কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

চিরায়ত বলবিজ্ঞান আমাদের চারপাশের জগতের অনেক ঘটনা নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। আইজাক নিউটন ১৬৮৬ সালে তাঁর বিখ্যাত বই Philosophiae Naturalis Principia Mathematica, সংক্ষেপে প্রিঙ্কিপিয়া মাতেমাতিকা-তে চিরায়ত বলবিজ্ঞানের মূলসূত্রগুলি লিপিবদ্ধ করেন। এরপর প্রায় দুইশ বছর ধরে এই সূত্রগুলিই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমস্ত ঘটনাবলির তাত্ত্বিক ব্যখ্যার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু ১৯শ শতকের শেষের দিকে এসে পরমাণুর ইলেক্ট্রনীয় গঠন ও আলোর ধর্মের উপর কিছু আবিষ্কার চিরায়ত বলবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন বুঝতে পারেন যে চিরায়ত বলবিজ্ঞানের ধারণাগুলি অত্যন্ত দ্রুত গতিবেগের, অর্থাৎ আলোর গতিবেগের কাছাকাছি বেগের বস্তুর ওপর প্রয়োগ করা যায় না। তিনি এটা ব্যাখ্যা করার জন্য নির্মাণ করেন আপেক্ষিকতাভিত্তিক বলবিজ্ঞান নামের শাস্ত্র। চিরায়ত বলবিজ্ঞান নীতিগতভাবে ভ্রান্ত হলেও ধীর গতিবেগের বস্তুসমূহের জন্য এটিকে আপেক্ষিকতাভিত্তিক বলবিজ্ঞানের একটি ভাল আসন্নীকরণ হিসেবে গণ্য করা যায়। প্রায় একই সময়ে পদার্থবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করেন যে চিরায়ত বলবিজ্ঞানের ধারণাগুলি অত্যন্ত ক্ষুদ্র বস্তুর ওপরেও প্রয়োগ করা যায় না। ১৯০০ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে বেশ কিছু পদার্থবিজ্ঞানী (মাক্স প্লাংক, নিল্‌স বোর, আলবার্ট আইনস্টাইন, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, লুই দ্য ব্রয়ি, এর্ভিন শ্র্যোডিঙার, প্রমুখ) কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান উদ্ভাবন করেন। চিরায়ত বলবিজ্ঞান নীতিগতভাবে ভ্রান্ত হলেও বড় আকারের বস্তুসমূহের জন্য এটিকে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের একটি ভাল আসন্নীকরণ হিসেবে গণ্য করা যায়।

কোয়ান্টায়ন ও প্লাংক[সম্পাদনা]

মাক্স প্লাংক কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সংক্রান্ত পরীক্ষার ফলাফল বর্ণনা করতে গিয়ে কোয়ান্টায়ন ধারণার সূত্রপাত করেন। বিজ্ঞানীরা কম্পাঙ্ক ও তাপমাত্রার সাপেক্ষে কৃষ্ণবস্তুর বিকিরিত শক্তি পরিমাপে আগ্রহী ছিলেন। পরীক্ষালব্ধ তথ্যের পরিমাণ ব্রৃদ্ধি পাওয়ার সাথে তাঁরা এগুলিকে সমীকরণের সাহায্যে প্রকাশ করার প্রয়াস নেন। কিন্তু দেখা গেল ভিলহেল্ম ভিনের দেয়া একটি সমীকরণ উচ্চ-কম্পাঙ্কের উপাত্ত সঠিকভাবে উপস্থাপন করে, আবার জন উইলিয়াম স্ট্রাট, লর্ড রেলির প্রস্তাবিত একটি সমীকরণ নিম্ন কম্পাংকের উপাত্তের জন্য একই রকম সঠিক ফল দেয়। কিন্তু এই সমীকরণ দুইটি ছিল একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, এবং এগুলি কীভাবে একত্রে একটি সমীকরণ দ্বারা নির্দেশ করা যাবে, তা বোঝা যাচ্ছিল না।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী সমস্ত কম্পাংকের জন্য এই সমীকরণটি বের করার চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাক্স প্লাংক এটি সমাধা করেন। তিনি তাপগতিবিজ্ঞানের নীতি ব্যবহার করে এমন একটি সূর বের করেন যা উচ্চ কম্পাংকের জন্য ভিনের সূত্র এবং নিম্ন কম্পাংকের জন্য রেলির সূত্রের সাথে মিলে যায়। তিনি তাঁর গবেষণার ফলাফল ১৯০০ সালের ১৯শে অক্টোবর জার্মান পদার্থবিজ্ঞান সমিতিতে উপস্থাপন করেন। সূত্রটি পরবর্তীকালে প্লাংকের বিকিরণ বিধি নামে পরিচিতি লাভ করে।

