঃ ধরণ। এটি ১৮৩৮ সালে জার্মান পতঙ্গবিদ হারম্যান বার্মিস্টার উদ্ভাবন করেন। এই বর্গকে প্রধানত ম্যান্টিস বলা হয়। ম্যান্টিড নামটি প্রধানত ম্যান্টিডি গোত্রের প্রজাতিদের বোঝায়, যা ঐতিহাসিকভাবে এই বর্গের একমাত্র গোত্র। এদের অন্য নাম প্রেয়িং ম্যান্টিস, যা উক্ত বর্গের যেকোনো প্রজাতিকে বোঝানো হয়।

গোত্র[সম্পাদনা]

দ্যা ম্যান্টোডি স্পিসিজ ফাইল । এদের গোত্রের তালিকাঃ

  • Acanthopidae: Neotropical
  • Acontistidae: Neotropical
  • Amorphoscelididae: Africa, Arabia, India through to New Guinea (PNG), Australia and Oceania
  • Angelidae: Central America, India, Indo-China, Borneo
  • Chaeteessidae: Neotropical
  • Coptopterygidae: Neotropical
  • Empusidae: North Africa
  • Epaphroditidae: Caribbean
  • Eremiaphilidae: Egypt, Middle-East, temperate Asia
  • Galinthiadidae: Sub-Saharan Africa
  • Hymenopodidae: Africa, India, China, Indo-China, Borneo, PNG (now includes the Sibyllidae)
  • Iridopterygidae: Madagascar, tropical Asia
  • Liturgusidae: Neotropical, India through to Australia
  • Mantidae: Worldwide
  • Mantoididae: Neotropical
  • Metallyticidae: South-East Asia
  • Photinaidae: Neotropical
  • Stenophyllidae: Neotropical
  • Tarachodidae: Africa, Madagascar & Indian Ocean Is., India
  • Thespidae: Neotropical, India, Indo-China through to PNG
  • Toxoderidae: Africa and Asia

জীববিজ্ঞান[সম্পাদনা]

শারীরতত্ত্ব[সম্পাদনা]

ম্যান্টিসদের অনেক লম্বা, ত্রিকোণাকার মাথা রয়েছে এবং চঞ্চুর মতো মুখ এবং ম্যান্ডিবল রয়েছে। এদের দুটি গোলাকার পুঞ্জাক্ষি, তিনটি সাধারণ চোখ এবং একজোড়া অ্যান্টেনা রয়েছে। এদের গ্রীবা অঞ্চল অনেকটা নমনীয়। ম্যান্টিসদের কিছু প্রজাতি তাদের গ্রীবা ১৮০ ডিগ্রী পর্যন্ত ঘুরাতে সক্ষম। ম্যান্টিস এর বক্ষ তিন অংশে বিভক্ত; যেমনঃ প্রোথোরাক্স, মেসোথোরাক্স এবং মেটাথোরাক্স। ম্যান্টিসের অগ্রপদ এবং মাথা প্রোথোরাক্স অংশে অবস্থান করে, যা অন্য দুটি থোরাসিক অংশ হতে বড়। প্রোথোরাক্স অংশ অনেকটা নমনীয় যা সামনের অংশগুলোকে সহজেই নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। ম্যান্টিসদের দুটি সূচালো, সুদৃঢ় অগ্রপদ রয়েছে যা তাদের শিকার ধরতে এবং কোনোকিছু ধরে রাখতে সাহায্য করে। ম্যান্টিসদের কক্সা এবং ট্রক্যান্টার একত্রে সমন্বিত হয়ে ফিমার গঠন করে, যা সুদৃঢ় অংশের ধারালো এবং সূচালো অংশ।

ম্যান্টিসদের স্বাধীনভাবে শ্রেনীকরণ করা যায় এবং তা হল, ম্যাক্রোপ্টেরাস (লম্বা ডানা), ব্রাকিপ্টেরাস (খাটো ডানা), মাইক্রোপ্টেরাস (অকেজো ডানা)। ম্যান্টিসদের সাধারণত ডানা বিদ্যমান, এদের দুই জোড়া ডানা থাকেঃ বহিঃডানা, এগুলো সরু থাকে। বিশেষকরে ছদ্মবেশ ধারণে এই ডানাগুলো সাহায্য করে। পুরুষ ম্যান্টিসের উদর স্ত্রী ম্যান্টিসের চেয়ে পাতলা হয়।

দর্শন[সম্পাদনা]

