জোনাকী ছবিঘর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জোনাকী ছবিঘর
Jonaki Cinema Hall.jpg
আসামের প্রথম স্থায়ী ছবিঘর জোনাকীর বর্তমান রূপ
সাধারণ তথ্য
ধরনছবিঘর
অবস্থানতেজপুর, আসাম

জোনাকী ছবিঘর হল জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা নির্মাণ করা আসামের প্রথম স্থায়ী চিত্রগৃহ।[১] ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছবিঘরটি জ্যোতিপ্রসাদের ঘাইঘর পকীর পিছনের হাবি-বন পরিষ্কার করে তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৩৫ সালে কলকাতার রওনক ছবিঘরে জয়মতী মুক্তিলাভ করার পরে আসামের দর্শকের জন্য কোনো স্থায়ী ছবিঘর ছিল না এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩৭ সালে জ্যোতিপ্রসাদ জোনাকী ছবিঘর নির্মাণ করেন। জ্যোতিপ্রসাদের পরে বিশেষভাবে তাঁর কনিষ্ঠ ভাই হৃদয়ানন্দ আগরওয়ালা এবং তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত প্রতীম আগরওয়ালা দেখাশুনা করা জোনাকী ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারিতে মহারজত জয়ন্তী পালন করে।

সংক্ষেপ ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৩৭-১৯৫০[সম্পাদনা]

অসমীয়া ছবি নির্মাণ করবেন বলে মন বেঁধে নিয়ে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা প্রথমে শোণিত কুঁয়রী নাটকের চিত্ররূপ দেয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি অসমীয়া জাতীয় জীবনের এক সাহসিকতাপূর্ণ চিত্র প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠা একটি কাহিনীর সন্ধানে ছিলেন। তদুপরি শোণিত কুঁয়রীর চিত্রায়ণে আসা থেকে জটিলতার কথাও তিনি ভেবেছিলেন। সেজন্য তিনি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জয়মতী নাটকটির কাহিনীটি নির্বাচন করেন।

১৯৩৫ সালের ১০ মার্চে কলকাতার 'রাওনাক' ছবিঘরে জয়মতী' প্রথম মুক্তি পান। ছবিটি উদ্বোধন করেন সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া। সেই সময় আসামে স্থায়ী ছবিঘর ছিল না। মাত্র গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় এবং শিলঙে অস্থায়ীভাবে ছবি দেখানোর ব্যবস্থা ছিল। সেজন্য ১৯৩৭ সালে জ্যোতিপ্রসাদ জোনাকী ছবিঘর নির্মাণ করেন। লোহার খুটা, ইট-চূণপাথরের মিশ্রণ এবং বোকামাটিতে লেপা দেওয়ালের সাথে কাঠের ব্যালকনী থাকা ছবিঘরটি একমাসের মধ্যে নির্মাণ করা হয়। মূল গৃহটি ২৭ ফুট চওড়া, ৮০ ফুট দীর্ঘ এবং ১৮ ফুট উচ্চতার ছিল। আগরওয়ালা পরিবারের ঘাইঘর পকীর পিছনে জোনাকী নির্মাণ করা হয়েছিল। আম-জাম, বিভিন্ন জোপোহা গাছ এবং অলাগতিয়াল গাছ-গাছালিতে ভরা স্থানটি জোনাকী নির্মানের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। এবং অনাগত দিনগুলিতে সেই অন্ধকার স্থানের টুকরোই মানুষকে মনোরঞ্জন দেবে বলে তার নাম রাখা হয়েছিল জোনাকী[২]

"তেজপুরের আমার ঘাই ঘর 'পকী'র (বর্তমান জ্যোতি ভারতী) এমন পরি থাকা কচুবনী এবং বড়ো বড়ো আম, লিচু এবং জামু গাছেরে ভরা স্থানে নির্মাণ করা হৈছিল। সেই স্থানডোখর আন্ধার-মুন্ধার, মানুহ আসা-যাওয়া করেও জোনাকী পরুবার আলোহে বাট দেখুবায়। সেইডোখর স্থান সদায় আলো হয়ে রাইজর মন আনন্দিত করে রাখিব বলেয়েই প্রেক্ষাগৃহটির নাম 'জোনাকী' থ'লে বলে আমাক বলা মনত আছে।..."

