পাঠশালা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

পাঠশালা হচ্ছে প্রাক-আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র যেখানে জমিদারি হিসাব, মহাজনী হিসাব, ওজনপরিমাপ, দলিল এবং পত্রলিখন শেখানো হতো। সাধারণত গুরু বলে পরিচিত একজন শিক্ষক কর্তৃক পাঠশালা পরিচালিত হতো, যিনি তাঁর ব্যক্তিগত বিবেচনায় পাঠশালা পরিচালনা করতেন। যদিও সামাজিক উদ্যোগে পাঠশালা কদাচিৎ প্রতিষ্ঠিত হতো, তবুও এর ব্যবস্থাপনায় গুরুর প্রাধান্য ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলায আদি কাল থেকে গুরুভিত্তিক পাঠশালার অস্তিত্ব ছিল[১] এবং ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক উনিশ শতকে নতুন শিক্ষানীতি প্রবর্তনের ফলে পাঠশালা শিক্ষা ব্যবস্থা বিলোপ সাধনের শুরু পর্যন্ত তা চালু ছিল।

পাঠশালার প্রকৃতি[সম্পাদনা]

পাঠশালা খোলা জায়গায় গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে পেশাগত জিনিসপত্র যেমন স্থায়ী কাঠামো, আসবাবপত্র এবং কর্মচারীবৃন্দ ইত্যাদি থাকত না। আজকের দিনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহের মত পাঠশালার কোনো নাম থাকত না। সাধারণত যে গুরু পরিচালনা করতেন তাঁর নামেই সমাজের কাছে পরিচিত হতো। ছাত্ররা মাটিতে বসত। তবে কেউ বসার জন্য বাড়ি থেকে ছোট আকারের বাঁশের চাটাই, বেতের মাদুর, গাছের ছাল, পাতা প্রভৃতি ইচ্ছামত নিয়ে আসতে পারত।

গুরু তাঁর বাড়ি থেকে আনা একটি চৌকিতে উপবেশন করে তার সম্মান ও ছাত্রদের থেকে পার্থক্য বজায় রাখতেন। যেহেতু গুরু নিজের উদ্যোগে এককভাবে পাঠশালা পরিচালনা করতেন, সেহেতু তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করতেন। গুরুদের অধিকাংশ আসতেন হিন্দুদের কায়স্থ বর্ণ থেকে, যারা সামাজিকভাবে শিক্ষাদান, দেশের কাজ এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন। পাঠশালা সব ধর্ম ও বর্ণের ছাত্রদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, তবে পাঠশালায় প্রধানত হিন্দু এবং মুসলিম ছাত্ররা পড়াশোনা করতো।

ঐতিহ্যগতভাবে ছাত্রদের অভিভাবকদের স্বতঃপ্রবৃত্ত চাঁদা এবং লোকহিতেষী পাড়াপড়শীদের দানে পাঠশালার খরচ নির্বাহ হতো। একজন গুরুর মাসিক আয় স্থান বিশেষে বিভিন্ন হতো। উনিশ শতকের প্রথম দিকে এ আয় ছিল গড়ে পাঁচ থেকে বারো টাকা। সে সময়ের জন্য এটি ছিল অতি সম্মানজনক আয়। এ কারণে যে এ অর্থ দিয়ে সে সময়ে গ্রামীণ এলাকায় দু থেকে তিনি মণ চাল ক্রয় করা যেত। এর বেশি বেতন কদাচিৎই একজন সমযোগ্যতা সম্পন্ন সরকারি কর্মচারি বা জমিদারি কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী পেত।

পাঠক্রম[সম্পাদনা]

পাঠশালা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল পঠন, লিখন, পাটিগণিত, পত্রলিখন, প্রাথমিক সংস্কৃত ব্যাকরণ, ধর্মীয় কাহিনী, জমিদারি, মহাজনী এবং ব্যবসা-সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ। ছাত্ররা কেবল গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা পেত না, মনোনীত বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছাত্রদের কাছ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করত। পাঠশালার শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এদেরকে বেশ সুবিধাদি দেওয়া হতো। তাদেরকে সরদার পোদো বলা হতো। সবাই নিয়মিত পাঠশালায় উপস্থিত হতো কিনা গুরু তা নজর রাখতেন। শৃঙ্খলা রক্ষার্থে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা ছাত্রদেরকে বাড়ি থেকে ধরে আনার জন্য সরদার পোদোদেরকে পাঠানো হতো। এ ছাত্রদেরকে অনুপস্থিতির কারণে নিয়মমাফিক কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। যখন স্বাভাবিক কথা ও সতর্ককরণ উপদেশাদি ব্যর্থ হতো, তখন গুরু এবং সরদার পোদোরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কঠিন শাস্তি প্রদান করতো। ছাত্ররা সাধারণত পাঁচ বছর বয়স থেকে পাঠশালায় প্রবেশ করত এবং পাঠশালার পাঠ্যবিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য সেখানে ছয় থেকে নয় বছর পর্যন্ত অধ্যয়ন করত। দুটি পর্বে পাঠ দেওয়া হতো। প্রথমটি সকালে, দ্বিতীয়টি বিকালে। নির্ধারিত কোনো বই ছাত্রদের পড়ার জন্য ব্যবহৃত হতো না। ফলে শিক্ষা প্রদানের কাজটি মৌখিকভাবেই সারা হতো। গুরু কোনো একটি পাঠ উচ্চস্বরে বলতেন আর ছাত্ররা তা সমবেতস্বরে পুনরাবৃত্তি করতো। মাঝে মাঝে সরদার পোদোর গুরুর হয়ে এ কাজ করত আর গুরু শুধু বেত হাতে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। ছাত্ররা শুরুতে বালুর উপরে লেখা শিখত। পরে কলাপাতায় ও অত:পর তালপাতায় এবং সর্বোচ্চ স্তরের ছাত্ররা কাগজে লিখত। পাঠশালার শিক্ষাপর্ব শেষ করার পর কোনো সনদপত্র দেওয়া হতো না। যে যার পাঠশালা থেকে পাঠ সমাপ্ত করত, সেটাই হতো তার ছাত্রত্ব অর্জনের সাময়িক স্বীকৃতি। পাঠশালা শিক্ষা ব্যবস্থা উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে, যখন চিরায়ত পাঠশালা শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে ক্রমবর্ধনমান চাপের সম্মুখীন হতে থাকে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]