নারী ভোটাধিকার আন্দোলন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সাফ্রোগেটস
Force-feeding poster (suffragettes).jpg
১৯১০ সালের আলফ্রেড পেয়ার্সের তৈরি পোস্টারে উইমেন্স সোশ্যাল এন্ড পলিটিকাল ইউনিয়ন (WSPU) এর নারী সদস্য - সাফ্রোগেটকে জোরপূর্বকভাবে খাইয়ে অনশন ভাঙানো হচ্ছে।
প্রথম নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকারীউইমেন্স সোশ্যাল এন্ড পলিটিকাল ইউনিয়ন (Women's Social and Political Union)
নামকরণসাফ্রেজ
গঠিত১০ অক্টোবর ১৯০৩; ১১৭ বছর আগে (1903-10-10)
প্রতিষ্ঠাতাএমেলিন পানখুর্স্ট (WSPU)
Later groups
  • উইমেন্স ফ্রিডম লীগ (প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০৭)
  • ওয়ার্কার্স সোশ্যালিস্ট ফেডারেশন ( প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১৪)
উদ্দেশ্যনারী ভোটাধিকার
পদ্ধতিসমূহআন্দোলন , আইন অমান্য, প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ, অনশন
মূল ব্যক্তিত্ব
এমেলিন পানখুর্স্ট, এমিলি ডেভিসন, ইভালিন হিল্ডা বুরকিট

বিগত শতাব্দীর গোড়ার দিকে নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সক্রিয় সদস্যদের সাফ্রোগেট বলা হতো। "নারীদের জন্য ভোট" এই ব্যানারে নির্বাচনে ভোটাধিকারের জন্য এই দলটি আন্দোলন করেছিলো।

সাফ্রোগেট বা নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত এই নারীরা মূলতঃ ব্রিটিশ নারী সংগঠন ডাব্লিউএসপিইউ (WSPU) এস সদস্য। ১৯০৩ সালে এমেলিন পানখুর্স্ট দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই নারী আন্দোলনটি একমাত্র নারী আন্দোলন যার সদস্যরা কিনা আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে তৎকালীন আইন অমান্য করেছিলো। [১][২] ১৯০৬ সালে ডেইলি মেইলের একজন রিপোর্টার সাফ্রোজিস্ট শব্দটি থেকে সাফ্রোগেট কথাটি প্রথমবারের মতো উল্লেখ করেন। সাফ্রোগেট শব্দটি সেই সময়ে নারী ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলনকারী নারীদের মর্যাদাহানি করতে ব্যবহার করা হলেও, সংঘবদ্ধ নারীসমাজ এই নতুন নামটিকে সাদরে গ্রহণ করে, এমনকি নিজেদের পত্রিকায় শিরোনাম হিসেবেও ব্যবহার করে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে বেশ কয়েকটি দেশে নারীরা ভোটের অধিকার অর্জন করে।

১৮৯৩ সালে, নিউজিল্যান্ড প্রথম স্ব-শাসিত দেশ হিসেবে ২১ বছরের বেশি বয়সী সকল নারীদের ভোট প্রদানের অধিকার দেয়।[৩] ১৯০৩ সালের মধ্যেও যখন ব্রিটেনে নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি, পানখুর্স্ট সিদ্ধান্ত নিলেন যে নারীদের "নিজেদেরকেই কাজটি করতে হবে" " [৪]। এরই প্রেক্ষিতে তার সংগঠন ডাব্লিউএসপিইউর প্রধান নীতিবাক্য হয়ে দাঁড়ায়, "কথায় নয়, কর্মে"। সংগঠনটির সদস্য - সাফ্রোগেটরা রাজনীতিবিদদের হেনস্থা ও সংসদে ঝামেলা সৃষ্টি করার সময়, পুলিশ দ্বারা আক্রমন ও যৌন হেনস্থার স্বীকার হয়েছিলো। প্রতিবাদে এই নারীরা ডাকবাক্সে ও পুরনো বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, গীর্জা ও অন্যান্য সম্পত্তিতে বোমা লাগায়। সেই সময়কার প্রচার মাধ্যমে সাফ্রোগেটদের প্রতি উষ্মা প্রকাশ ও তাদের নিয়ে তামাশাও করা হতো। কারাবন্দী হয়ে তারা অনশন কর্মসূচিতে গেলে, সরকার তাদের জোর করে খাওয়ায়। ইভালিন হিল্ডা বুরকিট প্রথম কারাবন্দী সাফ্রোগেট, যাকে সরকার জোর করে খাইয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলো। এমিলি ডেভিসন ১৯১৩ সালে এপসম ডার্বিতে রাজার ঘোড়ার সাথে দৌড়ে এসে আত্মাহুতি দেন। তার মৃত্যু বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ডাব্লিউএসপিইউ'র সাফ্রোগেটদের এহেন আন্দোলন সমাজের কিছু স্তর থেকে সমর্থন পেলেও, অনেক সদস্যই এরকম ক্ট্টর আন্দোলন সমর্থন করেনি [৫]

