কলিতা জনগোষ্ঠী
| উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল | |
|---|---|
| অসম | |
| ভাষা | |
| অসমীয়া ভাষা | |
| ধর্ম | |
উত্তর-পূর্ব ভারত তথা অসমের অন্যতম প্রাচীন এবং আদিবাসী ভূমিপুত্র জনগোষ্ঠী বা জনজাতি হলো কলিতা। পৌরাণিক প্রাগজ্যোতিষপুর তথা কামরূপ রাজ্যের অধিবাসী ছিলেন এই কলিতারা। রাজা ভগদত্ত, কুমার ভাস্কর বর্মা, পৃথুর মতো প্রবল প্রতাপশালী কলিতা পূর্বপুরুষ রাজারা প্রাচীন কামরূপ তথা প্রাগজ্যোতিষপুরে শাসন করেছিলেন।
কলিতারা প্রধানত অসমের একটি কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী। প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে অসমে বসবাস করে আসা এই ভূমিপুত্র জনগোষ্ঠীটি কৃষিকাজ, কুমোর, কাঁসারু, তাঁতি ইত্যাদি কর্মের সাথে জড়িত থেকে এক নিজস্ব গোষ্ঠীগত পরিচয় বহন করে আসছে। অসমে লাঙল দিয়ে জমি চাষ করার উন্নত মানের কৃষি পদ্ধতি কলিতাই প্রথম শুরু করেছিলেন।
কলিতা নারীরা নিজেদের ঘরের তাঁতশালে স্ব-জনগোষ্ঠীয় পোশাক যেমন—মেখলা-চাদর, গামোচা, পুরুষদের জন্য কামিজ, এড়ি চাদর ইত্যাদি নিজেরাই তৈরি করে নিতেন। অসমে কলিতাদের এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং গোষ্ঠীগত পরিচয় অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নৃ-গোষ্ঠীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার জন্য অসমের ভূমিপুত্র আদিবাসী কলিতারা বর্ণসংকর প্রজন্ম সৃষ্টি করার পক্ষপাতী নন। সেই কারণে অন্য জাতি বা গোষ্ঠীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে তারা খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেন না; যদিও গত কিছু বছর ধরে কলিতাদের যথেষ্ট পরিমাণে অন্য জনগোষ্ঠীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে।
এই জনগোষ্ঠীর লোকেদের অসমের পাহাড়ি বা সমতল—উভয় অঞ্চলেই বসবাস করতে দেখা যায়। কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যয়নের মাধ্যমে কলিতা জনগোষ্ঠীর লোকেরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করেন। নিম্ন অসমে উদযাপিত কৃষিভিত্তিক উৎসব 'মহোহো', 'ভঠেলি' ইত্যাদি কলিতাদের মূল উৎসব।
প্রাগজ্যোতিষপুরের মূল অধিবাসী কলিতারা আহোম রাজত্বকালেও বহু গুরুত্বপূর্ণ পদমর্যাদায় আসীন ছিলেন। আহোম রাজত্বকালে কর্ম-সূত্রে লাভ করা বেশ কিছু উপাধিও কলিতাদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। কলিতাদের পূর্বপুরুষ কুমার ভাস্কর বর্মার আমন্ত্রণে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৪২-৪৩ খ্রিস্টাব্দে কামরূপে অতিথি হিসেবে এক মাস কাটিয়েছিলেন। এই এক মাস রাজকীয় অতিথি সেবায় তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং কামরূপের কিছু ভৌগোলিক ও জীবনযাত্রা বিষয়ে লিখে রেখে গেছেন। [১]
উৎপত্তি
[সম্পাদনা]কিংবদন্তি উৎস
[সম্পাদনা]পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, কালিতাদের শুদ্ধ আর্য বলে মনে করা হয়, তবে এটিকে সম্পূর্ণ সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।[২] আর্য বংশোদ্ভব–সংক্রান্ত মতবাদ অনুযায়ী, বর্তমান পেশাভিত্তিক জাতিগুলো গড়ে ওঠার আগেই কালিতাদের আগমন ঘটেছিল। তবে কালিতারা সাধারণত নিজেদের ক্ষত্রিয় বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে এবং নিজেদের ‘কুললুপ্ত’ বলে পরিচয় দেয়।[৩] এখানে ‘কুল’ অর্থ জাতি এবং ‘লুপ্ত’ অর্থ বিলুপ্ত বা হারিয়ে যাওয়া জাতি। কিংবদন্তি অনুযায়ী, কালিতারা এমন ক্ষত্রিয় যারা পরশুরামের ক্রোধের ভয়ে পালিয়ে আসামে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল, কারণ পরশুরাম ক্ষত্রিয়দের নিধন করতে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।[৪]
