ককাটিয়েল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
ককাটিয়েল
Cockatielmale.jpg
পুরুষ / নর
Cockatielfemale.jpg
স্ত্রী / মাদি
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: Animalia
পর্ব: কর্ডাটা
শ্রেণী: পক্ষী
বর্গ: Psittaciformes
মহাপরিবার: Cacatuoidea
পরিবার: Cacatuidae
উপপরিবার: Nymphicinae
গণ: Nymphicus
ভাগলার, 1832
প্রজাতি: N. hollandicus
দ্বিপদী নাম
Nymphicus hollandicus
(কের, 1792)
Bird range cockatiel.png
ককাটিয়েলের বিস্তৃতি (লাল করা অংশ; সারাবছর পাওয়া যায়)
প্রতিশব্দ

Psittacus hollandicus
Leptolophus hollandicus

ককাটিয়েল হল কাকাতুয়া পরিবারের একটি পাখি । ককাটিয়েলকে ক্যারিওন এবং উইরো নামেও ডাকা হয় । বাংলাদেশে এটি 'ককাটেল' বা 'ককাটেল পাখি' নামেই বেশি পরিচিত । ককাটিয়েল মূলত অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের এন্ডেমিক প্রাণী; এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphicus hollandicus । বন্য প্রজাতি হিসেবে একে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া কোথাও পাওয়া না গেলেও বিশ্বব্যাপি এটি খাঁচায় পোষা গৃহপালিত পাখি হিসেবে পালিত হয় । সহজে বাচ্চা উৎপাদন, সৌন্দর্য ও আরও কিছু কারণে এটি বাজিরিগার এর পরে খাঁচায় পোষা দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রজাতি

ককাটিয়েল Nymphicus গণ এর একমাত্র প্রজাতি । পূর্বে এটিকে ঝুঁটিওয়ালা তোতা বা ছোট কাকাতুয়া হিসেবে বিবেচনা করা হত । সাম্প্রতিককালের মলিকিউলার গবেষণা ককাটিয়েলকে এটির নিজস্ব উপগোত্র Nymphicinae তে অন্তর্ভুক্ত করেছে । এটি এখন কাকাতুয়ার পরিবার Cacatuidae গোত্রের ক্ষুদ্রতম উপগোত্র হিসেবে পরিচিত । ককাটিয়েলের উৎপত্তি ও বিচরণ অস্ট্রেলিয়ায় । অস্ট্রেলিয়ান জলাভূমি, বুনো ঝোপঝাড় ও গুল্মভুমিগুলোতে এদের আবাসস্থল, বসবাস ।

শ্রেণীবিন্যাস ও উৎপত্তি[সম্পাদনা]

১৭৯৩ সালে সর্বপ্রথম স্কটিশ লেখক ও প্রকৃতিবিদ রবার্ট কের ককাটিয়েলের দ্বিপদ নামকরণ করেন । মূলত তিনি ককাটিয়েল বা ককাটিলকে Psittacus hollandicus নামে বর্ণিত করেন । পরবর্তীতে ভাগলার ১৮৩২ সালে ককাটিয়েলকে এটির নিজস্ব গণ Nymphicus এ লিপিবদ্ধ করেন । ককাটিয়েল এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphicus hollandicus হবার পেছনে একটি সুন্দর গল্প আছে । ইউরোপের পাখি দেখার দলগুলোর মধ্যে প্রথমদিককার একটি দল, যারা পাখিদের, তাদের নিজেদের বাসস্থানে পর্যবেক্ষণ করতে বেড়িয়েছিল; তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে ককাটিয়েলের গণ নামটি এসেছে । প্রথমবার পাখিটিকে দেখার পর তারা এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়েন যে, পৌরাণিক জলপরী নিম্ফের নামে এটির নামকরণ করে ফেলেন । অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক নাম New Holland থেকে ককাটিয়েল প্রজাতির Specific name hollandicus নেয়া হয়েছে ।