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে সাফ্রোগেটদের আন্দোলন স্থগিত করা হয়। যুদ্ধের পরে, জনপ্রতিনিধি আইন ১৯১৮ অনুসারে ৩০ বছরের অধিক বয়সী নারীরা নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করা পূর্বক ভোটাধিকার পায়। দশ বছর পরে, জনপ্রতিনিধি (সমানাধিকার ফ্র্যাঞ্চাইজ) আইন ১৯২৮ অনুসারে, ২১ বছর বয়স থেকেই পুরুষদের পাশাপাশি সকল নারী ভোটাধিকার অর্জন করে।

পটভূমি[সম্পাদনা]

নারী ভোটাধিকার সংক্রান্ত[সম্পাদনা]

যদিও আইল অফ ম্যান (যুক্তরাজ্যের সাথে সম্পর্কিত একটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল ও দ্বীপ) ১৮৮১ সালে সংসদীয় (টিনওয়াল্ড) নির্বাচনে সম্পত্তির মালিকানাধীন নারীদের ভোটাধিকার দিয়েছিলো, ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথম কোন স্বাধীন দেশ হিসেবে ২১ বছর ও তার ঊর্ধ্বে সকল নারীদের সমস্ত সংসদীয় নির্বাচনে ভোটের অধিকার দেয়। [৩] দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় নারীরাও একই অধিকার অর্জন করে এবং ১৮৯৫ সালে প্রথম সংসদে পদপ্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর অধিকার পান। [৬] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৮৯৯ সাল থেকে ওয়েমিংয়ের পশ্চিম অঞ্চল এবং ইউটাতে ১৮৭০ সাল থেকে ২১ বছরের বেশি বয়সী সাদা নারীদের ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

ব্রিটিশনারী ভোটাধিকার আন্দোলন[সম্পাদনা]

১৮৬৫ সালে জন স্টুয়ার্ট মিল নারীদের জন্য ভোটাধিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল এমন প্লাটফরমে সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৮৬৯ সালে তিনি লিঙ্গ সমতার পক্ষে দ্য সাবজেকশন অফ উইমেন নামক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়াও ১৮৬৫ সালে, দ্য কেন্সিংটন সোসাইটি নামে একটি নারী আলোচনার দল গঠিত হয়। নারীদের ভোটাধিকার বিষয় নিয়ে আলোচনার পরে, এই সমিতি একটি আবেদনের খসড়া এবং স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ১০০ টি স্বাক্ষর সংগ্রহ স্বাপেক্ষে স্টুয়ার্ট মিল তা সংসদে উপস্থাপন করতে রাজি হয়।[৭] অক্টোবর ১৮৬৬ সালে অপেশাদার বিজ্ঞানী লিডিয়া বেকার ম্যানচেস্টারে আয়োজিত "ন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর দ্যা প্রোমোশন অফ সোশ্যাল সায়েন্স " কর্তৃক অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে উপস্থিত হন। এখানে তিনি বারবারা বডিখনের পেপার "রিজন্স ফর এনফ্রাচাইজমেন্ট অভ উইমেন" শুনেন। বারবারার এই পত্রিকাপাঠ লিডিয়া বেকারকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ম্যানচেস্টারের চারিদিকে স্বাক্ষর সংগ্রহে নতুন গঠিত ম্যানচেস্টার কমিটিতে যোগ দেন। স্টুয়ার্ট মিল ১৮৬৬ সালে যখন সংসদে এই আবেদনটি উপস্থাপন করেন, ততক্ষণে সমর্থকরা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, হ্যারিয়েট মার্টিনাও, জোসেফাইন বাটলার এবং মেরি সামারভিলিসহ সর্বমোট ১৪৯৯ জনের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন।[৮]

ডাব্লিউএসপিইউ প্রচারণা[সম্পাদনা]

