জর্ডানের ধর্ম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অবস্থিত বাদশাহ আবদুল্লাহ-১ মসজিদের রাতের দৃশ্য। জর্ডানের রাজ পরিবার (আল-হাশিম পরিবার) সুন্নি ইসলামের অনুসারী

সুন্নি ইসলাম জর্ডানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্ম। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৯৩ শতাংশই মুসলিম।[১] এছাড়া দেশটিতে কিছু আহমদিয়া[২] এবং শিয়া ইসলামের অনুসারী রয়েছে। শিয়াদের অধিকাংশই ইরাকি ও লেবানিয় শরণার্থী।[৩]

দেশটির অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রাচীনতম খ্রিস্টান সম্প্রদায়সমূহের একটি, যারা বাকি জনসংখ্যার সাথে সহাবস্থান করছে। ২০০৫ সালে দেশটির মোট ৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪.২ শতাংশ ছিল খ্রিস্টান। অথচ ১৯৩০-এর দশকে এদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। জর্ডানে মুসলিম অভিবাসনের উচ্চ হার সহ বেশ কিছু কারণে খ্রিস্টানদের অনুপাত এভাবে কমে আসছে। এ খ্রিস্টান জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি গ্রিক অর্থোডক্স। বাকিরা লাাতিন বা গ্রিক ক্যাথলিক, সিরিয় অর্থোডক্স, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং আর্মেনিয়। প্রায় ১০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর এ দেশে খ্রিস্টান জনসংখ্যা প্রায় আড়াই থেকে চার লাখ (কয়েক হাজার ইরাকি ও সিরিয় খ্রিস্টান বাদে)।[৪] ২০১৫ সালে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় অনুমান করা হয় যে, দেশটিতে এমন প্রায় ৬৫০০ খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী রয়েছে যাদের মুসলিম প্রেক্ষাপট ছিল। এদের মধ্যে অধিকাংশই প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের বিভিন্ন ধারার দিকে ঝুঁকছে।[৫]

এছাড়াও জর্ডানে ২০ হাজার থেকে ৩২ হাজার দ্রুজ রয়েছে; যাদের অধিকাংশই দেশটির উত্তর অংশে বাস করে। এর পাশাপাশি এ দেশে প্রায় ৮০০ বাহাই রয়েছে যারা মূলত জর্ডান ভ্যালির কাছাকাছি আদাসিয়া গ্রামে বাস করে।[৬]

জর্ডানে ইহুদিদের উপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা জারি নেই। তবুও ২০০৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশটিতে কোনো ইহুদি নেই।[৭] বাহাই[৮] এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কিছু বিধিনিষেধের সম্মুখীন হতে হয়।[৯]

অঞ্চলভিত্তিক অবস্থান[সম্পাদনা]

জর্ডানের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের অনুপাতে শহর ও অঞ্চল ভেদে সামান্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন দেশটির দক্ষিণাঞ্চল এবং জারকার মতো শহরগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি। অন্যদিকে আম্মান, ইরবিদ, মাদাবা, আল-সল্ট এবং আল-কারাক এর মতো শহরগুলোতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনুপাত দেশটির গড় খ্রিস্টান জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়ে কিছুটা বেশি। আর ফুহেইস, আল হুসন এবং আজলন শহরে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অথবা দেশটির গড় অনুপাতের তুলনায় এ অঞ্চলের খ্রিস্টানদের সংখ্যা বেশি। কিছু গ্রামে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে বাস করছে; যেমন দেশটির উত্তরাঞ্চলের রায়মাউন এবং কুফরানজা গ্রাম।

জর্ডানের অ্যাংলিকান বা এপিস্কোপালিয়ানরা জেরুসালেমের অ্যাংলিকান বিশপের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। চার্চ অব রেদিমার হল সবচেয়ে বড় কংগ্রেশন যার সদস্য জেরুসালেমের বিশপের এলাকাভুক্ত যে কোনো গির্জা। অন্যান্য বিশপশাসিত গির্জাগুলো আশরাফিয়া, নুন, জারকা, মার্কা শরণার্থী শিবির, ইরবিদ, আল হুসন এবং আকাবাতে রয়েছে।

