বাংলা ভাষা আন্দোলনে নারী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক মর্যাদা বহুবছর ধরে সংগ্রাম আর পুরুষের পাশাপাশি লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’দাবির আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়ে ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্রীরা। পাকিস্তান আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে ভাষার দাবির মিছিলগুলোতে ছিলেন তারা সামনের কাতারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবির বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত পোস্টার একেছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে নারীরাই পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙে। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসা সাহায্যের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েরা চাঁদা তুলে আনে। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখে। আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য অনেক গৃহিণী অলঙ্কার খুলে দেন। শুধু তাই নয়, ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ায় অনেক নারীকে জেলও খাটতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন সংসার। কেউ আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হয়েছেন বহিষ্কৃত। সে সময়য়র ঘটনা নিয়ে আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, ভাষাসৈনিকদের স্মৃতিচারণা এবং দলিল ও বইতে এর প্রমাণ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে নারী ভাষা সৈনিক[সম্পাদনা]

৩১ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় ছাত্রীদের পক্ষ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেন, ‘বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে।’ আন্দোলনের শুরুর দিকে একজন ছাত্রীর মুখে এমন সাহসী উচ্চারণ কর্মীদের মনে উদ্দীপনা জোগাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেন, ‘১১ মার্চ ভোর বেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন ভবন ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। সকাল ৮টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করলে কয়েকজন ছাত্রী বাধা দিতে গেয়ে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন। ঠিক ওই মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল। আনোয়ারা খাতুন ও অনেকে মুসলিম লীগ সদস্য পার্টির বিরুদ্ধে আইনসভার ভীষণভাবে প্রতিবাদ করেন। আত্মজীবনীতে বলা হয় ‘ যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪টায় শেষ করতো। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’-এমন নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকতো। [১]

তমদ্দুন মজলিসে নারী[সম্পাদনা]

ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীদের অনবদ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে বাংলাভাষার দাবিকে চাঙ্গা করতে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। নারী ভাষা সৈনিকদের মধ্যে আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা, বোন রহিমা এবং রাহেলার ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া আন্দেলনকারী ছাত্রদের আজিমপুরের বাসায় দীর্ঘদিন রান্না-বান্না করে খাইয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাত ৪টার দিকে আবুল কাশেমের বাসা ঘিরে ফেলে পাকিস্তান পুলিশ। ভিতরে আবুল কাশেম ও আব্দুল গফুরসহ অন্যরা ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র ‘সৈনিক’ পত্রিকা প্রকাশের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পুলিশ দরজায় বারবার আঘাত করলে মিসেস রাহেলা কাশেম গভীর রাতে পারিবারিক বাসায় পুলিশ প্রবেশের চেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ তর্কবিতর্ক জড়িয়ে পড়েন। এ সুযোগে আবুল কাশেমসহ অন্যরা পেছনের দেয়াল টপকে পালাতে সক্ষম হন। এরপর পুলিশ ভিতরে ঢুকে কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে যায়। ভাষা আন্দোলন শুরুর দিকে অন্দরমহলে নারীর এই অবদান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। [১]


১৪৪ ধারা ভঙ্গ[সম্পাদনা]

২১ ফেব্রুয়ারি নারী ভাষা সৈনিকরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে দেয়ার মাধ্যমে আন্দোলনকারী দমাতে পুলিশের জারি করা ১৪৪ ধারা প্রথমেই ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হন। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজটা রওশন আরা বাচ্চুসহ আরো কয়েকজন ছাত্রীরা দ্বারাই হয়। কারণ ১০ জন করে বের হওয়া প্রথম দুটি দলের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা ব্যারিকেডের ওপর ও নিচ দিয়ে লাফিয়ে চলে যায়। পরে তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানির কাজ শুরু করেন ছাত্রীরাই। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে অনেক ছাত্রী আহত হন। এরমধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, বোরখা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহীম, সুরাইয়া ডলি ও সুরাইয়া হাকিম ছিলেন।[২]

ঢাকার বাইরে আন্দোলন[সম্পাদনা]

ঢাকার বাইরে নারীরা ভাষা আন্দোলনে একাত্ম হতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগম। তিনি কারানির্যাতনের একপর্যায়ে সরকারের চাপে স্বামী তাকে তালাক দেন। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, বেনু ধর ও শাবানীর মতো কিশোরীকেও পুলিশ সেদিন গ্রেপ্তার করে। সিলেটের কুলাউড়ার সালেহা বেগম ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালীন ভাষা শহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলণ করেন। এই অপরাধে সেখানকার জেলা প্রশাসকের আদেশে স্কুল থেকে তাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। তখন সালেহা বেগমের পক্ষে আর পড়ালেখা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। চট্ট্রগাম ও সিলেটে ছাত্রীরা আন্দোলনে জোড়ালো ভূমিকা রাখে। এদের মধ্যে স্কুলের কোমলমতি কিশোরীদের অংশগ্রহণই ছিল সবচেয়ে বেশি [৩]


ভাষা সৈনিক চেমন আরা বলেছেন ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যারা তমদ্দুন মজলিসের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আনোয়ারা খাতুন। তিনি ছিলেন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য। গাইবান্ধার বেগম দৌলতুন্নেছা ও অগ্রণী ভ‚মিকা রেখেছিলেন। তিনিও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন ১৯৫৪ সালে। নাদেরা বেগম ও লিলি হকের নামও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। হামিদা খাতুন, নুরজাহান মুরশিদ, আফসারী খানম, রানু মুখার্জী প্রমুখ মহিলারাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসতার প্রতিবাদে অভয়দাশ লেনে এক সভায় নেতৃত্ব দেন বেগম সুফিয়া কামাল ও নুরজাহান মুরশিদ। ধর্মঘট উপলক্ষে প্রচুর পোস্টার ও ব্যানার লেখার দায়িত্ব পালন করেন ড.শাফিয়া খাতুন ও নাদিরা চৌধুরী। ১৯৪৭ সালে আজাদ পত্রিকায় বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে একটি লেখা প্রকাশ হলে যশোরের হামিদা রহমান একটি নিবন্ধ লেখেন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক হয়েছিলেন। এ সময় সুফিয়া খাতুন, হালিমা খাতুন নামে দুজন মহিলার নাম শোনা যায়। যারা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমি রেখেছিলেন। নারায়ণগঞ্জের মরগান হাইস্কুলে হেড মিস্ট্রেস মমতাজ বেগম স্থানীয়ভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে নেতৃত্ব দেন। সিলেটের মেয়েরাও ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল এবং তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের নিকট প্রতিনিধিও পাঠায়। এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেয় সিলেটের মুসলিম লীগের নেত্রী জোবেদা খাতুন চৌধুরী। অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সাহারা বানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেছা, রাবেয়া বেগম প্রমুখ। বিল্পবের দেশ, বিদ্রোহের দেশ চট্টগ্রাম। যে কোনো সময়ে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে চট্টগ্রামের ভ‚মিকা অগ্রগামী। ভাষা আন্দোলনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। চট্টগ্রামেও বেশ কিছু কলেজছাত্রী এবং সে সময়ের ভদ্র মহিলারাও ভাষা আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম তোহফাতুন্নেছা আজিম, সৈয়দা হালিমা, সুলতানা বেগম, নুরুন্নাহার জহুর, আইনুনু নাহার, আনোয়ারা মাহফুজ, তালেয়া রহমান, প্রতিভা মুৎসুদ্দি। খুলনাতেও কাজ করেছেন তমদ্দুন মজলিসের কর্মী আনোয়ারা বেগম, সাজেদা আলী এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্রীরা। সাতক্ষীরায় সক্রিয়ভাবে এ আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন গুলআরা বেগম ও সুলতানা চৌধুরী। টাঙ্গাইলে আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন নুরুন্নাহার বেলী, রওশন আরা শরীফ। রংপুরে এই সময় মহিলারা রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন। তারা হচ্ছেন নিলুফা আহমেদ, বেগম মালেকা আশরাফ, আফতাবুন্নেছা প্রমুখ। ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীতে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ড. জাহানারা বেগম বেনু, মনোয়ারা বেগম বেনু, ডা. মহসিনা বেগম, ফিরোজা বেগম ফুনু, হাফিজা বেগম টুকু, হাসিনা বেগম ডলি, রওশন আরা, খুরশিদা বানু খুকু, আখতার বানু প্রমুখ। [৪]

গ্রেফতার[সম্পাদনা]

ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির দিন হলো ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ জন ছাত্রী গ্রেপ্তার হন। তাঁদের মধ্যে লায়লা নূর, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, রওশন আরা বেনু, ফরিদা বারি, জহরত আরা, কামরুন নাহার লাইলি, হোসনে আরা, ফরিদা আনোয়ার ও তালেয়া রহমান অন্যতম। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রক্টরের অনুমতি নিয়ে এবং প্রক্টরের সামনে পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে হতো। গ্রামের নারীরা তো ছিল পর্দা প্রথার আড়ালে বন্দি। এমন সময় সামাজিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা-বিপত্তি ঠেলে বাংলাভাষার দাবিতে নারীদের রাজপথে নেমে আসা কঠিন ছিলো। তারপরেও আন্দোলনে অংশ নিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটাই নিয়েছে নারীরা। [১]

উল্লেখযোগ্য যারা[সম্পাদনা]

.

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "স্মৃতির মিনার ভাষা আন্দোলনে নারী"এনটিভি। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯ 
  2. "ভাষা আন্দোলনে নারী - অদিতী ফাল্গুনী"দৈনিক ইত্তেফাক। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯ 
  3. "উপেক্ষিত নারী ভাষাসংগ্রামী"অনন্যা (ম্যাগাজিন)। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯ 
  4. "ভাষা আন্দোলনে নারী সমাজের ভূমিকা -"চেমন আরাদৈনিক ইনকিলাব। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মে ২০১৯