অ্যানি কেনি এবং ডাব্লুএসপিইউয়ের ক্রিস্টাবল পানখউর্স্ট। ১৯০৮ সালের ছবি

১৯০৫ সালে ম্যানচেস্টারে একটি রাজনৈতিক বৈঠকে ক্রিস্টাবল পানখার্স্ট এবং মিলকার্কার অ্যানি কেনি বিশিষ্ট লিবারেল উইনস্টন চার্চিল এবং স্যার এডওয়ার্ড গ্রেয়ের বক্তব্যকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে নারীদের রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে চার্চিল এবং গ্রের মন্তব্য জানতে চান। এমন সময়ে যখন রাজনৈতিক বৈঠকগুলিতে কেবল পুরুষরা উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তারা কোনও বাধা ছাড়াই তাদের মতামত প্রকাশ করা সৌজন্য বলে মনে করতো, দুই নারীর এমন প্রশ্ন শ্রোতাদের মাঝে উষ্মা তৈরি করে। "নারীদের জন্য ভোট" ব্যানার উত্তোলন করলে একজন পুলিশ সদস্যের উপর হামলার অভিযোগে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পানখুর্স্ট এবং কেনি আদালতে হাজির হলে তারা উভয়েই জরিমানা প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় এবং নিজেদের প্রচার বৃদ্ধিতে কারাগারে যায়। [৯]

১৯০৮ সালের জুলাইয়ে ডাব্লিউএসপিইউ ম্যানচেস্টারের কাছাকাছি হিটন পার্কে একটি বিশাল বিক্ষোভের আয়োজন করে। এমালিন, ক্রিস্টাবেল এবং অ্যাডেলা পানখুর্স্ট সহ ১৩ টি পৃথক প্ল্যাটফর্মে বক্তারা বক্তব্য দেন।

খবরের কাগজের কার্টুনিস্টরা তৈরি পুরুষালি পোশাকে দৃঢ় মনের নারীদের কার্টুন আঁকলে, সাফ্রোগেটরা নিজেদের মেয়েলি ও ফ্যাশনেবল প্রতিচ্ছবি তৈরিতে জনসম্মখ্যে নতুন রূপে আসার পরিকল্পনা করেন। ১৯০৮ সালে ডাব্লুএসপিইউয়ের সংবাদপত্র ভোটস ফর উইমেন এর সহ-সম্পাদক, এমেনিল পেথিক-লরেন্স, বেগুনি রঙকে সাফ্রোগেটদের রঙ হিসেবে তুলে ধরেন। বেগুনি রং বিশ্বস্ততা ও মর্যাদার জন্য পরিচিত। এছাড়াও, শুদ্ধির জন্য সাদা এবং আশার প্রতীক হিসেবে সবুজ রংকেও সাফ্রোগেটরা ব্যবহার শুরু করেন। লন্ডনের ফ্যাশনেবল দোকানগুলি সেলফ্রিজ এবং লিবার্টি তিনরঙা টুপি, রোসেটস, ব্যাজ এবং বেল্টের পাশাপাশি রঙিন পোশাক, অন্তর্বাস, হ্যান্ডব্যাগ, জুতা, চপ্পল এবং টয়লেট সাবান বিক্রি শুরু করে। [১০] ডাব্লুএসপিইউর সদস্যপদ বৃদ্ধির সাথে সাথে নারীদের মাঝে এই তিন রঙ ব্যবহার ফ্যাশনেবল হিসেবে বিবেচ্য হয়। প্রায়শই তারা একটি ছোট গহনা বা একটি ছোট হৃদয় আকৃতির "ভেস্ট কেস" নিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করতেন [১১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Holton, Sandra Stanley (নভেম্বর ২০১১)। "Challenging Masculinism: personal history and microhistory in feminist studies of the women's suffrage movement": (829–841), 832। ডিওআই:10.1080/09612025.2011.622533 
  2. Strachey, Ray (1928). The Cause: A Short History of the Women's Movement in Great Britain, p. 302.
  3. Harper, Ida Husted. History of Woman Suffrage, volume 6 (National American Woman Suffrage Association, 1922) p. 752.
  4. Pankhurst, Christabel (1959). Unshackled: The Story of How We Won the Vote. London: Hutchison, p. 43.
  5. Holton 2011
  6. "Constitution (Female Suffrage) Act 1895 (SA)"। Foundingdocs.gov.au। ৩ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ জানুয়ারি ২০১১ 
  7. Kuenzle, Dominique (২০১৮-০৬-২১)। "John Stuart Mill"Oxford Scholarship Onlineডিওআই:10.1093/oso/9780190225100.003.0011 
  8. "Becker, Lydia Ernestine (1827–1890)"Oxford Dictionary of National Biography। Oxford University Press। ২০১৮-০২-০৬। 
  9. Trueman, C.N.। "Women's Social and Political Union"History learning site। C.N. Trueman। সংগ্রহের তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ 
  10. Blackman, Cally (৮ অক্টোবর ২০১৫)। "How the Suffragettes used fashion to further the cause"The Guardian। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ 
  11. Crawford 1999