উপসম্পদা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মিয়ানমারের একটি বৌদ্ধবিহারে একজন শ্রমণ ভিক্ষুর উপসম্পদা চলছে

উপসম্পদা (পালি) হচ্ছে একজন বৌদ্ধ সন্যাসির প্রব্রজ্যা স্তরের শ্রমণ ভিক্ষুদের (নবীন ভিক্ষু) থেকে একজন পরিণত ও পূর্ণাঙ্গ ভিক্ষুতে রূপান্তরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বৌদ্ধধর্মীয় রীতি অনুসারে বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত (সাধারণত পনেরো বছর বয়সী) গৃহত্যাগী বালকদের প্রাথমিকভাবে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করা হলে তারা তখন প্রব্রজ্যা স্তরে থাকে। এই স্তরের ভিক্ষু বা সন্যাসীদের শ্রমণ বলা হয়। [১]

শ্রমণ ভিক্ষুরা প্রব্রজ্যা স্তরে নিয়মিত একজন পূর্ণাঙ্গ ভিক্ষুর অধীনে বৌদ্ধধর্মশাস্ত্র, ধর্মীয় রীতিনীতি-আচারুনুষ্ঠান সহ সকল আনুষঙ্গিক নিয়মকানুন শিখে। এই প্রব্রজ্যা স্তর শেষে পরিপূর্ণ ধর্মীয় দীক্ষালাভের পর একজন পরিপূর্ণ বৌদ্ধভিক্ষুতে রূপান্তরিত হওয়াকেই উপসম্পদা বলে। [২][৩]

বয়স[সম্পাদনা]

বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সব নিয়ম-কানুনের সংকলন বিনয় পিটক অনুসারে, একজন শ্রমণকে উপসম্পদা গ্রহণের মাধ্যমে পরিণত ভিক্ষু হতে হলে তাকে অবশ্যই কমপক্ষে বিশ বছর বয়সী হতে হবে। [৩] তবে বৌদ্ধধর্মীয় রীতিতে অধিমাসের হিসাব থাকায় এই বিশ বছরের হিসেবে পরিবর্তন আসতে পারে।

আবার এই বয়স গণণা শুরু হয় প্রতিসন্ধি গ্রহণ থেকে শুরু করা হয়। মাতৃগর্ভে যদি প্রতিসন্ধি গ্রহণ হয়, তাহলে সেই সময় থেকে শুরুকরে ২০ বছর পূর্ণ হলেই চলবে। কারণ বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতিঅনুসারে গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ থেকে শুরু করে বিশ বছর পূর্ণ হলেই তাকে পরিপূর্ণ বিশ বছর বয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হয়। বিনয় পিটকের মহাবর্গের ১২৪ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে কুমার কশ্যপমুনির উপসম্পদার জন্য বয়স গণনা করতে গিয়ে প্রতিসন্ধি গ্রহণ হতে শুরু করে বয়স গণনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ এক্ষেত্রে মাতৃগর্ভস্থ মাসগুলো সহ হিসাব করে বিশ বছর বয়সে উপসম্পদা দিয়ে তাঁকে পূর্ণ ভিক্ষু করা হয়েছিল। [৪]

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

গৌতম বুদ্ধের আমলে মোট আটটি পদ্ধতিতে শ্রমণ ভিক্ষুদের উপসম্পদার মাধ্যমে পূর্ণ ভিক্ষু করা হতো। কিন্তু এই আট পদ্ধতির মধ্যে ‘ঞত্তিচতুত্থ কম্ম’ ছাড়া সাতটিই বুদ্ধের অবর্তমানে করা সম্ভব নয়। তাই শুধুমাত্র ‘ঞত্তিচতুত্থ কম্ম’ই বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে। [২]

নিয়মাবলী[সম্পাদনা]