জীববিজ্ঞান, বিশেষ করে শ্রেণীবিন্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকে কাছাকাছি অন্যন্য প্রজাতির সাথে ককাটিয়েলের জৈবিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন বিতর্কিত একটি বিষয় ছিল । এখন এটিকে এটির মনোটাইপিক উপগোত্র Nymphicinae এ শ্রেণীবদ্ধ করা হলেও আগে এটিকে লম্বা লেজের তোতাদের গোত্র Platycercinae এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল । পরে এই সমস্যাটি আনবিক গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করা হয় । প্রোটিন অ্যালোজাইমের উপর ১৯৮৪ সালের একটি গবেষণা থেকে জানা যায় প্রজাতি হিসেবে ককাটিয়েল তোতাদের চাইতে কাকাতুয়ার খুব কাছাকাছি সম্পর্কের । এর মাইটোকন্ড্রিয়াল 12S rRNA সিকুয়েন্স তথ্য একে শ্যামা কাকাতুয়ার উপগোত্র Calyptorhynchinae এর অন্তর্ভুক্ত করে । বাসস্থানের পরিবেশগত পরিবর্তন ও আকারে ছোট হতে থাকার প্রভাব পড়ে লম্বা লেজবিশিষ্ট তোতা বা প্যারাকিট এর অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যে ।

ককাটিয়েল Calyptorhynchinae উপগোত্রের গণগুলোর ভেতর অন্তর্ভুক্ত হবার চাইতে যে Nymphicinae উপগোত্রে বেশি উপযোগী তা প্রমাণ করে এর কোষীও নিউক্লিয়াসের ফাইব্রিনোজেন জিনের ইনট্রন ৭ নিউক্লিওটাইডের সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করা আরেকটি গবেষণা ।

ককাটিয়েল এখন Cacatuidae পরিবারের জৈববৈজ্ঞানিকভাবে শ্রেণীবিন্যাসকৃত সদস্য । কাকাতুয়া পরিবারের জৈবিক বৈশিষ্ট্য যেমন, খাঁড়া ঝুঁটি, পিত্তাশয়, নিচের দিকের পাউডার পালক, পালকে সাজানো নীল ও সবুজ রঙয়ের মাঝে চাপা মেঘের মত স্তর এবং ঠোঁটের চারপাশে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মুখের পালক যেগুলো Cacatuidae গোত্রের বাইরে খুব কম দেখা যায়, সেই বৈশিষ্ট্যগুলো ককাটিয়েলের মধ্যে পাওয়া যায় ।

জীবনকাল[সম্পাদনা]

খাঁচাবন্দি ককাটিয়েল সাধারণত ১৬ থেকে ২৫ বছর বাঁচে । রেকর্ড অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে ককাটিয়েল ১০ থেকে ১৫ বাঁচে; ককাটিয়েলের ৩২ বছর বেঁচে থাকারও রেকর্ড আছে । একটি ককাটিয়েল পাখি অবশ্য ৩৬ বছর বেঁচে ছিল । এগুলো সাধারণত নির্ভর করে খাবার, পরিবেশ আর ওড়ার জায়গার উপর ।

বাসস্থান ও বিস্তরণ[সম্পাদনা]

ককাটিয়েল অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় পাখি । যেসব অঞ্চলে মরু, বিস্তৃত অনুর্বর ভূমি বা কিছুটা শুস্ক বিস্তীর্ণ ভূমি আছে, সেসব অঞ্চলে এদের বেশি দেখা গেলেও সবসময় পানির কাছাকাছি থাকে । এরা যাযাবর শ্রেণীর পাখি । যেখানে খাবার আর পানির প্রাচুর্য, সেখানে এরা উড়ে যেতে সময় নেয় না । প্রকৃতিতে ককাটিয়েলকে সাধারণত জোড়া বা ছোট ঝাঁক হিসেবে পাওয়া যায় । অনেক সময় অনেকগুলো ককাটিয়েলকে একসাথে ঝাঁক বেঁধে পানি খেতে দেখা যায় । অনেক কৃষকের কাছে এরা মূর্তিমান আতঙ্ক । এরা প্রায়ই ক্ষেতে হামলা করে চাষ করা ফসল খেয়ে আসে । অস্ট্রেলিয়ার অতি উর্বর দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, সুবিশাল ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মরুভূমিতে এবং কেপ ইয়র্ক পেনিনসুলা উপদ্বীপে এরা অনুপস্থিত । ককাটিয়েল একমাত্র কাকাতুয়া প্রজাতি যারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্মের প্রথম বছরের শেষের দিকেই বাচ্চা দেয়া শুরু করে দেয় ।

