কৌলীন্য প্রথা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

সম্মানলাভার্থে প্রজারা সৎপথে চলবে, এই উদ্দেশ্যে বল্লালসেন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন। শ্রোত্রিয়দের মধ্যে যাঁরা নবগুণবিশিষ্ট ছিলেন, বল্লাল তাঁদের কুলীন উপাধি দিয়েছিলেন। এই নবগুণগুলো হল : আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থ দর্শন, নিষ্ঠা, শান্তি, তপ ও দান। এগুলি 'কুল লক্ষণ' নামে পরিচিত।

কুলীন ও পরামানিক উপাধি প্রাপ্তি[সম্পাদনা]

বৈদ্যদের মধ্যে যারা ধার্মিক ও গুণবান এবং কায়স্থদের মধ্যে যারা শ্রোত্রিয়দের পরিচারক-সন্তান তারা কুলীন উপাধি পেয়েছিলেন।এভাবে ঘোষ, বসু, গুহ ও মিত্র বংশীয়রা কায়স্থরা কুলীন হল; তিলী, তাঁতি, কামার, কুমোর প্রভৃতি সৎশূদ্রদের গুণ ও সঙ্গতি দেখে বল্লাল তাদের শ্রেষ্ঠ লোকদের কুলীন করেছিলেন, এরাই মানী বা পরামানিক নামে পরিচিত হয়।

কৌলিন্য পরিবর্তন[সম্পাদনা]

বল্লাল নিয়ম করেছিলেন যে, প্রতি ছত্রিশ বছরের শেষে এক এক বার বাছাই হবে, এবং গতে গুণ ও কর্ম অনুযায়ী কুলীন ও অকুলীন নির্বাচিত হবে।সুতরাং কুলমর্যাদা লাভার্থে সবাই ধার্মিক ও গুণবান হতে চেষ্টা করবে।বল্লালের সেই আশা প্রথম প্রথম সফল হলেও লক্ষণসেনকৃত ব্যবস্থায় তা বংশানুক্রমিক হয়ে গিয়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

প্রবর্তক নিয়ে মতভেদ[সম্পাদনা]

কৌলিন্য প্রথার সৃষ্টি সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন কুলশাস্ত্রে বিভিন্ন মত দেখা যায়।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামগতি তর্করত্ন প্রভৃতি বিজ্ঞ রাঢ়ীয় পন্ডিতেরা বল্লাল সেন কেই কৌলিন্যের সৃষ্টিকর্তা বলেছেন।অথচ কোন কোন রাঢ়ীয় কুল শাস্ত্রে ধরাধর কর্তৃক রাঢ়ীয় শ্রোত্রিয় মধ্যে কুল মর্যাদা সৃষ্টি দেখা যায়।বাচস্পতি মিশ্র কৃত কুল শাস্ত্রের সাথে বারেন্দ্র কুল শাস্ত্রের কিছু ঐক্য আছে।

রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ[সম্পাদনা]

শান্ডিল্য গোত্রীয় বন্ধ্যঘাটিগ্রামবাসী, কাশ্যপ গোত্রীয় চট্টগ্রামবাসী, ভরদ্বাজ গোত্রিয় মুখুটিগ্রামী, সাবর্ণী গোত্রীয় গাঙ্গুলি ও কুন্দলাল গ্রামী এবং বাৎস্য গোত্রীয়, ঘোষাল, কাঞ্জিলাল এবং পুতিতুন্ড এই আট গ্রামীরা রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।

কৌলিন্য প্রথার মর্যাদা[সম্পাদনা]

কৌলিন্য মর্যাদা বাঙালীদের জীবনাধিক গুরুতর গণ্য ছিল।অনেকে সর্বস্ব বিক্রয় করে কুলমর্যাদা রক্ষা করতেন।কেউ কেউ অশীতিপর বৃদ্ধের সাথে সপ্তবর্ষীয় কন্যার বিবাহ দিয়ে কুল বাঁচাতেন।এমনকী রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেক সময় কুল মর্যাদা রক্ষায় ধর্মশাস্ত্রের বিধান লঙ্ঘিত হত এবং পঞ্চাশ বছর বয়স্কা কুমারীকে দশবর্ষীয় বালকের সাথে নামমাত্র বিবাহ দিয়ে কুলমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হত।পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি সুদীর্ঘ চারশ বছর বল্লালী কুলমর্যাদাই উচ্চ শ্রেণীর বাঙালীদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল।

কায়স্থ কুলীন[সম্পাদনা]

বঙ্গরাজ দেবপাল গৌড় নগর থেকে কয়েক ঘর কায়স্থ এনে বঙ্গদেশে স্থাপন করেন।তাদের সঙ্গে তিনি বিবাহ আদান প্রদান করে নিজে তাদের সমাজে মিলিত হন।সেই বঙ্গজ কায়স্থরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে বঙ্গজ ও দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ বলে পরিগণিত হয়।এদেরকে বল্লাল কৌলিন্য মর্যাদা দেন।

রাঢ়ী ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ[সম্পাদনা]

বল্লাল সেন কনৌজের ভট্টশালীগ্রাম-নিবাসী শ্রোত্রিয়দের বসবাসের অসুবিধা দূর করার জন্য নিজের প্রকান্ড রাজ্যের নানা স্থানে পাঠিয়ে তাঁদের ভরণ-পোষণের যোগ্য ব্রহ্মত্র দিয়েছিলেন।এদের মধ্যে একশ ঘর গঙ্গার বাম পারে বরেন্দ্রভূমিতে বাসস্থান পেয়ে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ নামে খ্যাত হন আর ছাপ্পান্ন ঘর গঙ্গার অপর পারে রাঢ়দেশে ব্রহ্মত্র লাভ করে রাঢ়ী ব্রাহ্মণ আখ্যা প্রাপ্ত হন।রাঢ়ী ও বারেন্দ্র বিভাগ ব্রাহ্মণ ছাড়াও বৈদ্য, কায়স্থ ও অধিকাংশ অপর জাতীর মধ্যেও ছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস, দুর্গাচন্দ্র সান্যাল, মডেল পাবলিসিং হাউস, ISBN 81-7616-067-9.