ম্যান্টিসরা স্টেরিও দৃষ্টি সম্পন্ন। এরা তাদের শিকারের অবস্থান স্টেরিও দৃষ্টির মাধ্যমে বুঝতে পারে। এদের পুঞ্জাক্ষি প্রায় ১০০০০ অমাটিডিয়া দিয়ে গঠিত। সামনের দিকে একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল নাম ফোভিয়া; যা পুঞ্জাক্ষির অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভালো দেখতে সাহায্য করে। পেরিফেরাল ওমাটিডিয়া উপলব্ধি করার মতো চলন সম্পন্ন। যখন কোনো চলনরত বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় তখন এদের মাথা সর্বদা সচল থাকে যেন বস্তু ফোভিয়ার দৃষ্টি অঞ্চলের মধ্যে আসে। বস্তুর পরবর্তী অবস্থান শনাক্ত করা হয় ফোভিয়ার মাধ্যমেই। ম্যান্টিসের পুঞ্জাক্ষি অনেক প্রশস্ত এবং আনুভুমিকভাবে অবস্থিত; যা একটি দূরবীক্ষন দৃষ্টি ক্ষেত্র এবং কাছের বস্তুর জন্য স্টেরিও দৃষ্টি সম্পন্ন। ম্যান্টিসের পুঞ্জাক্ষি ঘুরানোর সময় যে কালো বিন্দু দেখা যায় তাকে সিউডোপিউপিল বলা হয়।

যেহেতু ম্যান্টিসদের শিকার তাদের দৃষ্টির উপর নির্ভরশীল,প্রাথমিকভাবে এরা আহ্নিক। অনেক প্রজাতি, যা রাতে উড়ে বেড়ায়, আর কোনো কৃত্রিম আলোয় আকৃষ্ট হতে পারে। অনেক ম্যান্টিসের দেহে একটি অডিটরি থোরাসিক অঙ্গ থাকে যা তাদেরকে বাদুরের থেকে রক্ষা করে। এই অঙ্গের ফলে ম্যান্টিসের উপর বাদুরের শব্দের প্রতিফলন তার কাছে পৌঁছায় না।

খাদ্য এবং শিকার[সম্পাদনা]

ম্যান্টিস হচ্ছে আর্থ্রোপোডা পর্বের প্রানীদের মধ্যে সাধারণ শিকারি। ম্যান্টিসদের বেশীরভাগই আক্রমনকারী শিকারী যারা বেঁচে থাকে শুধু যখন তাদের কাছাকাছি শিকার আসে। শিকার কাছে আসলে হয় তারা ছদ্মবেশ ধারন করে নয়তো অচলাবস্থা হইয়ে থাকে যেন শিকার বুঝতে না পারে। বড় ম্যান্টিসরা মাঝে মাঝে তাদের প্রজাতির ছোট ম্যান্টিসদের খেয়ে ফেলে। এছাড়াও অন্যান্য ছোট ভার্টিব্রাটা প্রানী যেমনঃ গিরগিটি, ছোট ব্যাঙ, ছোট মাছ এবং পাখি। বেশিরভাগ ম্যান্টিস শিকার কাছে এলে আক্রমন করে, অথবা যখন খুব বেশী ক্ষুদার্ত থাকে তখন শিকার খুজার জন্য চলাফেরা করে। যখন শিকার কাছাকাছি আসে, তখন ম্যান্টিস তার সামনের পা দুটিকে খুব দ্রুত এগিয়ে নেয় এবং শিকারকে ধরে ফেলে।

চীনা ম্যান্টিস অন্যান্য সাধারন ম্যান্টিস থেকে বেশীদিন বাঁচে এবং তাড়াতাড়ি বড় হয় ।

যৌন নৃশংসতা[সম্পাদনা]

কস্বজাতিভক্ষন ম্যান্টিসদের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয়। এটি পতঙ্গদের মধ্যে সংখ্যা বৃদ্ধি হয়ে গ্লেলে দেখা দেয়, যার ফলাফল স্ত্রী জাতীয় ম্যান্টিস পুরুষ ম্যান্টিসকে খেয়ে ফেলে। প্রায় ৯০% ম্যান্টিসদের মধ্যে যৌন নৃশংসতা দেখা যায়। পুরুষ ম্যান্টিসদের থেকে স্ত্রী ম্যান্টিসদের সংখ্যা বেশী থাকে কারন পুরুষ ম্যান্টিসরা সাধারনত বিশেষ কারনে ক্ষুদ্র অন্য পুরুষ ম্যান্টিস ভক্ষন করে। আর স্বজাতিভক্ষন প্রক্রিয়ার ফলে উক্ত বিষয়ে সাম্যাবস্থা থাকে। প্রায় ৮৩% পুরুষ ম্যান্টিস স্বজাতিভক্ষন থেকে পালিয়ে আসে স্ত্রী ম্যান্টিসের সাথে এক লড়াই হওয়ার পর।