সেই সময় ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র থেকে সিনেমা দেখানোর অনুমতি পত্র বা লাইসেন্স লাভ করাটি সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু আন্দোলনের কার্যকলাপ থেকে দূরে রাখতে হয়তো জ্যোতিপ্রসাদকে অনুমতি পত্র প্রদান করা হয় এবং চিত্রলেখা ডিষ্ট্রিবিউটর্সের ব্যানারে ছবি প্রদর্শনের সূত্রপাত করা হয়।[২] ১৯৩৭ সালের দুর্গাপূজার আগেভাগে মেট্রো গোল্ডবিন মেয়রের এলিফেন্ট বয় ছবিটিতে জোনাকী ছবিঘরের শুভারম্ভ করা হয়। ভারতীয় চিত্র তারকা চাবু অভিনীত ছবিটি এলে মধ্যম গতিতে দর্শকের স্রোত আসে। ধীরে ধীরে জ্যোতিপ্রসাদ সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে থাকেন এবং জোনাকী পরিচালনার ভার তাঁর ভাই কমলা প্রসাদ আগরওয়ালার হাতে পড়ে। কিন্তু কমলা প্রসাদও রাজনীতিতে প্রবেশ করতে মনস্থ করেন এবং সহোদর বিবেকানন্দ আগরওয়ালাও ভোলাগুড়ি চা-বাগিচা দেখাশুনা করতে দূরে চলে যান। এদিকে সেই সময় সিনেমার রীলগুলি কলকাতা থেকে রেলে-জাহাজে আনতে হওয়ায় এবং দর্শকের সংখ্যাও কমে যাওয়ায় জোনাকী বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। দেখাশুনা করার কেউ নেই দেখে তেজপুর-এর আবুল হুসেইনকে ৪২ টাকা প্রতি মাসে লীজে দেওয়া হয়। ১৯৪০ সালের পূজার সময় আবুল হুসেইন ব্যবসায় উন্নত করার চেষ্টা চালান যদিও বিফল হন। ইতিমধ্যে সরকার ছবিঘরের আন্তঃগঠন দুর্বল বলে জোনাকীর অনুমতি পত্র রদ করে দেন। সেই সময়ে কলকাতায় পড়ে থাকা জ্যোতিপ্রসাদের কনিষ্ঠ ভাই হৃদয়ানন্দ আগরওয়ালা ঘরে আসেন এবং চন্দ্রকুমার আগরওয়ালার পুত্র তরুণ কুমার এবং অন্যান্যের সহযোগিতায় জোনাকীর মেরামতি করেন এবং পুনরায় অনুমতি পত্র আহরণ করেন। ১৯৪১ সালের ২০ জুন থেকে এম.জি.এম.র ব্লকহেড ছবি দ্বারা পুনরায় জোনাকীর প্রদর্শনী আরম্ভ হয়। সেই সময় পরিচালকের বেতন ছিল ১৫ টাকা এবং মেশিন অপারেটরের বেতন ছিল ১০ টাকা। ছবিঘরের দৈনিক উপার্জন ২.৫০ টাকা থেকে আরম্ভ করে ৬০-৭০ টাকা পর্যন্ত হয়েছিল।