ঐতিহ্যগতভাবে, উপসম্পদা অনুষ্ঠানটি একটি সিমা (সিমা মালাকা) নামক সু-নির্ধারিত ও পবিত্র স্থানের মধ্যে সম্পাদিত হয়। এই অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভিক্ষুর উপস্থিতি প্রয়োজন; সাধারণত দশ জন তবে ন্যূনতম পাঁচজন ভিক্ষুর প্রয়োজন হয়। [৫]

এক্ষেত্রে প্রথমে একজন শ্রমণ ভিক্ষু উপসম্পদা গ্রহণের মাধ্যমে পুর্ণাঙ্গ ভিক্ষু হওয়ার যোগ্য কি-না তা পরীক্ষা করা হয়। যদি সে যোগ্য প্রমাণিত হয়; তাহলে তাকে উপসম্পদা দানের জন্য উপস্থিত হওয়া ভিক্ষুদের নিকট মোট তিনবার প্রার্থনা করতে হয়। তারপর অন্যান্য সকলের সম্মতিক্রমে উপস্থিত ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্মীয় বিধানানুযায়ী তাকে উপসম্পদা প্রদান করেন। [২][৩]

তবে পুণ্যার্জনের আশায় এই অনুষ্ঠানে গৃহী বৌদ্ধরাও শ্রদ্ধাসহকারে অংশগ্রহণ করে। তবে উপসম্পদা অনুষ্ঠান প্রব্রজ্যা অনুষ্ঠানের মতো খুববেশি জাঁকজমকের সাথে পালন করা হয় না। বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানের বৌদ্ধ বিহারগুলিতে নির্দিষ্ট সময়ে উপসম্পদা অনুষ্ঠান পালিত হয়।

নিষেধ[সম্পাদনা]

যেসব ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তিকে উপসম্পদা দেয়া যায়না:[৬]

  • মা-বাবার অনুমতিহীন ব্যক্তি: কাউকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দিতে হলে মা-বাবা দুজনেরই অনুমতি প্রয়োজন। তবে যেকোন একজনের অবর্তমানে (মারা গেলে বা অন্য কোন কারণে অনুমতি নেয়া অসম্ভব হলে) শুধু একজনের অনুমতিক্রমেই তা বৈধ।
  • পঞ্চরোগগ্রস্ত ব্যক্তি: কুষ্ঠ, একজিমা, ফোঁড়া, যক্ষা, মৃগীরোগ থাকলে তাকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া উচিৎ নয়। তবে এক্ষেত্রে এই পাঁচটি রোগ ছাড়াও যেকোন সংক্রামক এবং দুরারোগ্য ব্যাধি প্রযোজ্য।
  • রাজকর্মচারী: সরকারী চাকরিজীবী সহ সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োজিত কোন ব্যক্তিকে উপসম্পদা দেয়া যাবে না।
  • বিকলাঙ্গ: পঙ্গু, কুঁজো, বামন, অন্ধ, বধির সহ যেকোন শারীরিক অস্বাভাবিকতা থাকলে তাকে উপসম্পদা দেয়া যাবে না।
  • ঋণী ব্যক্তি: তবে ঋণ শোধ করার নিশ্চয়তা থাকলে এক্ষেত্রে কোন বাধা থাকবে না।
  • কুখ্যাত চোর-ডাকাত
  • কারাগার ভেঙে পালানো আসামী
  • দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী
  • কারও দাস/চাকর

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বড়ুয়া, সুকোমল। "প্রব্রজ্যা"bn.banglapedia.orgবাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-২২ 
  2. বড়ুয়া, সুকোমল। "উপসম্পদা"bn.banglapedia.orgবাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-২২ 
  3. "Upasampada"bn.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-২২ 
  4. "উপসম্পদার বিবিধ বিষয়"gansanta.org। সংগ্রহের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২০ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  5. Peter Skilling, How Buddhism invented Asia, 2 April 2009. Peter Skilling interviewed by Phillip Adams. Online audio recording
  6. "প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া অনুচিত এমন ব্যক্তিদের কথা"gansanta.org। সংগ্রহের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২০ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]