স্ত্রী ম্যান্টিস পুরুষ ম্যান্টিসের মাথা খাওয়ার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু করে এবং যদি মিলন শুরু হয়, তাহলে পুরুষ ম্যান্টিস শুক্রানু ত্যাগে আরো সবল হয়ে উঠে। পুর্বে গবেষকরা মনে করতেন উদরীয় অঞ্চলে একটি গ্যাংগ্লিয়ন থাকায় কপুলেটরি মোভমেন্ট হয়, যা মাথার কারনে নয়, পুরুষ ম্যান্টিসের মাথা সরানোর ফলে স্ত্রী ম্যান্টিস জননক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

ম্যান্টিসের যৌন নৃশংসতা প্রক্রিয়ায় বিতর্ক থাকার কারন; গবেষনায় দেখা গেছে স্ত্রী ম্যান্টিসদের মধ্যে যারা কম খাদ্যগ্রহন করে তাদের মধ্যে এই প্রক্রিয়া দেখা যায়।

মানুষের সাথে সম্পর্ক[সম্পাদনা]

সাহিত্য এবং শিল্প[সম্পাদনা]

সবচেয়ে প্রাচীন ম্যান্টিস উল্লেখ করা হয়েছিল চীনা অভিধানে, যার মাধ্যমে সাহিত্যে এর উপস্থিতি বোঝা যায়, যেখানে এটি সাহস এবং নির্ভয় প্রদর্শন করে। ১১০৮ সালে একটি লেখা ম্যান্টিসের প্রজনন, জীবনকাল, শারীরতত্ত্ব এবং এন্টিনার কার্যক্রম উল্লেখ করে। যদিও প্রাচীন গ্রীসে ম্যান্টিসদের কম উল্লেখ করা হয়েছে।

১৮ শতকে পশ্চিমা ব্যাখ্যায় ম্যান্টিসের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা ভালোভাবে বুঝা যায়। রোজেল ভন রোসেনহফ ম্যান্টিস সম্পর্কে অনেক ব্যাখ্যাদান করেছেন তার Insekten-Belustigungen(Insect Entertainments) বইয়ে।

এল্ডাস হাক্সলে তার island (১৯৬২) উপন্যাসে ম্যান্টিসের মৃত্যু নিয়ে একটি দার্শনিক মতবাদ দেন। প্রকৃতিবিদ জেরাল্ড ডারেল তার বই My Family and Other Animals এ চার পৃষ্ঠার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যেখানে ম্যান্টিস আর গিরগিটির লড়াই উল্লেখ করা হয়েছে।

এম সি ইশার এর Dream এ  একটি মানব আকৃতি ম্যান্টিস এক ঘুমন্ত বিশপের উপর দাঁড়িয়ে  রয়েছে। ১৯৫৭ সালের চলচ্চিত্র A Deadly Mantis -এ একটি ম্যান্টিস দেখা যায় যা একটি দানব।

মার্শাল আর্টস[সম্পাদনা]

চীনে দুই ধরনের আলাদা মার্শাল আর্ট নিয়ম রয়েছে যা ম্যান্টিস এর উপর ভিত্তি করে।এদের মধ্যে একটি আর্ট উত্তর চীন দেশে উদ্ভাবন হয়েছিল, অন্যটি চীনের দক্ষিনাঞ্চলে উদ্ভাবিত। উভয় কৌশল বর্তমানে 'নর্দার্ন প্রেয়িং ম্যান্টিস এবং 'সাউদার্ন প্রেয়িং ম্যান্টিস' নামে পরিচিত। উভয় কৌশল চীনে খুব বেশী জনপ্রিয়।

পুরাশাস্ত্র এবং ধর্ম[সম্পাদনা]

পোষাপ্রানী হিসেবে[সম্পাদনা]

পতঙ্গনাশক হিসেবে[সম্পাদনা]

ম্যান্টিসের মতো রোবট[সম্পাদনা]

ম্যান্টিসের অগ্রপদ থেকে অনুপ্রানিত হয়ে একটি প্রোটোটাইপ রোবট তৈরি করা হয় যা রোবটটিকে হাটতে, কোনো কিছু ধরতে, উপরে উঠতে সাহায্য করে। একটি ঘুর্ননক্ষম সংযুক্তির কারনে রোবটের পায়ে এক নৈপুন্য পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে অনেক কাটাযুক্ত পা তৈরি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে যা কব্জাকে শক্তিশালী করবে এবং ভারী জিনিস তুলতে সাহায্য করবে।