কিন্তু প্লাংক তাঁর নিজের সমাধান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে, পরিসংখ্যানিক বলবিজ্ঞান ব্যবহার করে সমস্যাটি দেখার চেষ্টা করেন। পরিসংখ্যান বলবিজ্ঞানে বিপুলসংখ্যক কণাবিশিষ্ট সিস্টেমসমূহের আচরণ বর্ণনা করা হত। লুডভিগ বোলৎসমান চিরায়ত বলবিজ্ঞান ব্যবহার করে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এই শাখার গোড়াপত্তন করেন। বোলৎসমানের পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গিয়ে প্লাংক এই অনুমানটির আশ্রয় নেন যে n কম্পাংকের আলোর শক্তি E মৌলিক শক্তি e-এর পূর্ণসংখ্যা গুণিতক হবে। সুতরাং শক্তি E কোয়ান্টায়িত, এবং প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ক্ষুদ্রতম সম্ভাব্য শক্তি একক e-এর গুণিতক হারে বিচ্ছিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়। প্লাংকের প্রস্তাবিত এই শক্তি উপাদান এককগুলি কোয়ান্টা নামে পরিচিতি লাভ করে। প্লাংক এই কোয়ান্টামে শক্তির পরিমাণও নির্ধারণ করেন। এর আগে প্লাংক কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি নতুন ধ্রুবকের অবতারণা করেন, যার মান ছিল ৬.৫৫ x ১০ ^ -২৭ আর্গ-সেকেন্ড। এই ধ্রুবক প্লাংকের ধ্রুবক নামে পরিচিত এবং এর সার্বজনীন প্রতীক h। প্লাংক বললেন যে v কম্পাংকের আলোর প্রতিটি কোয়ান্টামের শক্তি e নিচের সমীকরণে পাওয়া যায়,

 \epsilon = h \nu \,

প্লাংক তাঁর এই নতুন গবেষণার ফলাফল ১৯০০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর জার্মান পদার্থবিজ্ঞান সমিতির এক সভায় Uber das Gesetz der Energieverteilung im Normalspectrum ("Normalspectrum"-এ শক্তি বণ্টন বিধির তত্ত্ব প্রসঙ্গে) নামের গবেষণাপত্র আকারে পাঠ করেন। এই তারিখটিকেই ইতিহাসবিদেরা কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের জন্মতারিখ হিসেবে গণ্য করেন।

কিন্তু প্লাংকের গবেষণায় বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা ছিল, আর অত্যন্ত দূরূহ গাণিতিক ভাষায় লেখা হয়েছিল বলে পদার্থবিজ্ঞানী মহল তাৎক্ষণিকভাবে এটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। তবে আইনস্টাইন প্লাংকের গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য, অর্থাৎ কোয়ান্টায়নের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে প্রস্তাব করলেন যে যেকোন একবর্ণ আলোকরশ্মি অনেকগুলি কোয়ান্টামের সমন্বয়ে গঠিত যেগুলির প্রতিটির শক্তি hv। এই নতুন অনুমান কাজে লাগিয়ে আইনস্টাইন অত্যন্ত সহজভাবে আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন। ১৮৯৯ সালে জোসেফ জন থমসনফিলিপ লেনার্ড পরস্পর স্বাধীনভাবে ধাতব পৃষ্ঠতলের ওপর আলো ফেলে দেখেছিলেন যে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি কম্পাঙ্কের আপতিত রশ্মির জন্য সেগুলি থেকে ইলেকট্রন ছিটকে বেরিয়ে আসে। বিচ্ছুরিত ইলেক্ট্রনগুলির বেগ আলোর কম্পাঙ্কের ওপর এবং এদের সংখ্যা আলোর প্রাবল্যের ওপর নির্ভর করে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Hanle, P.A. (1977) Erwin Schrodinger's Reaction to Louis de Broglie's Thesis on the Quantum Theory. Isis, Vol. 68, No. 4 (Dec., 1977), pp. 606–609

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]