উৎপত্তির অন্যান্য অনুমান
[সম্পাদনা]কিংবদন্তি অনুযায়ী, কালিতারা ছিলেন “অবৈদিক আর্য”, যারা আসামে আর্য সংস্কৃতির সূচনা করেন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যাওয়ার পরেও তারা তাদের সংস্কৃতি কিছুটা পরিবর্তন করলেও আজও আর্য সংস্কৃতির কিছু উপাদান সংরক্ষণ করে রেখেছে।[৫]
বি. এস. গুহা লক্ষ্য করেন যে গুজরাটের “আল্পাইন নগর ব্রাহ্মণ” সম্প্রদায়ের কিছু পদবীর সঙ্গে উত্তর–পূর্ব ভারতের কিছু পদবীর মিল রয়েছে। এই পদবীগুলোর উল্লেখ ষষ্ঠ শতাব্দীর কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মণের নিধানপুর তাম্রশাসনে পাওয়া যায়। যেমন—দত্ত, ধারা, দেব, নন্দী, সেন, বসু ইত্যাদি। তিনি এসব পদবীকে আসামের কালিতাদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।[৬] তবে ইতিহাসবিদ কানকলাল বড়ুয়া বলেন, এই পদবীগুলো বর্তমানে প্রায় একান্তভাবেই বাঙালি কায়স্থদের মধ্যে ব্যবহৃত হয়।[৭]
কে. আর. মেধি, কে. এল. বড়ুয়া, পি. সি. চৌধুরী, এম. নেয়োগ, বি. কে. কাকাতি প্রমুখ কয়েকজন গবেষক গ্রিক নথি, কাকাতিয়াই, কালাইয়াই, কাল্টিস, কৌদন্তাই, কুদুতাই, গুরুচারিতিস ইত্যাদি শব্দ এবং প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থের উল্লেখ থেকে কালিতাদের উৎপত্তি সম্পর্কে অনুমান করেছেন। তবে এসব গবেষণা নৃতত্ত্ব বা মানববিদ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়। বি. সি. অ্যালেনের মতে, ব্রাহ্মণ ও বোড়ো–কচারির মতো আদিবাসী গোষ্ঠী বাদে আসামের প্রায় সব হিন্দু সম্প্রদায়ই এক সময় কালিতা হিসেবে পরিচিত ছিল।[৮]
নিম্ন আসামের ইতিহাসের সঙ্গে মিল রেখে এক সময় কালিতাদের কোচ জাতিগোষ্ঠীর অংশ বলে মনে করা হতো।[৯] কোচ জাতির আদি পুরোহিত শ্রেণি হিসেবে কালিতারাই দায়িত্ব পালন করত।[১০] কিন্তু বিশ্ব সিংহ ব্রাহ্মণদের আসামে আনবার পর কালিতারা তাদের সেই পুরোহিতের মূল অবস্থান থেকে সরে যায়।[১১][১২] উচ্চ আসামে কালিতারা অসমীয়া সমাজের উপজাতি–বর্ণ ধারাবাহিকতায় সর্বোচ্চ স্তরের শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত। এখানে সাধারণত কাচারি, গারো, লালুং, মিকির প্রভৃতি উপজাতির কোনো ব্যক্তি একজন গুরুর মাধ্যমে একটি সত্ৰে দীক্ষা গ্রহণ করে।[১৩] এরপর সে ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো বিশ্বাস ও রীতিনীতি ত্যাগ করে হিন্দু সমাজব্যবস্থার নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করে। এছাড়াও দেখা যায়, সমাজে ওপরে ওঠার আশায় কিছু নিম্নবর্ণের মানুষ—যেমন সুৎ বা দুলিয়া (নাথ যোগীদের একটি শাখা)—নিজেদের সুৎ কালিতা বা দুলিয়া কালিতা বলে পরিচয় দেয়। একই কারণে কুমার, কোমার, সোনারি, কাটানি, নট (নৃত্যশিল্পী) প্রভৃতি কারিগর শ্রেণির মানুষও নিজেদের নামের সঙ্গে কালিতা শব্দটি যোগ করে।[১৪]
সংরক্ষণের দাবি
[সম্পাদনা]১৯৮৮ সাল থেকে কালিতা সম্প্রদায়ের একাংশ মানুষ নিজেদের তফসিলি উপজাতি মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।[১৫][১৬] অল আসাম কালিতা জনগোষ্ঠী ছাত্র ইউনিয়ন সরকারী চাকরিতে ৫০% সংরক্ষণ এবং আসাম বিধানসভায় ২৫টি আসন, লোকসভায় ৩টি আসন ও রাজ্যসভায় ২টি আসন সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে।[১৭]
এছাড়াও তারা কালিতা উন্নয়ন পরিষদ এবং পাগজ্যোতিষপুর স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ গঠনের দাবিও তুলে ধরেছে।[১৮]
উল্লেখযোগ্য কালিতা
[সম্পাদনা]- মণিরাম দেওয়ান, (১৭ এপ্রিল ১৮০৬ - ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৮) স্বাধীনতা সংগ্রামী, আসামে চা বাগান প্রতিষ্ঠাকারী প্রথম ব্যক্তিদের একজন।[১৯]