যৌন দ্বিরুপতা[সম্পাদনা]

প্রকৃতিতে বাচ্চা ককাটিয়েলকে নর / মাদিতে আলাদা করা খুব কঠিন । ডিম ফোটার পর থেকে প্রথম পালক বদলানোর আগ পর্যন্ত সব বাচ্চা ও অল্পবয়স্ক ককাটিয়েলকে দেখতে মাদির মত লাগে । এদের লেজের পালকের অঙ্কিয় তলে আনুভূমিক হলুদ রঙ্গের সরু রেখা বা চিকন দাগ দেখা যায় । পাখায় ওড়ার প্রাথমিক পালকের অঙ্কিয় বা নিচের দিকে বিন্দু বিন্দু হলুদ রঙ্গের ফোঁটা থাকে । মাথা ও ঝুঁটি ধূসর রঙ্গের হয় এবং প্রত্যেক বাচ্চার গলায় হাল্কা কমলা রঙ্গের দাগ থাকে ।

বেশিরভাগ পাখিপ্রজাতির মধ্যেই যৌন দ্বিরুপতা বিদ্যমান । প্রাপ্তবয়স্ক ককাটিয়েল যৌন দ্বিরুপী হয় । ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার ছয় থেকে নয় মাসের মাথায় ককাটিয়েল প্রথমবার পালক বদলায় । এসময় এদের যৌন দ্বিরুপতা অর্থাৎ নর ও মাদির আলাদা বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে । পুরুষ পাখির ক্ষেত্রে এদের পাখা ও লেজের পালকের নিচের দিকের হলুদ বা হলুদাভ অথবা সাদা বা সাদাভ রেখা, ফোঁটা ও দাগগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় । ঝুঁটি ও গলার ধূসর পালকগুলো পরিবর্তিত হয়ে গাঢ় হলুদ রঙ্গের পালকে পরিণত হয় । এসময় গলার কমলা দাগটি আরো উজ্জ্বল ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে । স্ত্রী পাখির ক্ষেত্রে মুখ ও ঝুঁটির পালক সাধারণত ধূসরই থাকে । তবে এদের গলায়ও কমলা দাগ থেকে যায় । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্ত্রী পাখির লেজের পালকের নিচের দিকের আনুভূমিক দাগ ও রঙগুলো আগের মত থেকে যায় ।

ককাটিয়েলের পালক ও অন্যান্য রঙ আসে মূলত দুটি রঞ্জক থেকেঃ মেলানিনলাইপোক্রোম । ককাটিয়েলের পালক, চোখ, ঠোঁট ও পায়ের রঙ ধূসর হয় মেলানিনের কারণে । আর মুখ ও লেজের হলুদ রঙ এবং গলার কমলা রঙ আসে লাইপোক্রোম থেকে । যদি কোন রঙের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের ক্ষেত্রে, যেমন পালকের রঙ ধূসর নাকি হলুদ অথবা কমলা হবে এক্ষেত্রে মেলানিন ও লাইপোক্রোম দুটি রঞ্জকই উপস্থিত থাকলে মেলানিন সবসময় লাইপোক্রোম এর বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বাঁধা দিয়ে ধূসর রঙের পালক সৃষ্টি করে ।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষ পাখির মুখের দিকে মেলানিনের পরিমাণ কমে লাইপোক্রোমকে জায়গা ছেড়ে দেয় । তাই লাইপোক্রোম এর প্রভাবে পুরুষ পাখির মাথা, গলা ও মুখমণ্ডল অঞ্চলে হলুদ ও কমলা রঙ স্পষ্ট হয়ে প্রভাব বিস্তার করে । এসময় দেহের নিচের দিকে মেলানিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় লেজের পালকের হলুদ রঙগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় ।

আরেকটি পরিবর্তন আসে গলার স্বরে । প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির ডাক স্ত্রী পাখির তুলনায় আরো তীব্র ও গাঢ় হয় ।

প্রকৃতিতে ককাটিয়েল (নর ও মাদি), পিকেডেল, সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া

রঙের পরিব্যক্তি[সম্পাদনা]

চিত্রকর্মে ব্যবহার[সম্পাদনা]

ছবির গ্যালারী[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

পড়ে দেখতে পারেন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Cockatoos