তার পরে হৃদয়ানন্দ পরবর্তী পর্যায়ের অধ্যয়নের জন্য কলকাতায় যান যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-এর অশান্তজর্জর সময় অধ্যয়নের সুবিধা না থাকায় ১৯৪১ সালের নভেম্বরে পুনরায় আসামে ফিরে আসেন আর ছবিঘরের ব্যবসায়ে মনোযোগী হন।[২] সেই সময় তেজপুরে মিত্রশক্তির সেনা-আধিকারিকদের আসা-যাওয়া বেড়ে যাওয়ায় ইংরাজী সিনেমার ব্যবসায় ভালর দিকে আসে। সেই সময় জোনাকীর উপার্জন দিনে ১০০ র থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং হৃদয়ানন্দ আগরওয়ালা নগাঁও-এর জয়শ্রী ছবিঘরটি পুনরুজ্জীবিত করে ব্যবসায় আরম্ভ করেন। ১৯৪৪ সালে একটি সিনেমা ডিষ্ট্রিবিউশন ফার্ম খোলা হয়।

১৯৫০-বর্তমান[সম্পাদনা]

১৯৫০ সালে জোনাকীতে একটি নতুন আর.।সি.এ. প্রজেক্টর সংরোপিত করা হয়। ষাটের দশকে আসামে সিনেমার ব্যবসায় যথেষ্ট উন্নত হয় এবং জোনাকী কিছু লাভের মুখ দেখে। ১৯৭৩ সালে জোনাকীর মেরামতি করা হয় এবং ৭০০ জন মানুষ একেসাথে দেখার জন্য নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৮ সালে তামোলবাড়ি চা বাগিচার মনোরঞ্জন আগরওয়ালার সহযোগিতায় হলঘরটি ৪০ ফুট বাড়িয়ে নেওয়া হয় এবং আসন সংখ্যা ১০০০তে বাড়ানো হয়। ইতিমধ্যে দূরদর্শন-এর আগ্রাসন, ভিডিও ছবির সহজলভ্যতা এবং পাইরেসির কবলে পড়ে আসামে ছবির ব্যবসায় মন্দা ধরে। সেই সময় তেজপুরে কেবল জোনাকী এবং আনোয়ার টকিজই ব্যবসায় করত। অসমীয়া ছবি উদ্যোগকে সহায়তা করতে সরকার পরিষেবা কর আরোপ করে কিন্তু তা বিশেষ লাভদায়ক হয়নি। ১৯৯৯ সালে মনোরঞ্জন আগরওয়ালার মৃত্যু হয় এবং হৃদয়ানন্দর হাতে পুনরায় জোনাকীর দায়িত্ব এসে পড়ে। একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় ডিজিটাল ছবি বাজার দখল করে এবং জোনাকীরও ডিজিটালাইজেশন করা হয়। ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ডিজিটাল প্রদর্শনী হিসাবে অস্কার পুরস্কার বিজয়ী ছবি শ্লামডগ মিলিয়নেয়ার দেখানো হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে জোনাকী ছবিঘর মহা রজতজয়ন্তী পালন করে।[১]

সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা[সম্পাদনা]

অসমীয়া ছবির ব্যবসায় উন্নতি করতে আসাম সরকার ছবিঘরের টিকিটে পরিষেবা কর বসায়। এই আয়োজন দ্বারা টিকিট থেকে পাওয়া কিছু অংশ টাকা প্রদর্শক নিজে রেখে ছবিঘরসমূহের উন্নয়ন সাধনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[২] সম্প্রতি আসাম সরকার আসাম রাজ্যিক চলচ্চিত্র (বিত্ত এবং উন্নয়ন) নিগমের অধীনে জোনাকী ছবিঘরের মেরামতির জন্য ৫০ লাখ টাকা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে।[৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. RAJIV KONWAR (16.01.13)। "Jonaki still burns bright - Assam's first hall to celebrate platinum jubilee on Jan. 17"। The Telegraph। সংগ্রহের তারিখ 18 April 2020  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  2. Sreemanta Pratim Agarwala। "Jonaki Cinema Hall"। সংগ্রহের তারিখ ১৮ এপ্রিল ২০২০ 
  3. Shambhu boro। "Rs 50 lakh State Govt project to renovate 'Jonaki'"। সংগ্রহের তারিখ ১৮ এপ্রিল ২০২০ 

সাথে দেখুন[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা