মুখপোড়া হনুমান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মুখপোড়া হনুমান[১]
Trachypithecus pileatus.JPG
Lawachara forest, Bangladesh
সংরক্ষণ অবস্থা
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণী: Mammalia
বর্গ: Primates
পরিবার: Cercopithecidae
গণ: Trachypithecus
প্রজাতি: T. pileatus
দ্বিপদী নাম
Trachypithecus pileatus
(Blyth, 1843)
Capped Langur area.png
Capped Langur range

মুখপোড়া হনুমান বা লালচে হনুমান (ইংরেজি: Capped langur, Capped Monkey, Capped leafed monkey, Bonneted Langur) বানর প্রজাতির একটি স্তন্যপায়ী প্রানী। মূলত গাছের পাতা খেয়ে জীবনধারণ করে বলে এদের পাতা বানরও বলা হয়।[৩] এরা Cercopithecidae পরিবারের অর্ন্তভুক্ত এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Trachypithecus pileatusবাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, চীন, ভারত এবং মায়ানমারে এদের দেখতে পাওয়া যায়। এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হচ্ছে ক্রান্তিয় ও নিরক্ষীয় শুষ্ক বনভূমি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, শিল্পায়ন ও কৃষিক্ষেত্রের সম্প্রসারণের দরুণ বনভূমি পরিমাণ হ্রাসের কারণে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।[৪] বর্তমানে পুরো বিশ্বে এরা বিপন্ন বলে বিবেচিত।[৩]

বাংলাদেশের ১৯৭৪[৪] ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।[৫]

দেহের বর্ণনা[সম্পাদনা]

পুরুষ মুখপোড়া হনুমানের দেহ ৬৮-৭০ সেন্টিমিটার, লেজ ৯৪-১০৪ সেন্টিমিটার এবং স্ত্রীর দেহ ৫৯-৬৭ সেন্টিমিটার, লেজ ৭৮-৯০ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ ১১ দশমিক ৫ থেকে ১৪ এবং স্ত্রী ৯ দশমিক ৫ থেকে ১১ দশমিক ৫ কেজি। দেহের চামড়া কালচে। পিঠ ও দেহের ওপরের লোম গাঢ় ধূসর-বাদামি এবং বুক-পেট ও দেহের নিচ লালচে, লালচে-বাদামি বা সোনালি। লোমবিহীন মুখমণ্ডল, কান, হাত ও পায়ের পাতা কুচকুচে কালো। মাথার চূড়া ও লেজের আগাও কালো।[৩]

স্বভাব-প্রকৃতি ও খাদ্যাভ্যাস[সম্পাদনা]

মুখপোড়া হনুমান হচ্ছে বৃক্ষচারী প্রাণি। চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, ঘুম, খেলাধুলা, বিশ্রাম, প্রজনন—সবকিছু গাছেই সম্পন্ন করে। শক্তপোক্ত একটি পুরুষের নেতৃত্বে দলের সব স্ত্রী, যুবক ও বাচ্চারা থাকে। এরা শান্তিপ্রিয়। দলবদ্ধ এই প্রাণীদের একেকটি দলে সচরাচর ২ থেকে ১৪টি প্রাণী থাকে। এরা মূলত পাতাভোজী। গাছের কচি পাতা, বোঁটা, কুঁড়ি ও ফুল খায়। তবে বট, চালতা, আমড়া, আমলকী, হরিতকী, বহেড়া ইত্যাদি ফলও বেশ পছন্দ।[৩] শীতকালে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এরা দিনের ৪০ ভাগ সময় পাতা, ফুল ও ফল খাওয়াতে ব্যয় করে। মুখপোড়া হনুমানের খাদ্যের ৬০% হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের পাতা এবং এরা প্রায় ৪৩ টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের পাতা খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে।[৬] এরা বিভিন্ন উদ্ভিদের পরাগায়ন ও বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। গাছের গর্ত ও পাতায় জমে থাকা পানি দিয়ে জলপান ও গোসল করে। সকাল-বিকেল-সন্ধ্যায় বেশি সক্রিয়। দুপুরে বিশ্রাম নেয়। এরা খেলাধুলা ও লাফালাফি করতে অনেক পছন্দ করে। বাচ্চা বুকে নিয়ে মা সহজেই এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে পড়ে। এরা অনেকটা কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের মতো করে ভুক ভুক শব্দ করে। অন্য কাউকে ভয় দেখাতে মুখে ভেংচি কাটে।[৩]

প্রজনন[সম্পাদনা]

জানুয়ারি-এপ্রিল এদের প্রজননকাল। স্ত্রী হনুমান ১৮০-২২০ দিন গর্ভধারণের পর একটি, কদাচিৎ দুটি বাচ্চার জন্ম দেয়। গড়ে প্রতি দুই বছরে একবার বাচ্চা হয়। বাচ্চারা এক বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করে। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে এরা ১৫-২০ বছর বাঁচে।[৩]

বাংলাদেশে মুখপোড়া হনুমান[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে যে তিন প্রজাতির হনুমান পাওয়া যায় তার মধ্যে মুখপোড়া হনুমানের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। টাঙ্গাইলের পাতাঝরা বন এবং সিলেটচট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে এদের দেখা যায়। তবে বন-জঙ্গল ধ্বংসের কারণে দিনে দিনে প্রাণিটি আশংকাজনকহারে হারে কমে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে এরা বিপন্ন বলে বিবেচিত।[৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Groves, C. (২০০৫)। Wilson, D. E., & Reeder, D. M., সম্পাদক। Mammal Species of the World (3rd সংস্করণ)। Johns Hopkins University Press। পৃ: 177। ISBN 0-801-88221-4 
  2. Das, J., Molur, S. & Bleisch, W. (2008). Trachypithecus pileatus. 2008 IUCN Red List of Threatened Species. IUCN 2008. Retrieved on 2008-12-15.
  3. ৩.০ ৩.১ ৩.২ ৩.৩ ৩.৪ ৩.৫ ৩.৬ বিপন্ন মুখপোড়া হনুমান - প্রথম আলো (০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)
  4. ৪.০ ৪.১ জিয়া উদ্দিন আহমেদ (সম্পা.), বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ: স্তন্যপায়ী, খণ্ড: ২৭ (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৯), পৃ. ২৭-২৮।
  5. বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, জুলাই ১০, ২০১২, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা-১১৮৪৯১
  6. Solanki GS, Kumar A, Sharma BK (২০০৮)। "Winter food selection and diet composition of capped langur (Trachypithecus pileatus) in Arunachal Pradesh, India"। Tropical Ecology 49 (2): 157–166।