সামাজিক জীবন[সম্পাদনা]

সাধারণত জর্ডানের মুসলিমখ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে বৈষম্য ও মতভেদ জাতীয় বড় কোনো সমস্যা নেই। তবে সংখ্যালঘু যেসব সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা একেবারেই কম যেমন: বাহাই, শিয়া, দ্রুজ ইত্যাদি, তারা সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ধর্মীয় বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে।[১০] বাহাইএংলিকান গির্জার সদস্যদের স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন জর্ডান সরকার কর্তৃক প্রত্যাখ্যান এর একটি বড় উদাহরণ।[১১]

ধর্মীয় স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

জর্ডানের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম, তবে দেশটির সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছে; যতক্ষণ না তা সাম্রাজ্যের কোনো নির্দেশনা বা নৈতিকতা লঙ্ঘন করে।

তবে কিছু বিষয়, যেমন ধর্ম পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতিটি বিতর্কিত। যদিও অন্য ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ আইনি জটিলতা থেকে অপেক্ষাকৃতভাবে মুক্ত। কিন্তু যারা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে চায় তাদের নাগরিক অধিকার হারানোর ঝুঁকি থাকে এবং সামাজিকভাবেও প্রচুর চাপের মুখোমুখি হতে হয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আরোপিত বিধি-নিষেধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

  • জর্ডানের সরকার যে কোনো ধর্মের স্বীকৃতি অস্বীকার করতে পারে।
  • বাহাই সম্প্রদায়, উপাসনালয় বা গোরস্থান প্রতিষ্ঠার অনুমতি নেই।
  • খ্রিস্টান ছাড়া অন্যান্য অমুসলিম সংখ্যালঘুদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা সমাধানে পৃথক আদালত নেই।
  • খ্রিস্টান মিশনারিদের মুসলমানদের কাছে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের অনুমতি নেই।

২০০৬ সালের জুনে সরকার সরকারি অফিসিয়াল গেজেটে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রকাশ করে। এই চুক্তির ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Chapter 1: Religious Affiliation"The World's Muslims: Unity and Diversityপিউ রিসার্চ সেন্টার। ৯ আগস্ট ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৫ 
  2. খুরশিদ, আহমাদ। "Propagation of Islam"। আল ইসলাম। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০১৬ 
  3. নিকি, অ্যাডাম (২৭ নভেম্বর ২০১২)। "Shiites in Jordan maintained low profile while marking Ashura observance"দ্য মিডিয়া লাইন। দ্য জিউইস জার্নাল। ২৫ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১৬ 
  4. কিলদানি, হান্না (৮ জুলাই ২০১৫)। "الأب د. حنا كلداني: نسبة الأردنيين المسيحيين المقيمين 3.68%" (Arabic ভাষায়)। Abouna.org। ৫ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুলাই ২০১৬ 
  5. জনস্টোন, প্যাট্রিক; মিলার, ডুয়ান (২০১৫)। "Believers in Christ from a Muslim Background: A Global Census"আইজেআরআর১১: ১৪। সংগ্রহের তারিখ ২০ নভেম্বর ২০১৫ 
  6. "Jordan International Religious Freedom Report 2005"। U.S. Department of State। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০৪-০৯ 
  7. US Department of State (2006), International Religious Freedom Report 2006. [১]
  8. البهائيون في الأردن
  9. "2018 Report on International Religious Freedom: Jordan"। ২০১৯-০৬-২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  10. "The Berkley Center for Religion, Peace, and World Affairs at Georgetown University: Religious Freedom in Jordan"। ২০১৫-০৭-১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-১১-১০ 
  11. الطائفة البهائية تتقدم بطلب اعتراف من الداخلية