বিষমদৃষ্টি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বিষমদৃষ্টি
Astigmatism text blur.png
বিভিন্ন দূরত্বে ঝাপসা দৃষ্টি
বিশেষত্বচক্ষুচিকিৎসাবিজ্ঞান, দৃষ্টিমিতি
লক্ষণসকল দূরত্বে বিকৃত বা ঝাপসা দৃষ্টি, মাথাব্যথা, চোখে চাপ বা টান অনুভব,[১]
জটিলতাঅ্যামব্লিয়োপিয়া[২]
কারণঅস্পষ্ট[৩]
রোগনির্ণয়ের পদ্ধতিচক্ষু পরীক্ষা[১]
চিকিৎসাচশমা, কন্ট্যাক্ট লেন্স, শল্যচিকিৎসা[১]
সংঘটনের হার৩০% থেকে ৬০% প্রাপ্তবয়স্ক (ইউরোপ, এশিয়া)[৪]

বিষমদৃষ্টি (ইংরেজি: Astigmatism) বা অ্যাস্টিগম্যাটিজম হলো একধরনের দৃষ্টিত্রুটি যেখানে কর্নিয়া বা লেন্সের বক্রতায় গড়মিল থাকে, যার ফলে যে-কোনো দূরত্বে বিকৃত বা ঝাপসা দৃষ্টি হয়।[১] অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে চোখে টান অনুভব, মাথাব্যথা ও রাতে গাড়ি চালাতে সমস্যা হওয়া।[১] বিষমদৃষ্টি প্রায়শই জন্ম থেকে থাকে এবং পরবর্তীতে পরিবর্তন হতে পারে বা নতুন করেও হতে পারে।[৫] যদি এটি অল্পবয়সে হয় এবং চিকিৎসা না করা হয় তাহলে অ্যামব্লিয়োপিয়া হতে পারে।[২]

বিষমদৃষ্টির সঠিক কারণ এখনও অস্পষ্ট; তবে জেনেটিক বিষয়াবলির সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।[৩][৪] কর্নিয়ার অনিয়মিত বক্রতা অথবা চোখের লেন্সের কোনো সমস্যা থেকে এর সৃষ্টি হতে পারে।[১][৩] চক্ষু পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় সম্ভব।[১]

তিন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে: চশমা, কন্ট্যাক্ট লেন্স ও শল্যচিকিৎসা।[১] সবচেয়ে সহজ উপায় হলো চশমা ব্যবহার করা।[১] কন্ট্যাক্ট লেন্স প্রশস্ততর দৃষ্টিক্ষেত্র প্রদান করে।[১] প্রতিসরণমূলক শল্যচিকিৎসা স্থায়ীভাবে চোখের আকৃতি পরিবর্তন করে দেয়।[১]

ইউরোপ ও এশিয়াতে ৩০% থেকে ৬০% প্রাপ্তবয়স্ক লোক বিষমদৃষ্টিতে আক্রান্ত।[৪] সকল বয়সের লোক বিষমদৃষ্টিতে আক্রান্ত হতে পারে।[১] ১৮০১ সালে থমাস ইয়াং প্রথমবারের মতো বিষমদৃষ্টির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।[৩][৬]

লক্ষণসমূহ[সম্পাদনা]

যদিও বিষমদৃষ্টি লক্ষণ বিহীন হতে পারে, তবে উচ্চমাত্রার বিষমদৃষ্টিতে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে যেমন, ঝাপসা দৃষ্টি, দ্বিদৃষ্টি, তির্যক দৃষ্টি, চোখে টান অনুভব বা ক্লান্তি ও মাথাব্যথা।[৭] কিছু গবেষণায় বিষমদৃষ্টি ও মাইগ্রেন মাথাব্যথার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।[৮]

কারণ[সম্পাদনা]

বিষমদৃষ্টির প্রকৃত কারণটি স্পষ্ট নয়, তবে বংশীয় সংশ্লিষ্টতা আছে বলে মনে করা হয়।[৩] চোখে আঘাত বা চোখের অস্ত্রোপচারের কারণেও হতে পারে। একটি বিরল রোগ কেরাটোকোনাস থেকে বিষমদৃষ্টি হতে পারে যেখানে অচ্ছোদপটল বা কর্নিয়া পাতলা ও মোচাকৃতির হয়ে যায়।

নিদানতত্ত্ব[সম্পাদনা]

চিত্রের মাধ্যমে বিষমদৃষ্টির ব্যাখ্যা।

স্বাভাবিক অবস্থায় চোখের লেন্স ও কর্নিয়াতে একটি মসৃণ বলের পৃষ্ঠতলের মতো গোলাকার বক্রতা থাকে যার ফলে কর্নিয়া ও লেন্সে আগত আলোকরশ্মি সমানভাবে প্রতিসরিত হয়ে অক্ষিপটে পতিত হয় এবং স্পষ্ট বিম্ব তৈরি হয়। যদি কর্নিয়া বা লেন্সের যে-কোনো একটি ভিন্ন বক্রতাসহ ডিম্বাকৃতির হয় তাহলে আলোকরশ্মিগুচ্ছ একইভাবে প্রতিসরিত হয় না ফলে ঝাপসা অথবা দ্বিদৃষ্টি হতে পারে। অল্প আলোয় পড়লে বা টেলিভিশনের খুব কাছে বসলে বিষমদৃষ্টি হয় না।[৯]

চিকিৎসা[সম্পাদনা]

বিষমদৃষ্টি চশমা, কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার ও রিফ্র‍্যাক্টিভ সার্জারি করে ভালো করা যায়।[১০] চশমা সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ, তবে কন্ট্যাক্ট বা স্পর্শ লেন্সের একটি সুবিধা হলো এটি চোখের সাথে সাথে ঘুরে এবং প্রশস্ততর দৃষ্টিক্ষেত্র প্রদান করে।[১১] শল্যচিকিৎসা করলে স্থায়ীভাবে চশমা বা লেন্স ব্যবহারের দরকার পড়ে না, তবে অন্যান্য শল্যচিকিৎসার মতো জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে।

রোগতত্ত্ব[সম্পাদনা]

মার্কিন গবেষণা অনুসারে, পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সি প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে প্রায় তিনজন (২৮.৪%) বিষমদৃষ্টিতে ভুগছে।[১২] ২০০৫ সালে প্রকাশিত ব্রাজিলের একটি গবেষণায় দেখা যায় একটি শহরের ৩৪% ছাত্র বিষমদৃষ্টিসম্পন্ন।[১৩] সম্প্রতি বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায় ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতি ৩ জনে ১ জনের (৩২.৪%) বিষমদৃষ্টি রয়েছে।[১৪]

২০০৫ সালে প্রকাশিত পোল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেখা যায় উইদ-দ্যা-রুল অ্যাস্টিগম্যাটিজম মায়োপিয়া বা নিকটদৃষ্টি করতে পারে।[১৫] বেশকিছু গবেষণায় দেখা যায় বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বিষমদৃষ্টির হার বাড়ে।[১৬]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৯৩ সালে ছাত্র থাকা অবস্থায় থমাস ইয়াং আবিষ্কার করেছিলেন যে তার এক চোখে সমস্যা আছে।[১৭] পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি তার দৃষ্টির সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেন।[১৮] ১৮০১ সালে তিনি বেকারিয়ান লেকচার প্রদানের সময় তার গবেষণা লব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করেন।[১৯] ইয়াং ছাড়াও জর্জ বিডেল এয়ারি নামে আরেক বিজ্ঞানী আলাদাভাবে তার নিজের চোখে বিষমদৃষ্টির বিষয়টি আবিষ্কার করেন।[২০] এয়ারি ১৮২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্যামব্রিজ ফিলোসোফিক্যাল সোসাইটিতে নিজের চোখের উপর তার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন।[২১][২২] এয়ারি ১৮২৫ সালের মধ্যে তার চোখের দৃষ্টিত্রুটি দূর করার জন্য লেন্স উৎপাদন করেন।[২০][২৩] অন্যান্য উৎসে ১৮২৭ সালের কথা বলা হয়েছে[২৪] যখন এয়ারি ইপ্সউইচের একজন অপটিশিয়ানের কাছ থেকে সিলিন্ডার আকৃতির লেন্স পেয়েছিলেন।[২৫] এর নামকরণ করেছিলেন উইলিয়াম হিউয়েল[২৬][২৭][২৮] ১৮৬০ সালের মধ্যে চক্ষুবিজ্ঞানে বিষমদৃষ্টি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা হিসেবে পরিচিত হয়।[২৯] এবং বইয়ের অধ্যায়ে বিষমদৃষ্টি আবিষ্কারের কথাও বর্ণনা করা ছিল।[৩০][৩১]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Facts About Astigmatism"। National Eye Institute। অক্টোবর ২০১০। Archived from the original on ২ অক্টোবর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ২২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  2. Harvey, EM (জুন ২০০৯)। "Development and treatment of astigmatism-related amblyopia."Optometry and Vision Science86 (6): 634–9। ডিওআই:10.1097/opx.0b013e3181a6165fপিএমআইডি 19430327পিএমসি 2706277অবাধে প্রবেশযোগ্য 
  3. Read, SA; Collins, MJ; Carney, LG (জানুয়ারি ২০০৭)। "A review of astigmatism and its possible genesis."। Clinical & Experimental Optometry90 (1): 5–19। এসটুসিআইডি 8876207ডিওআই:10.1111/j.1444-0938.2007.00112.xঅবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 17177660 
  4. Mozayan, E; Lee, JK (জুলাই ২০১৪)। "Update on astigmatism management."। Current Opinion in Ophthalmology25 (4): 286–90। এসটুসিআইডি 40929023ডিওআই:10.1097/icu.0000000000000068পিএমআইডি 24837578 
  5. "The Ultimate Guide to Astigmatism"। Feel Good Contacts। 
  6. "Thomas Young | British physician and physicist"Encyclopædia Britannica (ইংরেজি ভাষায়)। ২৯ আগস্ট ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ আগস্ট ২০১৭ 
  7. "Astigmatism"MedicineNet। OnHealth.com। ২ জুলাই ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ 
  8. Harle, Deacon E.; Evans, Bruce J. W. (২০০৬)। "The Correlation Between Migraine Headache and Refractive Errors"। Optometry and Vision Science83 (2): 82–7। এসটুসিআইডি 32019102ডিওআই:10.1097/01.opx.0000200680.95968.3eপিএমআইডি 16501409 
  9. Kierstan Boyd। "What is Astigmatism?"aao.org (English ভাষায়)। American Academy of Ophthalmology। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জানুয়ারি ২০২২ 
  10. "Facts About Astigmatism"National Eye Institute। National Institutes of Health। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০১৯ 
  11. Hall, John E.। "The Eye: I. Optics of vision"। Guyton And Hall textbook of Medical Physiology (13 সংস্করণ)। Elsevier। পৃষ্ঠা 613। আইএসবিএন 978-1-4557-7016-8 
  12. Kleinstein, R. N.; Jones, LA; Hullett, S; ও অন্যান্য (২০০৩)। "Refractive Error and Ethnicity in Children"। Archives of Ophthalmology121 (8): 1141–7। ডিওআই:10.1001/archopht.121.8.1141অবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 12912692 
  13. Garcia, Carlos Alexandre de Amorim; Oréfice, Fernando; Nobre, Gabrielle Fernandes Dutra; Souza, Dilene de Brito; Rocha, Marta Liliane Ramalho; Vianna, Raul Navarro Garrido (২০০৫)। "Prevalence of refractive errors in students in Northeastern Brazil"। Arquivos Brasileiros de Oftalmologia68 (3): 321–5। ডিওআই:10.1590/S0004-27492005000300009অবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 16059562 
  14. Bourne, R; Dineen, BP; Ali, SM; Noorul Huq, DM; Johnson, GJ (২০০৪)। "Prevalence of refractive error in Bangladeshi adults*1Results of the National Blindness and Low Vision Survey of Bangladesh"Ophthalmology111 (6): 1150–60। ডিওআই:10.1016/j.ophtha.2003.09.046পিএমআইডি 15177965 
  15. Czepita, D; Filipiak, D (২০০৫)। "The effect of the type of astigmatism on the incidence of myopia"। Klinika Oczna107 (1–3): 73–4। পিএমআইডি 16052807 
  16. Asano, Kazuko; Nomura, Hideki; Iwano, Makiko; Ando, Fujiko; Niino, Naoakira; Shimokata, Hiroshi; Miyake, Yozo (২০০৫)। "Relationship Between Astigmatism and Aging in Middle-aged and Elderly Japanese"। Japanese Journal of Ophthalmology49 (2): 127–33। এসটুসিআইডি 20925765ডিওআই:10.1007/s10384-004-0152-1পিএমআইডি 15838729 
  17. Coggin, David (১৮৯৩)। "Notes on the Centennial Anniversary of the Discovery of Astigmatism"Boston Med Surg J128 (6): 136–137। ডিওআই:10.1056/NEJM189302091280603 
  18. Atchison, David A; Charman, W Neil (২০১১)। "Thomas Young's contributions to geometrical optics" (PDF)Clinical and Experimental Optometry94 (4): 333–340। ডিওআই:10.1111/j.1444-0938.2010.00560.xঅবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 21214628 
  19. Thomas Young (১৮০১)। "II. The Bakerian Lecture. On the mechanism of the eye"Philosophical Transactions of the Royal Society of London91: 23–88। ডিওআই:10.1098/rstl.1801.0004অবাধে প্রবেশযোগ্যবিবকোড:1801RSPT...91...23Y 
  20. Levene, J. R. (১৯৬৬)। "Sir George Biddell Airy, F.R.S. (1801-1892) and the Discovery and Correction of Astigmatism"। Notes and Records of the Royal Society of London21 (2): 180–199। এসটুসিআইডি 72385672জেস্টোর 531067ডিওআই:10.1098/rsnr.1966.0017 
  21. Wang, Ming (২২ অক্টোবর ২০০৭)। Irregular Astigmatism: Diagnosis and Treatmentআইএসবিএন 9781556428395 
  22. George Biddell Airy (১৮২৭)। "On a peculiar Defect in the Eye, and a mode of correcting it"Transactions of the Cambridge Philosophical Society 
  23. Read, Scott A; Collins, Michael J; Carney, Leo G (২০০৭)। "A review of astigmatism and its possible genesis"। Clinical and Experimental Optometry90 (1): 5–19। এসটুসিআইডি 8876207ডিওআই:10.1111/j.1444-0938.2007.00112.xঅবাধে প্রবেশযোগ্যপিএমআইডি 17177660 
  24. Porter, Jason (২০০৬)। Adaptive optics for vision science: principles, practices, design, and applicationsআইএসবিএন 9780471679417 
  25. Wood, Alexander; Oldham, Frank (১৯৫৪)। Thomas Young Natural Philosopher 1773–1829 
  26. Donders, Franciscus Cornelis (১৮৬৬)। Die Anomalien der Refraction und Accommodation des Auges। Braumüller। পৃষ্ঠা 381 
  27. Wang, Ming (২২ অক্টোবর ২০০৭)। Irregular Astigmatism: Diagnosis and Treatmentআইএসবিএন 9781556428395। ২৯ জুন ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  28. Snyder, C. (১৯৬৫)। "The Rev. Mr. Goodrich and His Visual Problem"। Archives of Ophthalmology73 (4): 587–589। ডিওআই:10.1001/archopht.1965.00970030589023পিএমআইডি 14270148 
  29. Bumstead, J. F. (১৮৬৩)। "A Few Remarks on Astigmatism"Boston Med Surg J69 (14): 280–284। ডিওআই:10.1056/NEJM186311050691404 
  30. Donders, Franciscus C (১৮৬২)। Astigmatismus und cylindrische Gläser। Peters। পৃষ্ঠা 129 
  31. Artal, Pablo; Tabernero, Juan (২০১০)। "Optics of human eye: 400 years of exploration from Galileo's time"। Applied Optics49 (16): D123–30। এসটুসিআইডি 1539303ডিওআই:10.1364/AO.49.00D123পিএমআইডি 20517354বিবকোড:2010ApOpt..49G.123A 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

শ্রেণীবিন্যাস
বহিঃস্থ তথ্যসংস্থান