- বাণীকান্ত কাকতি, (১৫ নভেম্বর ১৮৯৪ - ১৫ নভেম্বর ১৯৫২) অসমীয়া ভাষার একজন বিশিষ্ট ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, সমালোচক এবং পণ্ডিত ছিলেন। সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান এবং তুলনামূলক ধর্মের ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ অবদান ছিল।
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Study traces Kalitas to Himachal in 4122 BC | Guwahati News - Times of India"। The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ Manilal Bose (১৯৯৮)। Social and Cultural History of Ancient India। Concept Publishing Company। পৃ. ২৯। আইএসবিএন ৯৭৮৮১৭০২২৫৯৮০। ২১ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৪ অক্টোবর ২০১৪।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|work=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - ↑ Col Ved Prakash (২০০৭)। India, Northeastern। Atlantic Publishers & Dist। পৃ. ১৫০। আইএসবিএন ৯৭৮৮১২৬৯০৭০৩৮। ২২ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ অক্টোবর ২০১৪।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|work=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - ↑ S. K. Sharma; U. Sharma, সম্পাদকগণ (২০০৫)। Discovery of North-East India: Geography, History, Culture, Religion, Politics, Sociology, Science, Education and Economy. North-East India. Volume 1। Mittal Publications। পৃ. ৯৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৩-২৪০৩৫-২। ১৭ এপ্রিল ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০২০।
- ↑ G.K. Ghosh (২০০৮)। Bamboo: The Wonderful Grass। APH Publishing। পৃ. ১৮৪। আইএসবিএন ৯৭৮৮১৩১৩০৩৬৯৬। ২৩ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ অক্টোবর ২০১৪।
- ↑ The Great Indian Corridor in the East (ইংরেজি ভাষায়)। Mittal Publications। ২০০৭। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৩২৪-১৭৯-৩।
- ↑ S. K. Sharma; U. Sharma, সম্পাদকগণ (২০০৫)। Discovery of North-East India: Geography, History, Culture, Religion, Politics, Sociology, Science, Education and Economy. North-East India. Volume 1। Mittal Publications। পৃ. ১৮২। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৩-২৪০৩৫-২। ১ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.
- ↑ Bharat, E. T. V. (১৮ জুলাই ২০২৩)। "Kalita community demands ST status: কলিতা জনগোষ্ঠীয়ে তুলিছে জনজাতিকৰণৰ দাবী"। ETV Bharat News (অসমীয়া ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "After six indigenous communities now Kalita community demands ST status, 50% reservations in jobs - Prag News"। Prag News (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "After six indigenous communities now Kalita community demands ST status, 50% reservations in jobs - Prag News"। Prag News (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ Desk, Sentinel Digital (২ জুলাই ২০২০)। "All Kalita Students' Union (AKSU) to fight poll | Assam Assembly election in 2021"। The Sentinel - of this Land, for its People (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০২৫।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}:|শেষাংশ=প্যারামিটারে সাধারণ নাম রয়েছে (সাহায্য) - ↑ S.L. Barua, A Comprehensive History of Assam, p. 15.